Pratapaditya 4 in Bengali Fiction Stories by Rajkonya রাজকন্যা books and stories PDF | প্রতাপাদিত্য - 4

Featured Books
Categories
Share

প্রতাপাদিত্য - 4

বিক্রমাদিত্যের কক্ষের ভেতরে তখন এমন এক নীরবতা নেমে এসেছে, যা যুদ্ধের শব্দকেও হার মানায়।বাইরে আগুন জ্বলছে। দূরে কামানের গর্জন শোনা যাচ্ছে।

প্রাসাদের করিডরে সৈন্যরা ছুটে বেড়াচ্ছে। কিন্তু এই ঘরের ভেতরে—সবকিছু যেন থেমে গেছে। প্রতাপ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে সেই রক্তমাখা কাগজ।কাঁপা হাতে লেখা মাত্র তিনটি শব্দ—"বিশ্বাস করো না..."

আর তার নিচে—"ব..."

শুধু একটি অক্ষর। কিন্তু সেই একটি অক্ষর যেন হাজারটা তলোয়ার হয়ে প্রতাপের বুকে আঘাত করল।তার মনে ভেসে উঠল—বসন্ত রায়। কাকা। শৈশবের শিক্ষক। যুদ্ধবিদ্যার প্রথম গুরু। যে মানুষ তাকে নিজের সন্তানের মতো মানুষ করেছেন।

প্রতাপের মুঠো শক্ত হয়ে উঠল। না। এটা কি সত্যি হতে পারে? নাকি কেউ ইচ্ছে করে এই সন্দেহের বীজ বপন করেছে?

ঠিক তখনই পেছন থেকে বসন্ত রায়ের কণ্ঠ ভেসে এলো। "দাদা......."

প্রতাপ ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। বসন্ত রায় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। তার মুখে গভীর শোক। চোখ লাল। তিনি কয়েক পা এগিয়ে এসে বিক্রমাদিত্যের নিথর দেহের পাশে হাঁটু গেড়ে বসলেন।

কাঁপা হাতে ভাইয়ের কপালে হাত রাখলেন। তারপর খুব নিচু গলায় বললেন—"তুমি আমাকে একা করে দিলে..."

ঘরে উপস্থিত অনেকের চোখ ভিজে উঠল। কারণ দুই ভাইয়ের সম্পর্কের কথা সবাই জানে। কিন্তু প্রতাপ চুপ।তার হাতে এখনও সেই কাগজ। তার চোখ স্থির বসন্ত রায়ের উপর।

হঠাৎ বসন্ত রায় মাথা তুলে তার দিকে তাকালেন।দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিলল। একটা অদ্ভুত নীরবতা। যেন দুজনেই কিছু লুকিয়ে রেখেছে।

ঠিক তখনই বাইরে থেকে দ্রুত পায়ের শব্দ শোনা গেল।একজন সৈন্য দৌড়ে ভেতরে ঢুকল। তার মুখ ফ্যাকাসে।"রাজপুত্র!"

প্রতাপ তাকাল। "কী হয়েছে?"

সৈন্যটা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—"মোগলরা পিছু হটছে!"

ঘরে উপস্থিত সবাই বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।

"কি?"

"পিছু হটছে?"

সৈন্যটা মাথা নেড়ে বলল—"হ্যাঁ। নদীর দিক থেকে ওদের জাহাজ সরে যাচ্ছে।"

প্রতাপের ভ্রু কুঁচকে গেল। এটা স্বাভাবিক নয়।মোগলরা এত বড় আক্রমণ চালিয়ে হঠাৎ কেন ফিরে যাবে? বসন্ত রায়ও মাথা তুললেন। তার চোখে চিন্তার ছায়া।

"ওরা যা নিতে এসেছে, হয়তো সেটা নিয়ে গেছে।"

প্রতাপের বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। রাজকোষাগারের দলিল। সেই হারানো নথি। ঠিক তখনই বৃদ্ধ নৌসেনাপতি ঘরে প্রবেশ করলেন। তার হাতে একটা কাপড় মোড়া বস্তু। মুখ গম্ভীর।"রাজপুত্র, এটা রাজকোষাগারের ধ্বংসস্তূপে পাওয়া গেছে।"

প্রতাপ কাপড়টা খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো একটা ধাতব বাক্স। ছোট। কিন্তু ভারী। বাক্সটার গায়ে অদ্ভুত নকশা খোদাই করা। আর মাঝখানে—একটি কালো সূর্যচিহ্ন।

ঘরের বাতাস মুহূর্তে ভারী হয়ে উঠল। প্রতাপ ধীরে ধীরে বাক্সটার দিকে তাকাল।"খুলেছ?"

বৃদ্ধ লোকটা মাথা নাড়লেন।"না। তালা ভাঙা যায়নি।"

প্রতাপ বাক্সটা হাতে তুলে নিল। অদ্ভুত ঠান্ডা। যেন বহু বছর কোথাও লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল—তালার নিচে ক্ষুদ্র অক্ষরে কিছু লেখা।সে মশালের কাছে নিয়ে গেল। ধীরে ধীরে লেখাগুলো স্পষ্ট হলো।"শুধু উত্তরাধিকারীর জন্য"

প্রতাপের বুকের ভেতর ধক করে উঠল। ঘরে উপস্থিত সবাই একে অপরের দিকে তাকাতে লাগল। কারণ এর অর্থ একটাই—এই বাক্সের ভেতরে এমন কিছু আছে, যা যশোর রাজ্যের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।

ঠিক তখনই—ঘরের এক কোণ থেকে আচমকা একটা শব্দ এলো।খট! সবাই একসঙ্গে ঘুরে তাকাল। দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি পুরনো কাঠের আলমারি ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। নিজে নিজেই।

প্রতাপের চোখ সংকুচিত হয়ে এলো। আলমারির পেছনে অন্ধকার একটা ফাঁক দেখা দিল। গোপন পথ।বিক্রমাদিত্যের ব্যক্তিগত কক্ষের ভেতরে লুকানো একটি গোপন সুড়ঙ্গ।

কেউ কিছু বলার আগেই—সেই অন্ধকারের গভীর থেকে ভেসে এলো ক্ষীণ পায়ের শব্দ।টক...টক...টক...যেন কেউ ধীরে ধীরে তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। 🔥

************************

বিক্রমাদিত্যের কক্ষের ভেতরে তখন মৃত্যু, রহস্য আর আতঙ্ক একসঙ্গে মিশে এক অদ্ভুত ভারী পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। চারদিকে নিস্তব্ধতা, অথচ সেই নীরবতার মাঝেও যেন অদৃশ্য কোনো উত্তেজনা ক্রমশ ঘন হয়ে উঠছে। কক্ষের চার কোণে জ্বলতে থাকা মশালগুলোর আগুন বাতাসে কেঁপে কেঁপে উঠছে। তাদের অনিয়মিত আলো দেয়ালের ওপর দীর্ঘ ছায়াগুলোকে জীবন্ত করে তুলেছে। মনে হচ্ছে, ছায়াগুলো যেন নিঃশব্দে নড়ে উঠছে, একে অপরের সঙ্গে মিশে আবার আলাদা হয়ে যাচ্ছে। আর সেই কাঁপতে থাকা ছায়ার মাঝখানে সবার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে আলমারির পেছনে সদ্য উন্মুক্ত হওয়া অন্ধকার সুড়ঙ্গটির দিকে।

হঠাৎ সেই সুড়ঙ্গের গভীর অন্ধকার থেকে ভেসে এলো একটানা পায়ের শব্দ—টক... টক... টক...। প্রথমে শব্দটা ক্ষীণ ছিল, কিন্তু মুহূর্তের পর মুহূর্ত কেটে যেতে তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল। আশ্চর্যের বিষয়, পদক্ষেপগুলোতে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না। যেন যে এগিয়ে আসছে, সে ইচ্ছে করেই ধীরে হাঁটছে। যেন সে জানে, এই মুহূর্তে কক্ষের প্রতিটি মানুষ তার অপেক্ষায় নিঃশ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে আছে।

প্রতাপের হাত অজান্তেই কোমরে ঝোলানো তরবারির হাতলে গিয়ে পড়ল। তার দৃষ্টিতে সতর্কতা আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যরাও মুহূর্তের মধ্যে অস্ত্র তুলে প্রস্তুত হয়ে গেল। বসন্ত রায় চোখ সরু করে সুড়ঙ্গের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বৃদ্ধ নৌসেনাপতি নিচু অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “যে-ই হোক... প্রস্তুত থাকুন।” এরপর আর কেউ একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। কক্ষজুড়ে শুধু শোনা যেতে লাগল সেই ধীর অথচ অস্বস্তিকর পায়ের শব্দ, আর তার সঙ্গে বাড়তে লাগল উত্তেজনা।

টক... টক... টক...

অবশেষে সুড়ঙ্গের গভীর অন্ধকারে একটি অস্পষ্ট ছায়া দেখা দিল। ধীরে ধীরে সেই ছায়া সামনে এগিয়ে আসতে লাগল। এক পা... তারপর আরেক পা...। মশালের কাঁপতে থাকা আলো ধীরে ধীরে তার শরীর স্পর্শ করতেই উপস্থিত সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল।

লোকটি একজন বৃদ্ধ। না, শুধু বৃদ্ধ নয়—অত্যন্ত বৃদ্ধ। কোমর সামান্য ঝুঁকে গেছে, বুক পর্যন্ত নেমে এসেছে লম্বা সাদা দাড়ি। গায়ে ধূসর রঙের সাধারণ পোশাক। মুখে সময়ের গভীর ছাপ স্পষ্ট, অসংখ্য বলিরেখা যেন বহু যুগের ইতিহাস বহন করে চলেছে। কিন্তু তার চোখ দুটো দেখে সবার বুকের ভেতর হঠাৎ একটা অস্বস্তি জন্ম নিল। সেই চোখে বার্ধক্যের কোনো দুর্বলতা নেই। বরং সেগুলো ছিল অস্বাভাবিক তীক্ষ্ণ, যেন মানুষের মুখ নয়, তার অন্তরের গভীরতম গোপন কথাও ভেদ করে দেখতে পারে।

বৃদ্ধ লোকটি সামনে এসে দাঁড়াতেই কক্ষে উপস্থিত কয়েকজন প্রবীণ সভাসদের মুখের রঙ মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল। একজন অবিশ্বাসে ফিসফিস করে বললেন, “অসম্ভব...” আরেকজন কাঁপা গলায় উচ্চারণ করলেন, “উনি... এখনও বেঁচে আছেন?”

প্রতাপ ভ্রু কুঁচকে লোকটির দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “আপনি কে?”

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ নীরবে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর শান্ত স্বরে বললেন, “আমি সেই মানুষ... যাকে সবাই মৃত বলে বিশ্বাস করে।”

কক্ষের ভেতর আরও গভীর নীরবতা নেমে এলো। প্রতাপের দৃষ্টি আরও কঠিন হয়ে উঠল। সে আবার বলল, “নাম বলুন।”

বৃদ্ধের ঠোঁটে মৃদু একটি হাসি ফুটে উঠল। কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে তিনি বললেন, “আমার নাম... রঘুপতি আচার্য।”

নামটি উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বৃদ্ধ নৌসেনাপতির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বসন্ত রায়ের চোখেও জীবনে প্রথমবারের মতো স্পষ্ট বিস্ময়ের ছাপ ফুটে উঠল। প্রতাপ সেই পরিবর্তন লক্ষ করল। সে সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেল, এই মানুষটিকে শুধু সবাই চেনে তা-ই নয়—সম্ভবত তাঁকে ভয়ও করে।

রঘুপতি ধীরে ধীরে চারদিকে তাকালেন। তারপর তাঁর দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো বিক্রমাদিত্যের নিথর দেহের ওপর। কয়েক মুহূর্ত তিনি নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর চোখের গভীরে যেন অদ্ভুত এক বিষাদের ছায়া নেমে এলো। খুব আস্তে তিনি বললেন, “শেষ পর্যন্ত সে চলে গেল...” তাঁর কণ্ঠে এমন এক গভীর বেদনা ছিল, যা কোনোভাবেই অভিনয় বলে মনে হলো না।

প্রতাপ আর সময় নষ্ট করল না। সে সামনে এগিয়ে এসে প্রশ্ন করল, “আপনি কে? আর এই গোপন সুড়ঙ্গে কী করছিলেন?”

রঘুপতি শান্তভাবে তার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলেন, “তোমার অপেক্ষা করছিলাম।”

প্রতাপ বিস্মিত হয়ে বলল, “আমার?”

“হ্যাঁ।”

এরপর বৃদ্ধের দৃষ্টি ধীরে ধীরে ঘুরে গিয়ে থামল কালো সূর্যচিহ্ন খোদাই করা ধাতব বাক্সটির ওপর। বাক্সটির দিকে তাকাতেই তাঁর চোখে এক অদ্ভুত ঝলক ফুটে উঠল। তিনি মৃদু স্বরে বললেন, “অবশেষে বাক্সটা বেরিয়ে এসেছে।”

প্রতাপের বুকের ভেতর ধক করে উঠল। সে দ্রুত প্রশ্ন করল, “আপনি এই বাক্স চেনেন?”

রঘুপতি শান্তভাবেই উত্তর দিলেন, “চিনি। কারণ এটা লুকানোর পরিকল্পনা আমিই করেছিলাম।”

কথাটি শুনে যেন কক্ষের ভেতর বিস্ফোরণ ঘটল। উপস্থিত সবাই বিস্ময়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল। বসন্ত রায় এবার আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি সামনে এগিয়ে এসে কঠোর কণ্ঠে বললেন, “তুমি কি জানো এই বাক্সের ভেতরে কী আছে?”

রঘুপতির চোখ ধীরে ধীরে তাঁর দিকে ফিরল। দুজনের দৃষ্টি কয়েক মুহূর্ত একে অপরের ওপর স্থির হয়ে রইল। সেই নীরবতার মধ্যেই যেন বহু বছরের অজানা ইতিহাস লুকিয়ে ছিল। অবশেষে রঘুপতি বললেন, “আমি জানি।”

এক মুহূর্ত থেমে তিনি আরও বললেন, “আর তুমি-ও জানো, বসন্ত।”

এই কয়েকটি শব্দ উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কক্ষের বাতাস যেন জমে গেল। প্রতাপ বিস্মিত চোখে নিজের চাচার দিকে তাকাল। বসন্ত রায়ের মুখ আগের মতোই কঠিন, কিন্তু তাঁর চোখের গভীরে এক মুহূর্তের জন্য যেন চাপা অস্থিরতা কেঁপে উঠল।

রঘুপতি এবার ধীরে ধীরে বললেন, “তোমরা দুজনই এখন একই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছ।”

তিনি প্রতাপের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি জানতে চাও তুমি কে।”

এরপর দৃষ্টি ঘুরিয়ে বসন্ত রায়ের দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে যোগ করলেন, “আর সে চায় সত্যিটা বাইরে না আসুক।”

পরিস্থিতি মুহূর্তের মধ্যে বিস্ফোরক হয়ে উঠল। প্রতাপের বুকের ভেতর রক্ত যেন আরও দ্রুত প্রবাহিত হতে লাগল। সে কঠিন স্বরে বলল, “আপনি কী বলতে চাইছেন?”

কিন্তু রঘুপতি উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে থেকে দ্রুত ছুটে এলো একজন প্রহরী। তার মুখ আতঙ্কে বিবর্ণ, নিঃশ্বাস দ্রুত ওঠানামা করছে। প্রতাপ বিরক্ত চোখে তাকিয়ে বলল, “কী হয়েছে?”

প্রহরী কাঁপা গলায় বলল, “রাজপুত্র! নদীর দিকে পাহারা দেওয়া সৈন্যরা খবর পাঠিয়েছে...”

প্রতাপ কঠোর স্বরে বলল, “বল!”

প্রহরী হাঁপাতে হাঁপাতে উত্তর দিল, “মোগল জাহাজগুলো সত্যিই চলে যায়নি। ওরা নদীর মোহনায় অপেক্ষা করছে। আর... তাদের সঙ্গে নতুন বাহিনীও যোগ দিয়েছে।”

কক্ষের সবাই একসঙ্গে চমকে উঠল। প্রতাপের কণ্ঠ আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। “কার বাহিনী?”

প্রহরী নিচু স্বরে উত্তর দিল, “রাজপুত সেনা...”

মুহূর্তের মধ্যেই পুরো কক্ষের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। কারণ এর অর্থ একটাই—এবার যে আসছে, সে সাধারণ কোনো সেনাপতি নয়।

ঠিক তখনই রঘুপতি আচার্য ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বললেন, “সময় শেষ হয়ে আসছে...”

কয়েক মুহূর্ত পর তিনি আবার চোখ খুলে প্রতাপের দিকে তাকালেন। তাঁর কণ্ঠে অদ্ভুত এক গাম্ভীর্য নেমে এলো।

“কারণ যার নাম শুনে বাংলার অনেক রাজা কেঁপে ওঠে...”

তিনি ইচ্ছে করেই থেমে গেলেন। কক্ষে উপস্থিত প্রত্যেক মানুষ নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাঁর পরের কথার অপেক্ষায় রইল।

অবশেষে তিনি ধীরে, স্পষ্ট উচ্চারণে বললেন—

“মানসিংহ বাংলার পথে রওনা দিয়েছে।”

কথাটি শেষ হতেই মশালের আগুন যেন হঠাৎ কেঁপে উঠল। আর সেই মুহূর্তেই প্রতাপ বুঝতে পারল—এতদিন যা কিছু ঘটেছে, তা ছিল কেবল ঝড়ের আগের প্রথম হাওয়া। প্রকৃত ঝড় এখনও আসেনি।

...............................................

প্রাসাদের ভেতরে যেন হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেল।

মানসিংহ।

নামটা উচ্চারণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘরে উপস্থিত বহু মানুষের মুখের রঙ বদলে গেল। কারও চোখে আতঙ্ক, কারও চোখে উদ্বেগ, আবার কারও চোখে এমন এক পুরোনো স্মৃতির ছায়া ভেসে উঠল, যেটাকে তারা বহু বছর ধরে ভুলে থাকার চেষ্টা করেছে। মুহূর্তের মধ্যে সভাকক্ষের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠল।

প্রতাপ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার দৃষ্টি নিবদ্ধ রঘুপতি আচার্যের মুখে। গভীর, অনুসন্ধানী কণ্ঠে সে জিজ্ঞেস করল, “তুমি নিশ্চিত?”

রঘুপতি ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন। তাঁর কণ্ঠে বয়সের ভার থাকলেও দৃঢ়তার কোনো অভাব ছিল না। তিনি শান্ত গলায় বললেন, “আমার বয়স অনেক হয়েছে, প্রতাপ। কিন্তু এখনও মিথ্যা বলার অভ্যাস হয়নি।”

ঠিক সেই সময় বাইরে কোথাও আগুনে পোড়া কাঠ ভেঙে পড়ার কর্কশ শব্দ ভেসে এলো—“খররর...”। সেই শব্দ যেন চারপাশের নিস্তব্ধতাকে আরও ভারী করে তুলল।

বসন্ত রায় ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এসে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “মানসিংহ যদি সত্যিই আসে... তাহলে মোগলরা আর শুধু যশোর দখল করতে আসছে না।”

রঘুপতি তাঁর দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বললেন, “অবশেষে তুমি ঠিক কথা বললে।”

বসন্ত রায়ের মুখ আরও কঠিন হয়ে উঠল। প্রতাপ তা লক্ষ করল। বৃদ্ধ আচার্যের কথার মধ্যে এমন এক ইঙ্গিত ছিল, যা বোঝাচ্ছিল—তাঁদের দুজনের মধ্যে বহু পুরোনো কোনো অমীমাংসিত ইতিহাস লুকিয়ে আছে।

ঠিক তখনই বাইরে থেকে শিঙার তীক্ষ্ণ শব্দ ভেসে এলো। একবার... দুবার... তিনবার। সংকেতটি এতটাই জরুরি ছিল যে পরমুহূর্তেই একজন সৈন্য দ্রুত সভাকক্ষে ঢুকে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “রাজপুত্র!”

প্রতাপ তৎক্ষণাৎ তার দিকে ফিরল। “কী হয়েছে?”

সৈন্যটি মাথা নিচু করে বলল, “নদীর মোহনা থেকে দূত এসেছে। জরুরি সংবাদ।”

এক মুহূর্ত দেরি না করে প্রতাপ সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। তাঁর পেছন পেছন বসন্ত রায়, রঘুপতি আচার্য এবং কয়েকজন বিশ্বস্ত সেনাপতি দ্রুত সভামণ্ডপের দিকে এগিয়ে চললেন।

সভামণ্ডপে পৌঁছে সবাই দেখল—একজন অশ্বারোহী দূত হাঁটু গেড়ে বসে আছে। তার পোশাক কাদা ও রক্তে ভেজা। দীর্ঘ পথ ছুটে আসার ক্লান্তি তার মুখে স্পষ্ট। ঘোড়াটিও হাঁপাচ্ছে, যেন শেষ শক্তিটুকু দিয়েই এখানে পৌঁছেছে।

প্রতাপ ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বলল, “বলো।”

দূত মাথা নত করল। কাঁপা গলায় বলল, “মহারাজ, মোহনার কাছে আমাদের গুপ্তচররা নতুন একটি শিবির দেখতে পেয়েছে।”

প্রতাপের চোখ সরু হয়ে এলো। “কত বড়?”

দূত একবার ঢোক গিলে উত্তর দিল, “অনেক বড়। শুধু মোগল সৈন্য নয়... রাজপুত অশ্বারোহী, কামানবাহিনী, যুদ্ধহস্তী—সবই রয়েছে।”

তার কথা শেষ হতেই সভামণ্ডপে চাপা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল। সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগল। প্রতাপের মুখ আরও কঠিন হয়ে উঠল। সে ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করল, “সেনাপতির নাম?”

দূত এবার চোখ তুলে তাকাল। তার কণ্ঠে স্পষ্ট ভয়ের ছাপ। “রাজা মানসিংহ।”

এই একটি নাম যেন পুরো সভামণ্ডপকে স্তব্ধ করে দিল। কয়েক মুহূর্ত কেউ একটি শব্দও উচ্চারণ করল না।

প্রতাপ ধীরে ধীরে সভার মাঝখানে হাঁটতে শুরু করল। তার মনে একসঙ্গে অসংখ্য প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল। কালো সূর্যের রহস্য... চুরি যাওয়া দলিল... বিক্রমাদিত্যের মৃত্যু... গোপন ধাতব বাক্স... আর এখন মানসিংহের আগমন।

হঠাৎ তার মনে হলো—এসব ঘটনা আলাদা নয়। সবকিছু যেন একই অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। এতদিন যেগুলো বিচ্ছিন্ন রহস্য বলে মনে হয়েছিল, সেগুলো হয়তো একই ষড়যন্ত্রের অংশ।

ঠিক তখনই রঘুপতি আচার্যের কণ্ঠ ভেসে এলো, “তুমি অবশেষে বুঝতে শুরু করেছ।”

প্রতাপ ঘুরে তাঁর দিকে তাকাল। রঘুপতি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ধাতব বাক্সটির দিকে আঙুল তুলে বললেন, “যে উত্তর খুঁজছ, তার শুরু ওই বাক্সের ভেতরে।”

প্রতাপ বাক্সটির দিকে তাকাল। মশালের কাঁপতে থাকা আলোয় তার গায়ে খোদাই করা কালো সূর্যের প্রতীকটি অদ্ভুতভাবে ঝলমল করছিল। যেন সেটি নিছক কোনো চিহ্ন নয়, বরং বহু শতাব্দীর গোপন ইতিহাসের নীরব সাক্ষী।

প্রতাপ দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “তাহলে খুলতে হবে।”

বৃদ্ধ নৌসেনাপতি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “কিন্তু তালা?”

রঘুপতি মৃদু হাসলেন। “এই তালা শক্তি দিয়ে খোলা যায় না।”

প্রতাপ বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করল, “তাহলে?”

রঘুপতি শান্তভাবে উত্তর দিলেন, “এটার চাবি আছে।”

প্রতাপ আরও এক ধাপ এগিয়ে এল। “কোথায়?”

এই প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গেই রঘুপতির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। তাঁর চোখে গভীর বিষাদের ছায়া নেমে এলো। ধীরে ধীরে তিনি বললেন, “বিক্রমাদিত্যের কাছে ছিল।”

প্রতাপের বুকের ভেতর ধক করে উঠল। সভায় উপস্থিত সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। কারণ বিক্রমাদিত্য আর বেঁচে নেই। তাঁর সঙ্গে যদি চাবিটিও হারিয়ে গিয়ে থাকে, তবে সেই রহস্যের সমাধান কীভাবে সম্ভব?

ঠিক তখনই সভামণ্ডপের বাইরে হঠাৎ তীব্র চিৎকার শোনা গেল।

“ধরো! ধরো!”

পরক্ষণেই ভেসে এলো দ্রুত দৌড়ানোর শব্দ।

প্রতাপ আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে তরবারি খাপ থেকে বের করে ঝড়ের গতিতে বাইরে ছুটে গেল। সৈন্যরাও তার পেছনে ছুটল।

প্রাসাদের উত্তর আঙিনায় পৌঁছেই সবাই দেখল—একজন মুখ ঢাকা লোক প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে। তার হাতে শক্ত করে ধরা একটি ছোট্ট থলে। কয়েকজন প্রহরী তাকে তাড়া করছে।

লোকটি প্রাসাদের উঁচু প্রাচীর টপকে পালানোর চেষ্টা করল। কিন্তু প্রতাপ বজ্রগতিতে সামনে এসে তার পথ আটকে দিল।

লোকটি থেমে গেল।

দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিলতেই প্রতাপের শরীর শীতল হয়ে উঠল। সেই চোখ সে আগে দেখেছে—প্রাসাদের ছাদের ওপর, আগুনের লেলিহান আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা সেই রহস্যময় ছায়ামূর্তির চোখ।

মুখোশধারী লোকটি থলেটি আরও শক্ত করে চেপে ধরে ঠান্ডা কণ্ঠে বলল, “অনেক দেরি হয়ে গেছে, প্রতাপাদিত্য।”

প্রতাপ তরবারি তুলে দৃঢ় গলায় বলল, “এইবার তুই পালাতে পারবি না।”

লোকটি ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। তারপর অদ্ভুত শান্ত স্বরে বলল, “আমি পালাতে আসিনি।”

কথা শেষ করেই সে আচমকা থলেটি মাটিতে ছুঁড়ে ফেলল।

থলেটি মাটিতে পড়তেই খুলে গেল। ভেতর থেকে একটি ছোট ধাতব বস্তু গড়িয়ে বেরিয়ে এলো। মশালের আলো পড়ে সেটি ঝলসে উঠল।

আর সেটি দেখেই রঘুপতি আচার্যের মুখ থেকে আতঙ্কভরা একটি আর্তনাদ বেরিয়ে এল—

“না...!”

প্রতাপের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। মাটিতে পড়ে আছে বহুদিনের হারিয়ে যাওয়া সেই চাবি। আর তার গায়ে গভীরভাবে খোদাই করা রয়েছে—একটি কালো সূর্য। 🔥

......…..................................

উত্তর আঙিনার বাতাস যেন হঠাৎ জমে গেল। মশালের কাঁপতে থাকা আলো দীর্ঘ ছায়া ফেলে নীরবতাকে আরও ভারী করে তুলেছে। চারদিকে দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যরা যেন নিঃশ্বাস বন্ধ করে মাটিতে পড়ে থাকা ছোট্ট ধাতব চাবিটার দিকে তাকিয়ে আছে। চাবিটির গায়ে খোদাই করা একটি পরিচিত প্রতীক—কালো সূর্য।

ঠিক একই চিহ্ন তারা দেখেছে অস্ত্রাগারের ধ্বংসস্তূপে, সেই একই চিহ্ন দেখা গিয়েছিল গুপ্তঘাতকদের বুকে, আবার রহস্যময় বাক্সটির গায়েও সেই প্রতীক খোদাই করা রয়েছে। আর এখন সেই হারিয়ে যাওয়া চাবির গায়েও একই চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

প্রতাপ ধীরে ধীরে দৃষ্টি তুলল মুখোশধারী লোকটার দিকে। লোকটা একেবারে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে ভয়ের কোনো ছাপ নেই, নেই সামান্যতম উদ্বেগও। বরং তার মুখভঙ্গিতে এমন এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস ফুটে উঠেছে, যেন সে নিশ্চিত জানে—এখানে উপস্থিত কেউই এখনও পুরো খেলাটা বুঝে উঠতে পারেনি।

হঠাৎ রঘুপতি আচার্য কাঁপা গলায় বলে উঠলেন, “ওই চাবি স্পর্শ করো না!”

প্রতাপ বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেন?”

রঘুপতির মুখে এই প্রথম স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ দেখা গেল। তিনি ধীরে ধীরে বললেন, “কারণ ওটা শুধু একটা চাবি নয়।”

প্রতাপ আরও গম্ভীর হয়ে প্রশ্ন করল, “তাহলে?”

বৃদ্ধ আচার্য গভীর নিঃশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বললেন, “ওটা একটা সংকেত।”

তার কথার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে এমন এক নিস্তব্ধতা নেমে এল, যেন সময় নিজেই থেমে গেছে। ঠিক তখনই মুখোশধারী লোকটা ধীরে ধীরে হেসে উঠল। হাসিটা খুব জোরে নয়, কিন্তু তার মধ্যে এমন এক অস্বস্তিকর শীতলতা ছিল, যা উপস্থিত সবার শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল।

সে রঘুপতির দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল, “বৃদ্ধটা এখনও সব ভুলে যায়নি দেখছি।”

প্রতাপের মুঠি শক্ত হয়ে উঠল। তার চোখে রাগের আগুন জ্বলে উঠল। সে কঠোর গলায় বলল, “তুই কে?”

লোকটা কোনো উত্তর দিল না। বরং ধীরে ধীরে নিচু হয়ে মাটিতে পড়ে থাকা চাবিটা তুলে নিল। তারপর আঙুলের ফাঁকে সেটাকে ঘুরাতে ঘুরাতে শান্ত গলায় বলল, “অনেক বছর আগে এই চাবি হারিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হারায়নি।”

প্রতাপ আর এক পা এগিয়ে এসে গর্জে উঠল, “নাম বল।”

কয়েক মুহূর্ত লোকটা নিশ্চুপ রইল। তারপর খুব ধীরে নিজের মুখের কাপড় খুলতে শুরু করল। চারদিকে দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যরা একযোগে অস্ত্র আরও শক্ত করে ধরল। বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল। এক মুহূর্ত… দুই মুহূর্ত… তারপর মুখোশটা মাটিতে পড়ে গেল।

সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে বিস্ময়ের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল।

প্রতাপের চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল। কারণ লোকটা সম্পূর্ণ অপরিচিত নয়। সে যশোর রাজ্যেরই একজন মানুষ—রাজপ্রাসাদের বহু পুরোনো কর্মচারী। নাম গোবিন্দ দাস। প্রাসাদের নথিঘরের রক্ষক। প্রায় কুড়ি বছর ধরে যে নিষ্ঠার সঙ্গে রাজপরিবারের সেবা করে এসেছে।

একজন সৈন্য অবিশ্বাসে বলে উঠল, “অসম্ভব!”

আরেকজন ফিসফিস করে বলল, “ও তো বহু বছর ধরে প্রাসাদেই আছে!”

প্রতাপ অবিশ্বাসভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “তুই?”

গোবিন্দ দাস ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে উত্তর দিল, “হ্যাঁ, রাজপুত্র।”

প্রতাপ আর দেরি করল না। সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, “তুই কালো সূর্যের লোক?”

গোবিন্দ সরাসরি উত্তর না দিয়ে শান্ত গলায় বলল, “কখনও কখনও ইতিহাসের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ তরবারি দিয়ে হয় না… হয় সত্য দিয়ে।”

সে হাতে ধরা চাবিটার দিকে তাকিয়ে যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলল।

প্রতাপ দাঁত চেপে বলল, “ধাঁধা বন্ধ কর।”

গোবিন্দ এবার প্রতাপের চোখে চোখ রেখে বলল, “তুমি কি সত্যিই জানতে চাও?”

প্রতাপ দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিল, “হ্যাঁ।”

গোবিন্দ একটুও দেরি না করে বলল, “তাহলে বাক্সটা খোলো।”

কিন্তু তার কথা শেষ হওয়ার আগেই রঘুপতি আচার্য আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলেন, “না!”

সবাই বিস্ময়ে তার দিকে তাকাল। বৃদ্ধের মুখে এমন ভয় আগে কেউ দেখেনি।

তিনি কাঁপা গলায় বললেন, “এখন না!”

গোবিন্দ হেসে প্রতাপের দিকে তাকাল। “দেখলে, প্রতাপ? সত্যের কথা উঠলেই এরা ভয় পায়।”

ঠিক সেই মুহূর্তে বসন্ত রায় প্রথমবার মুখ খুললেন। তার কণ্ঠ ছিল বরফের মতো ঠান্ডা। তিনি ধীরে ধীরে বললেন, “তুমি অনেক বেশি কথা বলছ।”

গোবিন্দের হাসি আরও প্রশস্ত হয়ে উঠল। সে শান্তভাবে জবাব দিল, “আর আপনি অনেক বেশি লুকিয়েছেন।”

এই একটি বাক্য যেন বজ্রপাতের মতো আঘাত করল। প্রতাপের বুকের ভেতর ধক করে উঠল। বসন্ত রায়ের চোখে এক মুহূর্তের জন্য আগুনের ঝলক দেখা দিল। দুজনের দৃষ্টির সংঘর্ষে যেন অদৃশ্য এক যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল।

ঠিক তখনই দূরে প্রাসাদের পূর্ব প্রাচীরের দিক থেকে ভয়ংকর শিঙার শব্দ ভেসে এল।

একবার…দুবার…তিনবার…

মুহূর্তের মধ্যে উত্তেজনা আরও তীব্র হয়ে উঠল।একজন প্রহরী আতঙ্কিত মুখে দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “রাজপুত্র!”

প্রতাপ সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”

প্রহরী কাঁপা গলায় বলল, “পূর্ব প্রাচীরের বাইরে অচেনা বাহিনী দেখা গেছে!”

প্রতাপের চোখ কঠিন হয়ে উঠল। “মোগল?”

প্রহরী মাথা নাড়ল। “না… তাদের পতাকা আলাদা।”

প্রতাপের কণ্ঠ আরও ভারী হয়ে উঠল। “কী পতাকা?”

কয়েক মুহূর্ত দ্বিধায় থেকে প্রহরী ফিসফিস করে বলল, “কালো সূর্য…”

মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে আবার গভীর নীরবতা নেমে এল। কারণ এর অর্থ অত্যন্ত ভয়ংকর।

এতদিন সবাই বিশ্বাস করেছিল কালো সূর্য কেবল গুপ্তঘাতকদের একটি গোপন প্রতীক। কিন্তু এখন স্পষ্ট হয়ে গেল—এটি শুধু একটি চিহ্ন নয়। তাদের নিজস্ব বাহিনী রয়েছে, নিজস্ব সৈন্য রয়েছে, সুপরিকল্পিত কৌশল রয়েছে এবং সম্ভবত এমন একজন নেতা রয়েছে, যার পরিচয় এখনও সম্পূর্ণ অজানা।

ঠিক তখনই গোবিন্দ দাস ধীরে ধীরে আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। তার কণ্ঠে এক অদ্ভুত প্রশান্তি।“অবশেষে তারা চলে এসেছে…”

প্রতাপ বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠল, “কারা?!”

গোবিন্দ ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল। তার চোখে এমন এক গভীর রহস্যের ছায়া, যা যেন বহু শতাব্দীর অন্ধকারকে নিজের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে।

সে শান্ত স্বরে বলল, “যারা তোমার জন্মেরও আগে থেকে এই দিনের অপেক্ষা করছে।”

হঠাৎ উত্তরের বাতাসে এক শীতল ঝাপটা বয়ে গেল। মশালের শিখাগুলো একসঙ্গে কেঁপে উঠল। সেই মুহূর্তে প্রতাপ স্পষ্ট বুঝতে পারল—এতদিন যে অন্ধকারের বিরুদ্ধে সে লড়াই করে এসেছে, সেটি ছিল কেবল শুরু। প্রকৃত শত্রু, প্রকৃত ষড়যন্ত্র এবং প্রকৃত যুদ্ধ এখনও তার সামনে এসে দাঁড়ায়নি।

.................................…...............চলবে