দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রুদ্র সেনের চোখে তখন শুধু একটাই আগুন—প্রতিশোধ। সিগারেটের ধোঁয়া ধীরে ধীরে বাতাসে মিশে যাচ্ছিল, আর তার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা হাসিটা ছিল ভয়ংকর শান্ত।
সে মনে মনে বলে "নীল রায় চৌধুরী তুই এবার আমার হাত থেকে কিছু তেই বাঁচতে পারবি না আর দেখি কি করে তুই তোর প্রিয় মানুষদের আমার হাত থেকে বাঁচাতে পারিস,, সে দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে --
তোর কোম্পানি তে আমাকে অপমান করে বের করে দেওয়া টা আমি আজও ভুলিনি।
"
এবার তুই দেখবি"
“এবার শুরু হবে আসল খেলা…”
---
সেই রাতটা মিমের জীবনে সবচেয়ে অস্বস্তিকর রাত হয়ে দাঁড়ায়।
নীলের গাড়িতে বসে আছে সে—চুপচাপ, শক্ত হয়ে। বাইরে শহরের আলো একটার পর একটা পিছনে চলে যাচ্ছে, কিন্তু গাড়ির ভেতরে একটা চাপা নীরবতা… যেন কেউ কথা বললেই কিছু ভেঙে যাবে।
নীল ড্রাইভ করছে, একদম স্থির মুখে।
"নীল আবিবা কে টেরা চোখে দেখচ্ছে। গাড়ির জানালা দিয়ে বাতাসে মিমের চুল গুলো এলোমেলো হয়ে মুখে বারি খাচ্ছে।মিমের চুল গুলো সরাতে বেস্ত। সে এই দিকে খেয়ালি করে নীল তাকে টেরা চোখে দেখছে সেটা "
“আপনি আমাকে বাসায় নামিয়ে দিন…” —মিম ধীরে বললো।
কোনো উত্তর নেই।
“আমি বলছি, আমাকে নামিয়ে দিন!”
এইবার নীল ব্রেক কষলো। গাড়ি একদম নির্জন রাস্তায় থেমে গেল।
মিম চমকে তাকালো—
“এখানে কেন থামালেন?”
নীল ধীরে তার দিকে ঘুরে তাকালো। চোখে সেই অদ্ভুত ঠান্ডা দৃষ্টি—
“তুমি এত ভয় পাচ্ছো কেন আমাকে?”
মিম বলে উঠলো ভয় পাবো না তো কি করবো "আপনার কারণে আমার জীবনের এই অবস্থা, কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসলেন আমার মাথায়। আপনি মোটেও শুভেদের নন আপনি একটা সে বলতে বলতে থেকে গেলো "
কিছুখন পর আমার মিম বলে উঠলো আপনি
“কিছুতেই আপনি স্বাভাবিক না!”
এক মুহূর্তের নীরবতা।নীল মিম এর দিকে এক নজরে তাকিয়ে আছে।
তারপর নীল হালকা হাসলো—
“ঠিক বলেছো… আমি স্বাভাবিক না।”
সে একটু ঝুঁকে এলো—
“আর তুমি যত তাড়াতাড়ি এটা মেনে নেবে… তত কম কষ্ট পাবে।”
মিমের শ্বাস আটকে গেল।
“আপনি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন?”
“না…”
নীলের গলা নরম হয়ে এলো—
“আমি তোমাকে প্রস্তুত করছি।”
"আর এটাও জানাচ্ছি যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই অভ্যেসটা করে নাও "
নীল মিমের কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বললো
"আমার প্রিয় মিম "
---
কিছুক্ষণ পর…
গাড়ি এসে থামলো মিমের বাড়ির সামনে।
মিম দরজা খুলে নামতে যাচ্ছিল, তখনই নীল তার হাতটা ধরে ফেললো।
“কাল থেকে তুমি একা কোথাও যাবে না।”
“মানে?”আপনি এখন বলতে চাইছেন আপনি আমাকে যে দিকে যেতে বলবেন আমিও সে দিকেই যাবো...?
“আমি বলছি—তুমি একা কোথাও যাবে না।”
"এটাই আমার শেষ কথা "
মিম হাত ছাড়িয়ে নিলো—
“আপনি আমার লাইফ কন্ট্রোল করতে পারেন না!”
নীল এবার একটু হাসলো—
“Already করছি…”
মিম রাগে বীরবীর করতে করতে দ্রুত বাসার ভেতরে ঢুকে গেল।
---
রাত ২টা…
সবাই ঘুমিয়ে গেছে, কিন্তু মিমের চোখে ঘুম নেই।
হঠাৎ জানালার পাশে একটা শব্দ হলো।
টিক… টিক…
মিম ধীরে ধীরে উঠে জানালার দিকে গেল। পর্দা সরাতেই—
মিম চমকে উঠলো।
নিচে দাঁড়িয়ে আছে নীল।
কালো গাড়ির পাশে হেলান দিয়ে, সিগারেট হাতে… আর সরাসরি তার জানালার দিকে তাকিয়ে।
মিম দ্রুত জানালা খুলে ফিসফিস করে বললো—
“আপনি এখানে কেন?”
নীল ধীরে ধোঁয়া ছাড়লো—
“ঘুম আসছিল না…”
“তাই বলে আমার বাড়ির সামনে?”
“তোমাকে না দেখে ঘুম আসে না।”
মিম কিছু বলার আগেই—
নীল হালকা গলায় বললো—
“আজ তুমি ভয় পেয়েছিলে…”
মিম চুপ।
“ওদের জন্য না…”
একটু থেমে—
“আমার জন্য।”
মিম নিচের দিকে তাকালো, তারপর ধীরে বললো—
“আপনি মানুষ না… আপনি একটা সমস্যা।”
নীল হেসে উঠলো—
“আর তুমি সেই সমস্যা… যেটা আমি solve করতে চাই না।”
---
পরদিন সকাল…
মিম অফিসে পৌঁছাতেই সবাই তার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকাতে লাগলো।
রিসেপশনে দাঁড়ানো মেয়েটা ফিসফিস করে বললো—
“তুই নাকি বড়লোক কারো সাথে…”
“কি?”
ঠিক তখনই—
অফিসের সামনে একের পর এক কালো গাড়ি এসে দাঁড়ালো।
সবাই থমকে গেল।
গাড়ি থেকে নামলো কয়েকজন স্যুট পরা লোক… আর তাদের মাঝখানে—
নীল।স্যুট পড়া, হাতে ঘড়ি, আর চোখে ব্ল্যাক চশমা,
তাকে দেখে মনে হচ্ছে কোনো সিনেমার নায়ক।
পুরো অফিস নিস্তব্ধ।
মিমের বুক ধড়ফড় করছে।
নীল ধীরে ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়ালো।
“Ready?”
“কিসের জন্য?”
“তোমার নতুন লাইফের জন্য।”
মিম হতবাক—
“আমি কোথাও যাচ্ছি না!”
নীল একটু ঝুঁকে তার কানে ফিসফিস করে বললো—
“তুমি already চলে গেছো… আমার দুনিয়ায়।”
তারপর সবার সামনে—
নীল তার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল।
মিম রাগে কাঁপছে—
“Leave my hand!”
নীল থামলো না।
“সবাই দেখছে!”
নীল শান্তভাবে বললো—
“Let them…”
---
অন্যদিকে…
রুদ্র সেন নিজের অফিসে বসে সব খবর পাচ্ছিল।
“স্যার, নীল রায় চৌধুরী মেয়েটাকে নিজের সাথে নিয়ে গেছে।”
রুদ্র চুপচাপ হেসে উঠলো—
“ভালো… খুব ভালো…”
তার চোখে তখন ভয়ংকর এক পরিকল্পনা—
“এবার মেয়েটাকেই টার্গেট করা যাক সে বাঁকা হাসি দিয়ে আসতে করে বললো ।”
---
সেদিন সন্ধ্যায়…
মিমকে নিয়ে যাওয়া হলো রায় চৌধুরী ভিলায়।
বড় গেট খুলে যখন গাড়ি ঢুকলো, মিম অবাক হয়ে চারপাশে তাকিয়ে রইলো—
এত বড় বাড়ি… যেন সিনেমার সেট।
গাড়ি থামতেই নীল দরজা খুলে নামলো, তারপর হাত বাড়িয়ে বললো—
“Welcome home…”
মিম গাড়ি থেকে নেমে অবাক চোখে চারিদিকে দেখছিলো কি সুন্দর ফুলের গার্ডেন মিম সেই ফুলের দিকে ছুটে গেলো, ফুল তাঁর খুব পছন্দের।
সে নিজের এক্সসাইটমেন্ট টাকে লুকিয়ে মিম এক পা পিছিয়ে গেল—
“এটা আমার বাড়ি না।”
নীল ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো—
“এখন থেকে… এটা তোমারই বাড়ি।”
মিম মাথা নাড়লো—
“আমি এখানে থাকবো না।”আমার ফ্যামিলি আছে আপনি জানেন তাহলে কেন এমন করছেন আমার সাথে ''
এক সেকেন্ডের জন্য নীলের চোখে কিছু একটা বদলে গেল—
গভীর, অন্ধকার কিছু।
সে ধীরে বললো—
“তুমি থাকবা… কারণ আমি চাই।”
---
ঠিক তখনই—
দূরে কোথাও ফোন বেজে উঠলো…
নীল কলটা রিসিভ করতেই তার মুখের ভাব বদলে গেল।
“কি?”
ওপাশ থেকে কিছু শোনার পর তার চোখ একদম কালো হয়ে গেল।
“কখন?”
মিম ভয় পেয়ে তাকিয়ে আছে।
কল কেটে দিয়ে নীল ধীরে তার দিকে তাকালো—
“তোমার ছোট ভাই… আদিল…”
মিমের বুক কেঁপে উঠলো—
“কি হয়েছে ওর?”
নীলের গলা ঠান্ডা হয়ে গেল—
“ওকে পাওয়া যাচ্ছে না।”
---
মিমের চারপাশের সবকিছু যেন থেমে গেল।
তার ঠোঁট কাঁপছে—
“মানে…?”
নীল ধীরে এগিয়ে এলো—
“Game started…
মিমের চারপাশের পৃথিবীটা যেন এক মুহূর্তে থেমে গেল—শব্দহীন, নিঃশ্বাসহীন। “ওকে পাওয়া যাচ্ছে না”—নীলের ঠান্ডা গলায় বলা কথাটা বারবার মাথার ভেতর ঘুরে ঘুরে আঘাত করতে লাগলো। তার হাত কাঁপছে, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, চোখে ভয় জমে উঠছে ধীরে ধীরে। “না… না এটা হতে পারে না… আদিল কোথাও যায় না, সে তো বাসায়ই ছিল…”—কাঁপা কাঁপা গলায় বললো মিম।
নীল চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইলো, তারপর ধীরে এগিয়ে এসে খুব স্বাভাবিক গলায় বললো—“Calm down.”
“কিভাবে calm down হবো আমি?”—মিম প্রায় চিৎকার করে উঠলো—“আমার ভাই নিখোঁজ আর আপনি আমাকে calm down হতে বলছেন?”
এক সেকেন্ডের জন্য নীলের চোখে বিরক্তি ঝলসে উঠলো, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিলো। তার কণ্ঠ এবার নিচু, কিন্তু আগের থেকেও বেশি ভয়ংকর—“চিৎকার কোরো না। আমি থাকলে কেউ তোমার পরিবারের গায়ে হাত দিতে পারবে না… যদি না আমি চাই।”
এই কথাটা শুনে মিমের বুক কেঁপে উঠলো। সে কয়েক পা পিছিয়ে গেল—“আপনি কি বলতে চাইছেন…? এটা… এটা আপনার কাজ?”
নীল হালকা মাথা কাত করলো, ঠোঁটে এক ফোঁটা রহস্যময় হাসি—“আমি এমন কাজ করি না যেটা আমাকে দুর্বল করে।”
“মানে?”
“মানে… তোমার ভাই আমার কাছে থাকলে তুমি আমার কথা শুনতে বাধ্য হতে… কিন্তু আমি চাই তুমি নিজের ইচ্ছায় আমার কাছে থাকো।”
মিমের চোখ ভিজে উঠলো—ভয়, রাগ, বিভ্রান্তি—সব একসাথে। “তাহলে কে করেছে এটা?”
নীল এবার একদম কাছে এসে দাঁড়ালো, এতটাই কাছে যে মিম তার শ্বাসের গরম বাতাস অনুভব করতে পারছে—“যে আমাদের খেলা শুরু করতে চায়…”
রাত নামতেই রায় চৌধুরী ভিলা আরও বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠলো। চারপাশে আলো জ্বলছে, কিন্তু তবুও যেন কোথাও অন্ধকার লুকিয়ে আছে। মিম বসে আছে নীলের রুমটা মাস্টার বেডরুম অনেক বড়ো এবং পরিপাটি করে সাজানো —বিশাল, ঠান্ডা, অচেনা একটা ঘর। সে বারবার ফোন করছে বাসায়, কিন্তু কেউ ধরছে না।
হঠাৎ দরজা খুলে ঢুকলো নীল।
“কিছু খেয়েছো?”
“আমার খাওয়া নিয়ে আপনার ভাবার দরকার নেই!”
নীল একটু থামলো, তারপর ধীরে বললো—“তুমি যদি না খাও তো অসুস্থ হয়ে যাবে আমি সেটা কিছুতেই চাই না প্লিস কিছু খেয়ে নাও ….. তুমি না খেলে আমিও খাওয়াবো।”
“Don’t you dare!”
এক সেকেন্ড… তারপর নীল হেসে ফেললো—
“তোমার এই attitude টা…”
সে ধীরে এগিয়ে এলো—
“খুব dangerous।”
মিম চোখ ফিরিয়ে নিলো—“আমি আপনাকে ভয় পাই না।”
নীল ফিসফিস করে বললো—
“তুমি আমাকে ভয় পাও… শুধু এখনো মানতে চাইছো না।”
ঠিক তখনই—
নীলের ফোন বেজে উঠলো।
সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো, তারপর কলটা রিসিভ করলো—
“বল।”
ওপাশ থেকে যা বলা হলো, সেটা শুনে নীলের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
“লোকেশন পাঠাও।”
কল কেটে দিয়ে সে একদম অন্য মানুষ হয়ে গেল—চোখে খুনে রাগ, শরীর টানটান।
মিম দৌড়ে তার সামনে এসে দাঁড়ালো—
“কি হয়েছে? আমার ভাইয়ের খবর পেয়েছেন?”
নীল এক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইলো… তারপর বললো—
“ওকে পাওয়া গেছে।”
মিমের চোখে হঠাৎ আলো জ্বলে উঠলো—
“কোথায়? ও ঠিক আছে?”
নীল উত্তর দিল না।
“বলুন!”
নীল ধীরে বললো—
“ওরা ওকে ছেড়ে দেবে না এত সহজে…”
“মানে?”
“তুমি আমার সাথে আসছো।”
রাত ১১টা…
কালো গাড়ির শহরের বাইরে একটা পরিত্যক্ত গুদামের সামনে গিয়ে থামলো। চারপাশে অন্ধকার, শুধু দূরে একটা ঝাপসা আলো।
মিমের হাত শক্ত করে ধরে আছে নীল।
“ভয় পাচ্ছো?”
মিম কিছু বললো না।
“ভয় পাওয়া উচিত…”
গুদামের ভেতরে ঢুকতেই একটা ঠান্ডা গন্ধ… ধুলো, মরিচা আর ভয় মিশে আছে বাতাসে।
হঠাৎ—
“Welcome, Mr. Roy Chowdhury…”
অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এলো রুদ্র সেন।
তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন লোক… আর তাদের মাঝখানে—
চেয়ার বাঁধা অবস্থায় আদিল।
মিম চিৎকার করে উঠলো—
“আদিল!”
ছেলেটা মাথা তুলে তাকালো—চোখে ভয়, মুখে আঘাতের দাগ।কান্না করতে করতে সে ডাক দেয়
“দিদি…”
মিম ছুটে যেতে চাইলো, কিন্তু নীল তাকে ধরে রাখলো।
“Not now…”
রুদ্র ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো—
“কেমন আছো, নীল?”
নীল ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বললো—
“তুই ভুল লোককে ছুঁয়েছিস।”
রুদ্র হেসে উঠলো—
“না… আমি ঠিক জায়গায় আঘাত করেছি।”
তার চোখ এবার মিমের দিকে গেল—
“এই মেয়েটা… interesting choice।”
নীলের শরীর একদম শক্ত হয়ে গেল—
“ওর দিকে তাকাবি না।”
রুদ্র ঠোঁট বাঁকালো—
“ওই মেয়েটার জন্য তুই দুর্বল হয়ে গেছিস, নীল… আর সেটাই তোর শেষ।”
হঠাৎ—
একটা বন্দুকের শব্দ!
মিম চমকে উঠে চোখ বন্ধ করে ফেললো।
চারপাশে চিৎকার, দৌড়ঝাঁপ… গুলির আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
নীল এক হাতে মিমকে নিজের দিকে টেনে নিলো, অন্য হাতে বন্দুক তুলে গুলি চালাতে লাগলো—একদম নিখুঁত, ঠান্ডা।
“Stay behind me!”
মিম তার শার্ট শক্ত করে ধরে আছে, কাঁপছে।
এই প্রথম—সে বুঝতে পারলো…
নীল শুধু বিপজ্জনক না—সে ভয়ংকর।
কিছুক্ষণ পর…
সব শান্ত।
মাটিতে পড়ে আছে কয়েকজন লোক।
রুদ্র নেই।
সে পালিয়ে গেছে।
নীল দ্রুত গিয়ে আদিলের বাঁধন খুলে দিলো।
মিম দৌড়ে গিয়ে ভাইকে জড়িয়ে ধরলো—
“তুই ঠিক আছিস?”
আদিল কাঁপা গলায় বললো—
“ওরা বলছিল… দিদি তুই নাকি…”
মিম তার মুখ চেপে ধরলো—
“কিছু বলবি না… আমি আছি।”
সবকিছু শেষ হওয়ার পর…
মিম ধীরে ধীরে নীলের দিকে তাকালো।
“আপনি এইসবের মধ্যে কেন?”
নীল কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো…
তারপর ধীরে বললো—
“কারণ আমি অন্ধকারে জন্মেছি…”
সে মিমের দিকে তাকালো—
“আর তুমি… আমার সেই আলো… যাকে আমি হারাতে পারবো না।”
দূরে কোথাও…
রুদ্র সেন রক্তাক্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
তার চোখে তখন একটাই প্রতিজ্ঞা—
“এটা শেষ না… এটা শুধু শুরু…”
গুদামের ভেতরের গুলির গন্ধ এখনো বাতাসে ঝুলে আছে—ধোঁয়া, রক্ত আর ভয় মিশে একটা ভারী নীরবতা তৈরি করেছে। মিম এখনো আদিলকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে, যেন ছেড়ে দিলেই আবার কেউ ছিনিয়ে নিয়ে যাবে। আদিলের শরীর কাঁপছে, চোখে আতঙ্ক জমে আছে—সে বারবার শুধু একটাই কথা বলছে, “দিদি… ওরা খুব খারাপ ছিল…”
মিম তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, নিজের চোখের জল চেপে রেখে বলছে—“আমি আছি… কিছু হবে না…” কিন্তু তার নিজের গলার ভেতরেই কাঁপন, কারণ সে জানে—সবকিছু এত সহজে শেষ হয়নি।
🌸
পেছনে দাঁড়িয়ে নীল সবকিছু দেখছে। তার শার্টে রক্তের দাগ, হাতে এখনো বন্দুক… কিন্তু তার চোখ শুধু মিমের উপর। অদ্ভুত একটা শান্তি আর ঝড় একসাথে খেলা করছে তার ভেতরে।
ঋত্বিক ধীরে এগিয়ে এসে বললো—“ভাই, এখানে থাকা সেফ না… পুলিশ আসতে পারে।”
নীল চোখ না সরিয়েই বললো—“গাড়ি রেডি কর।”
কিছুক্ষণ পর…
কালো গাড়ির দরজা বন্ধ হতেই বাইরের পৃথিবী যেন আবার দূরে সরে গেল।
মিম মাঝখানে বসে আছে—এক পাশে আদিল, অন্য পাশে নীল।
কেউ কিছু বলছে না। শুধু গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ আর মাঝে মাঝে আদিলের কাঁপা শ্বাস।
হঠাৎ—
“পানি…” —আদিল ফিসফিস করে বললো।
মিম তাড়াতাড়ি ব্যাগে হাতড়াতে লাগলো, কিন্তু কিছু পেল না।
এর আগেই নীল তার নিজের বোতলটা এগিয়ে দিলো—
“Take it.”
মিম কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বোতলটা নিলো। তাদের আঙুল ছুঁয়ে গেল এক মুহূর্তের জন্য—মিম দ্রুত চোখ সরিয়ে নিলো।
রায় চৌধুরী ভিলায় ফিরে আসতেই পুরো পরিবেশ বদলে গেল।
গেট খুলে গাড়ি ঢুকতেই গার্ডরা একদম সতর্ক হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। ভেতরে ঢুকতেই কয়েকজন স্টাফ দৌড়ে এলো—ডাক্তার, সিকিউরিটি, সবাই।
আদিলকে নিয়ে যাওয়া হলো মেডিকেল রুমে।
মিমও যেতে চাইছিল, কিন্তু নীল তার হাত ধরে থামিয়ে দিলো—
“ও ঠিক হয়ে যাবে।”
“আমি ওর সাথে যাবো!”
“ডাক্তার আছে।”
“আমি ওর দিদি!”
নীল এবার একটু শক্ত করে তার হাত ধরলো—
“আর তুমি আমার দায়িত্ব।”
এই কথাটা শুনে মিম রেগে উঠলো—
“আমি কোনো দায়িত্ব না! আমি মানুষ!”
নীল কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো, তারপর ধীরে বললো—
“Exactly… আর সেই কারণেই তোমাকে আমি হারাতে পারি না।”
মিম তার হাত ছাড়িয়ে নিলো।
“আপনার এই ‘হারাতে পারি না’—এইসব কথার মানে কি?”
নীল এক পা এগিয়ে এলো—
“মানে… তুমি আমার।”
“আমি কারো না!”
“তুমি আমার।”
“না!”
“হ্যাঁ।”
দুজনের চোখে চোখ—একটা তীব্র লড়াই।
হঠাৎ—
মিমের চোখ ভিজে উঠলো।
“আপনার জন্যই এসব হচ্ছে…”
নীল থমকে গেল।
“আপনার জন্যই আমার ভাইকে কিডন্যাপ করা হলো… আমার লাইফ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে…”
একটা ভারী নীরবতা নেমে এলো।
নীলের চোখের ভেতরে কিছু একটা ভেঙে গেল যেন।
সে খুব ধীরে বললো—
“আমি ঠিক করে দেবো…”
“সবকিছু ঠিক হয় না…”
সেই রাত…
মিমকে দেওয়া হলো একটা আলাদা রুম।
বড়, সুন্দর, বিলাসবহুল—কিন্তু তার কাছে যেন একটা সোনার খাঁচা।
সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। দূরে গার্ডদের চলাফেরা, সিকিউরিটি লাইট… সবকিছু খুব নিয়ন্ত্রিত।
তার মাথায় ঘুরছে হাজারটা প্রশ্ন—
“আমি কি এখানে বন্দি?”
“নীল কি সত্যিই আমাকে প্রোটেক্ট করছে… নাকি নিজের কাছে আটকে রাখছে?”
হঠাৎ দরজায় নক।
টক… টক…
মিম কোনো উত্তর দিল না।
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো নীল।
সে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলো, তারপর ধীরে বললো—
“খাবার পাঠানো হয়েছে… কিছু খেয়ো।”
মিম ঘুরেও তাকালো না—
“আমার ক্ষিদে নেই।”
নীল একটু কাছে এলো—
“তোমার শরীর ঠিক রাখা দরকার।”
“আমার শরীর নিয়ে ভাবার দরকার নেই আপনার।”
নীল এবার একটু বিরক্ত হলো—
“তুমি সবকিছু এত কঠিন করে দিচ্ছো কেন?”
মিম হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ালো—
“কারণ আপনি আমার জীবনটা কঠিন করে দিয়েছেন!”
এক মুহূর্তের নীরবতা।
তারপর—
নীল ধীরে এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়ালো।
“তুমি চলে যেতে পারো…”
মিম থমকে গেল—
“কি?”
“যদি চাও… এখনই চলে যেতে পারো।”
মিম অবিশ্বাসের চোখে তাকালো—
“সত্যি?”
নীল মাথা নেড়ে সরে দাঁড়ালো—
“Door is open.”
মিম এক পা এগিয়ে গেল… তারপর আরেক পা…
দরজার কাছে গিয়ে থেমে গেল।
তার বুক ধকধক করছে।
কেন যেন… সে যেতে পারছে না।
ধীরে ধীরে পিছনে ফিরে তাকালো।
নীল ঠিক আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে—চোখে এক অদ্ভুত শান্তি, কিন্তু সেই শান্তির নিচে লুকিয়ে আছে ভয়।
মিম ধীরে বললো—
“আপনি জানতেন… আমি যাবো না…”
নীল খুব আস্তে হাসলো—
“আমি জানি… তুমি পারবে না।”
“কেন?”
নীল এক পা এগিয়ে এলো—
“কারণ তুমি এখন এই অন্ধকারের অংশ হয়ে গেছো…”
সে ফিসফিস করে বললো—
“আর আমি… তোমার একমাত্র বের হওয়ার রাস্তা।”
দূরে কোথাও…
রুদ্র সেন আবার নতুন করে পরিকল্পনা সাজাচ্ছে।
তার সামনে টেবিলে মিমের ছবি।
সে আঙুল দিয়ে ছবিটা ছুঁয়ে বললো—
“এই মেয়েটাই হবে নীলের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা… আর আমি সেই দুর্বলতাকেই শেষ করে দেবো…”
তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে এক শয়তানি হাসি ফুটে উঠলো।
অন্ধকার আরও ঘন হয়ে আসছে…
খেলা এখনো শেষ হয়নি—
বরং… আরও ভয়ংকর হতে যাচ্ছে।