পর্ব ৩: রায় ভিলার দরজা
আকাশটা আবার কালো হয়ে এসেছে।
আরোহীর হাতে এখনও সেই ছোট্ট GPS ট্র্যাকার।
স্ক্রিনে একটাই লোকেশন জ্বলছে—
"রায় ভিলা"
লোকেশনের নিচে লাল অক্ষরে লেখা—
১২:০০:০০
ঘড়িটা ধীরে ধীরে কমছে।
১১:৫৯:৫৯...
১১:৫৯:৫৮...
আরোহী বুঝতে পারছিল না, এটা কীসের কাউন্টডাউন।
ঠিক তখনই তার মনে হলো—
কেউ যেন তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।
সে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
কেউ নেই।
শুধু ভেজা রাস্তা...
হাওয়ায় উড়তে থাকা শুকনো পাতা...
আর দূরে কয়েকটা কাকের ডাক।
"আমি কি সত্যিই ভয় পেতে শুরু করেছি?"—নিজেকেই প্রশ্ন করল সে।
মোবাইলটা আবার কেঁপে উঠল।
অচেনা নম্বর।
সে সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ করল।
— "হ্যালো!"
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর খুব ধীরে একটি নারীকণ্ঠ—
— "ওখানে যেও না..."
আরোহীর বুক ধক করে উঠল।
— "মেঘলা?"
— "যদি আমাকে বিশ্বাস করো... তাহলে রায় ভিলায় যেও না।"
— "তুমি কোথায়?"
— "আমি..."
হঠাৎ লাইনটা কেঁপে উঠল।
তারপর শুধু একটা চিৎকার—
"না...!"
কল কেটে গেল।
আরোহীর হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে আর এক মুহূর্তও দেরি করল না।
মোবাইলে লোকেশন খুলে ট্যাক্সি ডাকল।
প্রায় চল্লিশ মিনিট পর...
ট্যাক্সি শহরের ব্যস্ত রাস্তা ছেড়ে এক নির্জন এলাকায় ঢুকল।
চারপাশে পুরোনো গাছ।
বাতাসে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ।
ড্রাইভার রিয়ারভিউ মিররে তাকিয়ে বলল,
— "দিদি, আপনি কি নিশ্চিত এখানেই নামবেন?"
— "কেন?"
— "এই বাড়িটায় কেউ আসে না।"
— "কেন?"
ড্রাইভার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— "লোকজন বলে... এই বাড়িটা অভিশপ্ত।"
আরোহী হালকা হেসে বলল,
— "ভূতের গল্পে আমি বিশ্বাস করি না।"
ড্রাইভার দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— "ভূত থাক বা না থাক... মানুষ কিন্তু আছে।"
ট্যাক্সি থেমে গেল।
আরোহী নামতেই বিশাল একটা লোহার গেট চোখে পড়ল।
মরিচা ধরা গেটের ওপরে লেখা—
RAY VILLA
ভেতরে একটা তিনতলা পুরোনো বাড়ি।
বাড়িটার অনেক জানালা ভাঙা।
দেওয়ালে লতা-পাতা উঠে গেছে।
মনে হচ্ছে বহু বছর ধরে এখানে কেউ থাকেনি।
কিন্তু...
ঠিক দ্বিতীয় তলার একটি জানালায়...
সাদা পোশাক পরা একজন মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তার চুল মুখ ঢেকে রেখেছে।
সে স্থির হয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।
আরোহীর বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
সে চোখ কুঁচকে ভালো করে দেখার চেষ্টা করল।
মেয়েটা ধীরে ধীরে মুখ তুলল।
আরোহীর নিঃশ্বাস থেমে গেল।
ও মেঘলা!
— "মেঘলা!"
আরোহী চিৎকার করতেই...
মেঘলা জানালায় হাত রাখল।
তার ঠোঁট নড়ল।
দূর থেকেও আরোহী বুঝতে পারল—
সে বলছে...
"পালিয়ে যাও..."
ঠিক সেই মুহূর্তে...
মেঘলার পেছন থেকে একটি কালো ছায়া এগিয়ে এল।
একজোড়া হাত মেঘলাকে টেনে অন্ধকারের ভেতরে নিয়ে গেল।
জানালাটা জোরে বন্ধ হয়ে গেল।
ধাম!
আরোহী দৌড়ে গেটের কাছে গেল।
গেটটা তালাবদ্ধ।
সে মরিয়া হয়ে ধাক্কা দিতে লাগল।
ঠিক তখনই...
তার কাঁধে কেউ একজন হাত রাখল।
ঠান্ডা...
অস্বাভাবিক ঠান্ডা...
সে ধীরে ধীরে পিছনে ফিরল।
একজন বৃদ্ধ।
সাদা দাড়ি।
হাতে লণ্ঠন।
তিনি গভীর দৃষ্টিতে আরোহীর দিকে তাকিয়ে বললেন—
"তুমি যদি এই বাড়ির ভেতরে ঢোকো... তাহলে আর আগের মতো ফিরে যেতে পারবে না।"
বৃদ্ধের কণ্ঠে কোনো ভয় দেখানোর সুর ছিল না।
বরং ছিল এমন এক সতর্কতা, যেন তিনি বহুবার একই ঘটনা ঘটতে দেখেছেন।
আরোহী ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।
— "আপনি কে?"
বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,
— "এই প্রশ্নের উত্তর দিলে তুমি বিশ্বাস করবে না।"
— "আপনি কি এই বাড়িতে থাকেন?"
— "থাকতাম..."
শব্দটা শুনেই আরোহীর কপাল কুঁচকে গেল।
থাকতাম?
— "মানে?"
বৃদ্ধ লণ্ঠনটা মাটিতে নামিয়ে বললেন,
— "অনেক বছর আগে এই বাড়ির দেখাশোনা করতাম। এখন শুধু মাঝে মাঝে চলে আসি।"
তার চোখ হঠাৎ রায় ভিলার দিকে চলে গেল।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— "এই বাড়ি অনেক মানুষকে কাঁদিয়েছে।"
আরোহী আর ধৈর্য রাখতে পারল না।
— "আমি একজনকে খুঁজতে এসেছি।"
— "মেঘলা?"
বৃদ্ধের মুখে নামটা শুনে আরোহী স্তব্ধ।
— "আপনি... ওকে চেনেন?"
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ রইলেন।
তারপর খুব ধীরে বললেন,
— "যতটা তুমি ভাবছ, তার থেকেও বেশি।"
বাতাস হঠাৎ জোরে বইতে শুরু করল।
পুরোনো গেটটা ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করল।
আকাশে বিদ্যুৎ চমকাল।
বৃদ্ধ পকেট থেকে একটা ছোট্ট মরিচা ধরা চাবি বের করলেন।
চাবিটা আরোহীর হাতে দিয়ে বললেন,
— "এই চাবি দিয়ে ভেতরে ঢুকতে পারবে।"
আরোহী অবাক।
— "আপনি আমাকে সাহায্য করছেন কেন?"
বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,
— "কারণ অনেক বছর আগে... আমিও একজনকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম।"
— "পেরেছিলেন?"
বৃদ্ধের চোখ ভিজে উঠল।
তিনি কোনো উত্তর দিলেন না।
সেই নীরবতাই উত্তর হয়ে রইল।
...
আরোহী ধীরে ধীরে গেটের তালায় চাবিটা ঢোকাল।
ক্লিক...
তালাটা খুলে গেল।
গেটটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই একটা ঠান্ডা বাতাস তার মুখে এসে লাগল।
চারপাশে বিশাল বাগান।
আগাছায় ভর্তি।
মাঝখানে পাথরের পথ।
সেই পথ ধরে এগিয়ে গেল সে।
হঠাৎ তার নজর পড়ল ডানদিকে।
একটা পুরোনো দোলনা।
বৃষ্টির হাওয়ায় নিজে নিজেই দুলছে।
কিন্তু...
হাওয়ার দিক তো অন্যদিকে!
আরোহীর বুকের ভেতর অস্বস্তি বাড়তে লাগল।
সে নিজেকে শক্ত করে বলল,
— "ভয় পেলে চলবে না।"
ঠিক তখনই...
কোথা থেকে যেন খুব মৃদু একটা গানের সুর ভেসে এল।
একটা মেয়ে গাইছে।
কণ্ঠটা অদ্ভুত পরিচিত।
আরোহী কান পেতে শুনল।
এটা সেই গান...
যেটা মেঘলা ক্যাফেতে বসে খুব আস্তে আস্তে গুনগুন করছিল।
— "মেঘলা!"
সে দৌড়ে বাড়ির দরজার কাছে গেল।
দরজাটা আধখোলা।
ভেতরে অন্ধকার।
ধুলো আর পুরোনো কাঠের গন্ধ।
সে মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে ভেতরে ঢুকল।
প্রথম ঘরটা ফাঁকা।
দ্বিতীয় ঘরে ছেঁড়া সোফা।
দেওয়ালে একটা বিশাল পারিবারিক ছবি।
টর্চের আলো পড়তেই আরোহী থেমে গেল।
ছবিটায় একটা ছোট্ট মেয়ে।
হয়তো দশ-এগারো বছর বয়স।
মুখে হাসি।
চোখ দুটো...
একদম মেঘলার মতো।
আর ছবির নিচে লেখা—
"রায় পরিবার – ২০১১"
আরোহী ছবিটার দিকে আরও ঝুঁকে তাকাল।
হঠাৎ তার মনে হলো...
ছবির এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মহিলার মুখটা সে কোথায় যেন দেখেছে।
ঠিক তখনই...
উপরে দ্বিতীয় তলা থেকে জোরে একটা শব্দ হলো।
ধাম!
তারপর...
একটা মেয়ের কণ্ঠস্বর—
"আরোহী...!"
সে এক মুহূর্তও দেরি না করে সিঁড়ির দিকে দৌড়ে গেল।
আর ঠিক সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রাখতেই...
তার টর্চের আলোয় দেখা গেল—
তাজা রক্তের ফোঁটা...
যা সোজা দ্বিতীয় তলার দিকে চলে গেছে।
রক্ত...
টাটকা।
লাল ফোঁটাগুলো একটার পর একটা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেছে।
আরোহীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার মাথার ভেতর একটা কথাই ঘুরছিল—
"এটা যদি মেঘলার রক্ত হয়?"
সে আর ভাবার সময় পেল না।
মোবাইলের টর্চটা শক্ত করে ধরে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল।
প্রতিটি ধাপে কাঠের সিঁড়ি ক্যাঁচ... ক্যাঁচ... শব্দ করছে।
মনে হচ্ছে, বহু বছর ধরে কেউ এই সিঁড়ি ব্যবহার করেনি।
দ্বিতীয় তলায় পৌঁছেই সে থমকে দাঁড়াল।
লম্বা একটা করিডোর।
দুই পাশে বন্ধ দরজা।
শেষ প্রান্তে একটা জানালা।
বৃষ্টির আলো এসে মেঝেতে পড়েছে।
আর সেই মেঝেতেই শেষ হয়েছে রক্তের দাগ।
কিন্তু...
সামনে কেউ নেই।
হঠাৎ...
বাম দিকের একটা দরজার ভেতর থেকে খুব আস্তে একটা কান্নার শব্দ ভেসে এল।
আরোহী নিঃশ্বাস আটকে দরজার কাছে গেল।
দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ।
সে আস্তে বলল—
— "মেঘলা... তুমি ভেতরে আছো?"
কান্নার শব্দটা থেমে গেল।
তারপর খুব দুর্বল একটা গলা—
— "আরোহী..."
ওই গলা...
এটা মেঘলারই।
— "দরজা খোলো! আমি এসেছি!"
ভেতর থেকে উত্তর এল—
— "চলে যাও..."
— "না! তোমাকে ছাড়া আমি কোথাও যাব না।"
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর মেঘলার কণ্ঠে আতঙ্ক—
— "ও এখানে আছে..."
— "কে?"
মেঘলা কিছু বলল না।
ঠিক তখনই...
করিডোরের শেষ প্রান্ত থেকে কারও হাঁটার শব্দ শোনা গেল।
ঠক... ঠক... ঠক...
শব্দটা ধীরে ধীরে কাছে আসছে।
আরোহী ঘুরে তাকাল।
দূরে...
অন্ধকারের মধ্যে...
একজন মানুষ দাঁড়িয়ে।
তার মুখ দেখা যাচ্ছে না।
শুধু কালো পোশাক।
সে এক পা...
দুই পা...
তিন পা...
এগিয়ে আসছে।
আরোহী সাহস করে বলল—
— "আপনি কে?"
লোকটা থামল।
তারপর খুব ধীরে বলল—
— "তুমি এখানে আসার কথা ছিল না।"
কণ্ঠস্বরটা...
আরোহীর চেনা।
সে কোথায় যেন এই গলা শুনেছে।
হঠাৎ তার মনে পড়ল।
কলেজ স্ট্রিটে কালো গাড়ি থেকে নেমে আসা লোকটা!
লোকটা এবার আলোয় এগিয়ে এল।
মুখটা স্পষ্ট দেখা গেল।
তিরিশ-বত্রিশ বছর বয়স।
তীক্ষ্ণ চোখ।
ঠোঁটে ঠান্ডা হাসি।
সে আরোহীর দিকে তাকিয়ে বলল—
— "মেঘলাকে বাঁচাতে এসেছ?"
— "হ্যাঁ।"
— "খুব দেরি করে ফেলেছ।"
আরোহী রেগে উঠল।
— "মেঘলা কোথায়?"
লোকটা হাসল।
— "ও তো তোমার খুব কাছেই আছে।"
এই বলে সে দরজার দিকে তাকাল।
ঠিক তখনই...
ধাম!
ভেতর থেকে দরজায় জোরে আঘাত পড়ল।
মেঘলা চিৎকার করে উঠল—
— "আরোহী! ওর কথা শুনো না! পালিয়ে যাও!"
লোকটার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
সে পকেট থেকে একটা চাবি বের করল।
ধীরে ধীরে দরজার তালায় লাগাল।
ক্লিক...
দরজাটা খুলতে শুরু করল।
আরোহীর নিঃশ্বাস যেন থেমে গেল।
দরজা পুরো খুলতেই...
ঘরের ভেতর যা দেখল...
তা দেখে তার হাত থেকে মোবাইলটা মাটিতে পড়ে গেল।
তার চোখ বিস্ফারিত।
ঠোঁট কাঁপছে।
সে শুধু একটাই কথা বলতে পারল—
"এটা... কীভাবে সম্ভব?"
— চলবে ------