I gave my heart to you. in Bengali Thriller by Lamisa Anjum books and stories PDF | মন_তোকে_দিলাম - 13

Featured Books
Categories
Share

মন_তোকে_দিলাম - 13

সেরাফিনা কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। সাহিদা বিবির কান্নার শব্দ বারবার তার কানে বাজছে। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অস্বস্তি জমতে লাগল।

হঠাৎ সাহিদা বিবি সবার হাত সরিয়ে সিফানের লাশের কাছে এগিয়ে গেলেন। কাঁপা হাতে ছেলের মুখে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,
"একবার চোখ খুলে তাকাও বাবা... শুধু একবার। আমি আর কিছু চাইব না।"

উপস্থিত অনেকের চোখ ভিজে উঠল। কেউ মুখ ফিরিয়ে নিল, কেউ নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।

জেনিফা নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"একজন মায়ের জন্য এর চেয়ে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে?"

সেরাফিনা কোনো উত্তর দিল না। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে সিফানের নিথর মুখের দিকে। এত নংরা ছেলের জন্য সাহিদা বিবি কান্না করছে। 

ঠিক তখনই জানাজার জন্য সবাইকে প্রস্তুত হওয়ার অনুরোধ করা হলো।পুরুষেরা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে যেতে লাগল। হলরুমে আবারও চাপা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল।

জেহেফিল কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে সেরাফিনার দিকে তাকাল। তার মুখে আগের মতোই কোনো আবেগ নেই, কিন্তু চোখ দুটো অস্বাভাবিকভাবে গভীর।
"চলো।"
শান্ত গলায় বলল সে।

সেরাফিনা তার দিকে তাকাল।
"আপনার কি একটুও খারাপ লাগছে না?"

প্রশ্নটা শুনে জেহেফিল কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
"মৃত্যুর জন্য দুঃখ হয়। কিন্তু মৃত্যুর কারণের জন্য নয়।"
কথাটা শুনে সেরাফিনার ভ্রু কুঁচকে গেল।

"আমার ছেলের খুনিকে তুমি কঠিন শাস্তি দেবে বাবা... ওর যেন খুব খারাপ মৃত্যু হয়..."
সাহিদা বিবি কান্নায় ভেঙে পড়ে কথাগুলো বললেন। তার কাঁপা কাঁপা হাত দুটো আঁচল শক্ত করে চেপে ধরে আছে। চোখের পানি যেন থামার নামই নিচ্ছে না। উপস্থিত সবাই তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে, কিন্তু একজন সন্তানের মৃত্যুতে মায়ের বুকের যন্ত্রণা কি আর এত সহজে কমে?

জেহেফিল তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। মুখে গম্ভীর ভাব, চোখে কোনো আবেগের ছাপ নেই।
"জি আন্টি। আমি চেষ্টা করব।"
শান্ত স্বরে বলল সে।

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেরাফিনা কথাটা শুনেই ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে রাখার চেষ্টা করল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারল না।
"বাহ!"
সে নিচু স্বরে বলল।
"নিজেই খুন করে এখন আবার বলছে খুনিকে শাস্তি দেবে। কী সুন্দর অভিনয়!"
কথাটা বলেই সে খিলখিল করে হেসে উঠল।

জেনিফা সঙ্গে সঙ্গে তার বাহুতে চিমটি কাটল।
"এই বেয়াদব মেয়ে!"

"উফ!"
সেরাফিনা ব্যথা পেয়ে হাত সরিয়ে নিল।
"চিমটি মারলি কেন?"

"একটু আগে তো সাহিদা আন্টির জন্য তোর মন খারাপ ছিল। এখন আবার হাসছিস কেন?"

সেরাফিনা নাটকীয়ভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"আমি বহু প্রতিভার অধিকারী। একই সঙ্গে মন খারাপ আর হাসাহাসি—দুটোই করতে পারি।"

"তোর মাথায় সমস্যা আছে। একটু তো মন টা খারাপ কর"

"এটা নতুন খবর না।"
জেনিফা বিরক্ত মুখে তাকিয়ে রইল।
অন্যদিকে সাহিদা বিবির কান্না এখনও থামেনি। তিনি বারবার সিফানের নাম ধরে কাঁদছেন।আশেপাশের পরিবেশ এতটাই ভারী যে অনেকের চোখেই পানি চলে এসেছে।

কিন্তু সেরাফিনার মাথায় তখন অন্য চিন্তা।হঠাৎ সে মুখে ওড়না চেপে ধরে সামনে এগিয়ে গেল।তারপর এমনভাবে কাঁদা শুরু করল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শোক তারই হয়েছে।
"ও আমার আল্লাহ গো..."
"ছেলেটা কত খারাপ ছিল গো..."
"ওকে আগে কেন তুলে নিলে না গো..."
"আমার মা গো..."
"আমার বাপ গো..."
"আমার বড় গো..."
সে এমনভাবে নাটকীয় কান্না করছে যে পাশে থাকা দু-একজন মানুষ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।

জেনিফা তো লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে চাইছে।
"হে আল্লাহ, আমি এই মেয়েকে চিনি না।"
বিড়বিড় করে বলল সে।

ঠিক তখনই জেহেফিল তাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল।সেরাফিনার অভিনয় চোখ এড়াল না তার।
সে একবার তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল—
— "কান্না করছ যখন, অন্তত বিশ্বাসযোগ্য করে করো। সুন্দর ভাবে করো"

সেরাফিনা থেমে গেল, জেহেফিল এর কথা শুনে। 
"মানে?"

"তোমার কান্না দেখে মনে হচ্ছে নাটকের মহড়া চলছে।"
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জেনিফা হাসি চেপে রাখল।

সেরাফিনা চোখ বড় বড় করে তাকাল।
"আপনি আমার অভিনয়কে অপমান করলেন?"

"আমি সত্যি বললাম।"

"আপনি জানেন আমি স্কুলে একবার অভিনয়ের জন্য পুরস্কার পেয়েছিলাম?"

"কোন স্কুল?"
"স্বপ্নের স্কুল"

জেহেফিল কোনো উত্তর দিল না।সে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।সেরাফিনা নামক দুর্যোগের সঙ্গে যুক্তি দিয়ে লাভ নেই।
জেহেফিল চলে যেতে উদ্যত হতেই সেরাফিনার মাথায় নতুন দুষ্টুমি এল।
সে দ্রুত তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
"এই যে শুনছেন..."

জেহেফিল ভ্রু তুলল।
— "কী?"
"ইস আমার লজ্জা লাগছে" বলে ওরনার একটা ধার ধড়ে আঙুলের সাথে পাঁচাতে থাকে। 

জেহেফিল ভ্রু কুচকে সেরাফিনার কীর্তিকলাপ দেখতে থাকে"আমি তো এখন ও কিছু করিনি আর তোমার লজ্জা পাচ্ছে"

জেহেফিল এর কথা শুনে সেরাফিনার কান থেকে গরম ধোঁয়া বেড়িয়ে যাই কথা ঘুড়িয়ে বলে। 
"একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে।"

"হুম বল।"

"এক ভাইয়া আমাকে একটু আগে বলেছে সুন্দর করে কান্না করতে।"

"হুম।"

"এখন সমস্যা হলো, সুন্দর করে কান্না করার পদ্ধতি আমি জানি না।"

জেহেফিল চুপ।
সেরাফিনা আবার বলল—
"আপনি কি আমাকে শেখাতে পারবেন?"

"না।"

"কেন?"

"আমার সময় নেই।"

"আচ্ছা, তাহলে একটা ডেমো দেন।"

"কিসের?"

"সুন্দর কান্নার।"
জেনিফা পাশ থেকে কাশতে শুরু করল।

জেহেফিল কয়েক সেকেন্ড নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর সম্পূর্ণ নির্বিকার মুখে বলল—
" সার্চ করো।"

সেরাফিনা এক সেকেন্ড থমকে গেল।
"কোথায়?"

"চ্যাটজিপিটি।"

"ওখানে এসব শেখায়?"

"অনেক কিছু শেখায়।"

"সুন্দর কান্নাও?"

"হয়তো।"

"আচ্ছা, আমি যদি লিখি—'সুন্দরভাবে কান্না করার ১০১টি উপায়', তাহলে কি উত্তর দেবে?"

"চেষ্টা করে দেখতে পারো।"

"আর যদি লিখি—'নাটকীয় কান্নায় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার উপায়'?"

"তাহলেও কিছু একটা উত্তর পাবে।"

এবার জেনিফা হেসে ফেলল।
সেরাফিনা মুখ ফুলিয়ে বলল—
"আপনারা দুজনই আমাকে নিয়ে মজা করছেন।"

"না।"

"হ্যাঁ।"

"না।"

"হ্যাঁ।"

"না।"

"হ্যাঁ।"
জেহেফিল গভীর শ্বাস নিল।তারপর একটাও কথা না বলে সেখান থেকে হাঁটতে শুরু করল।সেরাফিনা হতভম্ব হয়ে তার চলে যাওয়া দেখল।
"এই যে! উত্তর শেষ না করেই চলে গেলেন?"

কোনো জবাব এল না।
"অসভ্য লোক একটা!"

জেনিফা এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না।হো হো করে হেসে উঠল সে।
আর শোকে ভারী সেই পরিবেশের মাঝেও, কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও, সেরাফিনার কাণ্ডকারখানায় আশেপাশের কয়েকজনের মুখে চাপা হাসি ফুটে উঠল।

Happy Reading😅
To Be Continue 😅