ঝরাপাতা
পর্ব - ৮১
🌹💞🌹💞🌹💞🌹
মুখে না বললেও বনিই ভাইকে ডাকাডাকি করে নামিয়ে আনল। রনি একমাত্র বাঁচার রাস্তা হিসেবে, যথাসম্ভব গম্ভীর মুখে খাওয়ার টেবিলে এসে বসতেই অবশ্য বনি হো হো করে হেসে ফেলল। রনি আর পিউ, দুজন দুই কারণে কটমট করে তাকাল। বনি জানে, আরও রাগলে শেষে ভাই না খেয়েই উঠে যাবে। তাড়াতাড়ি হাসি চেপে খুক খুক চালিয়ে গেল।
ঠকাস করে প্লেটটা ওর সামনে বসিয়ে পিউ গিয়ে দাঁড়াল ভাইয়ের পাশেই। প্লেটে মোমো, স্যুপের বাটি, জলের গ্লাস সব পাশাপাশি সাজিয়ে দিয়ে ভাইয়ের পিঠে হাত রাখল, "ওর দিকে তাকাতে হবে না। তুমি খাও তো। আমি মামনির সঙ্গে কথা বলছি, সব ঠিক হয়ে যাবে।" অসীম কৃতজ্ঞতা নিয়ে রনি একবার বৌদির দিকে তাকাল।
পিউ সরে যেতে নিচুগলায় বনি বলল, "গুরু, তুমিও জিনিস কম না, বোধহয় একধাপ বেশি। তবে খেয়াল রাখিস, মেয়েটা খুবই বাচ্চা। সবদিক সামলাতে পারবে না।"
রনি দাঁতে দাঁত চেপে চুপ করে আছে। ধুত, কি ভুল করেছে ! যদি মিলিকে একবার রাতে দেখা করতে বলত ! আসলে ওর চোখের জলে সব গোলমাল হয়ে গেল যে ! মিলিটাকে এত না কাঁদালেই হত ! সেদিন কাকুর সঙ্গে তর্ক না করে, পরে দাদাবৌদিকে ধরলে....... কী করলে কী হত, সুতো ধরে পিছিয়ে যেতে যেতে রনি সেই ফুলশয্যার রাতে পৌঁছে যায়।
বনি মন দিয়ে ভাইকে লক্ষ্য করছিল। এবার সিরিয়াস গলায় বলে, "ঘাবড়ে যাচ্ছিস কেন? আমরা একটুও ঠুকব না তোকে? এই তো শুরু। অভ্যেস কর। তোর পেয়ারের বৌদিই বেশি বেশি করবে জানিস। তবে তুই যদি পুরো গল্পটা বলে দিস, আমি সমরকাকুর সঙ্গে কথা বলব।" রনি আর তাকায়ও না। বনি খুক খুক করে হাসতে গিয়ে বিষম খায়।
তখনই পিউ আদর করে মিলিকে নিয়ে আসছিল। পিউর গলা শুনে একবার রনি তাকায়।
দিব্যি গোলাপি গালে লজ্জার লাল আভা মেখে মিলি বৌদির হাত ধরে আসছে। মুখটা যেন একটু হাসি হাসিও। চিড়বিড় করে জ্বলে ওঠে রনি, কতটা মিলির উপর রাগে আর কতটা বনির উপর, তার ঠিক নেই, "বাহ, ভালো ভালো। আমার বেলায় দাদা পাগল বানিয়ে দিচ্ছে, আর ও বৌদির আদরে আছে। কপালটাই খারাপ আমার। এখন যদি দাদার কাছে এটাকে ভিড়িয়ে আমি বৌদির পাশে বসে থাকি, তাও দাদা ওকে কিছুই বলবে না। আদর যত্নের বন্যা করে দেবে। কী, না ছোট মেয়ে ! হুঁহ, বিয়ের পর আটমাস পার হয়ে গেল, এখনও উনি ছোট !" ভাবতেই নিজেরই মনখারাপ হয়ে গেল। এতদিন হয়ে গেল, তাও বিয়েটা বিয়ে হয়ে উঠতে পারল না ওর জন্য।
তীব্র আত্মগ্লানিতে উঠে পড়ে রনি, "আমার খাওয়া হয়ে গেছে। চা পরে খাব।"
- "চা খাবি না খাবি তোর ব্যাপার। নেক্সট বার হাম খাবার সময় আরেকটু সাবধানে।" রনি তাকিয়ে দেখে, বনি দিব্যি একমুখ মোমো নিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে চিবোচ্ছে, এসব কথা সে বলেইনি। অবশ্য আর কেউ শোনেওনি, এত আস্তে বলেছে।
- "তু তু তুই.....তোর কোনো ইয়ে নেই। কি বলছিস জানিস? মিলি তোর চেয়ে কত ছোট জানিস?" রনি বুঝে গেছে অফেন্স ইজ দ্য বেস্ট ডিফেন্স।
- "কেন জানব না? ঐটুকু ভাইবোনের বয়সের অঙ্ক, পিতা পুত্রের বয়সের অঙ্ক আমি জানি। এবার মিলির রেজাল্টটা খালি দেখব আমি। তুই নিয়ে যেতি না পরীক্ষার সময়? হ্যাঁ রে মিলি, সব পরীক্ষা দিয়েছিলি?" মিলি লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফেলে, আর কোনো রাস্তা খুঁজে পায় না। রনি আর দাঁড়ানোর রিস্ক নেয় না। অলরেডি বৌদি প্রায় শুয়ে পড়েছে হাসতে হাসতে।
বনি লাফিয়ে গিয়ে ভাইয়ের ঘাড় চেপে ধরে, "পালাচ্ছিস কোথায়? তোকে আমি বিশ্বাস করি না। মুখে বল, আমরা তিনজন দাঁড়িয়ে আছি, সবার সামনে বল, এবার যদি সব মিটিয়ে দিই, আর বেগড়বাই করবি না তো?"
- "আমি বেগড়বাই করেছি?" অভিমানে মুখ ফোলায় রনি।
- "সেটা ঠিক বলা যায় না। কিন্তু কিছু ঝামেলা পাকিয়েছিলি। তাই তোকে এখনও অনেক পরীক্ষা দিতে হচ্ছে, হবে। সেগুলো দিবি তো? কি রে? আমাদের জন্য না, এই মেয়েটার জন্য?" বনি পিউর হাত থেকে মিলিকে টেনে এনেছে নিজের কাছে, ওর কাঁধে হাত রেখে বলে, "ভালো করে দ্যাখ, মেয়েটা শুধু সবার জন্য করে যাচ্ছে। ওকে বাড়িতে আনার অনুষ্ঠান ভেস্তে গেল, কিন্তু আমাদের মা অসুস্থ বলে ও সব মানসম্মান সরিয়ে রেখে এ বাড়িতে পড়ে আছে। ওর জন্য এবার নাহয় অন্যায় না করেও একটু নিচু হলি?"
- "একটু কেন, পুরোপুরি নিচু হয়ে ক্ষমা চাইতে রাজি আছি। কেন, আমি কি ওকে আনতেই যাইনি সেদিন? ও পুরোপুরি বিশ্বাস করে আমাকে? জিজ্ঞেস করে দ্যাখ ওকে। আর তোরা কি জিজ্ঞেস করবি, তোরাও বিশ্বাস করিস না।" রনির সত্যিই একটুকরো অভিমান ছিল, এবারও মিলি ওকে বিশ্বাস না করায়, সবাই সন্দেহ করায়। কথাগুলো বলার সুযোগ পেয়ে তাই বলেই ফেলে। বলে অবশ্য আর দাঁড়ায় না।
বনি মিলির কাঁধে হাত রেখে হাসে, "পাগল একটা ! তুই ভাবিস না। মনখারাটা ওর ছিল, আমি তো চিনি ওকে। এই যে বলে ফেলল, আর ওর মনে কিছু থাকবে না। ওর মতো ছেলেমানুষ আর একটা হয় না রে। আর বাকি ভাবনা তোদের দুজনকে ভাবতে হবে না, আমি আছি তো। আমি কাল সব ঠিক করে দেব। যাহ পালা। পিউ, কিছু খাইয়ে দাও মেয়েটাকে।"
পিউ আবার মিলিকে জড়িয়ে ধরে বলে, "খাওয়াতেই নিয়ে যাচ্ছিলাম। তুমি একদম ক্লাস নিয়ে নিলে দুটোর। চল তো খেয়ে নিই আমরা। মামনিকে একটু স্যুপ দিই, তুই আর আমিও খেয়ে নিই।"
চলবে