Titas Nodi in Bengali Love Stories by Projapoti books and stories PDF | তিতাস নদী - পর্ব 7

Featured Books
Categories
Share

তিতাস নদী - পর্ব 7

কোমল, নরম হাতের ছোঁয়া ঠোঁটের ওপর থেকে আচমকা সরে যেতে রুদ্রর কেমন যেন একটা খালি খালি মনে হয়। 

যে পুরুষকে শহরের ডার্কসাইটের মানুষেরাও সমীহ করে চলে। যার চওড়া চেহারা, তীক্ষ্ণ নজর আর গম্ভীর ব্যক্তিত্বের সামনে কেউ অহেতুক কথা বলার দুঃসাহস দেখায় না তাকে কিনা পিটপিটে চোখে তাকানো পাঁচ ফুটের এই পিচ্ছি মেয়েটা সোজা মুখে হাত চেপে ধরে ধমকে দেয়!

প্রথম এক সেকেন্ড রুদ্রর থমকে যাওয়া হৃদপিণ্ডটা পরের মুহূর্তে দ্বিগুণ বেগে রক্ত সারা শরীরে দ্রুত পাম্প করতে শুরু করে। পুরুষালী অহং আর টেস্টোস্টেরনের প্রভাবে বুকের ভেতরটা হুট করে কেঁপে ওঠে। 

তিতাস যখন একদম গায়ের কাছে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল, ওর রাগে ফুটতে থাকা গরম নিঃশ্বাস এসে পরে রুদ্রর গলায়। রুদ্রের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত তোলপাড় সৃষ্টি করে। তিতাসের রেশমের মতো তুলতুলে হাতের ছোঁয়া রুদ্রর প্রতিটি স্নায়ুতে যেন বিদ্যুৎ-এর ন্যায় ঝিলিক দিয়ে ওঠে।

রুদ্র আস্তে করে দুটো আঙুল দিয়ে নিজের ঠোঁট জোড়া ছুঁয়ে দেখে। জায়গাটা এখনও হালকা গরম। তার গাঢ় কালো, সরু চোখে এতক্ষণের মজার ছলনা নিমেষে উবে গিয়ে সেখানে জমা হয় গভীর এক বিপজ্জনক আকর্ষণ। 

তিতাস ততক্ষণে লজ্জায় যেন মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে। তার নিজের হাতের তালুটা এখনও রি-রি করছে। সে এক পা পিছিয়ে এসে দুই হাত বুকের ওপর জড়িয়ে ধরে, যেন নিজেকে এই লোকটার থেকে আড়াল করতে চায়।

রুদ্র কিন্তু পিছিয়ে যায় না। বরং এক পা এগিয়ে আসে তিতাসের দিকে। ট্রাউজার্সের পকেটে দু'হাত গুঁজে, সামান্য সামনে ঝুঁকে দাঁড়ায় সে।

"হাতটা তো ভারী চটপটে আপনার, ম্যাডাম! আপনি হয়তো ভুলে যাচ্ছেন আমি একটা পুরুষ। এভাবে হুটহাট করে সামনে এলে, পরে কী হতে পারে সেটার গ্যারান্টি কিন্তু আমি দিতে পারছি না।"

তিতাসের মেরুদণ্ড দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়। এদিক ওদিক দেখে আমতা আমতা করে বলে, "আ-আমি... আমি ইচ্ছে করে করিনি! আপনি আমাকে এত বিরক্ত করছিলেন যে..."

"বাহ্! দারুণ তো," রুদ্র আরও এক ধাপ এগিয়ে আসে তিতাসের কাছে। "বিরক্ত করছিলাম বলে একবারে অচেনা একটা পুরুষ মানুষের মুখে হাত চেপে ধরবেন? বলি, হাতটা মুখে চেপে ধরে যখন একনাগাড়ে ধমকে যাচ্ছেন, তখন কী খেয়াল ছিল না আপনার? তখন মনে ছিল না, কতটা গায়ের কাছে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছেন? একটু মনে হয়নি কী করছেন?"

তিতাসের বুকের ভেতর 'ধক' করে ওঠে। কান দুটো গরম হয়ে ওঠে পরম লজ্জায়।

রুদ্র আরেকটু ঝুঁকে তিতাসের কানের কাছে মুখটা এনে খুব নিচু গলায় বলে, "পরপর দু'দিন যে লোকটা আপনাকে বিপদের হাত থেকে টেনে তোলে, তার নামটা পর্যন্ত জিজ্ঞেস করার সৌজন্য আপনার হয় না! অথচ হাতটা দিয়ে এমনভাবে চেপে ধরলেন, যেন কতকালের চেনা সোহাগি অধিকার!"

"আমি... আমি সত্যি খেয়াল করিনি, আই অ্যাম সরি!" তিতাসের গলা জড়িয়ে আসে লজ্জায়, "আমি আর এক মুহূর্তও এখানে দাঁড়াব না!"

লজ্জা অস্বস্তির চরম সীমায় পৌঁছে তিতাস পাশ কাটিয়ে দৌড় দেওয়ার চেষ্টা করতে রুদ্র এতটুকু হন্তদন্ত না হয়ে, একদম ধীরেসুস্থে চট করে তার হাত বাড়িয়ে তিতাসের যাওয়ার পথ আটকে দেয়। তিতাস থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। তার বুকটা একলাফে বাইরে বেরিয়ে আসার উপক্রম। রুদ্রর চোখে তাকানোর ক্ষমতা নেই তার। সামনে মুখ করে চোখ বুজে আছে সে। 

রুদ্র পেছনে থেকে তার একেবারে কাছে ঘেঁষে দাঁড়ায়। রুদ্র চওড়া বুকে তিতাসের পিঠ। রুদ্র নিজের গলার স্বর গম্ভীর করে কানের পিঠে ঝুঁকে বলে,

"পালাচ্ছেন কোথায়, ম্যাডাম? এভাবে বিনা পারমিশনে কাছে এলেন, শাস্তি না দিয়ে অমনি ছেড়ে দেব ভাবছেন নাকি?"

'কী!' তিতাস চমকে চোখ মেলে তাকায়। চোখ দুটো ছানাবড়ার মতো গোল গোল। 'শাস্তি? কিসের শাস্তি? বললাম তো ভুল বসত করে ফেলেছি। কী চাই এনার?' 

ঢোক গিলে কোনোমতে সে ঘাড় ঘুরিয়ে রুদ্রের মুখোমুখি হয়।

'আহ!' 

তিতাসের বুক আঁতকে ওঠে। রুদ্র তার এতো পাশে, এতো কাছে সে আগে খেয়াল করে নি। রুদ্রের দিকে ঘুরে সে এককদম পিছিয়ে যায়। কিন্তু রুদ্রর হাতের কবলে থাকায় বেশি দূর যেতে পারে না। 

"কী হলো কোথায় পালাচ্ছেন? জরিমানাটা দিন। সেটা না দিলে যেতে দেবো না।"

"প্লিজ আমাকের যেতে দিন। এমন করছেন কেন আপনি? আমি তো বললাম ভুল করে হয়েছে। আমি ইচ্ছে করে করিনি। আপনি আমাকে খুব বিরক্ত করছিলেন। তাই....."

"তাই আমাকে ভুলবশত জাপ্টে ধরলেন। হ্যাঁ, বুঝেছি। কিন্তু কাণ্ডটা তো করেছেন আপনি তাই না? তার শোধটাও তো আপনাকে মেটাতে হবে।"

তিতাস কোনো উপায় না পেয়ে শেষমেশ বাধ্য হয় তার বলপূর্বক আবদার মেনে নিতে। "কী চাই আপনার?"

রুদ্রর স্থির নজর ধীরেসুস্থে তিতাসের পুরো মুখমণ্ডল মেপে নেয়। মেয়েটা যে একেবারে সাদামাটির মানুষ সে সেটা সে প্রথম দেখাতেই অনুমান করতে পেরেছে। একটু গলা উঁচিয়ে বললে যে মেয়ে ভয়ে কুঁকড়ে যায়, নিজের প্রতি অন্যায় হলেও মুখে কোনো প্রতিবাদ থাকে না, তাদের স্বভাবটা বোঝা বড্ড সরল রুদ্রর কাছে। এঁদের মধ্যে কোনো জটিলতা নেই। যা বলবে মাথা পেতে মেনে নেবে। তবে আজকে যখন তিতাস একটু হলেও রুদ্রর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল, রুদ্র বেশ খুশি হয়েছিল। কিন্তু সেটাও বেশিক্ষণ স্থায়ী থাকলো না। 

'মেয়েটা যে কবে মুখ ফুটে কথা বলতে পারবে কে জানে। এভাবে চললে কপালে দুঃখ আছে। যে কেউ এসে তাকে জব্দ করে চলে যাবে। না, এনার একটা ব্যবস্থা আমার নেওয়া দরকার।'

রুদ্র এক ধাপ পিছিয়ে যায়। তিতাস হাফ ছেড়ে বাঁচে। তার চোখ সরে না রুদ্রর দিক থেকে। রুদ্র ট্রাউজার্সের পকেট থেকে হাত বের করে বুকের সামনে আড়াআড়ি ভাবে ভাঁজ করে দাঁড়ায়। 

তিতাসের নজর সঙ্গে সঙ্গে চলে যায় রুদ্রর হাতের পেশীবহুল অংশে। নিমেষে গাল দুটো আবার লাল হয়ে পরে।

রুদ্র তিতাসকে টমেটোর মতো লাল হতে দেখে একটা ভুরু উঁচু করে। তিতাস অন্যদিকে চোখ ফিরিয়ে নেয়। 

গলা খাঁকারি দিয়ে রুদ্র বলে, "কী চাই বললে শুধু হবে না। আমার অনেক কিছু চাই। তুমি কতটা দিতে পারবে সেটা তোমার ওপর ডিপেন্ড করছে।"

তিতাস ঝট করে রুদ্রর মুখের দিকে তাকায়। আতঙ্কে চোখে জল আসার উপক্রম। কাঁপা কাঁপা গলায় বলে বসে, "প্লিজ, আমাকে যেতে দিন। আপনার যা লাগবে, আমি আপনাকে দিয়ে চলে যাচ্ছি।"

'ইস দিস গার্ল ফর রিয়াল!?' রুদ্র চোখ উল্টে, দু'আঙুল দিয়ে নাক চেপে ধরে। তিন চার বার বড়ো বড়ো নিশ্বাস ছেড়ে তিতাসের দিকে কড়া ভাবে তাকিয়ে বলে, "এই শহরের আলো না-পৌঁছানো গলিগুলোতে আমার নাম শুনলে পোক্ত অপরাধীরা থরথর করে কাঁপে। আর সেখানে আপনি না জেনে বুঝে মাথা নত করে অমনি মেনে নিলে? একবারও জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে করলে না আমি কী চেতে পারি? যদি আমি এমন কিছু চেয়ে বসি, যা আপনার পক্ষে দেওয়া অসম্ভব?"

"এই যে ম্যাডাম, আমার দিকে দেখুন। এদিক - ওদিক তাকিয়ে লাভ নেই। পার্কের এই দিকে কেউ আসবে না আপনার সহায়তার জন্য। এতো ভয় না পেয়ে, চোখে চোখ রেখে উল্টো প্রশ্ন করতে পারলেন না যে কেন আপনি আমার কথা শুনবেন। একবার মনে হলো না কেন কোথায় দোষ আপনার? অন্যায় যখন করেননি তখন অন্যায় সহ্য করবেন কেন? এরকম ভীতু প্রকৃতির কেন আপনি?"

তিতাস মাথা নিচু করে নিজের জুতোর দিকে তাকিয়ে থাকে। সাদা স্পোর্টস শু-জোড়ায় ধুলোর দাগ লেগে আছে। সেই দাগগুলোর দিকে নির্বাক চোখে তাকিয়ে থাকে সে।

রুদ্র যা বলতে চাইছে, সেটা সে বুঝেছে। লোকটা তাকে অপমান করছে না। ভয় দেখাচ্ছে না। বরং উল্টোটা। সে চাইছে তিতাস প্রতিবাদ করুক। নিজের হয়ে কথা বলুক। অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করুক।

কিন্তু...

সে কি সত্যি পারে?

যদি পারত, তাহলে গতকালই সবাইকে থামিয়ে দিত। যারা তাকে নিয়ে বডিসেম করছিলো, তাদের মুখের ওপর জবাব দিত। কিন্তু সে দেয়নি। তাই বলে দোষটা কি শুধু তার?

তিতাসের ঠোঁট কেঁপে ওঠে।

ছোটবেলা থেকে সে শিখেছে, ভালো মেয়ে হতে হয়। চুপচাপ থাকতে হয়। বড়দের সঙ্গে তর্ক করা যায় না। গলা উঁচু করা অভদ্রতা। প্রতিবাদ করা বেয়াদবি।

প্রথম প্রথম সে প্রতিবাদ করত। নিজের কথা বোঝানোর চেষ্টা করত। তারপর...ধীরে ধীরে থেমে গেছে। কারণ প্রতিবার একই কথা শুনতে হয়েছে।

"তোর এত কথা কেন?"

"মেয়ে মানুষ হয়ে এত তর্ক করিস না।"

"সব জায়গায় নিজের মতামত দিতে হবে?"

"চুপ করে থাক।"

"নিশ্চয়ই তোর দোষ ছিল।"

একসময় সে বুঝে যায়, নিজের কথা বলে লাভ নেই। যখন কেউ শোনার নেই!

যে জায়গাটা একজন মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা, যদি সেই জায়গাতে বারবার নিজের কণ্ঠস্বরকে চেপে ধরতে শেখানো হয়, তাহলে বাইরের পৃথিবীর সামনে দাঁড়ানোর সাহস আসে কীভাবে?

অভ্যাস ক্রমে সে বিশ্বাস করতে শিখে গেছে চুপ করে থাকা নিরাপদ। মেনে নিলে ঝামেলা কম হয়। কথা বললে শেষে দোষী সে-ই হবে।