Story of Mahabharat Part 248 in Bengali Spiritual Stories by Ashoke Ghosh books and stories PDF | মহাভারতের কাহিনি – পর্ব 248

Featured Books
Categories
Share

মহাভারতের কাহিনি – পর্ব 248

মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-২৪৮

যুধিষ্ঠিরের সশরীরে স্বৰ্গযাত্রা

 

প্রাককথন

কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।

সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষ মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।

মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।

সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।

অশোক ঘোষ

 

যুধিষ্ঠিরের সশরীরে স্বৰ্গযাত্রা

ভীমের পতনের কিছুক্ষণ পরে যুধিষ্ঠিরের কাছে ইন্দ্র রথারোহণে অবতীর্ণ হলেন এবং যুধিষ্ঠিরকে বললেন, তুমি এই রথে ওঠো। যুধিষ্ঠির শোকসন্তপ্ত হয়ে বললেন, আমার ভাইয়েরা এবং দ্রৌপদী এখানে পড়ে আছেন, তাদের ফেলে আমি যেতে পারি না, আপনি তাদেরও নিয়ে চলুন। ইন্দ্র বললেন, তারা দেহত্যাগ কোরে আগেই স্বর্গে গেছেন। শোক কোরো না, তুমি সশরীরে সেখানে গিয়ে তাদের দেখতে পাবে। যুধিষ্ঠির বললেন, এই কুকুর আমার ভক্ত, একেও আমার সঙ্গে নিতে ইচ্ছা করি, নতুবা আমার পক্ষে নিষ্ঠুরতা হবে।

ইন্দ্র যুধিষ্ঠিরকে বললেন, তুমি আমার তুল্য অমরত্ব ঐশ্বর্য সিদ্ধি ও স্বর্গসুখের অধিকারী হয়েছ, এই কুকুরকে ত্যাগ করো, তাতে তোমার নিষ্ঠুরতা হবে না। যুধিষ্ঠির ইন্দ্রকে বললেন, আমি আর্য হয়ে অনার্যের আচরণ করতে পারব না। এই ভক্ত কুকুরকে ত্যাগ কোরে আমি দিব্য ঐশ্বর্যও চাই না। ইন্দ্র বললেন, যার সঙ্গে কুকুর থাকে সে স্বর্গে যেতে পারে না, ক্রোধবশ নামক দেবগণ তার যজ্ঞাদির ফল বিনষ্ট করেন। যুধিষ্ঠির, তুমি এই কুকুরকে ত্যাগ করো।

যুধিষ্ঠির ইন্দ্রকে বললেন, ভক্তকে ত্যাগ করলে ব্রহ্মহত্যার তুল্য পাপ হয়, নিজের সুখের জন্য আমি এই কুকুরকে ত্যাগ করতে পারি না। প্রাণ বিসর্জন দিয়েও আমি ভীত অসহায় আর্ত দুর্বল ভক্তকে রক্ষা করি, এই আমার ব্রত। ইন্দ্র বললেন, কুকুরের দৃষ্টি পড়লে যজ্ঞ দান হোম প্রভৃতি নষ্ট হয়।  তুমি নিজের কর্মের প্রভাবে স্বর্গলোক লাভ করেছ, এখন মোহবশে এই কুকুরকে ছাড়তে চাও না কেন? যুধিষ্ঠির বললেন, মৃত জনকে জীবিত করা যায় না, তাদের সঙ্গে কোনও সম্বন্ধও থাকে না। আমার ভাইদের ও স্ত্রীকে জীবিত করবার শক্তি নেই সেজন্যই ত্যাগ করেছি, তাদের জীবদ্দশায় ত্যাগ করিনি। আমি মনে করি, শরণাগতকে ভয় দেখানো, স্ত্রীবধ, ব্রাহ্মণের সর্বস্ব হরণ ও মিত্রবধ — এই চার কাজে যে পাপ হয়, ভক্তকে ত্যাগ করলেও সেই পাপ হয়।

তখন কুকুররূপী ভগবান ধর্ম নিজের মূর্তি ধারণ কোরে যুধিষ্ঠিরকে বললেন, তুমি উচ্চ বংশে জন্মেছ, পিতার স্বভাবও পেয়েছ। তোমার মেধা এবং সর্বভূতে দয়া আছে। পুত্র, দ্বৈতবনে আমি একবার তোমাকে পরীক্ষা করেছিলাম, তুমি ভীম ও অর্জুনের পরিবর্তে নকুলের জীবন চেয়েছিলে, যাতে তোমার মায়ের ন্যায় মাদ্রীরও একটি পুত্র থাকে। স্বর্গেও তোমার সমান কেউ নেই, কারণ তুমি কুকুরের জন্য তুমি দেবরথ ত্যাগ করতে চেয়েছ। যুধিষ্ঠির, তুমি সশরীরে স্বর্গারোহণ কোরে অক্ষয় লোক লাভ করবে। এ তারপর ধর্ম ইন্দ্র মরুৎগণ প্রভৃতি দেবতা এবং দেবর্ষিগণ যুধিষ্ঠিরকে দিব্যরথে তুলে স্বর্গে নিয়ে গেলেন। দেবর্ষি নারদ উচ্চস্বরে বললেন, যে রাজর্ষিগণ এখানে উপস্থিত আছেন তাদের সকলের চেয়ে অধিক কীর্তিমান কুরুরাজ যুধিষ্ঠির। ইনি যশ তেজ ও সম্পদে সকলকে অতিক্রম করেছেন। আর কেউ সশরীরে স্বর্গে এসেছেন এমন শুনিনি।

যুধিষ্ঠির বললেন, আমার ভাইয়েরা যে স্থানে গেছেন তা শুভ বা অশুভ যাই হোক আমি সেখানেই যেতে ইচ্ছা করি। ইন্দ্র বললেন, এখনও তুমি মানুষের স্নেহ ত্যাগ করছ না কেন? নিজের কর্ম দ্বারা যে শুভলোক জয় করেছ সেখানেই বাস করো। তুমি পরম সিদ্ধি লাভ কোরে এখানে এসেছ, তোমার ভাইয়েরা এখানে আসবার অধিকার পাননি। এখনও তোমার মানুষের মতো স্বভাব রয়েছে কেন? এ স্বর্গ, এই দেখ দেবর্ষি ও সিদ্ধগণ এখানে রয়েছেন। যুধিষ্ঠির বললেন, দেবরাজ, যেখানে আমার ভাইয়েরা আছেন, যেখানে আমার পত্নী আছেন, সেখানেই আমি যাবো।

______________

(ক্রমশ)