The Fire of Dormant Love - 13 in Bengali Thriller by L Anjum Author books and stories PDF | সুপ্ত প্রেমের আগুন - 13

Featured Books
Categories
Share

সুপ্ত প্রেমের আগুন - 13

ভোরের প্রথম আলো কুয়াশার আড়ালে লুকিয়ে আছে। ঘর নীরব, এমন নীরব যেন আকাশের প্রতিটি ফোঁটা চুপ করে তাকিয়ে আছে। ঐশীর চোখ এখনও খোলা। সারারাত ঘুমায় নি। আযলানের আগের দিনের ঝড়ো দৃষ্টি, ভেজা শার্টে স্পর্শ—সব কিছু এখনও চোখের সামনে নাচছে। বুক কেঁপে ওঠে, ঠোঁট কাঁপে, হাত অচেতনভাবে টেবিলের ওপর, কাগজের ওপর অথবা নিজের বুকের ওপর—যেখানে যেন আযলানের স্পর্শের ছাপ লেগে আছে।


ঘড়ির কাঁটা ভোরের দিকে এগোচ্ছে। মৃদু বাতাস জানালার ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকছে। ঠোঁটের ওপর পড়ে, কানে আঘাতমুখর ভিজা বাতাসের মতো, কিন্তু মনে কোনো শীতলতা নেই—বরং মনে হলো আগুনের মতো। ঐশী হালকা শ্বাস নিয়ে চোখ চাপতে লাগলো। সারারাত তার মন আর শরীর যেন একসাথে আযলানের দখলে ছিল।


হঠাৎ দূরে মসজিদের মিনা থেকে ভোরের আযান শুরু হলো। বাতাসে ভেসে আসছে সেই শান্ত, গভীর সুর। প্রতিটি শব্দ যেন ঐশীর হৃদয়ে ধাক্কা মারছে। কণ্ঠের ভিব্রেশন, আর্থিক শব্দ, কিন্তু ভেতরে যে টানাপোড়েন—কোনো শব্দে প্রকাশ করা যায় না।


ঐশী জানালার পাশে বসে। হাত ঠোঁটে, চোখ বন্ধ। ভেতরের উত্তেজনা আর ভয়, আগ্রহ আর দ্বিধা—সব মিলিয়ে একটি অদ্ভুত সিম্ফনি তৈরি করছে। মনে মনে সে বলছে—“কেন… কেন আযলান আমাকে এত গভীরভাবে স্পর্শ করেছে? কেন আমি তার কাছে পালাতে পারছি না?”


ঘরের শান্তি ভেঙে যায়, কিন্তু বাইরে আযানের সুর যেন শান্তি দিচ্ছে। ঐশী চোখ বন্ধ রেখেও অনুভব করতে পারছে—প্রতিটি আযানের শব্দ তার হৃদয়ে পৌঁছে। ঠোঁটের কাঁপুনি আর বুকের দ্রুত ওঠা-নামা—সব মিলিয়ে একটি ভয়-উত্তেজনার মিশ্রণ।


ঘুমের অনুপস্থিতিতে তার মন এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বে ছড়িয়ে গেছে। আযলানের আগুনের দৃষ্টি, স্পর্শ, এবং উন্মাদ কথাবার্তা—সবকিছুই বারবার ভেসে উঠছে। সে জানে, এই অনুভূতি শুধু শারীরিক নয়, বরং মনেরও।


হঠাৎ কল্পনায় আযলান আবার উপস্থিত হলো। ভেজা শার্টে, চোখে আগুন, শরীরে ঝড়ের মতো শক্তি। ঐশী হঠাৎ চুপচাপ হয়ে যায়। মনে মনে সে চায়, এই মুহূর্ত যেন থেমে যায়। বুকের ভেতর কাঁপুনি, হৃদয়ের স্পন্দন—সবই যেন আযলানের হাতে বন্দি। 


আযানের কণ্ঠের স্মৃতি আবার ভেসে উঠলো—“তুমি যতই এড়াও… আমি তোমাকে ছাড়ব না।”

ঐশীর চোখ কেঁপে উঠলো, কণ্ঠ কেঁপে উঠলো, কিন্তু সে কিছু বলতে পারলো না। ভোরের নীরবতায় শুধুই আযানের কথা যেন ঘরের প্রতিটি কোণে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।


নিশ্চিন্ত বাতাস জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকছে। ঐশী হাত দিয়ে ঠোঁট স্পর্শ করলো—সেখানে এখনও আগুনের ছাপ লেগে আছে। মনে মনে সে বলছে—“আমি কি সত্যিই পালাতে পারব? নাকি হৃদয় ইতিমধ্যেই তার দিকে গেছে?”


ঘরে থাকা ছোট্ট নিঃশব্দ আকাশের আলোও যেন ঐশীর দ্বন্দ্ব বোঝে। প্রতিটি ধোঁয়া, প্রতিটি আলো—সব মিলিয়ে একটি অদ্ভুত আবহ সৃষ্টি করছে।


ঘন্টা গুনতে গুনতে ভোরের আযান শেষ হলো। ঐশী গভীর নিশ্বাস নিল। চোখের পানি গড়াতে লাগলো। জানালা দিয়ে ধূসর আলো পড়ছে, কিন্তু মন এখনও ঝড়ো। মনে হলো—আযান যেন শুধু তার কানেই নয়, বরং হৃদয়েও বাজছে।


ঐশী ধীরে ধীরে বিছানায় বসে, দু’হাত মুখে চেপে ধরলো। মনে মনে বলছে—“আজ রাত, সারারাত… আমি কখনো ঘুমাইনি, কারণ মন যেন তার জন্য জেগে আছে। কি করব? কীভাবে হারাবো এই টানাপোড়েন?”


বাইরে আকাশে সূর্যের কিরণ ধীরে ধীরে ঝাপসা আলো ছড়াচ্ছে। কিন্তু ঐশীর হৃদয়ে সূর্যের আলো নয়, বরং আযলানের আগুন জ্বলছে। সে জানে, আজকের দিন শুরু হলো শুধু ভোরের সঙ্গে নয়, বরং এক দীর্ঘ দ্বন্দ্বের সূচনা।


একটি গভীর নিশ্বাস নিয়ে ঐশী বললো—“আমি যদি আজ ঘুমাতে পারি… তবে কি স্বপ্নেও সে আমাকে খুঁজে পাবে?”

নিঃশব্দ ঘরে কেবল তার কণ্ঠের কম্পন, হৃদয়ের স্পন্দন, এবং ভোরের আযানের সুর—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত মেলডি তৈরি করছে।


মুহূর্তের পর মুহূর্তে মনোবেদনা, উত্তেজনা, ভয়, এবং আগ্রহ—সব মিলিয়ে একটি অদ্ভুত সিম্ফনি তৈরি করছে। ঐশী জানে, ভোরের আযান কেবল ধর্মীয় শব্দ নয়, বরং তার হৃদয়ের প্রতিফলন।


সেদিন ভোরের নীরবতা ছিল শুধু প্রকৃতির নয়—ঐশীর অন্তরেও এক অদ্ভুত ঝড় বইছে। প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি স্মৃতি—সব মিলিয়ে তার হৃদয়কে নতুন পথে পরিচালিত করছে।

৪:৩০~


“ঐশী আম্মু উঠে পড়ো, নাস্তা তৈরি, ঠান্ডা হয়ে যাবে মা, তাড়াতাড়ি উঠো।”

সারারাত না ঘুম হওয়ার কারণে ঐশী এক ডাকেই উঠে পড়ে।

গায়ের সাথে চাদরটা ভালোভাবে জড়িয়ে নেয়।

যেই মেয়ের ডাকতে সারা কলোনি উঠে যায়, সেই মেয়ের একবার ডাকেই উঠে গেল।

চুলগুলো উসকো খুসকো হয়ে মুখ ঢেকে রেখেছে—যেন কাউকে দেখতে দেবে না।

নীলিমা চৌধুরী ঐশীর মুখ থেকে চুলগুলো সরাতেই বুক কেঁপে উঠে।

চোখ-মুখে লালচে রঙ, চোখ থেকে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে।

কপালে হাত দিতেই নীলিমা চৌধুরীর চোখ বড় বড় হয়ে যায়, যা বোঝার বুঝে নিয়েছে।


মেয়ের ঐই অবস্থা দেখে তার চোখেও নোনা পানির আগমন ঘটে।

তার দূরন্ত মেয়েটা এইভাবে সারা রাত কাটিয়েছে, একবারও ডাকার প্রয়োজন বোধ করেনি।


“তোমাকে আর কতবার বারণ করবো ঐশী! বলেছিলাম বৃষ্টিতে না ভিজতে, তাও আমার কথা শুনলে না।”


নীলিমা চৌধুরী উঠতে যাবে, ঐশী জড়িয়ে ধরে।

একদম গুটিয়ে পড়ে, বিড়াল বাচ্চার মতো। 

নীলিমা চৌধুরী হাত বোলায় মেয়ের মাথায়।


করুণ কণ্ঠে বলল—

“চলো ফ্রেশ হয়ে নাও, নাস্তা করে ঔষুধ খাবে।”


ঐশী পিটপিট চোখে তাকায়—

“আম্মা, আমি নাস্তা করবো না… কেমন হচ্ছে, ভালো লাগছে না।”


“কাল তোমার পরীক্ষা, আম্মু। ঠিক না হলে পরীক্ষা দেবে কেমন করে! চলো ফ্রেশ হয়ে নাও।”


নীলিমা চৌধুরী ঐশীকে টানতে টানতে বাথরুমে নিয়ে যায়।

পানির স্পর্শ পেয়ে ভালো লাগলো ঐশীর, মনটা হালকা হলো।

“আম্মা, আব্বু কোথায়?"

“নীচে আছে।”

“ওহ, রাশিক ভাইয়া কোথাও গিয়েছে নাকি? আমাকে ডাকতে এলো না? কোথাও গেলে তো ডেকে যায়।"

“রাশিক গিয়েছিল তোমার রুমে, তুমি ঘুমিয়ে ছিলে বলে ডাকেনি। আমাকে ও ডাকতে বারণ করে ছিল। আবার বলল, ‘তোমাকে ডেকে আনতে।’”

“আচ্ছা।”


মা-মেয়ে একসাথে নাস্তা টেবিলের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়।

ঐশী মায়ের পেছনে পেছনে হাঁটতে থাকে।


ঐশীর কোনো ধারণা নেই, এক জোড়া চোখ তার দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে—

যেন কত যুগ দেখেনি। 

চোখ দিয়ে ক্ষুধা নির্বাহ করছে।

অজান্তেই মুখে মূগ্ধতার হাসি ফুটে উঠে।


ঐশী আশেপাশের পরিবেশ, পরিস্থিতি না খেয়াল করে চেয়ার টেনে বসে পড়ে।

টেবিলে কি কি আছে দেখে নেয়।

গরম গরম লুচির দিকে হাত বাড়াতে যাবে ঠিক তখনই ঐশীর হাত থেমে যায়।


কয়েকটি শব্দে হৃদপিণ্ড বেড়ে যায়, মনে হয় তবলা বাজছে—কাল রাতের কথা মনে পড়ে যায়।

সেই শব্দ, সেই আকাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত, কথা।

ঐশীর হাত-পা কাঁপতে থাকে।

কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা যায়।

অজান্তেই হাত দুটো ঠোঁটে চলে যায়, পাশে দেখারও সাহস নেই।


“Good Morning, sweet honey…”


ঐশী নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করে।

অনেক কষ্ট করে পাশে তাকায়।

হার্ট বেড়ে আসার উপক্রম।

সেই চোখ—যা কাল রাতে ঐশীকে ঘুমাতে দেয়নি।

মনে হচ্ছিল যেন তাকিয়ে আছে সর্বক্ষণ ঐশীর দিকে।

সেই নিঃশ্বাস—ঘুমের মাঝে ও ঐশী তার ঘাড়ে অনুভব করেছিল।

সেই ঠোঁট—যেটা তার ঠোঁটের সাথে লেপ্টে ছিল সারারাত। 


কাল রাতের আযলান আর আজকের আযলানের মধ্যে অনেক তফাৎ।

কাল রাতে তার চোখ ছিল আগুনের গোলা—যেন চোখ দিয়ে পুড়িয়ে ফেলবে।

কিন্তু আজ সেই চোখে এক রাশ মুগ্ধতা।

যেই ঠোঁট ছিল শক্ত, কঠোর, আক্রমণকারী—সেই ঠোঁটে এক অদ্ভুত মায়াবী হাসি।

যেই হাসি কারোরই মন কেড়ে নিতে সক্ষম।

এ যেন এক নতুন আযলানl

To be continue😅

Happy Reading ☺