মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-২৩১
অর্জুনের নানা দেশে যুদ্ধ এবং বভ্রুবাহন উলূপী ও চিত্রাঙ্গদার কাহিনি
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
অর্জুনের নানা দেশে যুদ্ধ এবং বভ্রুবাহন উলূপী ও চিত্রাঙ্গদার কাহিনি
ত্রিগর্তদেশের যে সকল বীর কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন তাঁদের পুত্র-পৌত্রগণ যুধিষ্ঠিরের যজ্ঞের ঘোড়া নেওয়ার জন্য যুদ্ধ করতে এলে অর্জুন বিনয়বাক্যে তাঁদের নিবৃত্ত করবার চেষ্টা করলেন কিন্তু তারা শুনলেন না, অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগলেন। অবশেষে তারা পরাজিত হয়ে বললেন, অর্জুন, আমরা সকলে আপনার বশ্যতা স্বীকার করছি, আদেশ করুন কি করবো। অর্জুন বললেন, আমি আপনাদের জয় করেছি, আপনারা আমার অধিনে থাকবেন।
তারপর যজ্ঞীয় ঘোড়া প্রাগজ্যোতিষপুরে উপস্থিত হোলে ভগদত্তের পুত্র বজ্রদত্ত তাকে হরণ করতে এলেন। তিন দিন ঘোর যুদ্ধের পর বজ্রদত্ত তার মহাহস্তী অর্জুনের দিকে ধাবিত করলে অর্জুন নারাচের আঘাতে সেই হস্তীকে বধ কোরে বজ্রদত্তকে বললেন, মহারাজ, ভয় নেই, তোমাকে হত্যা করবো না। আগামী চৈত্রপূর্ণিমায় ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির অশ্বমেধ যজ্ঞ করবেন, তার আদেশে আমি তোমাকে সেই যজ্ঞে যাওয়ার জন্য নিমন্ত্রণ করছি। পরাজিত বজ্রদত্ত সম্মত হলেন।
যজ্ঞের ঘোড়া সিন্ধুদেশে এলে সেখানকার রাজা জয়দ্রথবধের কথা স্মরণ কোরে ক্রুদ্ধ হয়ে বিপুল সৈন্য নিয়ে অর্জুনকে আক্রমণ করলে যুদ্ধে পরাভূত হলেন। তখন ধৃতরাষ্ট্রের কন্যা জয়দ্রথপত্নী দুঃশলা তার বালক পৌত্রের সঙ্গে রথারোহণে অর্জুনের কাছে এলে অর্জুন ধনু ত্যাগ কোরে বললেন, বোন, আমি কি করবো বলো। দুঃশলা বললেন, তোমার ভাগ্নে সুরথের এই পুত্র তোমাকে প্রণাম করছে, তুমি একে আশীর্বাদে করো। অর্জুন বললেন, এর পিতা কোথায়? দুঃশলা বললেন, তুমি যুদ্ধার্থী হয়ে এখানে এসেছ শুনে আমার পুত্র সুরথ হঠাৎ প্রাণত্যাগ করেছে। দুর্যোধন ও মন্দবুদ্ধি জয়দ্রথকে তুমি ভুলে যাও, তোমার বোন ও তার পৌত্রকে দয়া করো। পরীক্ষিৎ যেমন অভিমন্যুর পুত্র, এই বালক তেমন সুরথের পুত্র। অর্জুন অতিশয় দুঃখিত হলেন এবং দুঃশলাকে সান্ত্বনা দিলেন।
যজ্ঞের ঘোড়া ভ্রমণ করতে করতে মণিপুরে এলে পিতা অর্জুন এসেছেন শুনে মণিপুরের অধিপতি বভ্রুবাহন ব্রাহ্মণগণকে সঙ্গে নিয়ে সবিনয়ে উপস্থিত হলেন। অর্জুন রুষ্ট হয়ে তাঁর পুত্রকে বললেন, তোমার আচরণ ক্ষত্রিয় ধর্মের উপযুক্ত নয়, আমি যুধিষ্ঠিরের যজ্ঞের ঘোড়ার সঙ্গে তোমার রাজ্যে এসেছি, তুমি যুদ্ধ করছ না কেন? অর্জুনের তিরস্কার শুনে নাগকন্যা উলূপী উপস্থিত হয়ে বভ্রুবাহনকে বললেন, পুত্র, আমি তোমার বিমাতা উলূপী। তুমি তোমার মহাবীর পিতার সঙ্গে যুদ্ধ করো, তা হলেই ইনি খুশি হবেন। তখন বভ্রুবাহন স্বর্ণময় বর্ম ও শিরস্ত্রাণ ধারণ কোরে রথে উঠলেন এবং অনুচরদের সঙ্গে গিয়ে অশ্ব হরণ করলেন। অর্জুন খুশি হয়ে পুত্রের সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগলেন। তুমুল যুদ্ধের পর অর্জুন বভ্রুবাহনের তীরের আঘাতে প্রাণত্যাগ কোরে ভূমিতে পড়ে গেলেন। পিতার এই অবস্থা দেখে বভ্রুবাহনও মোহগ্রস্ত হয়ে ভূপতিত হলেন।
মণিপুরের রাজমাতা চিত্রাঙ্গদা রণস্থলে এসে পতি ও পুত্রকে দেখে শোকার্ত হয়ে উলূপীকে বললেন, তোমার জন্যই আমার বালক পুত্রের হাতে মহাবীর অর্জুন নিহত হয়েছেন। তুমি ধর্মশীলা, কিন্তু পুত্রকে দিয়ে পতিকে বিনষ্ট কোরে তোমার অনুতাপ হচ্ছে না কেন? আমার পুত্রও মরেছে, কিন্তু আমি তার জন্য শোক না করে পতির জন্যই শোকাগ্রস্ত হয়েছি। আমি অনুনয় করছি, অর্জুন যদি কিছু অপরাধ কোরে থাকেন তো ক্ষমা কোরে তাঁর জীবনদান করো। ইনি বহু পত্নী গ্রহণ করেছেন, কিন্তু পুরুষের পক্ষে তা অপরাধ নয়। এইরূপ বিলাপ কোরে চিত্রাঙ্গদা দুই হাত দিয়ে অর্জুনের পা ধারণ কোরে অনশন শুরু করলেন।
এই সময়ে বভ্রুবাহনের চেতনা ফিরে এলো। তিনি ভূপতিত পিতা ও মাতাকে দেখে শোকার্ত হয়ে বললেন, আমি নৃশংস পিতৃহন্তা, ব্রাহ্মণরা আদেশ দিন আমি কোন্ প্রায়শ্চিত্ত করবো। বিমাতা, এই দেখুন, আমি অর্জুনকে বধ কোরে আপনার ইচ্ছা পূর্ণ করেছি, এখন আমিও পিতার মতো প্রাণত্যাগ করবো। এই বলে বভ্রুবাহন তার মায়ের সঙ্গে অনশন শুরু করলেন।
তখন উলূপী সঞ্জীবন মণি স্মরণ করলে তৎক্ষণাৎ সেই মণি নাগলোক থেকে চলে এলো। উলূপী তা হাতে নিয়ে বভ্রুবাহনকে বললেন, পুত্র, শোক করো না, অর্জুন দেবগণেরও অজেয়। ইনি তোমার শক্তি পরীক্ষার ইচ্ছায় যুদ্ধ করতে এসেছেন, তার খুশির নিমিত্ত আমি এই মোহিনী মায়া দেখিয়েছি। এই দিব্য মণির স্পর্শে মৃত নাগগণ জীবিত হয়, তুমি তোমার পিতার বুকে এই মণি রাখো। বভ্রুবাহন তার পিতার বুকে সেই সঞ্জীবন মণি রাখলে অর্জুন যেন দীর্ঘনিদ্রা থেকে জেগে উঠলেন এবং মস্তক আঘ্রাণ কোরে পুত্রকে আলিঙ্গন করলেন।
অর্জুন উলূপীকে বললেন, নাগরাজনন্দিনী, তুমি ও চিত্রাঙ্গদা কেন এখানে এসেছ? আমার বা বভ্রুবাহনের বা চিত্রাঙ্গদার কোনও অপরাধ হয়নি তো? উলূপী সহাস্যে বললেন, তোমরা কেউ আমার কাছে অপরাধী নও। মহাবাহু অর্জুন, তুমি যুদ্ধে অধর্মাচরণ কোরে ভীষ্মকে শিখণ্ডীর সাহায্যে হ্ত্যা করেছিলে। আজ পুত্র কর্তৃক নিহত হয়ে তুমি সেই পাপ থেকে মুক্তি পেলে। এই প্রায়শ্চিত্ত না হলে তুমি মৃত্যুর পর নরকে যেতে। গঙ্গা ও বসুগণ তোমার প্রায়শ্চিত্তের এই উপায় বলেছিলেন। দেবরাজ ইন্দ্রও তোমাকে জয় করতে পারেন না। পুত্র আত্মস্বরূপ, তাই তুমি পুত্রের কাছে পরাজিত হয়েছ।
অর্জুন উলূপীকে বললেন, তুমি উপযুক্ত কাজ করেছ। তারপর তিনি বভ্রুবাহনকে বললেন, চৈত্রপূর্ণিমায় যুধিষ্ঠির অশ্বমেধ যজ্ঞ করবেন, তুমি তোমার দুই মাতা এবং অমাত্যগণের সঙ্গে সেখানে যেয়ো। বভ্রুবাহন বললেন, পিতা, আমি সেই যজ্ঞে দ্বিজগণের পরিবেশক হবো। আজ রাতে আপনি দুই স্ত্রীর সঙ্গে আপনার এই ভবনে বিশ্রাম করুন, কাল আবার যজ্ঞের ঘোড়ার অনুগমন করবেন। অর্জুন বললেন, আমি তোমার ভবনে যেতে পারব না। এই ঘোড়া যেখানে যাবে আমাকে সেখানেই যেতে হবে। তোমার মঙ্গল হোক, আমি আর এখানে থাকতে পারব না। এই বলে পুত্র ও দুই পত্নীর নিকট বিদায় নিয়ে অর্জুন প্রস্থান করলেন।
যজ্ঞের ঘোড়া মগধে এলে জরাসন্ধের পৌত্র রাজা মেঘসন্ধি অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে এসে পরাস্ত হয়ে বশ্যতা স্বীকার করলে অর্জুন তাকে যজ্ঞে উপস্থিত হবার জন্য নিমন্ত্রণ করলেন। তার পর অর্জুন ঘোড়ার অনুসরণে সমুদ্রতীর দিয়ে বঙ্গ পুণ্ড্র কোশল প্রভৃতি দেশে গিয়ে সেখানকার ম্লেচ্ছগণকে পরাস্ত করলেন। দক্ষিণে নানা দেশে বিচরণ কোরে যজ্ঞের ঘোড়া চেদিরাজ্যে এলো। সেখানে শিশুপালের পুত্র শরভ পরাজয় স্বীকার করলেন। কাশী অঙ্গ কোশল কিরাত ও তঙ্গন দেশের রাজারা অর্জুনের সংবর্ধনা করলেন এবং দশার্ণরাজ চিত্রাঙ্গদ ও নিষাদরাজ একলব্যের পুত্র যুদ্ধে পরাস্ত হলেন। অর্জুন তারপর দক্ষিণে সমুদ্রের তীর দিয়ে চললেন এবং দ্রাবিড় অন্ধ্র মাহিষক ও কোগিরিবাসী বীরগণকে জয় কোরে সৌরাষ্ট্র গোকর্ণ ও প্রভাস অতিক্রম কোরে দ্বারকায় এলেন। যাদব কুমারগণ অর্জুনকে আক্রমণ করলে বৃষ্ণি ও অন্ধকগণের অধিপতি উগ্রসেন এবং অর্জুনের মামা বসুদেব তাদের নিবারিত কোরে অর্জুনের সংবর্ধনা করলেন।
তারপর পশ্চিম সমুদ্রের উপকুল এবং পঞ্চনদ প্রদেশ অতিক্রম কোরে যজ্ঞের ঘোড়া গান্ধার রাজ্যে এলে গান্ধারপতি বহু সৈন্য নিয়ে যুদ্ধ করতে এলে, অর্জুনের অনুরোধেও নিবৃত্ত হলেন না। তখন অর্জুন শরাঘাতে গান্ধারপতির শিরস্ত্রাণ ভেঙ্গে ফেললে গান্ধারপতি ভীত হয়ে সসৈন্যে পলায়ন করলেন, তার বহু সৈন্য অর্জুনের অস্ত্রাঘাতে বিনষ্ট হোলো। তখন গান্ধাররাজের মাতা মন্ত্রীর সঙ্গে অর্জুনের কাছে এসে তাঁকে প্রসন্ন করলেন। গান্ধারপতিকে সান্ত্বনা দিয়ে অর্জুন বললেন, ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীকে স্মরণ কোরে আমি তোমাকে হত্যা করিনি, কিন্তু তোমার বুদ্ধির দোষে তোমার অনুচরগণ নিহত হোলো। তারপর অর্জুন গান্ধারপতিকে যজ্ঞে আসবার জন্য নিমন্ত্রণ কোরে হস্তিনাপুরে যাত্রা করলেন।
______________
(ক্রমশ)