Beyond time in Bengali Thriller by Miss writer books and stories PDF | সময়ের ওপারে

Featured Books
Categories
Share

সময়ের ওপারে



রাত তখন বারোটা। বাইরে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে। জানলার কাচে বৃষ্টির ফোঁটা আছড়ে পড়ছে একটানা। অয়ন পুরোনো বাড়ির চিলেকোঠায় বসে দাদুর জিনিসপত্র ঘাঁটছিল। দাদু মারা যাওয়ার পর বাড়ির এই ঘরটা কেউ খোলেনি। বাবা বলেছিলেন, পুরোনো জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখতে। কিন্তু অয়ন জানত না, এই ঘরের ধুলো জমা বাক্সের মধ্যে তার জন্য অপেক্ষা করছে এমন এক রহস্য, যা তার জীবনটাই বদলে দেবে।

একটা কাঠের বাক্স খুলতেই সে পেল পুরোনো চিঠি, কিছু ছবি আর একটি অদ্ভুত পকেটঘড়ি। ঘড়িটা দেখতে বেশ পুরোনো, কিন্তু আশ্চর্যভাবে তার গায়ে একটুও মরচে ধরেনি। ঘড়ির কাঁটা নেই। কাচের ভেতরে শুধু একটা নীলচে আলো জ্বলছে।

ঘড়ির পিছনে খোদাই করা ছিল কয়েকটি শব্দ—

“সময়কে বদলাতে যেয়ো না। প্রতিটি পরিবর্তনের মূল্য দিতে হয়।”

অয়ন কথাটার মানে বুঝতে পারল না। কৌতূহলবশত ঘড়িটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে দেখল। ঠিক তখনই ঘড়ির ভেতর থেকে একটা মৃদু শব্দ হল।

টিক… টিক… টিক…

যে ঘড়িতে কাঁটাই নেই, সেটা শব্দ করছে কীভাবে?

অয়ন অবাক হয়ে ঘড়ির ওপর আঙুল রাখল।

পরমুহূর্তে ঘরের আলো নিভে গেল।

তার চারপাশের বাতাস যেন ঘূর্ণির মতো ঘুরতে লাগল। কানে ভেসে এল অসংখ্য মানুষের কথা, গাড়ির হর্ন, ট্রেনের শব্দ, ঘড়ির কাঁটার আওয়াজ। অয়ন চোখ বন্ধ করে ফেলল।

কয়েক মুহূর্ত পর সবকিছু শান্ত হয়ে গেল।

চোখ খুলে সে দেখল, সে আর চিলেকোঠায় নেই। সে দাঁড়িয়ে আছে একটা রাস্তার ধারে। চারদিকে দিনের আলো। রাস্তার পাশে পুরোনো দোকান, দেওয়ালে সিনেমার পোস্টার, আর মানুষের পোশাক দেখে মনে হচ্ছে যেন সে বহু বছর পিছিয়ে এসেছে।

একটা চায়ের দোকানের সামনে ঝোলানো ক্যালেন্ডারের দিকে চোখ পড়তেই তার বুক কেঁপে উঠল।

তারিখ: ১৭ জুলাই, ২০১১।

অয়নের বয়স এখন ছাব্বিশ। অথচ এই তারিখটা তার কাছে খুব পরিচিত। কারণ এই দিনেই তার বাবা, অরুণাভ সেন, এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন।

সেদিন অয়নের বয়স ছিল মাত্র এগারো।

বাবার মৃত্যুর পর মা একা হাতে তাকে বড় করেছেন। বাবার শেষ যাত্রার সেই দিনটা অয়ন কোনও দিন ভুলতে পারেনি। অনেকবার মনে হয়েছে, যদি সে বাবাকে সতর্ক করতে পারত, যদি দুর্ঘটনাটা আটকাতে পারত, তাহলে হয়তো তাদের জীবনটা অন্যরকম হত।

আজ সে সেই দিনেই দাঁড়িয়ে আছে!

অয়ন কাঁপা হাতে পকেটঘড়িটা বের করল। নীল আলোটা জ্বলছে। তার মনে হল, সে সত্যিই অতীতে ফিরে এসেছে।

দূরে একটা পরিচিত বাড়ি দেখতে পেল সে। তাদের পুরোনো বাড়ি। গেটের সামনে ছোট্ট একটা ছেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ছেলেটাকে দেখেই অয়নের চোখে জল এসে গেল।

ওটা তার এগারো বছরের ছোটবেলার রূপ।

বাড়ির ভেতর থেকে বাবার গলা শোনা গেল, “অয়ন, স্কুলের ব্যাগটা গুছিয়ে রাখিস। আমি একটু বাইরে যাচ্ছি।”

ছোট্ট অয়ন দৌড়ে ঘরে ঢুকে গেল।

অয়ন দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তার বাবা তখনও বেঁচে আছেন। তিনি হাসছেন, মায়ের সঙ্গে কথা বলছেন, ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।

এই দৃশ্য দেখে অয়নের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে দৌড়ে বাবার কাছে যেতে চাইল, কিন্তু ঠিক তখনই পকেটঘড়িটা গরম হয়ে উঠল। ঘড়ির কাচের ওপর নতুন করে কিছু শব্দ ফুটে উঠল—

“তোমার হাতে সময় আছে। কিন্তু সবকিছু তোমার ইচ্ছেমতো হবে না।”

অয়ন বুঝল, দুর্ঘটনাটা আটকানোর সুযোগ তার সামনে এসেছে।

সে জানত, সেদিন বাবা অফিসের কাজ শেষ করে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন। রাস্তার একটা মোড়ে দ্রুতগতির ট্রাক তাঁর গাড়িতে ধাক্কা মেরেছিল।

অয়ন ঠিক করল, সে বাবাকে ওই রাস্তা দিয়ে যেতে দেবে না।

কিন্তু কীভাবে?

সে বাবার কাছে গিয়ে বলল, “বাবা, আজ তুমি বাইরে যেয়ো না।”

অরুণাভ অবাক হয়ে ছেলেটার দিকে তাকালেন। “কী হয়েছে? তুই কে?”

অয়ন বুঝতে পারল, তার বাবা তাকে চিনতে পারছেন না। এই সময়ে সে তো বাবার কাছে একজন অপরিচিত যুবক!

সে নিজেকে সামলে বলল, “আমি… আমি আপনাকে একটা কথা বলতে এসেছি। আজ সন্ধ্যায় ওই বড় রাস্তা দিয়ে যাবেন না। ওখানে দুর্ঘটনা হবে।”

অরুণাভ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে হেসে ফেললেন।

“তুমি কি ভবিষ্যৎ দেখতে পাও নাকি?”

অয়ন উত্তর দিতে পারল না। সে শুধু বলল, “দয়া করে আমার কথা বিশ্বাস করুন।”

অরুণাভ তার উদ্বিগ্ন মুখ দেখে একটু গম্ভীর হলেন। তারপর বললেন, “ঠিক আছে, আমি সাবধানে যাব।”

অয়ন বুঝল, শুধু সাবধানে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। তাকে দুর্ঘটনাটা আটকাতেই হবে।

সন্ধ্যায় সে বাবার গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে রইল। অরুণাভ গাড়ি নিয়ে বেরোতে গেলে অয়ন আবার অনুরোধ করল, “আপনি আজ যাবেন না!”

কিন্তু বাবার জরুরি কাজ ছিল। তিনি অয়নকে পাশ কাটিয়ে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

অয়ন দৌড়ে একটা ট্যাক্সি থামিয়ে তাঁর পিছু নিল।

রাস্তায় পৌঁছে সে দেখল, সেই পরিচিত মোড়। দূরে একটা ট্রাক দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসছে। অয়ন চিৎকার করে বাবার গাড়ির দিকে ছুটল।

“বাবা! থামুন!”

অরুণাভ ব্রেক কষলেন। গাড়ি থেমে গেল মোড়ের আগেই। ঠিক সেই মুহূর্তে ট্রাকটা তাদের পাশ দিয়ে ভয়ংকর গতিতে চলে গেল। দুর্ঘটনা ঘটল না।

অয়ন হাঁপাতে হাঁপাতে রাস্তার ওপর বসে পড়ল। তার চোখে জল। সে পেরেছে! সে বাবাকে বাঁচিয়েছে!

অরুণাভ গাড়ি থেকে নেমে তার কাছে এলেন।

“তুমি কে বলো তো? আমাকে বাঁচানোর জন্য নিজের জীবনের ঝুঁকি নিলে কেন?”

অয়ন বাবার দিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “কারণ আমি আপনাকে খুব ভালোবাসি।”

অরুণাভ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ছেলেটার কাঁধে হাত রাখলেন।

“তোমার বাড়ি কোথায়? তোমাকে পৌঁছে দেব।”

অয়ন উত্তর দেওয়ার আগেই পকেটঘড়িটা আবার কেঁপে উঠল। নীল আলোটা ক্রমশ উজ্জ্বল হচ্ছে।

সে ঘড়িটা বের করতেই দেখতে পেল নতুন একটি বার্তা—

“একটি জীবন বাঁচালে। কিন্তু সময় তার হিসাব রাখে।”

অয়ন বার্তাটা বুঝতে পারল না। তার মাথায় তখন একটাই চিন্তা—বাবা বেঁচে গেছেন। এবার সে বাড়ি ফিরে যাবে।

ঘড়ির ওপর আঙুল রাখতেই আবার সেই ঘূর্ণি শুরু হল।

চোখ খুলে অয়ন দেখল, সে নিজের বাড়িতে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু বাড়িটা যেন আগের মতো নয়। দেওয়ালে নতুন ছবি, ঘরে অন্য আসবাবপত্র। সে দৌড়ে বসার ঘরে গেল।

সেখানে একটা বড় ফ্রেমে পরিবারের ছবি টাঙানো। ছবিতে বাবা, মা আর অয়ন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে হাসছেন।

অয়নের চোখে জল এসে গেল।

বাবা বেঁচে আছেন! সব বদলে গেছে!

সে বাবাকে খুঁজতে লাগল। ঠিক তখনই ঘরের দরজা খুলে একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ ঢুকলেন।

“অয়ন, তুই এখানে কী করছিস?”

অয়ন তাকিয়ে দেখল—তার বাবা!

সে ছুটে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

“বাবা!”

অরুণাভ অবাক হয়ে বললেন, “কী হয়েছে তোর? এমন করছিস কেন?”

অয়ন কিছু বলতে পারল না। শুধু বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল।

সেই রাতে বহু বছর পর বাবার পাশে বসে খাওয়া, গল্প করা, হাসাহাসি—সবকিছু যেন স্বপ্নের মতো লাগছিল।

কিন্তু পরদিন সকালে অয়ন বুঝতে পারল, এই নতুন পৃথিবীতে কিছু একটা বদলে গেছে।

তার মা কোথায়?

সে বাবাকে জিজ্ঞেস করল, “মা কোথায়?”

অরুণাভের মুখটা মুহূর্তে গম্ভীর হয়ে গেল।

“তোর মা তো আর নেই, অয়ন। তুই ছোট থাকতে অসুখে মারা গিয়েছিল।”

অয়নের মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।

এই পৃথিবীতে বাবাকে বাঁচানো গেছে, কিন্তু মাকে হারাতে হয়েছে!

সে ছুটে নিজের ঘরে গেল। পুরোনো ছবিগুলো দেখতে লাগল। বাবার সঙ্গে তার অনেক ছবি রয়েছে, কিন্তু মায়ের সঙ্গে একটাও নেই।

অয়নের চোখে জল এসে গেল। সে বুঝতে পারল, অতীত বদলালে শুধু একটা ঘটনা বদলায় না—তার সঙ্গে বদলে যেতে পারে জীবনের আরও অনেক কিছু।

সে পকেটঘড়িটা বের করল। ঘড়ির নীল আলো মিটমিট করছে।

“আমি মাকে ফিরে পেতে চাই,” সে ফিসফিস করে বলল।

ঘড়ির কাচে ফুটে উঠল—

“তুমি কি আবার মূল্য দিতে প্রস্তুত?”

অয়ন এক মুহূর্তও ভাবল না। সে ঘড়ির ওপর আঙুল রাখল।

আবার সেই ঘূর্ণি, সেই অন্ধকার, সেই অসংখ্য শব্দ।

চোখ খুলে সে দেখল, সে ফিরে এসেছে ১৭ জুলাই, ২০১১ সালের সেই রাস্তার ধারে। এবার সে জানত, কী করতে হবে। সে বাবাকে দুর্ঘটনার দিন বাড়ি থেকে বেরোতে বাধা দেবে না। বরং এমন একটা ব্যবস্থা করবে, যাতে বাবা-মা দুজনেই দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে পারেন।

কিন্তু সময় যেন তার সঙ্গে খেলা করছিল।

যতবার অয়ন কোনও ঘটনা বদলানোর চেষ্টা করছিল, ততবার অন্য একটি ঘটনা পাল্টে যাচ্ছিল। কখনও বাবার চাকরি চলে যাচ্ছিল, কখনও তার নিজের জন্মের ঘটনাই অনিশ্চিত হয়ে উঠছিল। প্রতিটি পরিবর্তন যেন নতুন একটা মূল্য দাবি করছিল।

অয়ন ক্লান্ত হয়ে পড়ল। সে বুঝতে পারল, অতীতকে নিজের ইচ্ছেমতো সাজানো যায় না।

শেষবার সে ঘড়ির দিকে তাকাল। সেখানে লেখা—

“যে সময় চলে গেছে, তাকে ধরে রাখা যায় না। কিন্তু তার স্মৃতি নিয়ে সামনে এগোনো যায়।”

অয়ন দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।

তার মনে পড়ল, মা তাকে ছোটবেলায় বলতেন, “জীবনে সবকিছু নিজের হাতে থাকে না রে। যা আছে, তার মূল্য বুঝতে শেখ।”

অয়ন বুঝতে পারল, সে অতীতকে বদলাতে চেয়েছিল নিজের কষ্ট থেকে পালানোর জন্য। কিন্তু বাবাকে হারানোর দুঃখ তার জীবনের একটা অংশ। সেই দুঃখ মুছে ফেলতে গিয়ে সে এমন এক পৃথিবী তৈরি করছে, যেখানে অন্য প্রিয় মানুষকে হারাতে হচ্ছে।

সে এবার ঘড়ির ওপর আঙুল রাখল এবং মনে মনে বলল, “আমি আর কিছু বদলাতে চাই না। আমাকে আমার সময়ে ফিরিয়ে দাও।”

নীল আলোটা ধীরে ধীরে নিভে গেল।

পরমুহূর্তে অয়ন আবার দাদুর চিলেকোঠায়।

বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে। ঘড়িটা তার হাতে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। অয়ন দৌড়ে নিচে নেমে এল। বসার ঘরের দেওয়ালে বাবার ছবি এখনও টাঙানো। মা রান্নাঘর থেকে ডাকছেন, “অয়ন, খেতে আয়!”

অয়ন ছুটে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল।

“কী হয়েছে রে?” মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

“কিছু না, মা। তোমাকে খুব ভালোবাসি।”

সেদিন রাতে অয়ন ঘড়িটাকে দাদুর বাক্সে রেখে দিল। কিন্তু বাক্স বন্ধ করার আগে সে দেখল, ঘড়ির কাচে ক্ষীণ নীল আলো আবার জ্বলে উঠেছে।

তার নিচে নতুন একটা বাক্য ফুটে উঠল—

“সময় শেষ হয়নি। তোমার গল্পও নয়।”

অয়ন বাক্সটা বন্ধ করে দিল।

সে জানত না, ঘড়িটা আর কখনও তাকে অতীতে নিয়ে যাবে কি না। কিন্তু সে বুঝেছিল, সময়ের সবচেয়ে বড় শক্তি অতীত বদলানো নয়—বরং বর্তমানকে নতুন করে ভালোবাসতে শেখানো।

আর সেই রাতের পর থেকে অয়ন আর কোনও দিন সময়কে পিছনে ফেরানোর স্বপ্ন দেখেনি।

কারণ, কিছু স্মৃতি কষ্ট দেয় ঠিকই, কিন্তু সেই স্মৃতিগুলোই আমাদের শেখায়—যাদের আমরা ভালোবাসি, তারা পাশে থাকতে থাকতেই তাদের ভালোবাসা জানিয়ে দিতে হয়।

সময়ের ওপারে যাওয়া সম্ভব কি না, অয়ন জানত না। কিন্তু সময় থাকতে ভালোবাসার কথা বলে দেওয়া যে সম্ভব, সেটা সে সেদিন বুঝেছিল।