অন্ধকারের ভেতর দুইটা লাল আলো জ্বলে উঠল।
না, আলো নয়।চোখ।
Lucifer।
নেকড়েটা ছায়ার ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো,পায়ের নখ মাটিতে পড়তেই শুকনো পাতার মতো শব্দ হলো।তার শরীরের কালো লোমে রাত নিজেই হারিয়ে যায়।নিঃশ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে আসে গরম বাষ্প—যেন সে নিজেই আগুন।Lucifer গর্জন করল।
খুব জোরে না।কিন্তু সেই শব্দে বাতাস জমে গেল,আর গুদামের ভেতরে লুকিয়ে থাকা মানুষগুলো বুঝে গেল—ওরা আর শিকারি নয়,ওরা এখন শিকার।
আযলান ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টানল।
চোখ না সরিয়েই বলল—
“Go, Lucifer.”
পরের মুহূর্তটা বিশৃঙ্খলা।ছায়া ঝাঁপিয়ে পড়ল।
চিৎকার উঠল—একটা, দুটো, তারপর আরেকটা।কেউ পালাতে চাইল,কেউ বন্দুক তুলতে গিয়েও পারল না।
রক্ত ছিটকে পড়ল কংক্রিটের মেঝেতে,
গন্ধটা ভারী হয়ে উঠল—
গরম, কাঁচা, বাস্তব।
Lucifer কাউকে তাড়া করে,কারও পথ রোধ করে,
কারও গলার কাছে দাঁত বসিয়ে সব শেষ করে দিল।সবকিছু এত দ্রুত হলো যে চিৎকারগুলোও একসময় নিঃশব্দ হয়ে গেল।
শেষে শুধু শোনা গেল—
হালকা শ্বাসের শব্দ।
আর রক্তে ভেজা মাটিতে পড়ে থাকা দেহগুলো।
Lucifer ধীরে ধীরে ফিরে এলো।তার চোখে আগুন,
মুখে রক্তের ছাপ,কিন্তু ভঙ্গিতে নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ।
সে আযলানের সামনে থামল।
মাথা নিচু করল—নীরব আনুগত্যে।আযলান তার মাথায় হাত রাখল।রক্ত আর লোমে ভেজা হাত সরাল না।
ঠান্ডা গলায় শুধু বলল—
“Good boy.”
রাত আবার চুপ হয়ে গেল।
কিন্তু এই নীরবতা জানে—
এটা শান্তি নয়,
এটা শুধু পরবর্তী মৃত্যুর অপেক্ষা।
রাতের অন্ধকারে দুইটা চোখ জ্বলজ্বল করে—
রক্তমাখা লাল আলোয়।
ওটাই Lucifer, আযলান খান ইভানের পোশা নেকড়ে।তার গায়ের রং গভীর কালো, যেন রাতের ছায়াকেও হার মানায়।
হাওয়া কেটে চলার সময়, তার পদচারণায় শোনা যায় হালকা গর্জন—
যেন মৃত্যুর আগমনের ইঙ্গিত।
Lucifer কারও কথা শোনে না, শুধু আযলানের চোখের ইশারায় সাড়া দেয়।
আযলান যখন রেগে যায়, Lucifer তখন এক নিমিষে রক্তে ভিজিয়ে ফেলে চারপাশ।
সে কারও প্রতি করুণা দেখায় না—
কারণ তাকে শেখানো হয়েছে,
“দয়া শুধু দুর্বলদের জন্য।”
Lucifer দিনের বেলায় অদৃশ্য থাকে,
কিন্তু রাত নামলেই ছায়ার সঙ্গে মিশে যায় সে।
তার নিঃশ্বাস ঠান্ডা, কিন্তু উপস্থিতি গরম আগুনের মতো।
যে একবার তার চোখে তাকায়,
সে জানে — বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা নেই।
Lucifer শুধু এক নেকড়ে নয়,
সে আযলান খান ইভানের নীরব রক্ষক, ভয়ংকর প্রতিশোধের প্রতীক।
ভারী বুট মাটিতে পড়তেই শুকনো পাতাগুলো কড়মড় করে উঠল।
-------------
আযলানের চোখে হঠাৎ করেই ভেসে উঠল গত পনেরো বছরের ছবি।যেন স্মৃতিগুলো একটার পর একটা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছে তার ভেতর থেকে।
একটা সময় ছিল—
তাদের পরিবারটা কত সুন্দর ছিল।বাড়ির ভেতর হাসির শব্দে ভরে থাকত সবকিছু।আরস খান অফিস থেকে ফিরলেই ছোট্ট আযলান দৌড়ে যেত দরজার দিকে।আয়রিন খান হাসতে হাসতে বলতেন—
“আগে হাত মুখ ধুতে দাও তোমার আব্বুকে।”
তারপরও আযলান ছাড়ত না,বাবার গলায় ঝুলে পড়ত।ডাইনিং টেবিলে বসে সবাই মিলে গল্প,হালকা ঠাট্টা,
মাঝে মাঝে বাবার কড়া গলা—
“স্টাডি শেষ হয়েছে?”
তারপর আবার হাসি।সেই বাড়িটা ছিলএকটা ছোট্ট পৃথিবী।সেখানে ছিল ভালোবাসা,নিরাপত্তা,শান্তি।কিন্তু সবকিছু শেষ করে দিল।কিছু লোভী মানুষ।ক্ষমতার জন্য,টাকার জন্য,হিংসার জন্য—তারা কেড়ে নিল একটা মানুষের জীবন।আর সেই সঙ্গে,একটা পরিবারের সুখ।
বর্তমানের আযলান চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্ত।তার বুকের ভেতরটা ভার হয়ে উঠল।সে অনেক কিছু জিতেছে—ক্ষমতা, ভয়, পুরো ইতালির অন্ধকার দুনিয়া।কিন্তু সে জানে—যে জিনিসটা সে হারিয়েছে।সেটা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না।
রাত তখন গভীর।ইতালির আকাশে চাঁদ আধখানা ঝুলছে।রাস্তার আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেছে দূরে।একটা কালো লম্বা গাড়ি,নিঃশব্দে এসে থামল,একটা নির্জন কবরস্থানের সামনে।চারদিকে অন্ধকার।শুধু ঠান্ডা বাতাস,গাছের পাতায় পাতায় শব্দ করছে।
গাড়ির দরজা ধীরে খুলল।আযলান খান ইভান নামল।কালো কোটে মোড়া তার লম্বা শরীরটা,রাতের অন্ধকারের সঙ্গে মিশে গেল প্রায়।তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।চোখ দুটো ঠান্ডা,গভীর।কবরস্থানের ভেতর দিয়ে,ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল সে।তার বুটের শব্দ,নিঃশব্দ রাতের মধ্যে ভারী হয়ে বাজছে।
মনে হচ্ছে—এই জায়গাটা তার খুব পরিচিত।কারণ সে জানে
কোথায় যেতে হবে।একটা নির্দিষ্ট কবরের সামনেএসে থামল আযলান।কবরটার মাথার দিকে,একটা লম্বা ধূসর পাথর বসানো।সময়ের ছাপ পড়ে গেছে তাতে,তবু অক্ষরগুলো স্পষ্ট।
আযলান কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।তার চোখ ধীরে ধীরে গিয়ে থামলসেই পাথরের লেখার ওপর—
সেখানে খোদাই করা আছে—
“Ars Khan
A loving husband,
A proud father,
A king who left too soon.”
পাথরের নিচে ছোট করে লেখা—
“You may be gone from our sight,
but never from our hearts.”
আযলান হাত বাড়িয়ে,পাথরটার উপর আলতো করে হাত রাখল।ঠান্ডা পাথর।তার চোখের গভীরেএকটা ঝড় উঠল।ধীরে খুব আস্তে সে বলল—
“আব্বু…
আমি সব নিয়েছি।পুরো ইতালি আমার হাতে।”তার গলা ভারী হয়ে এলো।
“কিন্তু…
আপনাকে ফিরিয়ে আনতে পারলাম না।”
নির্জন কবরস্থানে,শুধু বাতাস বইছে।আর সেই বাতাসে
একজন ছেলের বুকভাঙা নীরবতা
ধীরে ধীরে মিশে যাচ্ছে।
---------------------
কবরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আযলান।চারদিকে নিস্তব্ধতা—
শুধু ঠান্ডা বাতাস আর শুকনো পাতার খসখস শব্দ।
দীর্ঘ সময় ধরে সে কিছুই বলল না।তার চোখ পড়ে আছে সেই পাথরের ওপর,যেখানে খোদাই করা আছে তার বাবার নাম।
হঠাৎ মনে হলো—সময় যেন থেমে গেছে এই জায়গাটায়।
আযলান ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল কবরটার সামনে।
তার শক্ত, নির্লিপ্ত মুখে কোনো আবেগ দেখা যায় না সাধারণত।
পুরো ইতালি যার নাম শুনে ভয়ে কেঁপে ওঠে—সেই মানুষটা আজ এখানে।একটা অসহায় ছেলের মতো বসে আছে।তার হাত আলতো করে ছুঁয়ে গেল কবরের মাটি।মাটিটা ঠান্ডা।
আযলানের বুকের ভেতর হঠাৎ একটা শূন্যতা ছড়িয়ে পড়ল।
সে খুব আস্তে বলল—
“আপনি তো বলেছিলেন…আমি কখনো একা হব না।”
বাতাস একটু জোরে বইল।গাছের ডাল দুলে উঠল।আযলান মাথা নিচু করল।
“দেখছেন তো আব্বু…সবকিছু আমি সামলেছি।”
তার চোখে ধীরে ধীরে আগুনের মতো একটা আলো জ্বলে উঠল।
“আপনার কোম্পানি…আপনার স্বপ্ন…আপনার নাম—কেউ ছুঁতে পারেনি।”
সে গভীর শ্বাস নিল।“যারা আপনাকে মেরেছিল…তাদের একজনও বেঁচে নেই।”
কবরস্থানের নিস্তব্ধতা যেন আরও ভারী হয়ে গেল।আযলান ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।তার লম্বা ছায়াটা পড়েছে কবরের ওপর।
এক মুহূর্তের জন্য তার চোখে আবার সেই ছোট্ট ছেলেটার,ছায়া দেখা গেল—যে একদিন বাবার আঙুল ধরে হাঁটত।কিন্তু মুহূর্তটা খুব দ্রুত শেষ হয়ে গেল।আবার ফিরে এল সেই ঠান্ডা, নির্মম মানুষটা।
মাফিয়া কিং।
সে কোটের পকেট থেকে একটা সাদা গোলাপ বের করল,আস্তে করে কবরের ওপর রেখে দিল।
তারপর খুব নিচু স্বরে বলল—
“আপনি চিন্তা করবেন না।”
“আপনার রাজ্য এখনো দাঁড়িয়ে আছে।”
এক সেকেন্ড থেমে আবার বলল—
“আর আমি…আমি এখনো লড়ছি।”
দূরে বজ্রের শব্দ হলো।আকাশে কালো মেঘ জমেছে।আযলান ধীরে ধীরে পিছন ফিরে হাঁটতে লাগল।কবরটা অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।কিন্তু তার বুকের ভেতর একটা প্রশ্ন
এখনো বেঁচে আছে—
এই অন্ধকার পথের শেষ কোথায়?কারণ সামনে,তার জীবনে আসতে যাচ্ছে এমন একজন মানুষ—যে হয়তো
প্রথমবারের মতো,মাফিয়া কিং আযলান খান ইভানকে
আবার মানুষ বানিয়ে দেবে।
আর সেই নাম—
ঐশী ঔরিন চৌধুরী।
কবর, পুরোনো গাছের ছায়া মাটির ওপর লম্বা হয়ে পড়েছে। রাতের ঠান্ডা বাতাসে শুকনো পাতার খসখস শব্দ শোনা যাচ্ছে। একটু আগেই যে ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছে, তার কোনো চিহ্ন যেন এই নীরবতা ঢেকে ফেলতে চাইছে।
আযলান ধীরে ধীরে কবরস্থানের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। তার মুখে আবার সেই ঠান্ডা, স্থির ভাব। যেন ভেতরে কিছুই ঘটেনি।
কবরস্থানের গেটের বাইরে কয়েকটা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। হেডলাইটের আলো অন্ধকার রাস্তার ওপর পড়ে ফ্যাকাসে আলো তৈরি করেছে।
আযলান ধীরে ধীরে গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। তার জুতোর শব্দ রাতের নীরবতায় স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছিল আহাদ।
আহাদ আযলানের ছোট কাকা ছেলে । ছোটবেলা থেকেই সে আযলানের সাথে আছে। ভাইয়ের প্রতি তার সম্মান আর ভালোবাসা দুটোই গভীর।
আযলান গাড়ির কাছে এসে থামল। একটু মাথা ঘুরিয়ে পিছনে তাকাল।
“আহাদ।”
আহাদ দ্রুত সোজা হয়ে দাঁড়াল।
“জি ভাই।”
আযলান শান্ত গলায় বলল—
“আহাদ, ব্যবস্থা করো। আজই… বাংলাদেশে ক্যামব্যাক করবো, তোর ভাবি কে অনেক দিন চুমু খাওয়া হয়নি।”
কথাটা বলেই সে আবার সামনে তাকাল।
কিন্তু কথাটা শুনে আহাদ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। যেন সে বিশ্বাসই করতে পারছে না যে অবশেষে সেই দিনটা এসেছে।"অনেক দিন বলছো কেন, এক বার তো চুমু খেয়ে ছিলে। আমি কি জানিনা, ওই দিন আমি, রাশিক আর সাদ্দাম দেখেছি''
আযলান আহাদে দিকে গরম চোখে তাকিয়ে আছে"সালা,ভাই-ভাবি রোমান্স দেখতে লজ্জা করে না"
তারপর হঠাৎ আহাদ সামনে এগিয়ে এল।
পিছন থেকে শক্ত করে আযলানকে জড়িয়ে ধরল।
তার কণ্ঠে আনন্দ আর আবেগ মিশে গেছে—
“থ্যাঙ্ক ইউ ভাই…”
আযলান একটু অবাক হয়ে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল।
আহাদ হালকা হেসে বলল—
“আমি অনেক দিন ধরে এই কথাটা শোনার অপেক্ষায় ছিলাম। আমরা আবার দেশে ফিরবো… এটা ভাবতেই ভালো লাগছে, আম্মু বড় আম্মু দাদিমা সবার কথা খুব মনে পড়ছিল।”
কয়েক সেকেন্ড দুজনেই চুপ করে রইল।তারপর আযলান ধীরে ধীরে আহাদের হাতটা নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে দিল।
তার ঠোঁটে হালকা একটা হাসি ফুটে উঠল।
সে শান্ত গলায় বলল—
“অনেক দিন হয়ে গেছে… এবার দেশে ফেরার সময়।”
আহাদ মাথা নাড়ল।
“ঠিক আছে ভাই। আমি এখনই সব ব্যবস্থা করছি।”
আযলান গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে বসে পড়ল।
গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট হতেই হেডলাইট অন্ধকার রাস্তা কেটে সামনে পড়ল। আহাদ বাইরে দাঁড়িয়ে একটা কল করলো। তার পড়েই আযলানের পাশের সিটে এসে বসে পড়লো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়িগুলো ধীরে ধীরে কবরস্থান ছেড়ে রাতের অন্ধকারের ভেতর মিলিয়ে গেল।
আর সেই রাতেই শুরু হলো—
আযলান খানের ইভান আর আহাদ আহমেদ এর বাংলাদেশে ফেরার পথ।
Happy Reading ☺
To Be Continu 😅