Haraye Khunji in Bengali Short Stories by Kumar books and stories PDF | হারায়ে খুঁজি

The Author
Featured Books
Share

হারায়ে খুঁজি

হারায়ে খুঁজি

বেশ অনেক বছর আগের ঘটনা । তখনও মোবাইল ফোন আসেনি আমাদের দেশে। ইন্টারনেট তো কল্পনারও বাইরে।

আমি ওকে প্রথম দেখেছিলাম একটা ব্যাংকে । না, ওখানে কাজ করতো না । একটা কাজে গিয়েছিলো, ব্যাংকের রিসেপশনে বসে অপেক্ষা করছিলো। আমি গিয়েছিলাম আমার কাজে ব্যাংক ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করতে। আমি ছিলাম একটি নামি কোম্পানির Sales Executive । ব্যাংকের খুব জরুরি প্রয়োজনীয়, এমন কিছু প্রোডাক্ট আমি বিক্রি করতাম ।

আমার তখন কত বয়স, এই ২৭ - ২৮ বছর হবে । এমনি কিছু সাধারণ কথা হয়েছিলো মেয়েটির সঙ্গে। তখন একটা Unemployment benefit দিতো গভর্নমেন্ট থেকে, সেইটার জন্যে ও গিয়েছিলো । কিছুক্ষন পর ম্যানেজারের ঘর থেকে আমার ডাক এলো। আমি ভেতরে চলে গেলাম । কাজ শেষ করে বেরিয়ে দেখি ও চলে গেছে । ব্যস ঐখানেই শেষ।

তখনকার মতো কাজে ব্যাস্ত হয়ে গিয়েছিলাম । পরে যখন বাড়ি ফিরে নিজের ঘরে আরাম করছি, তখন মনে হোলো মেয়েটার নামটাও তো জানা হয়নি। কোথায় থাকে জিগ্যেস করার পর্যায়ে আলাপটা অবশ্য পৌঁছয়নি । তখন তো আর মোবাইল ফোনও ছিলো না যে নম্বর নেবো। মেয়েটাকে কেমন যেনো মনে ধরে গিয়েছিলো । সুন্দর দেখতে যে এমন কিছুও না । ফিগারটা ভালো । তখন বোম্বেতে জীনাত আমান ছিলো না, মুখের ধরণটা সেইরকম অনেকটা, শুধু গায়ের রংটা একটু চাপা, আর সাস্থ্যটা জীনাত আমানের মত রোগা নয়। লম্বাটে গড়ন, সাধারণ বাঙালি মেয়েদের চেয়ে একটু বেশিই। মাথায় ঢুকে গেলো যে খুঁজে বের করে বন্ধুত্ব করতে হবে।

কিন্তূ বললেই তো আর হলোনা। তখন ইন্টারনেট ছিলোনা যে ফেসবুক সার্চ করবো, আর নামই তো জানিনা । পরের দিনটা অফিসের কাজের ফাঁকে ফাঁকে শুধু উপায় খুঁজে গেছি । সন্ধ্যের মধ্যে একটা প্ল্যান ঠিক করে ফেললাম।

পরের দিন অফিসের কাজে বাইরে বেরিয়ে ওই ব্যাংকটাতে গেলাম । গিয়ে খোঁজ করলাম ওই Unemployment benefit কোন ডিপারমেন্ট দেখে । এক ভদ্রলোককে দেখিয়ে দিলো পিওনটা । ওনাকে গিয়ে বললাম , " দাদা, একটা ব্যাপারে একটু সাহায্য চাই"।

উনি বললেন, "কি ব্যাপার বলুন ?"

বললাম, " গত পরশু আমি এই ব্যাংকে কাজে এসেছিলাম । এখানে আমার এক স্কুলের বন্ধুর বোনের সঙ্গে দেখা হয় । আমি স্কুলের পরে কলকাতার বাইরে চলে গিয়েছিলাম তো তাই ওই বন্ধুর সঙ্গে এতদিন যোগাযোগ ছিলোনা। ওর বোনের কাছে শুনলাম, আমার বন্ধুর নাকি চাকরি হয়নি, খুব অসুবিধের মধ্যে আছে। আমাদের কোম্পানিতে কিছু Sales এ ছেলে নেবে। আমি অফিসে বলে রেখেছি ওর জন্যে। কিন্তূ মুস্কিল হচ্ছে ওর এখনকার ঠিকানাটা আমি জানিনা । তাই আপনার কাছে অনুরোধ করছি , যদি আপনাদের রেকর্ড দেখে ওর বোনের ঠিকানাটা বলে দেন, তাহলে আমি আমার বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি ।"

ভদ্রলোক বললেন, "দেখুন আমার এখন অনেক কাজ, আপনার কাজ করতে সময় লাগবে । আমি পারবোনা ।"

আমি বললাম, " দাদা, একটা বাঙালি ছেলের চাকরি হবে, একটু উপকার করুন। আমি তাহলে ব্যাংকিং সময়ের পরে আসবো। কটার সময় এলে আপনি একটু সময় আমাকে দিতে পারবেন ? "

ভদ্রলোক বললেন, " ঠিক আছে, আপনি এত করে বলছেন, আপনি চারটের পরে আসুন ।"

ঠিক চারটায় পৌঁছে গেছি ব্যাংকে। ভদ্রলোক আমায় কাউন্টারের ভেতরে ডেকে নিলেন পিছন দিককার একটা টেবিলে ।

বললেন, " নাম বলুন মেয়েটির , আমি দেখছি খুঁজে ।"

আমি বললাম, "নাম তো জানিনা। মানে, বন্ধুর বোন তো, ওর ছোটবেলার ডাক নামটা জানি । কিন্তূ ভালো নাম তো জানিনা ।"

উনি বললেন, "তাহলে আর কি করে খুঁজবো ? আপনি যান মশাই ।"

আমি বললাম, "আপনাদের কাছে তো সবাইকার কোনো Application file থাকবে । সেই ফাইলে ছবি থাকবে, সেটা দেখে আমি চিনে নেবো ।"

ভদ্রলোক বললেন, "আরে সে ফাইল কি একটা নাকি ? আর কোথায় স্টোরে রাখা আছে। কে আনবে সে সব ফাইল ? আর অত application একটা একটা করে দেখা যায় নাকি? আপনি যান, Sorry, কিন্তূ পারলাম না ।"

আমি নাছোড়বান্দা, বললাম, "দেখুন, একটা ছেলের চাকরির ব্যাপার। গরিব ফ্যামিলি , বোঝেনই তো সব । একটু দয়া করে সাহায্য করে দিন না।"

আমি বললাম, " ও গত পরশু দিন এসেছিলো । দেখুন না পরশুর খাতাটা ।"

উনি বললেন, "তাতে কি হবে, আপনি তো নামই জানেন না ।"

আমি বললাম, "একদিনে বেশি মেয়ে তো থাকবেনা। যদি একজনই হয়...."

কম্পিউটার তো তখনও চালু হয়নি। উনি একটা রেজিস্টার টেনে বের করলেন । পরশুর তারিখের পাতাটা বের করে দেখে বললেন, "এখানে তো দেখছি তিনজন মেয়ের নাম আছে । কোনজন আপনার বন্ধুর বোন ? পদবি জানেন তো ?"

আমি বললাম, "না পদবি তো মনে নেই ঠিক । আপনি ওই তিনটে নামেরই ঠিকানা গুলো একটু রেজিস্টার দেখে যদি বলে দেন ?"

আমি ওই তিনটে নাম একটা কাগজে লিখে নিলাম । ভদ্রলোক আর একটা মোটা রেজিস্টার নিয়ে এলেন । সেখান থেকে দেখে দেখে ঠিকানা গুলো পড়লেন । আমি লিখে নিলাম ।

আমার কর্ম সিদ্ধি । ভদ্রলোককে অনেক অনেক ধন্যবাদ দিয়ে বেরিয়ে এলাম ।

আমার কাজ তো হলো । কিন্তূ আমার কাছে এখন তিনটে ঠিকানা । যারা কলকাতা চেনেন, তাদের বলি, একটা ঠিকানা কলেজ স্ট্রিট, একটা বেহালা আর একটা যাদবপুর । মানে একটা উত্তর , একটা পশ্চিম আর একটা দক্ষিণ কলকাতা ।

কিন্তূ ঠিকানা পেলেই তো আর হলোনা। হুট করে একটা বাড়িতে বেল বাজিয়ে তো আর জিগ্যেস করা যায়না, যে এই মেয়েটিকে একটু ডেকে দেবেন, দেখবো আমার সেই ব্যাংকে দেখা মেয়ে কিনা । মারধর খেয়ে যাবার ভয় আছে ।

তো সেটাও একটা ছক কসা ছিলো আমার মাথায়। ঠিক করলাম, আমি কলকাতা Universityর Business Management এর ছাত্র সেজে একটা Survey করবো আমাদের কলেজের প্রজেক্ট হিসেবে । প্রজেক্টটা হবে গভর্নমেন্ট যে Unemployment Benefit বা বেকার ভাতা দিচ্ছে, তার উপযোগিতা নিয়ে কিছু তথ্য সংগ্রহ করা । সেই মতো একটা প্রশ্নপত্রও বানিয়ে নিলাম ।

নাম -
ঠিকানা -
বয়স -
শিক্ষাগত যোগ্যতা -
এই বেকার ভাতা দিয়ে কি করেন ? -
কোনো চাকরির জন্য চেষ্টা করছেন কিনা ? -
কর্ম শিক্ষার কিছু কোর্স বা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন কিনা ? -
যদি করেন তো কি করছেন ? -
কোনো টিউশন বা ছাত্র পড়ানোর কাজ করছেন কিনা ? -
যদি না করেন, তো কেন করছেন না ? -
এই ভাতা কি যথেষ্ট মনে হয় ? -
আর কি ধরণের সাহায্য আসা করেন ? -

এইরকম একটা লিস্ট আমি হাতে লিখে তারপর অফিস থেকে টাইপ করে নিয়েছিলাম । এখন তিনটে ঠিকানা পাওয়াতে , সেই লিস্টের কয়েকটা ফটোকপি বানিয়ে নিলাম ।

পরের দিন থেকে আমার সার্ভে প্রজেক্ট শুরু । প্রথম দিন আমার বাড়ির কাছে কলেজ স্ট্রিটের ঠিকানাটা দিয়েই শুরু করব ঠিক করলাম । যদি এটা লেগে যায়, তাহলে আর দূরে যেতে হবেনা ।

আমার তো অফিসের বাইরে বাইরেই কাজ। তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে বিকেলের দিকে ৫টা নাগাদ কলেজ স্ট্রিটের বাড়িটার ঠিকানা খুঁজে পৌঁছে গেলাম। এক বয়স্কা মহিলা দরজা খুললেন । ওনাকে বললাম আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্টের ছাত্র , বেকার ভাতা নিয়ে একটা সার্ভে করতে এসেছি। ওই ঠিকানার মেয়েটির নাম বলে জিগ্যেস করলাম একটু কথা বলা যাবে কিনা । ভদ্রমহিলা তো ভীষণ আগ্রহে ভেতরে নিয়ে বসালেন। ঘর দেখে বুঝলাম, একটু নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার । ভদ্রমহিলা বললেন মেয়েটির শরীর খারাপ, শুয়ে আছে, উনি ডেকে আনছেন । বলে ভেতরে গেলেন ডাকতে । একটু পরে ফিরে এসে কাছে বসলেন। উনি ভেবেছেন আমি চাকরির ব্যাপারে এসেছি। ওনার সংসারের অভাবের কথা বলতে লাগলেন । ওনার স্বামী মারা গেছেন , এক ছেলে খুবই সামান্য কিছু করে, বেশি পড়াশোনা করেনি। মেয়েটি গ্র্যাজুয়েট হয়েছে কিন্তূ কোনো চাকরি পাচ্ছেনা । আমি যদি সরকারকে বলে একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে পারি, খুব উপকার হয়। ওনাকে বোঝাতে পারছিনা, আমি শুধু একটা সার্ভে করতে এসেছি।

ইতিমধ্যে মেয়েটি ঘরে এসে ঢুকেছে। না, এ সেই মেয়ে নয় । মেয়েটি দেখতে সুশ্রী, রং পরিষ্কার, লম্বাটে গড়ন , কিন্তূ এ আমার সেই মেয়েটা নয় ।

মেয়েটি এসে আমার সামনে একটা চেয়ারে বসলো। আমি তাকে আমার পুরো সার্ভের ব্যাপারটা বললাম। সব প্রশ্নগুলো একেক করে করলাম । মেয়েটি ধৈর্য ধরে উত্তর দিলো। আমিও কিছু কিছু নোট করতে থাকলাম । মেয়েটির মা চা বিস্কুট , নিমকি নিয়ে এলেন। আমার সব প্রশ্ন শুনে, ভদ্রমহিলার আরো ধারণা হয়ে গেলো যে আমি গভর্নমেন্টের লোক । আমাকে একেবারে ধরে পড়লেন একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে হবে। মেয়েটিও বোঝাবার চেষ্টা করলো যে আমি চাকরির জন্য আসিনি। উনি তবুও আমার হাত ধরে বলতে লাগলেন। এত খারাপ লাগছিলো আমার । মানুষের কি দুরবস্থা । আমরা ভালো ভাবে সব কিছু পেয়ে বড় হয়েছি বলে, এই কষ্ট বুঝতেই পারিনা। ওদের বাড়ি থেকে বেরিয়েও ভদ্রমহিলার আকুতি আমার মাথায় ঘুরতে থাকলো।

পরের দিন, একই ভাবে আমার অফিসের কাজে বেহালার দিকের ব্যাংক গুলোয় Sales calls করলাম । তারপর বিকেলের দিকে ওই বেহালার ঠিকানার খোঁজে গেলাম । জায়গাটা একটু ভেতরের দিকে, তখনও অতটা ঘন বসতি হয়নি। লোকজন কম রাস্তায়। একটা মেয়ের নাম নিয়ে ঠিকানা জিগ্যেস করতে সংকোচ হচ্ছিলো। বাবার নামও দেওয়া নেই ঠিকানাতে। অনেক ঘুরে শেষে বাড়িটা খুঁজে পেলাম । দেখি এক ভদ্রলোক সদর দরজায় তালা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন বাড়ি থেকে। মেয়েটির নাম বলতেই বললেন যে ওনার বোন । তখন আমি আমার পুরো গল্পটা বললাম, সার্ভে - ম্যানেজমেন্ট ছাত্র - প্রজেক্ট বেকার ভাতার উপযোগীতার উপরে, সব বললাম। সব শুনে বললেন, " ও তো বাড়িতে নেই । উনিভার্সিটি গেছে তো । MA পড়ছে এখন । আপনি আমায় প্রশ্ন গুলো করতে পারেন, আমি ওর সমন্ধে সব জানি ।"

আমি বললাম, " না, আসলে আমার প্রশ্ন গুলো ওকেই করতে হবে ।"

উনি বললেন, "তাহলে কাল আসুন, আমি বোনকে থাকতে বলবো বাড়িতে।"

আমি ভাবলাম আবার কাল আসতে হবে, এত দূরে ? একটা শেষ চেষ্টা করে দেখি । বললাম, "আমার তো ওই ওদিকেই বাড়ি । ফেরার পথে একবার উনিভার্সিটি ঘুড়ে যেতে পারি । কোন সাবজেক্ট আর কোন ইয়ার যদি বলেন, তাহলে খুঁজে নিতে পারি। আর চেহারার একটু কিছু, মানে লম্বা, রোগা, চশমা আছে , এইরকম ? "

ভদ্রলোক বললেন, " বাংলায় MA ফার্স্ট ইয়ার । আর চেহারা মানে লম্বা নয়, ছোটখাটো , স্বাস্থ ভালো , চশমা আছে ।"

আমি বললাম, "ধন্যবাদ, এতেই হবে, আমি খুঁজে নেবো ।" বলে নমস্কার করে তাড়াতাড়ি ওখান থেকে চলে এলাম ।

আমি বুঝে গেলাম, এই মেয়েও সেই মেয়ে নয় । অতএব যা হবার সব কাল হবে ......

পরের দিন, একটু বেশিই উত্তেজিত লাগছিল আমার । আজ দেখা হবে তার সঙ্গে। আবার চিন্তাও হচ্ছিলো । ওই দিন সেই মেয়েটা ব্যাংক থেকে টাকা তুলতেই এসেছিলো তো ? নাকি ওর একাউন্ট সংক্রান্ত অন্য কোনো কাজে ? আমি তো ব্যাংকের রেজিস্টার থেকে যে তিনটে নাম ঠিকানা নিয়েছি, তারা ওইদিন টাকা তুলেছিলো। ও যদি ওইদিন টাকা না তুলে থাকে, তাহলে তো আমার কাছে যে নাম, ঠিকানাটা আছে, সেটা হয়তো তৃতীয় কোনো মেয়ের। আমার উত্তেজনা আবার মিইয়ে গেলো ।

সেদিন আমি অফিস থেকে হাফ ডে ছুটি করিয়ে নিলাম । অন্য দিনকার মতো বিকেল অবধি অপেক্ষা আর করতে পারবোনা । একটা খুব জরুরি কাজ ছিলো, সেটা সেরে দুপুর বেলাতেই পৌঁছে গেলাম যাদবপুরে।

এবারের ঠিকানা খুঁজে পেতে খুব একটা অসুবিধে হলোনা । দুরু দুরু বুকে বেল বাজালাম দরজায় । একটু পড়ে এক বয়স্কা মহিলা দরজা খুললেন । আমার সেই ম্যানেজমেন্ট কোর্সের সার্ভের গল্প শোনালাম ওনাকে । বললাম রঞ্জনা পাল বাড়িতে আছেন । ওনাকে এই সার্ভে সংক্রান্ত কিছু প্রশ্ন করার ছিলো।

ভদ্রমহিলা বললেন, "আমার মেয়ে তো এখন বাড়ি নেই । ওর বাবা হাসপাতালে ভর্তি আছে, ও দুপুরের খাবার নিয়ে গেছে ।"

আমি ভাবলাম আমার কপালটাই খারাপ । জিজ্ঞেস করলাম, "কোন হাসপাতালে ? কখন ফিরবেন ?"

ভদ্রমহিলা বললেন, " PG তে । তা ফিরতে ফিরতে এক ঘন্টা লেগে যাবে। আপনি ঘুরে আসতে পারেন ।"

অগত্যা। কাছাকাছি একটা ব্যাংক ছিলো, আমি সেখানে একটা Sales canvassing call করে নিলাম। তারপরও দেখলাম আধঘন্টা সময় আছে । আজ উত্তেজনায় দুপুরে কিছু খাওয়া হয়নি, সোজা এখানে চলে এসেছি। তাই ওই পাড়ার একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে কিছু খেয়ে নিলাম। তারপর আবার গেলাম ওই বাড়িতে।

এবারে বেল বাজাতে ওই ভদ্রমহিলাই আবার দরজা খুললেন। বললেন, "হ্যাঁ, আমার মেয়ে একটু আগেই এসে গেছে, আমি বলেছি আপনি কি একটা দরকারে এসেছিলেন। আমি ওকে ডাকছি, আপনি ভেতরে এসে বসুন।"

ভেতরে বসলাম। ছোট ঘর । মোটামুটি ছিমছাম ভাবে সাজানো। আমি আমার প্রশ্নের কাগজ, কলম বার করে বসলাম। একটু পরে পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকলো.....হ্যাঁ এতো সেই মেয়ে ।

ঘরে ঢুকে আমাকে দেখেই চিনতে ও পারলো । একটু হেঁসে বললো, "আরে আপনি ?"

আমিও হেঁসে বললাম, " আরে এটা আপনার বাড়ি নাকি ? কি অদ্ভুত ! আবার যোগাযোগ হয়ে গেলো।"

ততক্ষনে ঘরে ওর মা এসে গেছে। আমি আর ওকে বলতে পারলাম না, যে আমি ওর জন্যেই এত কাঠ খড় পুড়িয়ে ঠিকানা জোগাড় করেছি। আমি বসলাম surveyর প্রশ্ন পত্র খুলে। ওর মা কিছুক্ষন প্রশ্ন টোশ্ন শুনে চলে গেলেন ঘর থেকে । আমি তখন প্রশ্নের ফাঁকে ফাঁকে একটু ব্যক্তিগত কথা জিগ্যেস করে বন্ধুত্ব করার চেষ্টা করলাম। বাবার কি হয়েছে ? কেমন আছেন ? ভাই বোন কতজন ? দাদা আছে বললো; কি করেন দাদা ? তারপর আমার সম্মন্ধে বললাম, সত্যিটাই বললাম । ওই ম্যানেজমেন্ট সার্ভে টাই শুধু বানিয়ে বলেছিলাম । সব সার্ভের প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত করিও নি। তার আগেই ভাব জমিয়ে নিয়েছিলাম এদিক ওদিক কথা বলে । ঐখানে বসেই, আবার আরেকদিন দেখা করার দিনক্ষণ ঠিক করে নিলাম । তারপর উঠে পড়লাম ওখান থেকে ।

আমার এতো পরিশ্রমের সফল পরিণতি।

আমার গল্প এখানেই শেষ । শুধু উপসংহারে বলে রাখি যে ওর সঙ্গে তারপর থেকে সপ্তাহে অন্তত একবার তো দেখাই করতাম । সিনেমা, ভিক্টোরিয়া , চিড়িয়াখানা, রেস্টুরেন্ট ... মানে তখনকার দিনে প্রেম করার যে সব জায়গা ছিলো সব ঘুরে নিয়েছি । কিন্তূ ও কোনো দিনও বিশ্বাস করেনি যে আমি শুধুমাত্র ওকে খোঁজার জন্য ওই ব্যাংক অফিসারকে মিথ্যে গল্প বলে কি করে ঠিকানা জোগাড় করেছিলাম । আর শহর জুড়ে ভুয়া ম্যানেজমেন্ট সার্ভে করে বেড়িয়েছি অচেনা মেয়েদের বাড়ি ঘুরে ঘুরে, শুধু ওর বাড়ি খুঁজবো বলে ।

( এটা গল্প নয় - সত্যি এমনটাই হয়েছিলো । নামটাই শুধু পাল্টানো হয়েছে । )