অন্ধকার ঘরটা যেন নিজেই একটা রহস্য ধরে বসে আছে—শ্বাসরুদ্ধ, নিস্তব্ধ, তবু অদ্ভুতভাবে জীবন্ত। চারপাশে কোনো আলো নেই, শুধু ল্যাপটপের স্ক্রিনে পরপর ভেসে ওঠা কিছু ছবি… সেই আলোই রুমের প্রতিটা কোণে এক ধরনের নীলাভ, ঠাণ্ডা ঝিলিক ছড়িয়ে দিচ্ছে। যেন ছায়াগুলোও তাকিয়ে আছে, কী হচ্ছে এখানে।
সোফার এক কোণে গা এলিয়ে বসে আছে সে—অলস নয়, ঝড়ের আগের সেই ভয়ানক শান্তির মতো। ডান হাতের দুই আঙুলের ফাঁকে চেপে রাখা সিগারেটটা ধীরে ধীরে জ্বলছে, ধোঁয়ার সরু লাইন উপরে উঠে মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের ভেতর। আলোটা ঠিকমতো না পেলেও দেখা যায়—চোখ দুটো জ্বলজ্বলে বাদামি, রাগ, ক্লান্তি, এবং গোপন ক্ষতের মিশ্র আগুনে দীপ্ত। চোখ দুটো স্ক্রিন থেকে এক মুহূর্তের জন্যও সরছে না। যেন ওই ছবিগুলোর মাঝেই লুকিয়ে আছে তার প্রতিশোধ, তার উত্তর, অথবা তার সবচেয়ে গভীর ব্যথা।
কপালের ওপর এলোমেলো স্কিলকি চুলগুলো ঘামের ক্ষীণ দাগে লেপ্টে আছে। এগুলো তার চেহারাকে আরও অগোছালো, আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। গায়ে ফিটেড কালো টি-শার্ট—যার ভেতর জিম করা পেশিগুলো এতটাই শক্ত, এতটাই বেরিয়ে আছে যে মনে হয় জামাটাই আরেকটু টেনে ধরলে ছিঁড়ে যাবে। বুকের মাংসপেশি ওঠানামা করছে ধীরে, কিন্তু ভেতরের দমিত আগ্রাসনটা যেন চারপাশের বাতাসও টের পাচ্ছে।
টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের গ্লাসে গাঢ় লাল রেড ওয়াই—আলোতে ঝলসে উঠে রক্তের মতোই মনে হয়। গ্লাসের পাশে আরও কিছু ছড়ানো কাগজ, আধা ভরা অ্যাশট্রে, আর একটা ছুরি—যেটা আলো পেলেই হালকা ঝিকিমিকি করে।তার পাশে পড়ে আছে রক্ত মাখা সেই চিঠি টা।
ঘরের ভেতর শুধু তিনটা শব্দ—ল্যাপটপের হালকা ‘টিক-টিক’ সাউন্ড,সিগারেটের আগুনের মৃদু ফিসফিস,
আর তার ভারী, ভাবনায় ডুবে থাকা নিশ্বাস।ল্যাপটপের স্ক্রিনে হঠাৎ ভেসে ওঠে ঐশীর একটা ছবি—রুমের অন্ধকারে যেন ছবিটাই আলো হয়ে দাঁড়ায়।
ঐশীর মুখটা অসাধারণ শান্ত।তার গাল দু’টোতে নরম একটা গোলাপি আভা—একদম স্বাভাবিক, তবুও অদ্ভুতভাবে আকর্ষণীয়।চোখ দুটো বড়, গভীর—এমন চোখ, যেগুলোতে তাকালে মানুষ নিজের কথাই ভুলে যায়।চোখের কোণায় হালকা ভেজা চকচকে ছোঁয়া, যেন সে হেসেছে একটু আগে… অথবা কিছু ভাবছে নিঃশব্দে।
লম্বা, মসৃণ চুলগুলো কাঁধের ওপর দিয়ে দু’পাশে নরম তরঙ্গের মতো নেমে এসেছে।আলোয় চুলগুলোতে একটা বাদামি-কালো মিশ্র ঝিলিক—যে ঝিলিক আযলানের দৃষ্টি থেকে লুকোতে পারে না।
ঠোঁট দুটো সামান্য বাঁকা—না পুরো হাসি, না পুরো গম্ভীর।
সেই আধা-হাসির ভঙ্গিটাই যেন ছবিটাকে আরও জীবন্ত করে তোলে।মনে হয়, ছবির ঐশী এখনই কিছু বলবে,
হয়তো শান্ত করে দেবে,হয়তো আরও রহস্যের ভেতর টেনে নেবে।
ঐশীর গায়ে একটা সাদা, খুব সিম্পল ড্রেস—কিন্তু ওটাই তাকে সবচেয়ে সুন্দর দেখাচ্ছে।
পবিত্র, নরম, সহজ…
এমন সৌন্দর্য যা কোনো মেকআপ না থাকলেও চোখ আটকে দেয়।
তার গলার পাশ দিয়ে নেমে আসা ছোট্ট সোনালি লকেটটা ছবির আলোয় ঝকঝক করছে—
ঠিক যেমন ঐশীর উপস্থিতি আযলানের পুরো জীবনে ঝকঝক করে উঠে।
আযলান ধীর শ্বাস টেনে ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকে—
ঐশীর এই ছবিটা অন্য সবার মতো নয়।
এটা তার শান্তি…
তার ভয়…
আর তার ঠিক না-বলা ভালোবাসার সবচেয়ে নরম অংশ।
লেপটপের দিকে তাকিয়ে ফিস ফিস করে বলতে থাকে।
“যে তোমার দিকে ভুল নজর দিয়েছে…
তার কবরের মাটি আমি নিজ হাতে খুলে ফেলবো।
ওর শেষ নিঃশ্বাসটাও আমি ঠিক করে দেব—
কবে, কোথায়, কীভাবে থামবে।”
এই ঘরটা অন্ধকার না…
এটা হলো তার মাথার ভেতরের ঝড়ের ঠিক প্রতিচ্ছবি। হঠাৎ দরজা ঠেলে বেড়িয়ে এলো আহাদ সিকদার।
"ভাই, আপনি যেই কাজটার কথা বলেছিলেন… কাজটা হয়ে গেছে।"
আহাদের গলা থমথমে অন্ধকারে আরো ভারী শোনায়।
"ওই সালাটা এখন হাসপাতালে ভর্তি। ডাক্তার বলতেছে— তিন মাস তো দূরের কথা, বিছানায় থেকেও ঠিকমতো নড়তে পারবে না!"
কথাটা শেষ হতেই আযলানের ঠোঁটের কোণে এক অস্বাভাবিক বিকৃত হাসি ফুটে ওঠে।
একটা এমন হাসি—যেটা মানুষ নয়, দানবের মুখে মানায়।
হাসিটাতে ছিল শীতল সন্তুষ্টি, আর লুকানো হুমকির মতন অদ্ভুত রহস্য।
আযলান ধীরে ধীরে রক্তমাখা চিঠিটা হাতে তুলে নিল।
চিঠিটার লালচে দাগ যেন দেয়াল জুড়ে ছায়া ফেলছে।
তার চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলে উঠল—
একটা দৃষ্টি, যা কোন মানুষকে ছারখার করে দিতে পারে।
"আযলান…" সে এতটাই নিচু স্বরে বলল যে, মনে হলো শব্দটা বাতাসের ভেতর গলে যাচ্ছে,
"তুই যদি জানতিস— আসলে তুই কার কাছে চিঠিটা পাঠাইছিস…"
আযলান হালকা ঝুঁকে চিঠিটার রক্ত শুকিয়ে যাওয়া দাগের ওপর আঙুল বুলাল।
হাসিটা আরও গভীর হলো—একটা বরফ-ঠাণ্ডা নিষ্ঠুরতা মিশে।
"তাহলে তুই স্বপ্নেও এমনটা ভাবতে পারতি না।
কারণ যার নাম এখানে লেখা…"
সে থামল, চোখের দৃষ্টি আরও ধারালো হলো।
"আমি কখনো ঋণ রেখে দিয় না—আর কখনো ক্ষমাও করি না।"
-------------
বাইরে মাগরিবের আজানের ধনি শোনা যাচ্ছে। পুরো বাড়িটা যেন হালকা কুয়াশার মতো শান্তিতে ঢেকে আছে। সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত—কেউ রান্নাঘরে, কেউ উঠোনে, কেউ আবার ছাদে কাপড় তুলছে।
হাওয়া একটু একটু করে বইছে। সেই হাওয়ার টানে কাঁচের জানালায় গাছের ডালপালা লেগে টুং টাং আওয়াজ তৈরি হচ্ছে। সন্ধ্যার নরম অন্ধকারে শব্দটা আরও স্পষ্ট শোনা যায়।
ঐশী নিজের ঘরে ঘুম দিচ্ছে—কি শান্তির ঘুম। লাইবা আর রাইশা যাওয়ার পরে থেকেই ওর চোখে ঘুম লেগে ছিল। তাদের আড্ডার পরের ক্লান্তির মতো হাসি-ঘুম।
আজানের শব্দ আসতেই ঐশীর ঘুমটা হালকা হয়ে গেল। চোখ দুটো আস্তে আস্তে খুলল। ঘুম ভাঙার সাথে সাথে শরীরের আলসেমিটা যেন আরও জড়িয়ে ধরল তাকে। তবুও ধীরে ধীরে উঠে বসল।
আলসেমি ভেঙে, আস্তে আস্তে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে।
মেঝে ঠান্ডা, তাই পা নামাতেই একটু শিরশির করে ওঠে।
ওজু করে মাগরিবের নামাজ আদায় করল—নামাজ শেষে মুখটা যেন আরও সতেজ হয়ে গেল।
নীচে যায় কিছু খাওয়ার জন্য। পেট ভরতি থাকলেও ঐশীর যেন সব সময় কিছু খেতে ইচ্ছা করে। যেন এটাই তার অভ্যাস—কিছু খুঁজে দেখা, কিছু চিবিয়ে খাওয়া।
নিচে সিঁড়ি দিয়ে নেমেই ঐশী থমকে দাঁড়ায়।
সোফাগুলোয় নীলিমা চৌধুরী, সিদ্দিকা বেগম, রেশমিকা চৌধুরী, সাদিয়া চৌধুরী—সবাই বসে গল্প করছে।
এরা একবার বসলে আর উঠার নাম নেয় না।
হাসি, গল্প, একটু গম্ভীর কথা, আবার হাসি—সব মিলিয়ে ঘরের ভেতর বিরাট হৈচৈ।
এই যুগে জয়েন্ট ফ্যামিলি দেখা যায় না, সবাই আলাদা থাকতে চায়। কিন্তু চৌধুরী পরিবারের তিন বউ মিলে পুরো পরিবারটাকে এক করে রেখেছে।
ঘরের শান্তি, ছেলেমেয়েদের শাসন, সংসারের ব্যস্ততা—সবই এদের হাত ধরে চলে।
এই বাড়ির পিছনে আসলে এই তিন মহিলারই বড় ভূমিকা।
তাদের হাসিতে ঘর ভরে থাকে।
তাদের কথায় বাড়ি গুছানো থাকে।
তাদের একতাই চৌধুরী পরিবারটাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে।
ঐশী নীরবে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্যটা দেখে।
বাইরের হাওয়া, জানালার টুক টাক আওয়াজ, ভেতরের হাসি—সব মিলিয়ে বাড়িটা যেন এক অন্যরকম শান্তিতে ভরে আছে।
ঐশীর মনে হয়—
ফ্যামিলি মানে এমনই হওয়া উচিত। বন্ধন, হাসি আর একটু একটু আদর।
ঐশীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সিদ্দিকা বেগমের প্রথমেই চোখে পড়ে গেল।
বয়স ৮৫–এর কাছাকাছি, কিন্তু চলাফেরা, কথা বলা—সবই একদম স্টোন।
সবার ভাষায়—
“সিদ্দিকা বেগম এখনো পুরা হিরোইন।”
ঐশীকে দেখেই উনি গলা চড়িয়ে বললেন,
“এই যে মেয়ে, উঠলি কখন? লাইবা–রাইশা চলে যাওয়ার পরই শুয়ে পড়ছিলি না? ঘুম তো দ্যাখি শেষই হয় না তোর!”
ঐশী একটু লজ্জার হাসি দিল।
“আচ্ছা দাদি, একটু ঘুম পেলো তাই…”
সিদ্দিকা বেগম তখন চোখ ছোট করে তাকালেন,
“ঘুম পেলো? ঘুম না কি আচ্ছন্ন হয়ে গেলি! তোকে দেখে মনে হয়—শুধু ঘুম আর খাওয়া… এই দুইটাই তোর কাজ!”
রেশমিকা আর সাদিয়া হাঁটুতে হাত মেরে হাসতে লাগলো।
নীলিমা চৌধুরী বললেন,
“মা, ঐশীকে একটু বাঁচান তো! মেয়েটা বেচারি লজ্জায় মরে যাচ্ছে।”
সিদ্দিকা বেগম মুখ ঘুরিয়ে বললেন,
“মারা যাবে কেন? খেয়ে-দেয়ে গোলগাল হওয়া মেয়েরাই সুন্দর! আর বাইরে যেই হাওয়া বইছে সেই হাওয়াতে ঐশী উড়ে চলে যেতে পারবে। একটু গোলুমোলু হলে তোরা আরও সন্দুর লাগতো।
আর ঐশী তো আমার চোখের মণি—কিন্তু এবার বলো দেখি, কি খুঁজে খুঁজে নিচে নামলি? ফ্রিজ লুট করতে?”
ঐশী মুখ ফুলিয়ে বলল,
“দাদি, আমি কি চোর নাকি?”
সাথেই সাদিয়া মজা করে বলে উঠল,
“না রে, চোর না… ‘ফুডি’! সবসময় কিছু না কিছু চাবাই খুঁজে।”
রেশমিকা আবার যোগ করল,
“বাড়ির যে যা খাবার বানাই, শেষ দেখা যায় ঐশীর প্লেটে।”
সবাই আবার হেসে উঠলো।
হাসির শব্দে ঘরটা আরও উজ্জ্বল লাগছে।
ঐশী লাজুক হাসি হেসে রান্নাঘরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
“ঠিক আছে ঠিক আছে, হাসেন হাসেন… আমি কিছু খুঁজে নিই।”
পিছন থেকে সিদ্দিকা বেগম আবার সন্দুর গলায় বলে উঠলেন—
“খা মা খা, খাইয়া–দাইয়া হালুম হইয়া যাইসো…
আর শুন, কোনদিন যদি জামাই পাইস, সে বেচারা তোকে দেখে পালাইয়া যাবে না তো?”
এই কথায় পুরো সোফা আবার কেঁপে উঠল হাসিতে।
ঐশী রান্নাঘরে ঢুকে মাথা নেড়ে বলল,
“আমার দাদি তো আসলেই কমেডি পিস…”
বাড়িটার পরিবেশ যেন আরও নরম, আরও আপন হয়ে উঠলো—
হাসি, মজা, সন্ধ্যার হাওয়া… সব মিলিয়ে চৌধুরী পরিবারের আসল রং।
ঐশী রান্না ঘড়ে গিয়ে ফ্রিজ খুলে আইস-ক্রিম বেড় করে নেয়। হালকা কিছু খাওয়ার ইচ্ছা হচ্ছে। হঠাৎ রাশিকে আওয়াজ শুনে বেড়িয়ে আসে। ঐশু ঐশু ডাকতে ডাকতে দরজা খুলে বেড়িয়ে আসে। রাশিকের হাতে একটা বড় পার্সেল দেখে ঐশীর চোখ বড় বড় হয়ে যায় আর খুব খুশি হয়। রাশিক ঐশীর হাতে পার্সেল ধরিয়ে নিজের রুমে চলে যায় ফ্রেস হওয়ার জন্য। পার্সেলের মধ্যে ঐশীর সব পছন্দের জিনিস, সব গুলো ফাস্টফুড,সবাই মিলে মজা করে খেতে থাকে।
Happy reading☺
To Be Continue 😅