মার্কস বাই সিন–১১
ছোটো দেবাংশ বেলুন ও রিবিন দিয়ে সাজানো ছাদের একধারে দাঁড়িয়ে মায়ের সাথে ফটো তুলছিল। আহান ছাদে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় দৌড়ে আসে সে। চিৎকার করে দুই হাত বাড়িয়ে দেয় আহানে উদ্দেশ্য, “কাকু…!”
আহনও আর দেরি না করে ওর প্রাণ প্রিয় ভাগ্নেকে ঝটপট কোলে তুলে নেয়। একগাল হেসে ওর গালে একটা আদুরে চুমু খায়।
“হ্যাপি বার্থডে, চ্যাম্প!”
দেবাংশ— ঘন্টু আহানের গলা জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বলে “থ্যাঙ্কু আমার হিরো।"
"হিরো....!" আহানের চোখে প্রশ্ন।
"হুম হিরোতো। আজ তোমাকে একেবারে হিরোর মতো লাগছিলে টিভিতে! জানো, স্কুলে আমার এক বন্ধুর মা বলছিলেন, তোমায় নাকি দেখতে খুব হ্যান্ডসাম লাগছিলো। আমি বললাম—কাকুটা কার, সেটা আগে দেখতে হবে!’ জানো আমার স্কুলের সবাই তোমার ফ্যান হয়ে গেছে।”
"তাই বুঝি....। তবে আমি করলামটা কি?" আহান ঘন্টুর কপালের ওপর নেমে আসা চুলগুলো ঠিক করতে করতে বলে।
ঘন্টু গলা টেনে আদুরে ভঙ্গিতে বলে “তুমি জানো না কাকু, তোমার জন্য কত সব দুষ্টু লোকেরা ধরা পড়ে! সবসময় তো নিউজে দেখাচ্ছে—তোমার জন্যই দুষ্টু লোকেরা শাস্তি পাচ্ছে। আচ্ছা, বলো তো—হিরো ছাড়া আর কে দুষ্টু লোকদের শাস্তি দেয়? তাই তো তুমি আমার হিরো! শুধু হিরো না তুমি আমার সুপারহিরো।”
ওর কথা শুনে আহনসহ বাকিরা সবাই হেসে ওঠে। দেবাংশের কথা যেন ছোট্ট স্পটলাইট—আহান সবার প্রিয়, কিন্তু ঘন্টুর চোখে সে সুপারহিরো।
মায়া ওদের পাশে এসে দাঁড়িয়ে দেবাংশের পিঠে আলতো হাত রেখে হেসে বলে, “এতোক্ষণ ধরে আমাকে বলছিল—‘কাকার সাথে আমি কথা বলব না! আমার জন্মদিনে কাকা এতো দেরি করে এসেছে।' এক্ষুণি কত রাগ দেখাচ্ছিল! আর এখন কাকাকে দেখেই সব রাগ গলে জল হয়ে গেল, হুঁম…!”
আহান চোখ সরু সরু করে ঘন্টুর দিকে তাকিয়ে বলে "তাই বুঝি।"
ঘন্টু একগাল হেসে ভারিক্কি গলায় বলে ওঠে “আজ ক্ষমা করলাম তোমায়, তবে এর পর দেরি করলে কথা বলব না।”
আহান চটপট করে বলে ওঠে “আরে না না ঘন্টুবাবু। আজ আমার ভুল হয়ে গেছে। আর হবে না! আপনি দয়া করে আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করবেন না।”
দেবাংশ চোখ সরু সরু করে বলে "আগে আমার গিফ্টকা দেখি, তারপর বলছি কি করবো।"
"নিশ্চয়।"
আহান পকেট থেকে একটা সেলিব্রেশনস প্যাকেট বের করে দেবাংশের হাতে দেয়।
“তোমার গিফ্ট এই যে। আরো দুটো, কাল সকালে পাবে।”
“আরো দুটো.........। কি গিফ্ট বল না কাকু?”
“বলব না। সারপ্রাইজ।” আহান মাথা নেড়ে বলে।
"প্লিজ....... প্লিজ বলোনা কাকু..." ঘন্টু ঘ্যানঘ্যান করে ওঠে।
মায়া এগিয়ে আসে। "আহ্, ঘন্টু কাকাতো বললো, কাল সকালে পাবে। তাহলে এইরকম করছো কেন?" মায়ার কন্ঠশ্বর কানে যেতেই চুপ করে যায় দেবাংশ।
তারপর আশীষ আর মায়া ছাদ থেকে নেমে যায় কেক আর খাবার আনতে যাওয়ার জন্য। ওদের পিছন পিছন দেবাংশও লাফাতে লাফাতে মা-বাবার সাথে নিচে নেমে যায়।
আহান সেই দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে হাসে তারপর ছাদের এক ধারে এসে পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিনের ওপর চোখ বোলায়। হঠাৎ ওর মুখভঙ্গি কঠিন হয়ে ওঠে। সে অপেক্ষা করতে থাকে একটা জরুরী কলের জন্য।
“আহানদা…।” হঠাৎ পেছন থেকে এক চেনা কণ্ঠস্বর ভেসে আসতে হালকা চমকে উঠে ঘুরে দাঁড়ায় আহান।
"ঋষিল, তুই কখন এলি?” আহান এগিয়ে যায়।
ঋষিল, কলেজ টপার। বয়স তেইশ। সদ্য কলেজ শেষ করেছে, কিন্তু এখনো কোথাও চাকরি পায়নি। তার কারণ—ওর স্কিলস গড়পড়তা কোনো কাজের চেয়ে অনেক বেশি ড্যাঞ্জারাস। ওর আঙুল ছোঁয়ালেই শহরের ট্রাফিক সিগনাল থেমে যেতে পারে, সিসিটিভির লাইভ ফিড ঘুরে যেতে পারে অন্য রেকর্ডিংয়ে, কিংবা সরকারি ডেটাবেসের তালা খুলে যেতে পারে এক ক্লিকেই।
তবে ঋষিল নিজেকে হ্যাকার বলতে চায় না। ওর মতে, “আমি হ্যাক করি না, আমি ভুল শুধরাই।” ছোট থেকেই আঁকতে ভালোবাসে, শিল্পচর্চা করতেই চায়। কিন্তু সময়ের চাহিদা, বাস্তবের ছায়া, আর আহান সেনগুপ্তের মতো একজন মানুষের অনুরোধ—এই তিনে মিলে ওকে ডার্ক ওয়েবে নামতে হয়েছে বারবার। ও যেকোনো মুহূর্তে গোটা সিস্টেম থামিয়ে দিতে পারে, কিন্তু থামাতে চায় না। ওর কাজের একটা ধরন আছে। ও দরকার ছাড়া কিছুই করে না।
ঋষিল আহানের পিসির ছেলে, ছোটো থেকেই এরা তিনজন একসঙ্গে বড়ো হয়েছে। আহান যখন প্রথম জানতে পারে ঋষিলের হ্যাকিং -এ ইন্টারেস্ট আছে, ওই ওকে উৎসাহ দেয় এই নিয়ে আরোও শিখতে, তখন ঋষিলেও বেশ ইন্টারেস্ট লাগে আর ব্যাস ফল এখন হাতে। ঋষিল হল আহানের সবথেকে প্রিয় ভাই এবং একজন প্রাইভেট হ্যাকার।
আহানের প্রশ্নে ঋষিল হেসে বলে “এইতো বিকেলে এলাম। ঘন্টুর বার্থডে ছিল, ভাবলাম চলে আসি, তোর সাথে দেখাও হয়ে যাবে।"
"হুম, ভালো করেছিস।"
“কনগ্র্যাচুলেশন আহানদা। তুই এখন পুরো মিডিয়ার পোস্টার বয়।”
আহান মুখ ঘুরিয়ে নেয় “ছাড়তো, বেশি পাত্তা দিবি না এইসব। প্রয়োজনে মিডিয়া হিরো বানায়, আবার ছুঁড়ে ফেলে দেয়।"
ঋষিল মাথা নাড়ায়। তারপর বলে “তুই যে কেসটা নিয়ে কাজ করছিস, সেই কেসে তোর, আমাকে লাগতে পারে আহানদা।”
"জানি, এই জন্যই তোর সাথে কিছু কথা ছিল। ভালো হয়েছে আজ এসেছিস।"
চলবে...........................................