The fire of dormant love in Bengali Love Stories by Lamisa Anjum books and stories PDF | সুপ্ত প্রেমের আগুন - 28

Featured Books
Categories
Share

সুপ্ত প্রেমের আগুন - 28

হলরুমের ভেতর তখন যেন এক উন্মত্ত উৎসব চলছে। বিশাল ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি থেকে ঝরে পড়া সোনালি আলো পুরো ঘরটাকে ঝলমল করে তুলেছে। দামি পারফিউমের গন্ধ, গ্লাসের ঠোকাঠুকির শব্দ, জোরে বাজতে থাকা সংগীত—সব মিলিয়ে যেন এক বেহিসাবি আনন্দের রাত।

সাজানো মঞ্চের সামনে কিছু মানুষ নাচছে, কেউ হাসতে হাসতে মদের গ্লাস উঁচু করছে, আবার কেউ কোণের টেবিলে বসে গম্ভীর মুখে ব্যবসার আলোচনা করছে। ওয়েটাররা নিঃশব্দে রুপার ট্রে হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে, অতিথিদের সামনে একের পর এক দামি খাবার আর পানীয় পরিবেশন করছে।
কিন্তু এই সব কোলাহলের মাঝেই হঠাৎ আরশ খানের মনে এক অদ্ভুত অস্বস্তি জাগল।

সে চারদিকে তাকাল।
তার চোখ যেন কাউকে খুঁজছে।
আযলান।

কিছুক্ষণ আগেও তো ছেলেটা তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল—বিস্মিত চোখে চারপাশের ঝলমলে দৃশ্য দেখছিল। কিন্তু এখন… কোথাও তাকে দেখা যাচ্ছে না।

প্রথমে আরশ খান বিষয়টা গুরুত্ব দিল না। ভাবল হয়তো ছেলেটা হলরুমের অন্য কোনো কোণে চলে গেছে। কিন্তু কয়েক মিনিট কেটে গেলেও যখন আযলানের কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না, তখন তার বুকের ভেতর অজানা এক অস্বস্তি ধীরে ধীরে জমতে শুরু করল। ছেলে টা তো এমন না, না বলে কোথাও যাওয়া ছেলে না। 

সে ভিড়ের মাঝ দিয়ে হাঁটতে লাগল।
একজনকে জিজ্ঞেস করল,
— “আমার ছেলেটাকে দেখেছ?”

কেউ মাথা নাড়ল, কেউ বলল খেয়াল করেনি।
আরশ খান হলরুমের প্রতিটা কোণ খুঁজল। মঞ্চের পাশে গেল, সিঁড়ির ধারে গেল, এমনকি পাশের ছোট ছোট কক্ষগুলোতেও উঁকি দিল। কিন্তু কোথাও আযলানের দেখা নেই।
তার ভ্রু কুঁচকে গেল।

অবশেষে সে দ্রুত পা বাড়িয়ে হলরুম থেকে বেরিয়ে এল।
প্রাসাদের সামনের দিকটা তখনও আলো আর মানুষের হাসিতে ভরা। বাগানের ল্যাম্পপোস্টগুলো জ্বলছে, ফোয়ারার পানিতে আলো পড়ে ঝিলমিল করছে। কিন্তু বাড়ির পেছনের দিকটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা—সেখানে আলো কম, আর পরিবেশটা অস্বাভাবিক নীরব।

আরশ খান দ্রুত সেই অন্ধকার দিকের দিকে এগিয়ে গেল।
প্রাসাদের পেছনে পৌঁছাতেই ঠান্ডা বাতাস তার মুখে এসে লাগল। চারদিকে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। দূরে কোথাও গাছের পাতা নড়ে হালকা খসখস শব্দ করছে।

আর ঠিক তখনই—তার কানে এল একটা চাপা শব্দ।যেন কেউ কাঁদছে…অথবা কষ্টে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।

আরশ খান থমকে দাঁড়াল।
ধীরে ধীরে সে সেই শব্দের দিকে এগিয়ে গেল।
আর পরের মুহূর্তেই—তার চোখের সামনে যে দৃশ্য ভেসে উঠল, তা দেখে তার পুরো শরীর জমে গেল।

চাঁদের ফিকে আলোয় দেখা গেল মাটির ওপর এক মেয়ে নগ্ন অবস্থায় পড়ে আছে। তার শরীর এতটাই দুর্বল যে সে নড়তেও পারছে না। তার শরীরে স্পষ্ট আঘাতের চিহ্ন, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তার চোখ আধখোলা—যেন সে এখনও বেঁচে আছে, কিন্তু আর লড়াই করার শক্তি নেই।

কয়েকজন লোক তাড়াহুড়ো করে মাটি খুঁড়ছে। তাদের মুখে কোনো ভয় বা দয়া নেই—শুধু দ্রুত কাজ শেষ করার তাড়া।যেন এই দৃশ্য তাদের কাছে একেবারেই স্বাভাবিক।

মাটির গর্তটা ধীরে ধীরে গভীর হচ্ছে।আর ঠিক সেই ভয়ংকর দৃশ্যের একটু দূরেই দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট আযলান।
তার ছোট শরীরটা কাঁপছে। চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। সে ভয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে—চিৎকার করার শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছে।

তার শিশুমনে হয়তো পুরো ঘটনা বোঝার ক্ষমতা নেই, কিন্তু সে বুঝতে পারছে—এটা খুব ভয়ংকর কিছু।
খুব অন্যায় কিছু।
হঠাৎ আযলানের চোখ পড়ল তার বাবার দিকে।
সেই চোখে ছিল ভয়,সে দৌড়ে ছুটে এলে আরশ খানে দিকে অসহায়তা… আর এক অদ্ভুত প্রশ্ন—
“বাবা… এটা কী হচ্ছে?”

আরশ খান কয়েক সেকেন্ড নড়তেই পারল না।
তার বুকের ভেতর যেন ভারী কিছু চেপে বসেছে।
কারণ সে বুঝে গেছে—
এই রাত… এই দৃশ্য…
শুধু একটা ভয়ংকর ঘটনা নয়।

এটা এমন এক গোপন সত্যের দরজা খুলে দিয়েছে—
যার ভেতরে লুকিয়ে আছে ক্ষমতা, পাপ, আর এমন অন্ধকার…
যা একদিন এই ঝলমলে প্রাসাদটাকেই পরিণত করবে
ভয় আর রহস্যে ভরা এক অভিশপ্ত পরিত্যক্ত বাড়িতে। 

জঙ্গলের সেই প্রাসাদের পেছনের দিকটা যেন অন্য এক পৃথিবী। সামনে যেখানে আলো, সঙ্গীত আর মানুষের উচ্ছ্বাসে রাতটা উৎসবের মতো জ্বলছিল—ঠিক তার বিপরীতে এই দিকটা ছিল অস্বাভাবিক নীরব, ঠান্ডা আর অন্ধকারে ডুবে থাকা।

দূরে কোথাও রাতের পাখি ডাকছে। বাতাসে গাছের পাতা নড়ে খসখস শব্দ তুলছে। চারপাশে এমন এক অদ্ভুত পরিবেশ—যেন প্রকৃতিও নিঃশব্দে কোনো ভয়ংকর ঘটনার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

আর সেই অন্ধকারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট আযলান।
তার ছোট শরীরটা কাঁপছে। চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। সে বুঝতেই পারছে না ঠিক কী ঘটছে, কিন্তু তার ছোট্ট মনটা বুঝে গেছে—কিছু একটা ভয়ংকর হয়েছে।

আরশ খান কয়েক সেকেন্ড আগে যে দৃশ্যটা দেখেছে, সেটা তার মাথার ভেতর এখনো বজ্রপাতের মতো আঘাত করছে। মাটির গর্ত… রক্তে ভেজা একটা অসহায় মেয়ে… আর তাকে জীবন্ত অবস্থায় মাটির নিচে চাপা দেওয়ার সেই নিষ্ঠুর চেষ্টা।
এক মুহূর্তের জন্য তার মাথা ঝিমঝিম করে উঠেছিল।
কিন্তু তার সব চিন্তা, সব রাগ, সব বিস্ময়—সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে একটাই অনুভূতি।

তার ছেলে।আযলান।আরশ খান দ্রুত পা বাড়াল তার দিকে।
“আযলান!”

ছোট্ট ছেলেটা বাবার কণ্ঠ শুনেই চমকে উঠল। তার চোখ ভয়ে বড় হয়ে গেছে। মুখ বেয়ে কান্না গড়িয়ে পড়ছে।আরশ আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে দ্রুত নিচু হয়ে আযলানকে নিজের কোলে তুলে নিল।

আযলান মুহূর্তেই বাবার গলায় শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
তার ছোট হাত দুটো আরশের কাঁধে শক্ত হয়ে চেপে আছে। যেন সে ভয় পাচ্ছে—যদি বাবাকেও হারিয়ে ফেলে।আরশ আলতো করে ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। তার বুকের ভেতরটা যেন মোচড় দিয়ে উঠছে।তারপর ধীরে ধীরে আযলানের মুখটা নিজের বুকের সাথে গুঁজে দিল—
যেন সে আর এক মুহূর্তও সেই ভয়ংকর দৃশ্য দেখতে না পারে।
তার বড় হাতটা আযলানের মাথার ওপর রেখে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

ছোট্ট আযলান ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলছে—
“আব্বু… আমার খুব ভয় করছে…
চলো না আব্বু… প্লিজ…
আমি আম্মুর কাছে যাবো…”

তার কণ্ঠে এমন ভয়, এমন অসহায়তা—যা শুনে আরশ খানের বুকটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছিল।

সে ছেলেটাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
“কিছু হয়নি… আব্বু আছে…”
কিন্তু তার নিজের কণ্ঠেও যেন অদ্ভুত এক চাপা উত্তেজনা। কারণ সে জানে—যা দেখেছে তা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়।
ঠিক তখনই—মাটি খুঁড়তে থাকা লোকগুলোর একজন হঠাৎ তাদের দিকে তাকাল।

চাঁদের ফিকে আলোয় তার মুখ স্পষ্ট হয়ে উঠল।
লোকটার চোখে মুহূর্তেই ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল। সে দ্রুত চারপাশে তাকাল—যেন বুঝতে চাইছে আর কেউ এই দৃশ্য দেখেছে কি না।

তারপর ধীরে ধীরে সে আরশদের দিকে এগিয়ে এল।
তার পায়ের শব্দ শুকনো পাতার ওপর চাপা খসখস আওয়াজ তুলছে।
তার কণ্ঠ কাঁপছে—
“আ… রে… মিস্টার খান…
আ…আপ… আপনি এখানে?”

আরশ খান কোনো উত্তর দিল না। তার চোখ ঠান্ডা হয়ে গেছে।
সে একবার মাটির গর্তটার দিকে তাকাল—তারপর সেই লোকটার দিকে।
লোকটা অস্বস্তিতে কাঁপছে।
ঠিক তখনই—

প্রাসাদের ভেতর থেকে কয়েকজন লোক দ্রুত বাইরে বেরিয়ে এল।
তারা ছিল ইভান’স গ্রুপের কর্মচারী।

সবকিছু যেন হঠাৎ খুব দ্রুত ঘটে গেল।একজন লোক ঝড়ের মতো সামনে এগিয়ে এল।তার চোখে ছিল হিংস্রতা।
সে এক ঝটকায় আরশ খানের কোলে থাকা আযলানকে ছিনিয়ে নিল।
“আব্বু!!!”

আযলানের কণ্ঠ ছিঁড়ে বেরিয়ে এল।
আরশ খান কিছু বুঝে ওঠার আগেই—
ধপ!একটা ভারী আঘাত এসে পড়ল তার মাথায়।সবকিছু যেন মুহূর্তে থেমে গেল।তার চোখের সামনে সবকিছু ঘুরে উঠল।
তার কপাল ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল।

সে টাল সামলাতে না পেরে ধীরে ধীরে মাটিতে নুয়ে পড়ল।
মাটিতে পড়ার আগে তার চোখ একবার ছেলের দিকে গেল।
ছোট্ট আযলান স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে।
তার সামনে…
তার জান্নাত…
তার আব্বুকে আঘাত করা হয়েছে।সে বুঝতেই পারছে না কী হচ্ছে।শুধু কাঁদছে—
“আব্বু… আব্বু… উঠো…”

তার কান্নার শব্দ জঙ্গলের অন্ধকারে প্রতিধ্বনি হয়ে ছড়িয়ে পড়ল।চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে।কেউ এগিয়ে আসছে না।কেউ কিছু বলছে না।

আর সেই মুহূর্তে সামনে এসে দাঁড়াল সেই লোকটা—যার চোখে জ্বলছে বহু বছরের জমে থাকা হিংসা।তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে একটা নিষ্ঠুর হাসি ফুটে উঠল।সে নিচু হয়ে রক্তাক্ত আরশ খানের দিকে তাকাল।তারপর ঠান্ডা কণ্ঠে বলল—
“অনেক দিন ধরে ইচ্ছা ছিল তোকে মারার…আজ সুযোগ পেলাম…”

সে এক পা এগিয়ে এল।তার চোখে অদ্ভুত এক জয়ের উন্মাদনা।
“এত বছর ধরে কেউ আমার কোম্পানির সাথে টেক্কা দিতে পারেনি।
কিন্তু তুই…তুই এসে সবকিছু বদলে দিলি।”

সে দাঁত চেপে বলল—
“আজ সব শেষ হবে, আরশ খান।”

মাটিতে পড়ে থাকা আরশ খান কষ্ট করে চোখ খুলে তাকাল।
তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।কিন্তু সেই ঝাপসা দৃষ্টির মাঝেও সে দেখতে পাচ্ছে—তার ছোট্ট ছেলে আযলান কাঁদছে।
“আব্বু… আব্বু…”

তার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।সে হাত তুলতে চাইলছেলেটাকে একবার জড়িয়ে ধরতে চাইল…কিন্তু তার শরীর আর কথা শুনছে না।তার চোখ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসছে।
আর সেই অন্ধকার রাতের নীরবতার মাঝে—একটা ছোট্ট ছেলের কান্না আর এক বাবার নিঃশব্দ লড়াই

জঙ্গলের গভীরে হারিয়ে যেতে লাগল…আর কেউ জানত না।এই রাতটাই একদিন জন্ম দেবে।একটা ভয়ংকর প্রতিশোধের গল্প।

Happy Reading☺
To Be Continue😅