রাতটা যেন শেষই হচ্ছিল না—রায় চৌধুরী ভিলার চারপাশে নেমে আসা নীরবতা ধীরে ধীরে আরও ভারী হয়ে উঠছিল, যেন অদৃশ্য কিছু একটা অপেক্ষা করছে। মিম জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল অনেকক্ষণ, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্লান্ত শরীরটা বিছানায় ফেলতেই চোখ লেগে আসে… তবুও ঘুমটা ছিল অস্থির, ভাঙা ভাঙা।
হঠাৎ—
কোনো এক তীক্ষ্ণ শব্দে তার ঘুম ভেঙে গেল।
টক… টক…
দরজায় আবার নক।
মিম চোখ মেলে উঠে বসল—হৃদপিণ্ডটা জোরে ধকধক করছে।
“কে?”
কোনো উত্তর নেই।
সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল, হাত বাড়িয়ে লক খুললো…
দরজা খুলতেই—
কেউ নেই।
ফাঁকা করিডোর, নিস্তব্ধ।
মিম একটু এগিয়ে বাইরে তাকালো… ঠিক তখনই—
পিছন থেকে একটা ঠান্ডা বাতাস তার গায়ে লাগলো।
সে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ালো—
আর তার চোখ একদম বিস্ফোরিত হয়ে গেল।
তার রুমের ভেতরে…
বিছানার ওপর রাখা একটা কালো বাক্স।
“এটা… কে রাখলো?”
তার হাত কাঁপতে কাঁপতে বাক্সটার দিকে এগিয়ে গেল।
ধীরে ধীরে ঢাকনা তুলতেই—
ভেতরে একটা মোবাইল ফোন… আর একটা কাগজ।
মিম কাগজটা তুলে নিলো।
লেখা—
“Game isn’t over yet.”
তার বুকের ভেতর ঠান্ডা একটা ভয় নেমে এলো।
ঠিক তখনই—
ফোনটা বেজে উঠলো।
ট্রিং… ট্রিং…
মিম কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো, তারপর কাঁপা হাতে কলটা রিসিভ করলো—
“হ্যালো…?”
ওপাশ থেকে ধীরে, টেনে টেনে একটা গলা—
“ঘুম ভাঙিয়ে দিলাম?”
মিমের শরীর জমে গেল—
“কে…?”
একটা হালকা হাসি—
“তুমি আমাকে চেনো… খুব ভালো করেই চেনো।”
মিমের গলা শুকিয়ে গেল—
“রুদ্র…”
“Good girl…”
মিম কাঁপা গলায় বললো—
“তুমি আবার কি চাও?”
রুদ্র শান্তভাবে বললো—
“তোমাকে।”
“আমি কোনো জিনিস না!”
“আমার কাছে… তুমি একটা চাবি।”
“কিসের?”
“নীলের পতনের।”
---
ঠিক তখনই—
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো নীল।
তার চোখ একদম তীক্ষ্ণ—সে এক নজরে সব বুঝে গেল।
“Phone give me.”
মিম কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু নীল ফোনটা কেড়ে নিলো—
“রুদ্র…”
ওপাশ থেকে হাসি—
“Nice timing.”
নীলের গলা একদম ঠান্ডা—
“তুই ভুলে গেছিস আমি কে?”
রুদ্র উত্তর দিল—
“না… তাই তো খেলা খেলছি।”
“Stay away from her.”
“Too late…”
কল কেটে গেল।
---
ঘরের ভেতরে হঠাৎ একটা ভারী নীরবতা নেমে এলো।
নীল ধীরে ফোনটা নামালো, তারপর মিমের দিকে তাকালো—
“সে এখানে এসেছিল।”
মিম কাঁপা গলায় বললো—
“মানে… এই বাড়ির ভেতরে?”
“হ্যাঁ।”
“কিভাবে?”
নীল কোনো উত্তর দিল না। তার চোখে তখন শুধু রাগ—নিজের ওপর, সিকিউরিটির ওপর, পুরো পরিস্থিতির ওপর।
হঠাৎ সে দরজার দিকে ঘুরে চিৎকার করে উঠলো—
“Security!”
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লোকজন দৌড়ে এলো।
“এই ফ্লোরে কে ডিউটিতে ছিল?”
সবাই চুপ।
নীলের চোখ ভয়ংকর হয়ে উঠলো—
“Find him… NOW.”
---
সবাই চলে গেলে…
ঘরে শুধু নীল আর মিম।
মিম ধীরে বললো—
“আমি এখানে সেফ না…”
নীল তার দিকে তাকালো—
“তুমি আমার সাথে থাকলে সেফ।”
“কিন্তু সে তো এখানে ঢুকে গেছে!”
“That was a mistake…”
“না! এটা একটা warning!”
---
মিমের চোখে ভয় স্পষ্ট—
“সে আমাকে টার্গেট করছে…”
নীল ধীরে এগিয়ে এলো—
“সে তোমাকে ব্যবহার করতে চাইছে…”
“আর আপনি?”
প্রশ্নটা শুনে নীল থেমে গেল।
এক সেকেন্ড… দুই সেকেন্ড…
তারপর সে খুব আস্তে বললো—
“আমি তোমাকে হারাতে চাই না…”
---
হঠাৎ—
বাইরে আবার একটা শব্দ!
গ্লাস ভাঙার আওয়াজ!
নীল এক ঝটকায় মিমকে নিজের পেছনে টেনে নিলো।
“Stay here.”
সে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে গেল।
মিম দাঁড়িয়ে আছে, নিঃশ্বাস আটকে।
কয়েক সেকেন্ড…
তারপর—
দূরে চিৎকার, দৌড়ঝাঁপ…
আর একটা শব্দ—
গুলির।
---
মিম আর থাকতে পারলো না।
সে দৌড়ে বেরিয়ে গেল।
করিডোরে গিয়ে দেখলো—
একজন গার্ড মাটিতে পড়ে আছে… আর জানালার কাঁচ ভাঙা।
নীল দাঁড়িয়ে আছে, বন্দুক হাতে।
তার চোখে সেই আগুন—
“সে এখানেই ছিল…”
---
মিম ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল।
তার মাথায় তখন একটাই কথা—
“এই খেলা… খুব বড়…”
---
নীল ধীরে তার দিকে তাকালো—
“এখন থেকে… তুমি একা এক মুহূর্তও থাকবে না।”
“আমি বন্দি হয়ে যাচ্ছি…”
“না…”
নীল এগিয়ে এলো—
“তুমি আমার সুরক্ষায় আছো।”
---
মিম চোখ বন্ধ করে ফেললো এক মুহূর্তের জন্য।
তার মনে হলো—
সে একটা জালে আটকে গেছে…
যেখান থেকে বের হওয়ার রাস্তা নেই।
একদিকে নীল—যে তাকে ছাড়তে চায় না…
আরেকদিকে রুদ্র—যে তাকে ব্যবহার করতে চায়।
---
রাতটা আবার নেমে এলো…
কিন্তু এবার সেই রাতের ভেতরে লুকিয়ে আছে আরও বড় ঝড়।
কারণ—
খেলা এখন ব্যক্তিগত হয়ে গেছে।
রাতটা যেন আর শান্ত থাকতে চাইছে না—রায় চৌধুরী ভিলার প্রতিটা করিডোরে এখন টানটান উত্তেজনা, প্রতিটা কোণায় সন্দেহ। ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলো এখনো মেঝেতে ছড়িয়ে, সেগুলোর ওপর আলো পড়লে যেন ঝলসে উঠছে সেই মুহূর্তটার স্মৃতি—যখন রুদ্র ঠিক এখানেই ছিল… এতটা কাছে।
মিম করিডোরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে, বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছে। তার মনে হচ্ছে—এই বাড়ির দেয়ালগুলোও তাকে দেখছে, শ্বাস নিচ্ছে, আর অপেক্ষা করছে।
নীল একটু দূরে দাঁড়িয়ে গার্ডদের নির্দেশ দিচ্ছে—তার গলা ঠান্ডা, কিন্তু প্রতিটা শব্দে চাপা আগুন।
“সব ক্যামেরা ফুটেজ চেক করো… একটাও ব্লাইন্ড স্পট যেন না থাকে… আর যে গার্ড ডিউটিতে ছিল—ওকে আমার সামনে নিয়ে আসো।”
“জি স্যার…”
সবাই ছুটে গেল।
---
মিম ধীরে বললো—
“আপনি কাউকে বিশ্বাস করেন?”
নীল থেমে গেল।
কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সে উত্তর দিল—
“না।”
“আমাকেও না?”
এই প্রশ্নে নীল তার দিকে তাকালো—একটা অদ্ভুত দৃষ্টি।
“তোমাকে…”
সে একটু থামলো—
“আমি বিশ্বাস করতে চাই।”
---
এই উত্তরটা মিমকে আরও বেশি অস্বস্তিতে ফেলে দিল।
সে ধীরে বললো—
“আপনার এই ‘চাওয়া’ আর ‘না চাওয়া’—এইসবের মাঝখানে আমি আটকে যাচ্ছি…”
নীল এগিয়ে এলো—
“তুমি বের হতে পারবে না।”
“কেন?”
“কারণ তুমি এখন এই গল্পের কেন্দ্র।”
---
ঠিক তখনই—
ঋত্বিক দৌড়ে এলো—
“ভাই… ফুটেজে কিছু পেয়েছি!”
নীলের চোখ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো—
“Show me.”
---
কন্ট্রোল রুম—
বড় বড় স্ক্রিনে ভিলার প্রতিটা কোণ দেখা যাচ্ছে।
ঋত্বিক একটা ফুটেজ প্লে করলো—
রাত ২টা ১৭ মিনিট…
একজন গার্ড নিজেই দরজা খুলে দিচ্ছে… আর তার পেছনে—
কালো হুডি পরা একজন লোক।
মুখ দেখা যাচ্ছে না… কিন্তু তার হাঁটার স্টাইল, আত্মবিশ্বাস—সবকিছুই চেনা।
রুদ্র।
---
মিম নিঃশ্বাস আটকে দেখছে।
“ও… এত সহজে ঢুকে গেল?”
নীলের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল—
“Inside help…”
---
হঠাৎ—
আরেকটা ফুটেজ।
সেই গার্ড—যে দরজা খুলেছিল—
সে এখন একটা অন্ধকার কোণায় দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে—
“হ্যাঁ… কাজ হয়ে গেছে…”
এর পর—
হঠাৎ পেছন থেকে কেউ এসে তার গলায় ছুরি বসিয়ে দিলো।
স্ক্রিন লাল হয়ে গেল।
---
মিম চমকে উঠলো—
“ওকে… মেরে ফেললো?”
ঋত্বিক ধীরে বললো—
“হ্যাঁ…”
---
ঘরের ভেতর ভারী নীরবতা।
নীল ধীরে বললো—
“সে নিজের ট্রেস মুছে দিচ্ছে…”
---
মিম ধীরে পিছিয়ে গেল।
“এই লোকটা… পাগল…”
নীল তার দিকে তাকালো—
“না…”
“সে খুব হিসেবি।”
---
হঠাৎ—
একটা অদ্ভুত শব্দ—
বিপ… বিপ… বিপ…
সবাই থেমে গেল।
ঋত্বিক চারদিকে তাকালো—
“এই সাউন্ডটা… কোথা থেকে আসছে?”
---
নীলের চোখ হঠাৎ নিচে গেল—
টেবিলের নিচে একটা ছোট ডিভাইস।
লাল লাইট ব্লিঙ্ক করছে।
---
“Everyone back!”
---
মিম কিছু বুঝে ওঠার আগেই—
নীল দৌড়ে এসে তাকে টেনে নিজের সাথে মাটিতে ফেলে দিলো।
এক সেকেন্ড…
দুই সেকেন্ড…
---
বুম!!!
একটা তীব্র বিস্ফোরণ—
পুরো রুম কেঁপে উঠলো, কাঁচ ভেঙে চারদিকে উড়ে গেল, ধোঁয়ায় ঢেকে গেল সবকিছু।
---
কিছুক্ষণ… শুধু শোঁ শোঁ শব্দ।
মিমের কানে কিছুই ঠিকমতো আসছে না।
সে চোখ খুললো—চারপাশ ধোঁয়ায় ভরা।
তার ওপর নীল ঝুঁকে আছে—নিজের শরীর দিয়ে তাকে ঢেকে রেখেছে।
তার কপালে কেটে গেছে, রক্ত ঝরছে।
---
“আপনি…?”
নীল ধীরে চোখ খুললো—
“আমি ঠিক আছি…”
---
মিম হঠাৎ তার হাত ধরে ফেললো—
“আপনি রক্তাক্ত!”
নীল হালকা হেসে বললো—
“First time… তুমি আমার জন্য চিন্তা করলে?”
মিম কিছু বললো না।
---
চারপাশে লোকজন দৌড়াচ্ছে, কেউ চিৎকার করছে—
“Fire! Fire!”
---
নীল ধীরে উঠে দাঁড়ালো, তারপর মিমকে উঠতে সাহায্য করলো।
তার চোখ এখন আগের থেকেও বেশি ভয়ংকর—
“Enough is enough…”
---
সে ফোন বের করে একটা নম্বরে কল করলো—
“সব লোক নামাও… শহরের প্রতিটা কোণা চেক করো… আমি রুদ্রকে আজই চাই।”
---
কল কেটে দিয়ে সে মিমের দিকে তাকালো—
“এখন থেকে… খেলা শেষ…”
---
মিম ধীরে বললো—
“না…”
নীল থেমে গেল—
“কি?”
“এটা এখনো শুরু…”
---
দুজনের চোখে চোখ—
দুজনেই বুঝে গেল—
এটা শুধু প্রতিশোধ না…
এটা এখন একটা যুদ্ধ।
---
দূরে কোথাও…
রুদ্র সেন একটা উঁচু বিল্ডিংয়ের ছাদে দাঁড়িয়ে শহরের দিকে তাকিয়ে আছে।
তার কানে এখনো বাজছে সেই বিস্ফোরণের প্রতিধ্বনি।
সে হালকা হাসলো—
“Feel the chaos, Neel…”
---
রাতটা জ্বলছে—
আর সেই আগুনের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে তিনটা জীবন—
নীল, মিম… আর রুদ্র।
---