Jharapata 71 in Bengali Love Stories by Srabanti Ghosh books and stories PDF | ঝরাপাতা - 71

Featured Books
Categories
Share

ঝরাপাতা - 71

ঝরাপাতা 

পর্ব - ৭১

🌹💞🌹💞🌹💞🌹

সবাই মিলিয়ে মিশিয়ে শুয়েছে আজ রাতে। মামীরা দুজন বেড়াতে এলে বরাবর মণিকার ঘরে শোয়, আজও তাই। মামারা একতলাতেই পাশের বাড়তি ঘরে, যেটাকে গেস্টরুম বলে পিউ। আজ অবশ্য পিউ মণিকার ঘরে থাকতে চেয়েছিল। মামীরা বলেছেন, আগামীকাল থেকে তো ওকেই থাকতে হবে। 

পিউ শুয়েছে দোতলায় ওর ঘরে, টুকাই, সুবর্ণ আর মিলিকে নিয়ে। ওদের ঘরে একটা বাড়তি ডিভান আছে, তাতে সুবর্ণ। দোতলার গেস্টরুমে বনি, সাত্যকি, সৌভিক। রনির ঘরে ভাইয়েরা কেউ যায়নি। রনির মেজাজের ভয়ে নয়, যদি মুখ ফসকে প্ল্যান বেরিয়ে যায়? 

রনি মাথা ঠান্ডা করতে ব‌ইপত্র খুলেই বসেছিল। মন দিয়ে পড়ে নোট‌ও করছিল। পড়াশোনায় ডুবে গিয়ে বাকি কথা ভুলেই গেছিল। হঠাৎ হুঁশ এল, ভীষণ রকম জলতেষ্টা পাচ্ছে। আসলে খাবারের প্লেট নিয়ে চলে এসেছিল। জল আনা হয়নি। ঘরে একটা বোতলে হাফ বোতলের‌ও কম জল ছিল, তখন সেটুকু খেয়ে নিজের ঘরের এ্যাটাচট বাথরুমে হাত ধুয়েছে। পিউ এ কদিনের চোট, আজ মণিকার ওষুধ, পথ্য, ব্যবস্থাপনা, সঙ্গে মিলির দেখাশোনা, এর মধ্যে রনিকে ভুলেই গেছে। ওকে ডেকে ঘরে জল আছে কিনা জিজ্ঞেস‌ই করেনি। 

এখন ফাঁকা জলের বোতলটা দেখেই রনির সেই কথাটাই প্রথম মনে হয়, যত ভাই ভাই করুক, মিলিই হল বৌদির ফেভারিট। নারীশক্তির জয়ের ধুয়ো তুলে ফস করে এক পার্টি হয়ে যাবে। আর কি দোষ‌ই বা দেবে ওদের? নিজের মা কি? মনে মনে গজগজ করতে করতে রনি জল নিতে বেরোয়। এই ঠান্ডায় রাত দুটোর সময় জল নিতে দোতলা থেকে একতলায় যেতে হলে যতখানি তিরিক্ষি মেজাজ হওয়ার কথা, সঙ্গত কারণেই তার চেয়ে বেশিই মেজাজ খারাপ তার। 

এদিকে টুকাই আজ ঠাম বাড়ি এসেছে, মিলিপিসি রাতে ওর পাশে শোবে, জটাবুড়ির গল্পের বাকিটা বলবে, এত আনন্দের চোটে দোতলার প্যাসেজে ট্রাই সাইকেল চালিয়েছে শুতে যাওয়ার আগে। এবং সেটা রাতে কোথায় থাকে জানা না থাকায় মিলি সিঁড়ির পাশে ঠেলে রেখে টুকাইকে গল্পের লোভ দেখিয়ে শুতে নিয়ে গেছিল। 

আবছা আলোছায়া মাখা প্যাসেজে প্রথমেই রনি তাতে ধাক্কা খায়। বুড়ো আঙ্গুলের নখটা আরেকটু হলেই উড়ে যেত। সাত্যকি বা সৌভিক কেউ সাইকেল রেখেছে ভেবে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে নিচে নেমে আসে। সবাই ক্লান্ত, কারও ঘুম না ভাঙে, তাই একদম আওয়াজ করে না আর। 

মিলির কাছে জটাবুড়ির গল্প শুনতে শুনতে ক্লান্ত পিউ, তারপর সুবর্ণ আর সবশেষে টুকাই‌ও ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম নেই মিলির চোখে। একেই এই বাড়িতে হঠাৎ থেকে যাওয়া, তার উপর এই ক দিন যা হল ! সেসব কথাই মাথায় ঘুরছে কেবল। 

আগেও একবার এই ঘরে রাতে শুয়েছিল, নিয়মমতো যেটা ওর ফুলশয্যার রাত ছিল। সুবর্ণ এভাবেই ডিভানে শুয়েছিল, খাটে ও আর পিউবৌদি, টুকাই নিচে ওর ঠামের ঘরে। সেই রাত থেকে একটার পর একটা কথা মনে করে চোখের জলে বালিশ ভিজে যাচ্ছে। আজও রনি একটুও ভালো করে কথা বলতে পারত না? ভালো করে দূরে থাক, কথাই বলছে না। মিলি নিচে ছিল বলে, ওখানে বসে খেলোও না। অবশ্য সবার মাঝখানে বসবেই বা কি করে? ছাইপাঁশ গিলে এসেছে। সবার সামনে এইসব নাটক করে দেখাতে চায় মিলির জন্য দুঃখে...........

খনখন ঝনঝন ঠনঠন ঠ্যাং ঠ্যাং আওয়াজে মিলি আঁতকে উঠল। চোখের জল টল ভয়ের চোটে কোথায় উধাও ! বিরাট আওয়াজ হয়েছে, তা হয়ত নয়। কারণ আর কেউ জাগেনি। ও জেগে ছিল বলে শুনতে পেয়েছে। শুনশান শীতের রাতে সত্যিই চমকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট এই আওয়াজ। 

তারপর বুকের ধড়াস ধড়াসটা যখন শান্ত হয়ে এসেছে, মিলির খেয়াল হয় নাহোক পাঁচ মিনিট কেটে গেছে, কোনো আওয়াজ নেই ! কি ছিল তবে ওটা? 

মিলি ভাবে, বাড়ির কেউ হবে না। তারা এত সাবধানে চলাফেরা করত না, কোনো জিনিসে ধাক্কা খেলে বাবাগো মাগো করত নির্ভয়ে। এ তার মানে....... 

চোর হলে একবার উঠে দেখতেই হয়। পিউবৌদি বা সুবর্ণ, কাউকে ডাকবে? উঁহু, ওরা গভীর ঘুমে। ঐ আওয়াজ টেরটিও পায়নি। এখন জোরে ডাকলে, ধাক্কাধাক্কি করে জাগালে চোর‌ও টের পেয়ে যাবে। আর টুকাই যদি এসবে জেগে যায়, চোর ধরার আশা ফক্কা। যা করার ওকেই লুকিয়ে করতে হবে। 

নিঃশব্দে ওঠে মিলি। কম্বল সরাতেই মনে হয়, কলকাতা সাইবেরিয়া হয়ে আছে। ওর গায়ে একটা সোয়েটার ছিল, মাথার কাছে খুলে শুয়েছিল। ওটা পরলে হবে না এখন। লুকিয়ে দেখতে হবে। সুবর্ণ একটা ক্রিম কালারের স্টোল জড়িয়েছিল না? ওর মাথার কাছ থেকে সেটা টেনে নিয়ে মাথা মুখ মুড়ি দেয় মিলি। 

পা টিপে টিপে দরজায় এসে সাবধানে প্যাসেজের দুদিকে তাকায়, তারপর ঝপ করে বেরিয়ে আসে। পাশের ঘরটা রনির, দরজা হাট করে খোলা। এই ঘরে ঢোকেনি তো চোরটা? পায়ের আঙ্গুলে ভর দিয়ে ডিঙি মেরে ঘরের ভেতরটা দেখার চেষ্টা করে। তখনই মনে হয়, চোর না হয়ে যদি রনিই ঘরে থাকে? ওকে দেখলে কি ভাববে? নিচের তলায় খচ করে একটা আওয়াজ না? পিছিয়ে আসে বটে, কিন্তু মনটা খচখচ করছে, চোরটা কোথায় জানা গেল না। 

মিলি সাঁ করে পরের ঘরের দরজার সামনে চলে যায়। এঘরে ছেলেরা শুয়েছে, দরজাও শুধু ঠেলে রাখা। যদি রাতে মায়ের কোনো অসুবিধা হয়, তাই বনি দরজা খুলে শুয়েছে, ডাকলেই উঠে পড়তে পারবে। 

মিলি দরজা ঘেঁষে পর্দার পাশে আড়ালে দাঁড়ায়, ভালোই হয়েছে। ছেলেরা সবাই আছে, বেগতিক দেখলে ও চ্যাঁচাবে। সব শুনশান দেখে আবার পা টিপে টিপে এগিয়ে আসে সিঁড়ির দিকে। দোতলায় চোর আর নেই, ও বুঝে গেছে। 

রনি জল খেয়ে, জলের বোতলটা আবার ভরে, সিঁড়ির সামনে এসে প্রথম ধাপে পা দেয়। তার সঙ্গে সঙ্গে উপরে মুখ তুলেই হতভম্ব হয়ে যায়। বৌদির ঘর থেকে মাথা মুখ ঢাকা অদ্ভুত একটা মূর্তি ওর ঘরে ঢুকতে যাচ্ছে। উঁকি দিয়েই বোধহয় পিছিয়ে এলো। রনি শুকনো জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটে, চোর ! কজন ঢুকেছে কে জানে ! মেয়েরা তিনজন‌ই ঐ ঘরে, যেভাবে লোকটা বেরোল, দরজা খোলা বোঝা যাচ্ছে। দাদা, সাত্যকি সব ঘুমোচ্ছে। 

তখনই মনে হয়, "আমি নিজে নিচে আছি। যদি এক বা দুজন হয়, একহাত লড়ে যেতে পারব। আর জোরে চ্যাঁচালে দাদারা সবাই জেগে যাবে।" জলের বোতলটা খাওয়ার টেবিলে রেখে পা টিপে টিপে রনি সিঁড়ির ছায়ার দিকে আড়ালে সরে দাঁড়ায়। 

নিজের বুকের ধকধকটা শুনতে পাচ্ছে।চোরটা কিছু করার আগেই ওকে ধরতে হবে। কিন্তু সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় যদি ওকে দেখে ফেলে? চোরটা উপরে, ও নিচের তলায়। চোরটা এ্যাডভান্টেজ পাচ্ছে। ধ্যাত, ভীষণ আপশোষ হয় রনির। নামার আগে কেন দেখল না? নিশ্চয়ই ও সাইকেলে ধাক্কা খেয়ে আওয়াজ হয়েছে বলে চোরটা উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। 

ঝট করে চোরটাকে ধরতে হবে, একচান্সে, একটুও সময় দিলে হবে না। যেভাবেই হোক রনি দোতলায় উঠবেই। দুই লাফে ও সিঁড়ির সামনে আসে। বাবাগো বলে চোরটা সিঁড়ির প্রথম ধাপ থেকে ওর ঘাড়ের উপর পড়ে। 

চলবে