(১)
পাঁচদিন আগে
স্থান: ভবানীপুর, কলকাতা
সময়: সকাল
রমেন সাহা বাজারে ঢুকে দেখলেন পল্টু গদিতে নেই।
পল্টু মাছ বিক্রি করে। তার বদলে একটা কমবয়সী ছেলে বসে আছে।
মাছের বাজারে ঢোকার আগে প্রতিদিন রমেনবাবু একবার করে চা খান। রাস্তায় দাঁড়িয়ে দেখলেন বড়ির দোকান আজ বন্ধ।
হলটা কি ? আশেপাশে তাকিয়ে পরিচিত কাউকে দেখতে পেলেন না।
এইসময় একটা ছেলে সাইকেল চালিয়ে আসতে আসতে বলল," কি কাকা ? "
রমেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন," বড়ি কোথায় ? "
ছেলেটা সাইকেল থামিয়ে বলল," বোনের বাড়ি গেছে।"
রমেনবাবু আর দাঁড়ালেন না। অন্য চায়ের দোকানের দিকে এগিয়ে গেলেন।
একটা দোকান টপকে আরেকটা দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন," স্পেশাল চা। "
" আমার চা স্পেশাল হয়," দোকানদার উত্তর দিল।
" দাও,", রমেনবাবু চেয়ারে বসলেন। দোকানে আরও তিনজন কাস্টমার।
চা হয়ে গেলে দোকানদার বলল," কাপে দেব না ভাঁড়ে ? "
" ভাঁড়ে। "
" বিস্কুট ? "
" না । '
ধোঁয়া ওঠা চা। রমেনবাবু আলতো করে চুমুক দিলেন।
খেতে খেতে তাঁর মনে হল এই চা যেন কোথায় খেয়েছিলেন কিন্তু ঠিক মনে করতে পারছেন না।
৬২ বছর বয়স। মাঝে মাঝেই অনেক কিছু ভুলে যান।
বয়সের দোষ হলে যা হয়।
চা খাওয়া হয়ে গেলে দোকানদার বললেন," কেমন হয়েছে ? "
" আমি কি তোমার দোকানে আগে কখনও চা খেয়েছি ? "
" আপনি তো বড়ির দোকানে চা খান। আমার কাছে কখনও আসেননি। "
" হবে হয়তো," রমেনবাবু মাথা নেড়ে দাম মিটিয়ে দিলেন। তারপর বাজারে দিকে পা চালালেন।
(২)
পাঁচদিন আগে
স্থান: আমধারা, বোলপুর সময়: রাত
গ্রামের অতি সাধারণ বাড়ি। গৃহকর্তা হরেন দাস তার দুই ছেলে দীপক সমীর। বউ মারা গেছে।
হরেন পেশায় শ্রমিক। তাঁর দুই ছেলেও তাই।
এখন রাত দশটা। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে তিনজন বিছানায় বসেছে।
হরেন বললেন," তমালদা আমাকে বলে দিয়েছে ওই কাজের দায়িত্বটা আমি পাচ্ছি। "
" কিন্তু জমিটা ? ," দীপক জিজ্ঞেস করল।
" সেটার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আমি তো আছি," সমীর বলল।
" এত সোজা নয়। মালিক অলরেডি মামলা করে বসে আছে," দীপক বলল।
" তমালদা আছে ঠিক সামলে নেবে," হরেন বললেন।
" তাহলে এতদিনেও সামলানো গেল না কেন ? ," দীপক জিজ্ঞেস করল।
" মালিকের এক বোন আছে। তাঁর সঙ্গে আমি কথা বলেছি। তিনি রাজি হয়েছেন," সমীর বলল।
" সমস্যা হচ্ছে চক্রধর," দীপক বলল।
" ওকে তো বিকল্প জায়গা দেওয়া হবে। তমালদা বলেছেন," হরেন বললেন।
" তেমন হলে ওকেই আমরা কাজে রেখে দেব," সমীর বলল।
" চক্রধর বিয়ে করেনি। বুড়ো হয়ে গেছে। ও আর কি কাজ করবে ? এমন লোককে আমরা রাখব কেন ? ," দীপক বলল।
" আমরা অবশ্যই ওকে রাখব। তারপর _____ ", সমীর হাসতে লাগলো যে হাসির মধ্যে লুকিয়ে আছে গভীর ষড়যন্ত্রের ছাপ।
এবার বাবা এবং দুই ছেলে সবাই হাসতে লাগলো।
(৩)
তিনদিন আগে
স্থান: আউশগ্রাম, পূর্ব বর্ধমান
সময়: সকাল
বৃষ্টি শুরু হয়েছে দশ মিনিট। এর মধ্যেই চরিতার্থ বেরিয়ে পড়েছেন মাছ ধরতে। বাড়ির পাশেই নিজস্ব পুকুর।
কিন্তু বৃষ্টি হলেও সমস্যা নেই শেড আছে। গ্রামের বাড়িতে আসার সময় চরিতার্থের এটা অবসর বিনোদন।
গ্রামের বাড়িতে থাকে মা , ভাই , ভাইবৌ। চরিতার্থ ব্যবসার সূত্রে কলকাতায় থাকেন। যোধপুর পার্কে। সপরিবারে। বাড়িতে আছে বউ। ছেলে প্যারিসে ফ্যাশন ডিজাইনিং নিয়ে পড়তে গেছে।
চরিতার্থ পেশায় প্রোমোটার। কলকাতার প্রোমোটার হিসেবে তাঁর নাম আছে। চরিতার্থ সেন নামটা ওজনদার।
গ্রামের বাড়িতে এলে তিনি মাছ ধরলেও সেই মাছ ফের পুকুরে ছেড়ে দেন। তিনি আদ্যোপান্ত নিরামিষাশী।
মাছ ধরাটা তাঁর কাছে নেশা।
সকাল থেকে আকন্ঠ পান করেছেন চরিতার্থ। তবুও নেশা হয়নি। পুকুরপাড়ে এসে তিনি চেয়ারে বসলেন টেবিলের ওপর পা তুলে দিয়ে। অল্প অল্প করে পান করতে লাগলেন। এই সময় তাঁর কাছে পৃথিবীর আর কোনও খবরই গুরুত্ব পায় না। তার ধ্যানজ্ঞান একটাই-- মাছ।
পানীয় শেষ করে চরিতার্থ বড়শি তুলে পুকুরে ছুঁড়লেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বুঝতে পারলেন মাছ ধরা পড়েছে।
বড়শি টানতে যাবেন এমন সময় তিনি দেখলেন একটা বড় মাছ লাফ দিয়ে এলো পুকুরের তলা থেকে।
কিন্তু ওটা কি সত্যিই মাছ ? নেশা করলেও চরিতার্থ বুঝতে পারলেন কিছু একটা গন্ডগোল আছে।
মাছটা পালিয়ে গেল। কেন এমন হল তিনি বুঝতে পারলেন না। এমন তো কোনওদিন হয় না। অন্তত আজ পর্যন্ত হয়নি।
চরিতার্থ ফের বড়শি ছুঁড়লেন। এবার জল থেকে কেউ উঠে এসে বড়শিটা ক্যাচ ধরার মতন ধরে তারপর চরিতার্থর দিকেই ফিরিয়ে দিল। কিন্তু চরিতার্থ দেখল বড়শিটা এমনি এমনিই চলে আসল।
এবার মাথা গরম হয়ে গেল। কি হচ্ছে এসব ? টলোমলো পায়ে চরিতার্থ পুকুরের সামনে গেলেন। পরিষ্কার জল। নিজের ছবি দেখে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এবার পুকুরের ধারে বসেই মাছ ধরতে হবে স্থির করলেন। কিন্তু তার আগে সম্পূর্ণ নেশা করা দরকার।
ফের পান করতে লাগলেন। পুরো বোতল শেষ করে তিনি বড়শি ছুঁড়লেন। এবার দেখতে পেলেন মাছের মত দেখতে একটা অবয়ব সেটা ধরল তারপর ফিরিয়ে দিল।
চরিতার্থর মাথায় কিছু ঢুকল না। তিনি বিশ্বাসই করতে পারছেন না মাছ কেন ধরতে পারছেন না। এবার তিনি হোহো করে হাসতে লাগলেন। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়লেন পুকুরে।
কিছুক্ষণ আগে
মহীয়সী আউশগ্রাম বেড়াতে এসেছেন বন্ধুর বাড়িতে। তাঁর কলেজের বন্ধু অমিতা।
অমিতার দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। তারা থাকে একজন বাঙ্গালোর আরেকজন চেন্নাই।
স্বামী দুই বছর হল মারা গেছেন। দোতলা বাড়ি। থাকার বলতে অমিতা আর তাঁর ৯০ বছর বয়সী মা।
বাড়ির কাছেই একটা শিব মন্দির আছে। মহীয়সী ঠিক করেছেন আজ পূজো দিতে যাবেন। সোমবার।
সেইমতো তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন।
কিছুটা পথ এসেই তিনি এক ভদ্রলোককে দেখলেন। সঙ্গে সঙ্গে তার শরীরে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা গেল। ভীষণ রাগে কেঁপে উঠল দেহটা। তিনি থতমতো খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন।
ভদ্রলোক তাঁকে দেখলেন কিন্তু অপরিচিত বলে শুধু একটু হাসলেন তারপর চলে গেলেন নিজ গন্তব্যে।
(৪)
চারদিন আগে
স্থান: যোধপুর পার্ক, কলকাতা
সময়: দুপুর
" গৃহকোণ "-- বহুতল বাড়িটা পাঁচতলা। চরিতার্থ সেনের তৈরি বিল্ডিং। পুরোটাই তাঁর। দোতলায় তাঁর অফিস। তিনতলায় পুরো ফ্যামিলি থাকেন। আর একতলায় গাড়ি রাখার জায়গা। চারতলায় ভাড়াটে।
আমধারা থেকে এসেছেন কন্ট্রাক্টার তমাল দত্ত।
নিজের চেম্বারে চরিতার্থ বসে আছেন। তাঁর সামনে বসে আছেন তমাল।
তমাল বললেন," দাদা, কাজ শুরু করে দেব। কিছু অগ্রিম চাই। "
" আগে জমিটা। আমি কোনও ঝামেলায় যেতে চাই না। "
" সেসব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। "
" মামলা করেছে মালিক। ওর এক বোন থাকে ওই বাড়িতে। বিয়ে করেনি। "
" বোন কি বলছে ? "
" তাকে রাজি করান কোন ব্যাপার না। "
" ডায়লগ না দিয়ে আগে কাজ কর। "
" সব হয়ে যাবে আমার উপর ভরসা রাখুন। কিছু অগ্রিম না লাগলেই চলছে না। কাজ শুরু করতে পারছি না। "
ড্রয়ার থেকে ৫০০ টাকা নোটের দুটো বান্ডিল বের করে চরিতার্থ টেবিলের উপর রাখলেন। তারপর বললেন," এরপর যখন আসবে জমির কাগজ নিয়ে আসবে। "
নোটের দিকে তাকিয়ে তমাল বললেন," এত কম টাকায় হবে না দাদা। আরও লাগবে। "
" আগে প্রথম কাজটা করো। "
(৫ )
পাঁচদিন আগে
স্থান: ভবানীপুর, কলকাতা
সময়: সকাল
তারাপদ সাঁতরা দেখলেন দোকানে এখন কোন কাস্টমার নেই। চা তৈরি আছে। কাস্টমার আসলে দেওয়া যাবে। তিনি দেরি না করে মোবাইল তুললেন।সঙ্গে সঙ্গে লাইন পেয়েও গেলেন।
" বল," ওপার থেকে কেউ বলল।
" আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। "
" ধন্যবাদ," লাইন কেটে গেল।
খবরটা দিয়ে তারাপদ নিশ্চিন্ত হলেন।
কাজটা ঠিকঠাক মতন হতে পারলে তিনি মালামাল হয়ে যাবেন
(৬)
এখন
স্থান: আমধারা, বোলপুর
সময় :সকাল
বড়ির বোন কাঁদতে কাঁদতে পুলিশ অফিসারকে বলতে লাগল," আমরা নিজেদের বাড়িতে থাকছি এটাই কি আমাদের অপরাধ ? দাদার উপর হামলা হল। আমার বাড়িতে কুকুর লেলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আপনারা কি কিছুই দেখতে পান না ? "
" আপনারা তো আমাদের আগে কোন অভিযোগ করেননি ? "
" ন্যাকামো মারবেন না। আমাদের অভিযোগ করতে দেওয়া হয়েছে নাকি ? "
" ঠিক আছে আপনার বক্তব্য বলুন। "
মিডিয়ার লোকজন হাজির হয়েছে।
সাংবাদিকরা বাইট নিচ্ছে।
যাদের নামে জমি বাড়ি হাতানোর অভিযোগ সেই তমাল দত্ত এবং তার দলবল এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে।
চরিতার্থ সেনের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু ঘাতককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
(৭)
এখন
স্থান: ভবানীপুর ,কলকাতা
সময়: সকাল
বাড়িটার নাম " সিংহদুয়ার। "
রমেন সাহার আস্তানা। দোতলা বাড়ি।
মহীয়সী বললেন," তোমার শরীর এখন কেমন ? "
" এখন ভালো লাগছে। আসলে ওকে আমার খুব চেনা চেনা লাগছিল কিন্তু মনে করতে পারছিলাম না। "
" এখন বুঝতে পেরেছ তো ? "
" অবশ্যই। "
" তোমার সাহায্য না পেলে আমিও অসুস্থ হয়ে পড়তাম। "
" আমার সাহায্য নয়, অন্য একজনের। "
" ঠিক। "
_______________