শ্রী শ্রীকান্ত রায়।
লেখক:– সোহন ঘোষ।
১
সে বছর আমরা ক্লাস সেভেন পেরিয়ে ক্লাস এইটে উঠেছি। বয়স তখন ঠিক সেই মোড়ে দাঁড়িয়ে—যেখানে শৈশব ধীরে ধীরে গুটিয়ে আসে, আর কৈশোর অজান্তেই কাঁধে হাত রাখে। নতুন ক্লাসরুম, নতুন বেঞ্চ, নতুন বইয়ের গন্ধের ভিড়ে প্রথম দিনই চোখে পড়েছিল এক অপরিচিত মুখ। ছেলেটির নাম শ্রীকান্ত বিশ্বাস।
শ্রীকান্তের মামা এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে এই পাতা-গজানো চারা গাছটিকে তুলে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসে নতুন মাটিতে রোপণ করেছিলেন। যাতে এই চারা গাছটি রোদ, জল, বৃষ্টি পেয়ে আকাশের দিকে মাথা তুলে বাঁচতে পারে।
শুরুতে তাকে নিয়ে আমাদের বিশেষ কৌতূহল ছিল না। যেন মাটির গভীরে লুকিয়ে থাকা একটা অমসৃণ হীরা—বাইরে থেকে দেখলে শুধু ধূসর পাথরের টুকরো, কিন্তু ভিতরে যে আলোর ঝিলিক লুকিয়ে আছে, তা জানার কোনো উপায় ছিল না।
কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই সে নিজেকে চোখে পড়িয়ে দিল। সরস্বতী পুজোর অনুষ্ঠানে, যখন হারমোনিয়ামের মৃদু সুরের সঙ্গে তার গলা ভেসে উঠল, তখনই মনে হয়েছিল—এই ছেলেটির বুকের গভীরে কোথাও একটা অদম্য নদী বয়ে চলেছে। সেই নদী শান্ত থাকলে শান্ত, কিন্তু সুযোগ পেলেই উচ্ছ্বাসে উপচে পড়ে গান হয়ে যায়। বাইরের চেহারা, চলাফেরা, কথাবার্তা—কোনোটাতেই বোঝার উপায় ছিল না যে তার অন্তরে এমন একটা সংগীতের ঝর্ণা লুকিয়ে রয়েছে।
যারা বলে চঞ্চল মানুষ কখনো সংগীতের গভীর ধ্যানে ডুব দিতে পারে না, তারা নিশ্চয়ই কখনো শ্রীকান্তকে তবলার সামনে বসে দেখেনি। যখন তার আঙুলগুলো চামড়া আর কাঠের উপর নাচতে শুরু করে, তখন যেন কাঠ কথা বলে, চামড়া সাড়া দেয়—এক অদ্ভুত জীবন্ত সংলাপ চলতে থাকে। সেই ছন্দে, সেই তালে, তার চঞ্চলতা যেন আরও গভীর, আরও স্থির হয়ে ওঠে।
হীরের সন্ধান পেলে যেমন সাধারণ কর্দমাক্ত জায়গাও বিশেষ মানুষদের চোখে মূল্যবান হয়ে ওঠে, ঠিক তেমনই খুব অল্প দিনের মধ্যেই শ্রীকান্ত কিছু কিছু স্যার-ম্যামের মনে গভীর জায়গা করে নিল। তার গানের সুর যেন একটা অদৃশ্য সেতু তৈরি করে দিত—আমাদের ক্লান্ত মন থেকে দূর করে নিয়ে যেত সেই জায়গায়, যেখানে শুধু সৌন্দর্য আর আনন্দের বাস।
তাকে একবার আমরা প্রশ্ন করাতে জানতে পেরেছিলাম যে, সে যখন ফাইভে পড়ত তখন তার মা যে বাড়িতে কাজ করত, সেই বাড়ির মালিক রবিন চ্যাটার্জির কাছ থেকে গান শিখেছিল।
শ্রীকান্তের সামনে কেউ বিপদে পড়লে সাহায্য চাইবার আগেই সে এগিয়ে যেত—এতে যে তার গুরুত্ব কিছু মানুষের চোখে কমে যেত, সেটা তাকে বলে বোঝানো দরকার ছিল না। একবার আমাদের ক্লাসের পিন্টু বর্মনের হাওয়াই চটির ফিতে খুলে গেলে, শ্রীকান্তই কোথা থেকে একটা শক্ত কঞ্চি জোগাড় করে ফিতেটা বেঁধে দেয়। মজার প্রকৃতির এই ছেলেটি গল্প আর অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গিতে আমাদের হাসাত। গোমড়ামুখো এই শহরে মন খারাপের দিনে, সমাজের চোখে তুচ্ছ সেই ছেলেটির সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললেই বুকের ভেতরের ভার হালকা হয়ে যেত।
আমাদের ক্লাসে কিছু পালোয়ান স্বভাবের ছেলে ছিল। বাহাদুরি দেখানোই ছিল তাদের প্রধান পরিচয়। কখনো সিনিয়র দাদাদের চোখের সামনে, কখনো ছোটদের ভিড়ে, আবার কখনো মেয়েদের সামনে—তারা শ্রীকান্তকে ঘুসি, চড়, ধাক্কা মেরে নিজেদের শক্তি জাহির করত। যেন শ্রীকান্তই তাদের প্রদর্শনীর স্থায়ী মঞ্চ।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, শ্রীকান্ত কোনোদিন পাল্টা হাত তুলত না, কোনো প্রতিবাদ করত না। মুখে কোনো রাগের রেখা নেই, চোখে কোনো অভিযোগ নেই—শুধু একরকম নিশ্চুপ সহ্য।
ধীরে ধীরে অনেকে তাকে বিদ্রূপ করে ‘শ্রী ক্যাবলাকান্ত বিশ্বাস’ বলে ডাকতে শুরু করল। আমরা বন্ধুরা বারবার জিজ্ঞেস করতাম,
“তুই মারছিস না কেন? এভাবে চুপ করে সহ্য করিস কেন?”
শ্রীকান্ত একই শান্ত গলায় বলত,
“আমার মা বলতেন, মারপিট করা মোটেও ভালো জিনিস না। এতে দু-পক্ষেরই ক্ষতি হয়। মারপিট করার সময় মানুষ পশুর চেয়েও হিংস্র হয়ে ওঠে।”
আমার মা বলতেন, ‘আমি তোমাকে কাউকে ছোবল মারতে বলছি না। কিন্তু একটু ফোঁস করো।’
এই কথাটাও তাকে আমি বলেছিলাম। তার উত্তরে সে বলেছিল,
“যদি আমাকে মেরে কেউ আনন্দ পায়, তাহলে পেতে দে না। আমরা তো সবাই বন্ধু। তাছাড়া গ্রাম থেকে শহরে এসেছি—মা আমাকে কড়া করে বলে দিয়েছেন, কারো সঙ্গে ঝগড়া, অশান্তি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা করবি না। আমি মায়ের কথা ভাঙতে পারি না।”
একদিন সকালে স্কুলে ঢুকে দেখি, ব্ল্যাকবোর্ডে বড় বড় অক্ষরে শ্রীকান্তর নাম লিখে ব্যঙ্গাত্মক ছড়া:
শ্রী ক্যাবলাকান্ত বিশ্বাস,
বুদ্ধিতে আস্ত একটা হাঁস।
মার খায় ধুসধাস,
করে নাকো ফুঁস-ফাঁস।
গোবর ভরা মাথা,
শ্রীকান্ত একটা বোকা।
এই ছড়া দেখে শ্রীকান্তকে অনেকেই বিদ্রূপ করেছিল।
কিছু মাস পর আমাদের প্রথম পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন হলো। পরীক্ষার খাতা বেরোলে আমরা একটু অবাক হয়েছিলাম। আমাদের ক্লাসে প্রথাগত প্রথম স্থানাধিকারী ঝিলিক রায় এই প্রথম কারো থেকে কম নম্বর পেয়েছে। সেদিন থেকে তার অবস্থা অনেকটা শার্সিতে আটকে পড়া মৌমাছির মতো লাগছিল। সামনে পরিষ্কার আকাশ দেখেও উড়ে যেতে পারছে না। তার যে কী হয়েছিল তা জিজ্ঞেস করার সাধ্যি আমাদের ক্লাসের কারো ছিল না।
পরবর্তীকালে আমরা অভিজিৎ স্যারের কাছ থেকে জানতে পারি, ঝিলিককে নাকি তার বাবা-মা বেশ বকাঝকা করেছেন। পড়াশোনার ব্যাপারে তার বাবা অত্যন্ত কড়া। তিনি একজন ডাক্তার, আর মেয়েকেও ভবিষ্যতে সেই পেশাতেই দেখতে চান।
এক বছর পর ক্লাস এইট থেকে নাইনে ওঠার সময়ে শ্রীকান্ত প্রথম স্থান অধিকার করার জন্য যে পেনটা প্রতিবছর আমাদের ক্লাসের ঝিলিক রায় পেত, সেটা এবছর সে পেয়েছে। এটার জন্য যখন ঝিলিক রায় স্কুলের মধ্যে কাঁদতে থাকে, তখন শ্রীকান্ত ব্যাপারটা বুঝতে পেরে এগিয়ে গিয়ে পুরস্কৃত পেনটা ঝিলিককে দিতে গেলে, সে সেটা হাতে নিয়ে ছুঁড়ে স্কুলের ড্রেনে ফেলে দিয়ে তাকে ধাক্কা দিয়ে রাগে গজগজ করতে করতে স্কুল থেকে বেরিয়ে যায়। আর শ্রীকান্ত পেনটাকে তুলে ভালো করে ধুয়ে নিজের জামা দিয়ে মুছে জামার বুক পকেটে গুঁজে বাড়ি ফিরে যায়।
সে ফার্স্ট হয়েছিল শুনে তার দাদু তাকে একটা অ্যান্ড্রয়েড ফোন কিনে দিয়েছিল, যাতে সে আরও ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারে।
নবম শ্রেণিতে ওঠার বেশ কিছু মাস পর একদিন ক্লাসে আমরা সবাই বসে গল্প করছি। এমন সময় ঝিলিক রায় শ্রীকান্তর সঙ্গে আলাদা করে কথা বলতে চায়। এটা শোনার পর তো আমরা হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। যে মেয়েটা স্কুলের কারোর সাথেই কথা বলে না সে কেন শ্রীকান্তকে ডেকে পাঠালো, সেই বিষয়ে আমরা কৌতূহল ছিলাম।
সে ফিরে আস মাত্রই আমরা জিজ্ঞেস করলাম,
“হ্যাঁরে শ্রীকান্ত! তোকে ঝিলিক কী বলল রে?”
“তেমন কিছু না, পেনটা ছুঁড়ে ফেলার জন্য আমার কাছ থেকে ক্ষমা চাইল।”
তাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে রাজ রসিকতা করে বলল,
“এ যে দেখছি ভূতের মুখে রাম রাম! কালে কালে কত কিছু হল, কুকুরেরও ডানা গজাল।”
সেদিন হাসি ছাড়া আর কিছু কথা হল না।
সেদিন থেকে শ্রীকান্ত আর ঝিলিক ভালো বন্ধু হয়ে উঠল। তাদের মধ্যে পড়াশোনা নিয়ে আলোচনা হত। আবার শ্রীকান্ত একটু মজার প্রকৃতির হওয়ায় তাকে রাগাত, তখন ঝিলিক তাকে ঘুসি মারত, মাঝে মাঝে ঠেলে দিত। এমনকি ঝিলিক শ্রীকান্তের কাছ থেকে তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর এবং ফোন নম্বর নিয়েছিল। একমাত্র শ্রীকান্তর কাছ ছাড়া আমাদের ক্লাসের কোনো বন্ধু বা বান্ধবীর কাছে ঝিলিকের নম্বর ছিল না।
২
সেদিন আমরা সৌরভ স্যারের কাছে ভৌতবিজ্ঞান পড়তে গেছি। সৌরভ স্যার প্রতিদিনের মতো এক ঘণ্টা পড়িয়ে আমাদের ছেলেগুলোকে একটু দাঁড়াতে বলে সবাইকে ছুটি দিয়ে দিলেন।
“আচ্ছা, তোরা কাল একবার এখানে আসতে পারবি? তাহলে একটা আলোচনা করতাম। আসলে আমি ভাবছি এবছর থেকে এখানে সরস্বতী আনব। তা তোদের একটু দায়িত্ব নিতে হবে। কারণ, তোরা তো জানিস আমি ক্লাস ফাইভ থেকে ক্লাস টেন পর্যন্ত ছাত্রদের পড়াই। ক্লাস টেনের ছাত্রদের সামনে মাধ্যমিক পরীক্ষা, তাই ওদের আর এদিকে ব্যস্ত করলাম না। এখন তোরাই আছিস।”
আমরা সবাই মিলে রাজি হলাম। এবং স্যারের অনুমতি নিয়ে আমরা স্যারের বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। এমন সময় শ্রীকান্তের ফোনটা বেজে উঠল।
“ঝিলিক এখন ফোন করছে কেন আমাকে?”
“প্রেমিকা প্রেমিককে ফোন করবে, এটাই তো স্বাভাবিক,” রাজ বলল।
“আরে, ওই সব কিছু নয় রে। আমরা শুধু বন্ধু হয়েছি। তুই এইসব উল্টোপাল্টা ভাবিস কেন?”
“ওই হহে… বন্ধু পড়েছ প্রেমে,
ঝিলিক রায়ের ফ্রেমে।”
“তাহলে ফোনটা জোরে দে দেখি, আমরাও শুনি। আর হ্যাঁ, ওকে কিন্তু কিছু বুঝতে দিলে হবে না যে তুমি ফোনটা জোরে দিয়েছ।”
“ঠিক আছে, শোন তাহলে।”
তারপর শ্রীকান্ত ফোনটার লাউডস্পিকার অন করে।
“হ্যালো।”
“তুই কোথায়?”
“এই তো, স্যারের বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি।”
“তা তুই এতক্ষণ কী করছিলি স্যারের কাছে?”
“স্যার আমাদের সঙ্গে একটু আলোচনা করছিলেন।”
“কীসের আলোচনা?”
“আসলে তেমন কিছু না। এবছর সৌরভ স্যার তার বাড়িতে সরস্বতী পুজো করবেন, সেটা নিয়েই একটু আলোচনা করছিলেন।”
“তাহলে তাড়াতাড়ি আয়, আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি।”
“কেন?”
“এই একটু গল্প করতে করতে যেতাম। একা একা যেতে ভালো লাগে না। তুই এলে একটু মজা করতে করতে যেতাম।”
একটু থেমে নরম সুরে,
“তুই থাকলে কাউকে একজনকে রাগাতে পারতাম।”
এই বলে সে হাসতে শুরু করে।
“ঠিক আছে, যাচ্ছি। দাঁড়া।”
ফোনটা রাখা মাত্রই রাজ শ্রীকান্তকে ধাক্কা দিয়ে বলল, “বন্ধু, বিশাল ব্যাপার তো।”
তারপর শ্রীকান্ত কী যেন একটা বলতে যাবে, তাকে বলতে না দিয়ে রাজ সামনে গিয়ে বাচ্চা ছেলেদের মতো তিরিং বিরিং করে লাফিয়ে নাচতে নাচতে গান ধরল:
তারাপীঠে গিয়ে,
টোপর মাথায় দিয়ে,
শ্রীকান্ত করবে বিয়ে।
ঝিলিককে সঙ্গে নিয়ে।
ঝিলিককে করবে বিয়ে,
সিঁথিতে সিঁদুর দিয়ে।
উপহার দেব গিয়ে,
খাব কব্জি ডুবিয়ে।
আমরা সবাই গিয়ে,
শ্রীকান্তের দেখব বিয়ে।
“আরে, ওই সব কিছু নয়। এইসব উল্টোপাল্টা ভাবিস না।”
তারপর অরিজিৎ একবার শ্রীকান্তকে পাশ থেকে ধাক্কা মেরে ছড়া বলতে থাকে:
বন্ধুর মনে লেগেছে রং,
ভালো লাগে কি তোর ঢং!
পড়েছে প্রেমে আমাদের শ্রীকান্ত,
তোরা দু-একটা গোলাপ আনতো।
ঝিলিক রায়ের ছবি!
অবশ্যই তোরা আনবি।
পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে শ্রীকান্ত চলে যায়।
**৩**
সরস্বতী পুজোর তিন দিন আগে হেডস্যারের কাছে গিয়ে ঝিলিক কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“স্যার, শ্রীকান্ত সব সময় আমার গায়ে পড়ে, আমাকে অযথা স্পর্শ করে। আমি এতদিন চুপ করে ছিলাম, কারণ আমার বাবা যদি কোনোমতে জানতে পারতেন তাহলে আমাকে পড়াশোনা ছাড়িয়ে দিয়ে আমার বিয়ে দিয়ে দিতেন। কিন্তু আগের দিন চৌমাথার কাছে আমার হাত ধরে টেনেছিল। সেই দৃশ্য আমার দাদা দেখে। আপনি দেখবেন এই খবরগুলো যেন আমার বাবার কানে না পৌঁছায়। তাহলে আমার বাবা কিছু না বুঝে না শুনে আমার বিয়ে দিয়ে দেবেন। আপনি শুধু ওকে মানা করে দেবেন।”
তারপর ঝিলিক আর কিছু না বলতে পেরে কেঁদে ফেলে। স্যারের মনটাও খারাপ হয়ে যায়। আমাদের স্যার মেয়েদের সাথে অসভ্যতামি করা পছন্দ করে না। হেডস্যারের মুখে ঝিলিকের করার নালিশ শুনে শ্রীকান্ত যেন সেদিন বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। সেদিনকে স্যার শ্রীকান্তকে প্রহার করেছিল। শ্রীকান্ত কোনো অভিযোগ, কোনো কথা না বলে চুপচাপ মার খেতে লাগল।
এই খবরটা তার মামার কাছে পৌঁছাতেই তার মামা তাকে মেরেছিল। তার মামার বাড়ির দাদুর আদেশে এই কথাটি শ্রীকান্তের মায়ের কানে পৌঁছাল না। সেদিন থেকে তার মামি, মামার মেয়েরা ও মামার ছেলেরা তার থেকে দূরে থাকতে শুরু করে। এটা সে বুঝতে পারে। যখনই সে তাদের সঙ্গে মিশতে যায়, তাকে পূর্বের এই ঘটনা তুলে অপমান করে দূরে সরে যায়। তার মামার এক ছেলে তাকে চরিত্রহীন বলেও অপমান করে।
সরস্বতী পুজোর দিন বিকেল থেকে শ্রীকান্তকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। শ্রীকান্তের দাদু থানায় জানালে পুলিশরা শ্রীকান্তকে খুঁজতে শুরু করে। তার ঠিক একদিন পর ঝমঝম বৃষ্টির এক রাতে পুলিশের গাড়ি থেকে কয়েকজন পুলিশ কাদামাখা শ্রীকান্তকে মামার বাড়িতে পৌঁছে দেয়। শ্রীকান্ত কেঁদে উঠে বলল,
“আমি বাড়ি চলে যাচ্ছিলাম। তোমরা আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে এলে কেন?”
মাঘ মাসে এই শহরে প্রচণ্ড ঠান্ডা পড়ে। তারপর আবার হঠাৎ বৃষ্টিতে শীত আরও জাঁকিয়ে পড়েছে। খাটে শুয়ে জ্বরের ঘোরে সে ভুল বকতে থাকে। ডাক্তার ডাকা হয়, ডাক্তার এসে ওষুধ দেয়। দিন দিন পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাওয়ায় তার মামারা তার মাকে খবর দেয়।
শ্রীকান্তের দাদু রোগশয্যার পাশে বসে শ্রীকান্তের মায়ের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।
শ্রীকান্ত এই রোগশয্যায় শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে,
“আমি কিছু করিনি-নি-নি…”
এমন সময় শ্রীকান্তের মা ঝড়ের মতো ঘরে প্রবেশ করে, উচ্চকণ্ঠে শোক করতে লাগলেন। শ্রীকান্তের বড়ো মামা অতিকষ্টে তার শোকোচ্ছ্বাস নিবৃত্ত করেন। শ্রীকান্তের মা ছুটে গিয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে উচ্চস্বরে বললেন,
“কী হয়েছে বাবা? মানিক আমার!”
শ্রীকান্ত বলল,
“মা, আমি কিছু করিনি। আমি চরিত্রহীন নই…”
শ্রীকান্ত কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর,
“মা, আসছি…”