ঝরাপাতা
পর্ব - ৫৪
❤💕❤💕❤💕❤
রনি হেসে ফেলে বলে, "এই রে যুগল গেছে সেই তিনটের সময়, আর এখন সাড়ে ছটা বেজে গেছে। এতক্ষণ পর ফোন করলে আমাকে যা করবে। তুমি দিদিকে ফোন করো।"
- "ঐ একই হবে। দিদি কি আমাকে ছেড়ে দেবে নাকি?" মিলি খাটে বসে পড়ে। আবার উঠে পড়ে বলে, "তুমি ফোন করো, আমি মুখটা ধুয়ে আসি। যুগলদা আসার আগে ফ্রেশ হয়ে নিই।"
রনি মিলির দিকে একবার তাকায়, বেশ সেজেগুজেই এসেছিল, এখন তার চিহ্নমাত্রও নেই। মুখ ধুয়ে এলেও, এই মুখ দেখলে যুগল আর লিলি সবটাই বুঝতে পারবে।
রনির চোখের দৃষ্টি পড়তে মিলির অসুবিধা হয় না, লজ্জায় লাল হয়ে বলে, "তুমিই তো, কতবার বললাম ছাড়ো।"
রনি তেড়ে ওঠে, "আমার জন্য নাকি তোমার জন্য? তুমি যদি আমাকে এতদিন না জ্বালাতে......"
- "আবার শুরু করেছ? কি জ্বালিয়েছি আমি?" মিলিও তেড়ে আসে। রনির সুবিধাই হয়, টপ করে মিলির গালে একটা চুমু খেয়ে বলে, "এরকম করে আমার কাছে এগিয়ে আসতে না, সেই জ্বালার কথা বলেছি।"
- "তুমি থামবে? বাড়ি থেকে ফোন করছে, তাও তুমি...." মিলি তড়বড় করে পালাতে যাচ্ছিল, রনি ওর কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের কাছে আটকে রাখে। ওর চোখের দুষ্টু হাসিটা দেখে মিলি হেসে ফেলে, ওর বাহু ধরে বলে, ''এরকম কোরো না, এবার বাড়ি চলো, ফোন করো।"
রনি মাথা নামিয়ে নেয়, একমুহূর্ত নিজের ঠোঁট টিপে রেখে আবার মিলির চোখে চোখ রেখে বলে, "বাড়ি গিয়ে আমার কথা মনে পড়বে?"
হঠাৎ ওর গলার স্বরের গাঢ়তা মিলিকে ছুঁয়ে যায়। হাসিমুখটার আলো নিভে গেছে। এবার নিজেও রনিকে জড়িয়ে ধরে, রনির বুকে মাথা রেখে বলে, "তোমাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু এখন কি করব?"
রনি ওকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দেয়, ওর দু কাঁধে হাত রেখে বলে, "সরি মিলি, আমার আজ উচিত হয়নি তোমাকে ওভাবে ছোঁওয়া। বিশ্বাস করো, আমি যা করেছি, তোমাকে ভালোবাসি বলে, তুমি আমার স্ত্রী বলে। তোমার কোনো অসম্মান আমি করতে চাইনা। তবুও আরও হয়ত কয়েকটা দিন সময় লাগবে। তারপর তোমাকে আমার কাছে নিয়ে আসবই। সেটুকু ভরসা রেখো। আর কিছু মনে হলে আমাকে বোলো। দিনেরাতে যখন খুশি আমাকে ফোন কোরো, দরকার হলেই ডেকো।" মিলি মাথা নাড়ে, রনি ওকে ছেড়ে দিয়ে অন্যদিকে ঘুরে যায়। মিলি তাও দেখতে পায়, ওর হাত মুঠো করে রেখেছে, চোয়ালের রেখা শক্ত হয়ে রয়েছে। মিলি চট করে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে, ওর সামনে কাঁদা উচিত নয় এখন, এটা বুঝেছে।
🌹💕🌹💕🌹💕🌹
যুগল ফোন ধরে বলে, "ভাইয়া আমি ভেবেছিলাম, তুমি আজ আর ফোন করতে পারবে না।"
ওর হো হো করে হাসির উপর দিয়ে রনি বলে, "বাজে কথা বন্ধ করে এক্ষুণি বাড়িতে এসো। তোমরা জানো, মিলির সব কথা মনে পড়েছে? তাই এত ইরেজিস্টেবল হয়ে ছিল।"
যুগল লাফিয়ে ওঠে, "সাচ ভাইয়া? আপনে তো সাচমে খুশ কর দিয়া।"
- "যুগল, থ্যাংকস ভাই। মেনি মেনি থ্যাংকস। তুমি, তোমরা আজ যা করলে ! তোমরা ওর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দিলে বলেই সব মিটল। এবার চলে এসো, ফিরতে হবে আমাদের।"
- "রনিদা, মিলি কোথায়?" লিলি ফোন নিয়ে বলে।
- "ও ওয়াশরুমে। এসো, বোনের সঙ্গে কথা বলে নাও।" যুগল আর লিলির হাসির শব্দ শোনা যায়। তারপর লিলি বলে, "ওকে বলে দিও, আমরা দুজন দীঘা যাচ্ছি। আমাদের হাউজিং কমিউনিটির পিকনিক। আজ তিরিশের রাতে পৌঁছব, কাল একত্রিশ, আর পরশু ফার্স্ট জানুয়ারি সেলিব্রেট করে আমরা ফিরব। আমার বইয়ের তাকের উপর চাবি আছে। দরজার ল্যাচটা টেনে, চাবি দিয়ে তোমরা চলে যাও।"
- "পিকনিক মানে? তিনদিনের জন্য বেরিয়ে গেলে, তোমরা তো খালি হাতে গেলে বাড়ি থেকে?" রনি বোঝে, যুগল আর লিলি ওকে সবদিকে টেক্কা দিয়েছে।
- "ব্যাগ গুছিয়ে পাশের ফ্ল্যাটের আন্টির কাছে রেখেছিলাম। তোমাদের একটু কোয়ালিটি টাইম কাটাতে দিতাম, মজাও করতাম তাই নিয়ে। তোমরা যে এত আনন্দ দেবে ভাবতে পারিনি। এবার তুমি ওকে তোমার বাড়ি নিয়ে যেও রনিদা। তোমরা খুব ভালো থেকো। আমাদের সঙ্গে দেখা কোরো মাঝে মাঝে।"
- "তোমাদের সঙ্গে সবসময় থাকব লিলি। ভালো ঘুরে এসো। তোমরা দুজন এরকমই থেকো। এরকম আনপ্রেডিক্টেবল, এরকম বোহেমিয়ান। এটাই তোমাদের মানায়। হ্যাপি জার্নি, রাখছি।" ফোনটা রেখে মন ভারী হয়ে যায় রনির, লিলি আর যুগলের জন্য। এই পৃথিবীতে এত মানুষের মধ্যে রনি আর মিলি ছাড়া আর কোনো আত্মীয় নেই বেচারাদের।
রনি ফোন ছেড়ে দিতে যুগল আর লিলি আরেকটু ঘন হয়ে বসে বাসের সিটে। যুগল একহাতে জড়িয়ে রেখেছে লিলিকে, লিলি ওর বুকের কাছে ঘেঁষে আরামে চোখ বুজে আছে।
🌹💕🌹💕🌹💕🌹
আজ সবকিছুই অন্যরকম, তার উপর যখন বাড়ির সামনে এসে রনি ওর সঙ্গে গেট খুলে ভিতরে এসে ওর আগেই দরজার সামনে পৌঁছে বেল বাজালো, মিলি কিছুই বুঝতে পারছে না ও কি করতে যাচ্ছে। আজ এখনই কি বাড়িতে কথা বলবে?
সমর এসে দরজা খুলেই রনিকে এসো এসো বলে ডাকাডাকি করে ভিতরে আনলো। পিছন পিছন মিলি, ঢুকেই মায়ের পিছনে লুকিয়েছে ও। রনি সেটা দেখেই বলল, "একটা কথা বলতে এলাম কাকু। মিলিকে একবার ডঃ গিরিকে দেখিয়ে আনলে ভালো হত। ওর সব কথা মনে পড়ে গেছে। ওর দিকে একটু খেয়াল রাখবেন কাকিমা। আমি ডাক্তারের সঙ্গে এ্যাপয়েন্টমেন্টটা করিয়ে রাখব।"
গোপা আর সমর দুজনেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে রনিকে বসাতে। ও কারও অনুরোধই শোনে না, "আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হবেন না। আপনারা ওর খেয়াল রাখুন। আমি পরে আসব আবার।" রনি বেরিয়ে আসে। মিলির দিকে তাকাতেও সাহস পায় না। সত্যিই নিজের বুকের পাঁজর খুলে রেখে আসল মনে হচ্ছে। তার মানে মিলি কতটা আপসেট। তাও সারা রাস্তা ভেবেছে, "আমি তো বাড়ি গিয়ে সবার সঙ্গে কথা বলতে পারব, মিলি বেচারি কাকে বলবে?" সেজন্যই নিজেই ওর বাড়িতে খবরটা দিয়ে আসে।
গোপা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে আদর করে বসায়, "এখন ঠিক আছিস তো মা?"
মিলির ভীষণ লজ্জা করছে, রনিদা যে কি না ! আজকেই বাড়িতে বলে দেবে, ওকে বলেইনি। তাও মাথা নাড়ে, "ঠিক আছি মা। আচ্ছা, রনিদা আমার থেরাপিস্টের সব জানে? ও যে এ্যাপয়েন্টমেন্ট করবে বলল?"
এবার সমরই মেয়েকে সমস্ত কথা বলে। ওর জন্য সাইকায়াট্রিট সাজেস্ট করা থেকে, ডঃ গিরির কাছে থেরাপি শুরু, এমনকি রনির জোর করে চিকিৎসার ভার নেওয়া। মিলির মন ভরে যাচ্ছিল সব জেনে। যাক, ভুল মানুষকে বাছেনি ও, বরং সব জানত না বলে অকারণ কষ্ট পেয়েছে, রনিকেও কষ্ট দিয়েছে। খুব ইচ্ছে করছে এখনই একবার রনির সঙ্গে কথা বলে।
রনি তখন বাড়িতে দাদা বৌদির জেরার সামনে। ওরা রনিকে জানায়নি, মণিকাকে সব বলা হয়ে গেছে। দুজনেই চেপে ধরেছে, মিলিকে নিয়ে কোথায় গেছিল, সারাদিন কি করেছে দুজন, সব বললে, তবেই ওরা মাকে বলবে।
ফাঁদে পড়ে রনি শুধু বলে, এক বন্ধুর বাড়িতে গেছিল।
বনি চোখ সরু করে তাকায়, "বন্ধু নিজে বাড়িতে ছিল?" পিউ হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে। রনির পকেটে এখনও লিলিদের ফ্ল্যাটের চাবি। ধরা পড়ে আমতা আমতা করে, "কি যে সব বলছিস না? আমাকে বলছিস ঠিক আছে। মিলি তোর থেকে কত ছোট, সেটাও ভুলে গেছিস? তুই না ওর ভাসুর?"
- "তা কি করব? তোর বৌকে দেখে ঘোমটা দিয়ে থাকব আমি?"
- ''আর বৌ ! নিজের বৌয়ের সঙ্গে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা করতে হয়। তোরাও সবাই এ্যাডভান্টেজ নিতে বসে আছিস। তোদের জেরার উত্তর দিয়ে তবে রেহাই পাই।" রনি মুখ টিপে হাসে। দাদাকে পালটা চাপ দিতে হবে বুঝে গেছে।
- "আচ্ছা, আচ্ছা, আর বেশিদিন না। তোমার ঘরে তোমার বৌকে এনে দেব, কথা দিলাম। শুধু সবটা বলো আজকের গল্প।" পিউ হাসি চেপে ঘনিয়ে বসেছে গল্প শুনতে।
- "গল্প আবার কি? মিলি রেগে ছিলই, কথা বলছিল না, আমার কথাও শুনছিল না। আমার এক বন্ধু ওকে ফোন করে নিমন্ত্রণ করেছিল সব মেটাতে। ওখানেই কথায় কথায় বলল, কয়েকদিন আগে সব মনে পড়েছে। ঐজন্যই আমার সঙ্গে কথা বলছিল না।" রনির মুখটা ধীরে ধীরে কালো হয়ে যাচ্ছে, নিজের অপরাধের ভাবেই।
বনির আজ খুব কষ্ট হয় ভাইয়ের জন্য। এবার ঠাট্টা ছেড়ে উঠে এসে ওর কাঁধে হাত রেখে বলে, "মিলির রাগ কমেছে? তোর সব কথা বলতে পেরেছিস তো?"
- "আমি আমার মতো করে বলেছি। এ বাড়িতে আনতে গেলে আসবে কিনা তাও জিজ্ঞেস করেছি।"
- "কি বলল? আসবে? আমরা গিয়ে নিয়ে আসব তাহলে।" পিউও ভাইকে আশ্বাস দেয়।
- "প্রথমে চুপ করে ছিল। আমি বলেছি, সবাইকে সব বলার ভার আমার। ওকে বাড়িতে রেখে, মিলির যে সব মনে পড়ে গেছে, বলেও এসেছি ওদের। এ বাড়িতে আনার কথা বলতে পারিনি। প্লিজ তোমরা একবার মাকে বলো, আমি মানে আমার খুব লজ্জা করবে মাকে বলতে।"
- "ওরে হতভাগা, মাকে বলা হয়ে গেছে। মা কি খুশি হয়েছে বুঝতে পারছিস? মা কাল নিজে গিয়ে ও বাড়িতে কথা বলত। তুই তো খানিকটা বলেই এসেছিস। এটা অবশ্য খুব ভালো করেছিস। এবার যা, মেয়েটাকে ফোন কর, বল, সব ঠিক আছে।"
রনি তাও দাঁড়িয়ে আছে দেখে পিউ বুঝতে পারে। হাসি চেপে বলে, "দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই। এখন পৌষমাস, মা এতকাণ্ডের পর এসময় বাড়ির বৌকে বাড়িতে আনবে না। ওরাও পাঠাবে বলে মনে হয় না।"
বনি জুড়ে দেয়, "আর এখন ওকে এ বাড়িতে আনলে এই সেমিস্টারও দিতে পারবে মনে হয় না।"
- "ধ্যাত, তোরা না, যাচ্ছেতাই।" রনি পালিয়ে বাঁচে।
চলবে