ঝরাপাতা
পর্ব - ৬৫
🌹🌿🌹🌿🌹🌿🌹
- "আমি মিলিকে ডাকছি দাঁড়াও।" গোপা চটপট মিলির ঘরের দিকে হাঁটা দেয়।
মিলি টের পেয়েছে, পিউ এসেছে। সেজন্যই ঘর থেকে বেরোয়নি। আগের দিনও এসে ওকে একগাদা প্রশ্ন করেছে। রনির সম্পর্কে কোনও আলোচনাই আর ভালো লাগছে না মিলির।
গোপা মেয়ের পাশে এসে বসল, "একটা ঝামেলা হয়েছে, বুঝলি। মণিকাদির শরীরটা এখনও ভালো হয়নি। এদিকে তোকে দেখতে চাইছে। দ্যাখ, ভুল ভাবিস না মা, আমরা তোর দিকেই আছি। কিন্তু একটা অসুস্থ মানুষের এইটুকু ইচ্ছেপূরণ না করলে, টেনশন, কান্নাকাটি করে যদি আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন নিজেদের কাছে নিজেরাই অপরাধী হয়ে যাব।"
- "পিউবৌদির কথা শুনতে পাচ্ছিলাম। এখন কি করতে বলো মা?"
- "দ্যাখ, মণিকাদি রনির উপর রাগ করে আছে, ওর মুখও নাকি দেখছে না। এসময় নার্সিং হোমে গিয়ে ওনার সঙ্গে একবার দেখা করে আয়। হয়ত কাঁদাকাটা করবেন, তোর কাছে ক্ষমা টমা চাইবেন। তুই বলবি, তোর ওনার উপর কোনো রাগ নেই। বুঝলি না, মানুষটার যাতে মন ভালো হয়ে যায়, সেরে ওঠে।"
- "বাবা রাজি আছে?"
- "হ্যাঁ রে বাবা। আমরা দুজনও যাব। আমরা এমনিই একবার যেতাম, যেতে হয়, সামনের বাড়ি। এখন তোকে আলাদা করে দেখতে চাইছে বলেই। চল, ঘুরেই আসি।"
🌹🌿🌹🌿🌹🌿🌹
বিরাট জায়গা নিয়ে, বেশ কয়েকটা ছড়ানো বিল্ডিং, ফাঁকে ফাঁকে বাগান, শহরের একটা নামী সুপার স্পেশালিটি প্রাইভেট নার্সিং হোম। গেট দিয়ে ঢুকে বাঁদিকে ডাক্তার এবং স্টাফদের পার্কিং। ডানদিকে বাগানের মাঝখানে প্রথম বিল্ডিং এ রিসেপশন আর ইমার্জেন্সি ইউনিট। প্রচুর মানুষ সেখানে অপেক্ষা করছেন, নিজের বাড়ির যে মানুষটার চিকিৎসা চলছে, তার সুস্থতার খবর পেতে। বনিরাও সারারাত এখানেই চেয়ারে বসেছিল। ভোরে মণিকা কিছুটা সুস্থ বোধ করতে, ইমার্জেন্সি থেকে এনে পিছনদিকে কার্ডিওলজি ডিপার্টমেন্টের বিরাট বিল্ডিং এর চারতলায় ফিমেল ওয়ার্ডে একটা কেবিনে দেওয়া হয়েছে। বনি আর রনি সেই বিল্ডিং এর একতলায় বসে আছে।
বনি একটাও কথা বলছে না ভাইয়ের সঙ্গে। মুশকিলে পড়েছে মায়ের সঙ্গে দেখা করে এসে। ওকে ফোন করে ডেকে নিয়ে ডাক্তার মায়ের কন্ডিশন জানিয়েছেন। মা ওকে দেখতে চেয়েছেন বলে ভিতরে যেতে দিয়েছেন। অবশ্য বেশি কথা বলাতে বারণ করে দিয়েছেন। বনিও তাই মাকে সব কথায় হ্যাঁ বলে পালিয়ে এসেছে।
রনি সাহস করে কিছু জিজ্ঞেস করছে না, তবে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, বুঝতে পারছে। রনিকেও তো জানানো উচিত, মা কেমন আছে।
রনির কাছাকাছি দাঁড়িয়ে, অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, "মা কথা বলতে পারছে। তবে বুকে ব্যথা করছে। ডাক্তার বললেন, চব্বিশ ঘন্টা ওয়াচ করছেন, ওটা না কমলে আবার টেস্ট করে দেখে স্টেন্ট বসাতে হবে। ততক্ষণ অপেক্ষা।"
মিলির কথা বলবে কিনা একবার ভেবেওছিল, ঠিক করল, আপাততঃ থাক। তখন থেকেই দুই ভাই দুরকম টেনশন নিয়ে বসে আছে। শেষে পিউ ফোন করল, মিলির বাড়ির সবাইকে নিয়ে ও আসছে। বনি ভাবল, ওদের যাতে খোঁজাখুঁজি করতে না হয়, গেটের সামনে চলে যাবে।
রনিকে বলে গেল, "তুই এখানে বোস। পিউ আসছে, আমি ওকে এগিয়ে আনি।"
রনিও ওর পিছন পিছন বেরিয়ে এসে বিল্ডিং এর বাইরে বাগানের ধারে হাঁটাহাঁটি করছিল, অবাক হয়ে দেখল, মিলি আসছে। ও বিশ্বাসই করতে পারছিল না, সত্যিই মিলি এখানে এসেছে। পিউর সঙ্গে চোখাচোখি হয় রনির, অনেকখানি অস্বস্তি ওর চোখেমুখে। বাকিরা দূর থেকে রনিকে দেখেই সচেতনভাবে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। রনিও বাধ্য হয়ে মাথা নিচু করে ফেলে।
তখনও ভিজিটিং আওয়ার শুরু হয়নি। তবে বনি গিয়ে কথা বলে, মণিকা যাকে দেখতে চেয়েছিল, সে এসেছে। ডাক্তারও জিজ্ঞাসা করেছিলেন ওকে, কাকে দেখতে চাইছে মণিকা। উনি বুঝে নিতে চাইছিলেন মণিকার এ্যাংজাইটির সঙ্গে এ কিভাবে জড়িত। বনি জানিয়েছিল, বাড়ির ছোটবউ মিলি। ডাক্তার সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন, মণিকার সঙ্গে তার কোনো অশান্তি হয়েছে কিনা।
বনি বলেছে, "না, মা ওকে খুব ভালোবাসে। আমাদের সামনের বাড়ির মেয়ে, অল্পদিন হল বিয়ে হয়েছে। ওর পরীক্ষা চলছিল, তাই ও বাপের বাড়িতে আছে।"
নিজের কানেই কথাগুলো সত্যি হয়েও কি ভীষণ মিথ্যে। অথচ খাঁটি সত্যিটা, মিলির সঙ্গে এখন ওদের সবার সম্পর্ক কেমন, সেটা শুনলে বাইরের মানুষরা কিছু বুঝবে না, মায়ের সঙ্গে হয়ত মিলির দেখা করার পারমিশনই দেবে না। ওরা বলবে, মা আরও উত্তেজিত হতে পারে। বনি জানে, সেটাও হতে পারে। তবে এই রিস্কটা ওকে নিতেই হবে। একমাত্র এটাই শেষ পন্থা।
বনি যেভাবে বলে রেখেছিল, তাতে মিলি এসেছে শুনেই ওকে মণিকার সঙ্গে দেখা করার পারমিশন দেওয়া হয়। ডাক্তারও আশায় আছেন, এই মেয়েটিকে দেখলে পেশেন্টের কিছুটা রিলিফ হতে পারে। মিলি হাত পা স্যানিটাইজ করে কেবিনের সামনে যায়। দরজায় হাত রেখে একবার ভয়ে ভয়ে ঘুরে তাকায়। সবার মুখে আশার আলো চকচক করছে। এই দলের পিছনে অনেকটা দূরত্ব রেখে করিডরের শেষমাথায় রনিও দাঁড়িয়ে। ওকে দেখেই মন শক্ত করে মিলি ঘরে ঢুকে পড়ে।
চলবে