Titas Nodi in Bengali Love Stories by Projapoti books and stories PDF | তিতাস নদী - পর্ব 6

Featured Books
Categories
Share

তিতাস নদী - পর্ব 6

'লোকটা এখানেও!'

মুহূর্তের মধ্যে তিতাসের মনে সন্দেহ জাগে। লোকটা কি তাকে ফলো করছে?

সন্দেহটা যত জোরালো হয়, তত নিজের ওপর বিরক্ত লাগে তিতাসের। কারণ ভয় পাওয়ার কথা থাকলেও ঠিক সেটা হচ্ছে না। বরং রুদ্রকে সামনে দেখামাত্র বুকের ভেতরটা কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যায়।

ধক ধক! ধক ধক!

হৃৎপিণ্ডটা যেন নিজের ইচ্ছেমতো দৌড়াতে শুরু করে। চোখ সরিয়ে নেওয়া উচিত, তবু পারে না তিতাস। অদ্ভুত এক টানে বারবার চোখ চলে যায় রুদ্রর দিকে।

কয়েক মুহূর্ত আগে ভারসাম্য হারিয়ে প্রায় ওর বুকের ওপর গিয়ে পড়েছিল সে। রুদ্রর চওড়া বুকের স্পর্শটা যেন এখনও আঙুলের ডগায় লেগে আছে। মনে পড়তে গাল দুটো আপনাআপনি গরম হয়ে ওঠে। লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলতে চায়, পারে না। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার গাঢ় কালো চোখ দুটো স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকেই।

তিতাস নিজে বুঝতে পারে না নিজের কী হচ্ছে। একজন অচেনা লোককে সন্দেহ করছে, অথচ সেই লোকটার কাছাকাছি এলে কেন যেন বুকের ভেতর এমন অদ্ভুত কাঁপুনি শুরু হয়ে যায়!

কিন্তু পর মুহূর্তে রুদ্রর যা বলে তা তিতাসকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনার জন্য যথেষ্ট। তার মনে হয় কেউ এসে বরফ গলা ঠান্ডা জল তার গায়ে ঢেলে দিয়েছে। 

"হ্যালো ম্যাডাম! ড্যাবড্যাব করে কী দেখছেন? কানে তালা লেগে গেছে নাকি? কখন থেকে জিজ্ঞেস করছি, সাতসকালে পুকুরের ধারে কী করছেন? প্রশ্নের জবাব না দিয়ে ভূত দেখার মতো দাঁড়িয়ে আছেন কেন??"

রুদ্রর এমন কড়া কথার ধাক্কায় তিতাসের নাক-মুখ বিরক্তিতে কুঁচকে যায়।

ইস্! সকাল সকাল কি তিতা খেয়ে এসেছে নাকি? লোকটা একটু ভালো করে কথা বলতে জানে না?! মনে মনে গজগজ করে ওঠে তিতাস। দাঁড়াও, আজ আমি চুপ থাকবো না আমি।

"আপনি আমাকে ফলো করছেন?" গলার জোর বাড়িয়ে সোজা রুদ্রর চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে তিতাস।

"কী??" রুদ্র যেন একেবারে আকাশ থেকে পড়ে! "আমি আপনাকে ফলো করব? কেন, আপনি কোনো সেলিব্রিটি নাকি?"

"আমি কী জানি! সেই গতকাল থেকে দেখছি আপনি সব জায়গায় হাজির!"

"ও বাবা... মেয়ের গলা দিয়ে দেখছি আজ খই ফুটছে!" 

"বাজে কথা বলবেন না তো! সেই গতকাল থেকে কথায় কথায় আমাকে বকে যাচ্ছেন তো বকেই যাচ্ছেন! কী ব্যাপার বলুন তো আপনার?!"

রুদ্র এবার পুরোপুরি ভ্যাবাচ্যাঁকা খেয়ে যায়। গত রাতের গুটিপোকা আজকে একেবারে ফণা তুলে ধরেছে।

রুদ্র অবশ্য নিজেকে সামলে নিতে খুব বেশি সময় নেয় না। এক গাল তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে হাত দুটো বুকের ওপর আড়াআড়িভাবে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ায় সে।

"কথা শুনলে তো আর আমার বকুনি খেতে হয় না ম্যাডাম!" রুদ্রর গলায় যেন কটাক্ষ ঝরে পড়ে। "অত বড় একটা শেওলা জমে থাকা পুকুরের ধার, সেটা দেখতে পেলেন না কীভাবে? আর এক সেকেন্ড দেরি হলে তো সোজা উল্টে পড়তেন! একেবারে পুণ্যি করে গঙ্গা স্নান হয়ে যেত! কোথায় প্রাণটা বাঁচানোর জন্য একটা ধন্যবাদ জানাবেন, আর তা না করে উল্টে আমাকে বলছেন আমি নাকি স্টক করছি ম্যাডামকে? বলি, বুদ্ধিশুদ্ধি বলতে কিছু কি আদৌ অবশিষ্ট আছে, নাকি সেটাও অন্য সবকিছুর মতো বাড়ির আলমারিতেই বন্ধ করে রেখে এসেছেন?"

তিতাস চুপ করে যায়। সত্যি তো! উনি যদি না আসতেন তাহলে আজ আমার কী হতো! গতকালকেও আমাকে যেটাই হোক বাঁচিয়েছেন। আর আমি এখানে কৃতজ্ঞতা জানানোর বদলে উল্টে সন্দেহ করছি। কিন্তু উনি এখানে কেন?

"আপনি ঠিকই বলছেন... স্যরি, আমি আপনাকে থ্যাংক ইউ বলতে ভুলে গেছি। গতকাল আপনি যা করেছেন, আপনার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে হয়তো পরিস্থিতি অন্যরকম হতো। সেটার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আর... আজকের জন্যও।" তিতাস ধীর গলায় অপরাধীর মতো অপরাধ স্বীকার করে নেয়।

'যাক, মাথায় অন্তত কিছুটা বুদ্ধি আছে তাহলে!' ঠোঁটের কিনারে আসা হাসিটা কোনোমতে চেপে মুখটা গম্ভীর করে রাখার চেষ্টা করে।

কিন্তু তিতাসের পরের প্রশ্নটা কানে আসতে নিজের কপালে নিজেরই চড় মারতে ইচ্ছে করে রুদ্রর!

"কিন্তু... আপনি এখানে কেন? আপনার তো এখানে থাকার কথা নয়!" ভ্রূ দুটো কুঁচকে রুদ্রর দিকে তাকায় তিতাস।

রুদ্র এক মুহূর্তের জন্য যেন বাক্‌রুদ্ধ হয়ে যায়। তারপর চোখ দুটো কপালে তুলে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে, "তাহলে আপনার মতে কোথায় থাকব ম্যাডাম? পাতালে?"

তিতাস হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকে। "আ-আমি কখন বললাম আপনি পাতালে থাকেন?! আমি তো শুধু জানতে চাইছি আপনি এত সকালে এই চিলড্রেনস পার্কে কী করছেন? একটা সোজা প্রশ্নের সোজা উত্তর দেওয়া কি এতই কঠিন?"

"ওঃ আচ্ছা! সরি আমি বোধহয় পার্কের প্রবেশ পথে সাইন বোর্ডটা পড়তে ভুলে গেছি। নাহলে জানতে পারতাম এই পার্কে ম্যাডামের ব্যতীত অন্যদের প্রবেশ নিষেধ।"

তিতাস হতবাক। কী যা তা বলে যাচ্ছে?!

"আমি কি একবারও বললাম যে আপনি আসতে পারবেন না?!" তিতাস খেপে গিয়ে হাত নেড়ে বলে, "আমি শুধু জানতে চাইছি.."

"জানতে চাইছেন নাকি জেরা করছেন?" মাঝপথে তিতাসের কথা থামিয়ে দিয়ে রুদ্র ভ্রূ নাচায়। "আপনি তো পরিষ্কার বললেন, 'আপনার এখানে থাকার কথা নয়!' তার মানেটা কি? আপনি বলতে চাইছেন আমার এখানে আসা ঠিক হয়নি তাই তো? সরি সরি নেক্সট ডে থেকে আমার সকালের রুটিন চার্ট আপনার কাছে জমা দিয়ে তবে আমি বাইরে বেরোবো।"


রুদ্রর জিলিপির প্যাঁচের মতো ঘোরানো-প্যাঁচানো কথায় তিতাসের মাথা যেন ঝাঁঝাঁ করে ওঠে। লোকটা যে কী করে একটা অতি সাধারণ প্রশ্নকে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে সম্পূর্ণ উল্টো বানিয়ে ওর ঘাড়েই দোষটা চাপিয়ে দিল, তা ভেবে তিতাসের মাথা গণ্ডগোল হয়ে যায়। বিরক্তি, রাগ আর চরম অসহায়তায় ওর চোখে জল চলে আসার উপক্রম হয়।

"আপনি... আপনি কি সবসময় কথা ঘুরিয়ে মানুষকে পাগল বানিয়ে দেন?!" তিতাসের গলা রাগে আর অপমানে সামান্য কেঁপে ওঠে, "আমি একটা সহজ কথা জিজ্ঞেস করলাম, আর আপনি সেটাকে কোথাকার কোন জটিলতায় নিয়ে ফেলছেন!"

"কথা আমি ঘোরাচ্ছি নাকি আপনি কোনো উত্তর না পেয়ে গলার জোর দেখাচ্ছেন?" রুদ্র মুখ বাঁকিয়ে জবাব দেয়। "প্রথমত, চোখ কান বন্ধ করে হাঁটেন বলে শ্যাওলা ভরা পুকুরে উল্টে পড়তে যাচ্ছিলেন। দ্বিতীয়ত, প্রাণটা বাঁচানোর পর উল্টে আমাকেই স্টকিংয়ের অপবাদ দিলেন। আর তৃতীয়ত, এখন আমি পার্কে আসব কী আসব না, তার পারমিশনও আপনার থেকে নিতে হবে? বাহ্ ম্যাডাম! ধন্যবাদ জানানোর ভারী অদ্ভুত কায়দা তো আপনার!"

"আপনি... আপনি বড্ড বাজে লোক।"

"ওওওওও!!!!" রুদ্র বেশ সুর টেনে বলে, "এখন আমি বাজে লোক! বেশ! সেটাই বটে। তাহলে ম্যাডাম, এই বাজে লোকটা আপনার প্রাণ বাঁচিয়েছে সেটা ভুলে যাননি তো!"

"আপনি বারবার আমাকে ভুল প্রমাণ করছেন কেন? আমি কখন বলেছি আমি অকৃতজ্ঞ! আমি শুধু সাধারণ একটা কথা জিজ্ঞেস করলাম যে আপনি এখানে কেন? পরপর দু'দিন এভাবে হুটহাট দেখা হয়ে যাওয়াটা কি নিছকই কাকতালীয়?"

"নাও! আবার আমাকে স্টকিংয়ের টাইটেল দেওয়া হচ্ছে!" রুদ্র চোখ দুটো গোল গোল করে তাচ্ছিল্যের হাসিতে দু'পাশে মাথা নাড়ায়, "কেন ম্যাডাম, আমি কি এই পার্কে হাঁটতে আসতে পারি না?"


"আমি কি একবারও বলেছি পারবেন না???" তিতাসের ধৈর্য সীমা ছাড়িয়ে যায়। হাত দুটো শূন্যে ছুঁড়ে গলার শিরা ফুলিয়ে সে বলে, "আমি শুধু জানতে চাইছি আপনি কেন এখানে? একটা সোজা কথা বোঝার মতো ক্ষমতা কি আপনার নেই?"

"তাহলে আমি কোথায় থাকব?"

তিতাস এবার সত্যিই ক্ষেপে বোম হয়ে যায়! বিরক্তি আর রাগে ওর মাথাটা যেন ঝাঁঝাঁ করে ওঠে, ইচ্ছে করে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার চুলগুলো ধরে এক টানে উপড়ে ফেলতে! একে তো গতকালের রেশ এখনো তার কাটেনি তার ওপর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা মাথা খাচ্ছে। শেষমেশ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তীব্র চিৎকার করে বলে ওঠে,

"আমার মাথায়!"

"যাহ বাবা! আপনার মাথায়? না না থাক, ওই ছোট্ট কুঠুরিতে আর যাই হোক, আমার জায়গা হবে না।"

কথাটা বলে রুদ্র এমন একটা ভাব করে যেন খুব বড় একটা সত্যি কথা বলে ফেলেছে! তিতাস আর দাঁড়িয়ে থাকার মতো শক্তি খুঁজে পায় না। ইন্টারভিউয়ের মানসিক চাপ, সকালে জলে পড়ে যাওয়ার ভয় আর এই লোকটার মাথা খারাপ করা কথাবার্তা সব মিলিয়ে ওর সমস্ত শক্তিক্ষয় হয়ে এসেছে যেন। একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পেছনে থাকা কাঠের বেঞ্চটায় ধুপ করে বসে পড়ে সে।

রুদ্র তিতাসের সামনে এসে দাঁড়ায়। যে হাসিটা এতক্ষণ সে জোর করে চেপে রেখেছিল, সেটা এবার ঠোঁটের কোন দিয়ে একটুখানি ফুটে উঠেই আবার অদৃশ্য হয়ে যায়। মুখটা আবার আগের মতো গম্ভীর করে ফেলে সে।
"কী হলো? বসে পড়লে যে?"

তিতাস দুই হাতের তালুতে মুখ ঢেকে কিছুক্ষণ বড় বড় শ্বাস নেয়। তারপর মাথা তুলে চোখ ছোট ছোট করে বলে, "আপনি ইচ্ছে করে আমাকে ঘোরাচ্ছেন..."

রুদ্র ভুরু দুটো হালকা ওপরে তোলে, "ঘোরাব কেন? আপনি কি লাটিম নাকি?"

তিতাস কয়েক সেকেন্ড রুদ্রর দিকে তাকিয়ে থাকে।
তারপর বিরক্তিতে প্রায় পা ঠুকে বলে ওঠে, "ধুর!"

"আবার ধুর কী? সত্যি কথাটা বললে তো আপনারা..." রুদ্র আবার মুখ বাঁকিয়ে নিজের বাচালতা শুরু করতে যায়।

কিন্তু তিতাসের ধৈর্যের বাঁধ এবার পুরোপুরি টুটে যায়। তিতাস নিজের ওপর থেকে সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। সে যে কী করছে, সেটা ভাবার মতো মানসিক অবস্থাও আর তার নেই।

হুট করে বেঞ্চ থেকে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ায় তিতাস। আর তার পরের মুহূর্তে এমন এক কাণ্ড করে বসে, যা সে নিজের স্বপ্নেও কখনো ভাবেনি!

সে সোজা রুদ্রর এক হাত দূরত্বে এগিয়ে গিয়ে ডান হাতের তালুটা সজোরে চেপে ধরে রুদ্রর ঠোঁটের ওপর! 

এক মুহূর্তের জন্য যেন পুরো পার্কটা থমকে যায়। রুদ্রর মুখের ভেতর আটকে যায় তার অর্ধেক বলা বাক্যটা। সে একেবারে প্রস্তুত ছিল না যে এই চুপচাপ, শান্ত মেয়েটা হুট করে এমন একটা কাণ্ড করে বসবে! চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে যায় রুদ্রর।

তিতাস বুক ফুলিয়ে দ্রুত শ্বাস টানছে, আর নিজের ডান হাতের তালুটা শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে রুদ্রর মুখের ওপর।

"একদম... একদম আর একটা কথা বলবেন না আপনি! চুপ! কিচ্ছু বলতে হবে না আর! কখন থেকে আবোলতাবোল বলেই চলছেন। এতো কথা বলেন আপনি? আমি কী বলছি আর কী শুনছেন। ক্ষমা করুন, ভুল হয়ে গেছে আমার আপনাকে প্রশ্ন করে। বাপরে একটার পর একটা জিলাপির প্যাঁচ দিয়ে চলছেন। মাথাটা খেয়ে ফেললেন আমার। শান্ত থাকা যায় না?"

রুদ্র চোখের পলক ঝাপ্টে নেয় দু'তিনবার। এদিকে তিতাসের খেয়াল নেই সে রুদ্রের মুখে হাত চাপা দিয়ে রেখেছে। ভুরু কুঁচকে বলে, "কী হলো এবার মুখ বন্ধ কেন?"

রুদ্র শুধু একটা ভুরু তুলে প্রথমে তিতাসের দিকে তারপর তিতাসের হাতের দিকে ইশারা করে। তিতাস নাক কুঁচকে রুদ্র পথ অনুসরণ করে।

রিয়্যালটি চেক হতে দু'সেকেন্ড সময় লাগে না। তিতাসের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে আসে।

আমি কী কাণ্ড করে বসেছি। রাগের চোটে কখন কী করলাম খেয়াল করিনি কেন? তিতাসের মনে হয় কেউ যেন ওর গায়ে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে! লজ্জায় মরি মরি অবস্থা। যেন কোনো ফুটন্ত কড়াইয়ে হাত দিয়ে ফেলেছে, এমনভাবে বিদ্যুৎবেগে হাতটা রুদ্রর মুখ থেকে সরিয়ে পেছনে টেনে নেয় সে।

পিছিয়ে যেতে গিয়ে পা দুটো সামান্য থমকে যায় তিতাসের। সে কি সত্যি সত্যি এই কাজটা করল?!