পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীআচার্য্যদেব কথায় কথায় আমায় বললেন,-" একজন মানুষ কোন কারনে দোষ করতেই পারে, জন্মগত বা পরিবেশগত কারনে অন্যায় করতেই পারে। কিন্তু তার আত্মা তো নিস্পাপ। ঠাকুর তো এইবার তাঁর আত্মাগুলিকে কুড়িয়ে নিতে এসেছেন। তিনি কাউকে ব্রাত্য করেন নি। তাই আমরাও কাউকে ত্যাগ করতে পারিনা। সবাইকে নিয়ে চলতে হয়, সহ্য করতে হয়। ক্ষমা করা মানে,- কাউকে দয়া করা নয়। বরং ক্ষমা করা মানে ক্ষমতাশালী হওয়া। আমি তোমার বাজে ব্যাবহার সহ্য করার ক্ষমতা অর্জন করলাম। ক্ষমা করলে অন্যের কি উপকার হয় জানিনা,- কিন্তু নিজের মন শান্ত হয়। আর শান্ত মনেই ঠাকুর থাকেন। "
তিনি নিজের জীবনের জীবনের একটি অভিজ্ঞতা বললেন,-" একবার একজন খুব কাছের লোক আমায় এমন একটা কথা বলল,- আমার মনে খুব খারাপ লাগল। সারাদিন মনটা খুব খারাপ হয়ে আছে,- শুধু মনে আসছে,- সে কেন আমার সাথে এই খারাপ আচরণটা করল? গাড়ী করে যাচ্ছি,- হঠাৎ মনে হল,- আমার মাথায় তো ঠাকুর নেই। শুধু ঐ লোকটির কথাটাই মাথায় ঘুরছে। সাথে সাথে স্থির করলাম,- মাথায় ঠাকুর ছাড়া অন্য কোন চিন্তা যেন স্থান না পায়। আমার মন শান্ত হল। "
আমরা দেখি,- শিবের গলায় সাপ ঝুলে আছে। অর্থাৎ শিবগুনসম্পন্ন পুরুষ যিনি তিনি কাউকে বাদ দেন না। ঐ সাপ হ'ল খল হিংস্র ব্যাক্তির প্রতীক। সাপের মত চরিত্রওয়ালা লোক যারা- মহাদেব তাদের প্রেমে বশীভূত ক'রে কাছে রেখে দেন, যা'তে তারা বাইরে যেয়ে বৃহত্তর সমাজের ক্ষতি করতে না পারে। আবার তাদের ভিতরে ও যে সত্তাপ্রীতি আছে তা' উস্কে দিয়ে ঐ অমনতরদের দ্বারা লোকমংগল যতটুকু করানো সম্ভব তাও করিয়ে নেন। এই হল শিবভাবের বৈশিষ্ট্য। আচার্য্যদেবও তাই করেন। তিনিই শিবগুনসম্পন্ন পুরুষ।
হেমকবি তার শেষ জীবনে একটা কথা বলেছিলেন,-" জগতে বহু মহাপুরুষ এসছেন, সাধু-গুরু এসছেন। তারা কতশত মানুষকে আশ্রয় দিয়েছেন। কিন্তু এই জগতে প্রশ্রয় যদি কেউ দিয়ে থাকেন,- তবে তিনি শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূল চন্দ্র। "
হেমকবি আচার্য্যদেবকে দেখে যান নি,- তাই তিনি শুধু শ্রীশ্রীঠাকুরের কথাই বললেন। তিনি যদি আজকে জীবিত থাকতেন,- আর আচার্য্যদেবের সঙ্গ করার সুযোগ পেতেন তবে তিনি আচার্য্যদেব সম্পর্কেও একই মন্তব্য করতেন। আমরা যারা আচার্য্যদেবের সন্নিকটে যাই,- আমাদের অজস্র চারিত্রিক দোষগুলির সবগুলোই তিনি জানেন। কোনকিছুই তাঁর চোখে গোপন নেই। তারপরও তার সামনে গেলে তিনি এতটাই ভালবাসা দেন, গূরত্ব দেন,- মনে হয় বিশ্বের সবচেয়ে দামী ও গুরত্বপূর্ণ ব্যাক্তিটি যেন আমিই। আমার মত অতি সাধারণ মানুষটিও তাঁর দৃষ্টিতে ভীষণ গুরত্বপূর্ণ। আমার সকল মলিনতা, সকল পাপ, সকল চারিত্রিক ত্রুটি সহ তিনি আমাকে গ্রহন করেন, আশ্রয় দেন। এটাকেই প্রশ্রয় বলে। অমন লক্ষ কোটি মানুষকে প্রশ্রয় দিয়ে দিয়ে তিনি আগলে রেখেছেন।
কিন্তু তাঁর এই ভালবাসা ও প্রশ্রয়কে granted ধরে নিয়ে আমরা যদি নিজের চারিত্রিক দোষগুলিকে আরো শান দিতে থাকি, তাঁকে বোকা ভেবে কপটতা ও ধুর্ততাকে আরো প্রশ্রয় দিতে থাকি,- তবে একসময় প্রকৃতি রুষ্ট হয়ে উঠে। প্রকৃতি বড় নিষ্ঠুর। এই প্রকৃতির কোপে পড়ে যন্ত্রনা ভোগ করলে তখন তিনিও আমার জন্য কষ্ট পান। অসহায় পিতার মত অবস্থা হয় তার।
আবার,- কখনো কখনো তাঁর এই প্রশ্রয়, ভালবাসা, অহেতুক দয়া, তার গূরত্বারোপ, - আমার মনে অহংবোধের জম্মও দিতে পারে। মনে হতে পারে,-" আমি তো বিশাল এক কেউকেটা!! তিনি আমায় কাছে ডাকেন,- মানে আমি কত জ্ঞানীগুণী, পূন্যবান!! আমাকে ছাড়া কি তাঁর চলবে?" এই অহংবোধ এক নিমেষে আমাকে গভীর অন্ধকারে টেনে নিতে পারে। তিনি মূর্খ্যকে দিয়েও বহু জ্ঞানের কথা বলাতে পারেন, খোঁড়াকে দিয়ে হিমালয় জয় করাতে পারেন। তাই অহংকার করার কিছুই নেই। তাঁর হাত আমার মাথায় আছে বলেই আমি এই করছি-সেই করছি। যেইমাত্র এই হাতটা সরে যাবে আমার অবস্থা চার্জশূন্য মোবাইলের মত হবে। তখন এত দামী জিনিসটা একটা প্লাস্টিকের বাক্স মাত্র। তিনি আছেন বলেই আমি আছি।
মহাদেবের গাত্রবর্ন ' রজতগিরিনিভ', অর্থাত রূপালী পর্ব্বতের ন্যায় শুভ্রবর্ন। কেন? সাদা হল সমস্ত রংগের সমাহার। সমস্ত বর্ন, সকল বিভিন্নতা তার মধ্যে এসে সমন্বয় লাভ করে। সকল তত্ত্ব ও তথ্যের সার্থক সমাহার তিনি। তারই প্রতীক ঐ শ্বেতবর্ন। আচার্য্যদেবও তাই। তাঁর সন্নিধানে এসে জ্ঞানী-অজ্ঞানী, পাপী-পূন্যবান, ধনী-গরিব সব বিভেদ মুছে যায়, সকল বিভিন্নতা তাঁর পদপ্রান্তে এসে সমন্বয় লাভ করে।
তিনিই জীবন্ত শিব, তিনিই সেই পরম প্রশয়দাতা। তিনিই সকল বিচ্ছিন্নতার সমন্বয়কারী।