Poran Bondhua - 2 in Bengali Thriller by Srabanti Ghosh books and stories PDF | পরাণ বঁধুয়া - 2

Featured Books
Categories
Share

পরাণ বঁধুয়া - 2

পর্ব - ২


শর্মিষ্ঠা মাঝদুপুরে হুড়মুড়িয়ে এসে বড়বৌদির ঘরে ঢোকে। জানে খেয়ে উঠে এসময় তিন জা গল্পগুজব, উপন্যাস, ম্যাগাজিন নিয়ে গড়াগড়ি দেয়। কিন্তু শর্মির তো দুপুরে কাজের চাপে খাওয়ার সময় হয় না এক একদিন। 

নিচে ওর বড়দা স্বপনবাবু দরজা খুলে দিয়েছেন। তিনিও অবাক, "তুই, এখন? মুখচোখ এরকম কেন? কি হয়েছে?"

--"অনেক কথা আছে বড়দা। ঠিক যে আমার কিছু হয়েছে তা নয়। তবে আমার মনটাও ভাল নেই। তাই তোমাদের কাছে এলাম। উপরে চলো। সবাইকে একসঙ্গে বলব।"

এখন বাড়িতে তিন ভাইয়ের খুবই সদ্ভাব। তবে একদিন অশান্তি হয়েছিল, আর সেটা শর্মির জন্যই। শর্মি তার বান্ধবীর দাদা অরুণেশকে বিয়ে করার জেদ ধরেছিল। নব্বইয়ের দশকে কলকাতার একদম নাকের ডগায় স্কুল শিক্ষিকা মেয়েকে ঘরবন্দী করে রাখা যায়না বটে, তবে তার বাবা, মা আর এই বড়দা স্বপনবাবু তীব্র আপত্তি জানাল। 

দুদিন যেতেই বোঝা গেল, বাকি দুই দাদা, তপন আর মোহনের বেশ পছন্দ অরুণেশ বা বাবলুকে। হবারই কথা, পাড়ার ছেলে, স্বভাব চরিত্র ভাল, ছোট পরিবারটিও ভাল। ছেলে ডাক্তার। তার উপর দেখতেও বেশ। শর্মির রঙটা বরং বাবলুর চেয়ে একপোঁচ ময়লা। মেঘের মতো একঢাল চুল, টানা টানা হরিণ চোখের শর্মি আর বাবলু যেন কুমোরটুলিতে অর্ডার দিয়ে বানানো জুটি।

শর্মি আর বাবলু সই করে বিয়ে করল, দিল্লী চলে গেল। সেখান থেকে শর্মির সুখের সংসারের খবর আসতে থাকল। বাবার মন নরম হয়েছিল কিনা জানা যায়নি। তার আগেই হঠাৎ ঘুমের মধ্যে চলে গেলেন। সেসময় বাবলু এসেছিল শর্মিকে নিয়ে। মা আর বড়দা গলে গেল। বড়বৌদি তো তলে তলে ননদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতই। সেই থেকে আজ পর্যন্ত ভাই, ভাইবৌ, ভাইঝিরা সব মাথায় করে রেখেছে স্বপনবাবুকে। তিনিও কোথাও যেন পরিবারের বাবার জায়গাটাই পালন করে আসছেন। 

বৌদিরাও ওকে দেখে হাঁ। শর্মি এখন একটা কিন্ডারগার্ডেন স্কুল চালায়। এসময় ওর দম ফেলার ফুরসত নেই। মুখ মুছে খাটের ধারে বসে বলে, "এতো লেখাপড়া শিখলাম। এতো প্রোগ্রেসিভ হতে চাইলাম। আজ বুড়ো হতে বসে মনে হয় ভাগ্যই কি সব? আমার বাবলিটা বোধহয় বাঁচবে না।" বাবলি, অরুনিমা ওর ননদ, ওর প্রাণের বন্ধু। সবাই অবাক। এ ওর মুখের দিকে চেয়ে আছে। 

বছর দশেক আগে শর্মিরা মুম্বাই থেকে ফিরেছে। ফিরেছিল ভাঙা মন নিয়েই। বাবলুর একমাত্র বোন, গাইনোকোলজিস্ট বাবলির বিয়ে দিয়েছিল বাবলু। নিজের সহকর্মী দেবদত্তের সঙ্গে। একই হাউজিং এ ওদের সুখের সংসার। বাবলু আর শর্মির, নিজেদের নিঃসন্তান জীবনে দেবদত্ত আর বাবলির মেয়ে রুমঝুমকে নিয়ে স্বপ্নের মতো কাটছিল। 

সাজানো স্বপ্ন একদিনে ভেঙে গেল। নিউরোলজিস্ট দেবদত্ত, চল্লিশ পার করে ফেঁসে গেল এক সুন্দরী পেশেন্টের চালে। সেই বিধবা মহিলা কিছু ছবি, প্রমাণ দাখিল করে দেবদত্তকে বাধ্য করল তাকে বিয়ে করতে। বাবলি খাতায় কলমে বিচ্ছেদের আগেই অন্য জায়গায় এ্যাপ্লাই করা শুরু করেছিল। সংসারের পাঠ চুকতেই চলে গেল মুম্বাই, নতুন চাকরিতে। দাদাকে আগেই শর্ত করিয়েছে, এবার ওকে ভাগ্যের হাতে একলা ছাড়তে হবে। 

দিল্লী বাবলুরাও আর সহ্য করতে পারল না। চাকরি ছেড়ে দুজনেই চলে এল পুরনো পাড়ায়। বাড়ি সারাই করে, পড়ে থাকা জমিতে ঘর বানিয়ে শর্মি করল কিন্ডারগার্ডেন, বাবলু ঢুকল প্রাইভেট হাসপাতালে। এ বাড়ির ছেলে মেয়েদের নিয়ে দিন কাটতে থাকল। সময়ে দুঃখ ধুয়ে গেল। তবে বাবলি আর কোনোদিন কলকাতায় আসেনি। শর্মিরা বছর বছর মুম্বাই যায়। ওখান থেকে চারজনে এদিক ওদিক ঘুরে ফিরে আসে। এ বাড়ির সবাই বেড়ানোর ছবি দেখে। 

তুলির বিয়েতে বাবলিকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে। আসবে না ধরা ছিল। পুপুলের বিয়েতে আসেনি যখন। হঠাৎ সবাইকে অবাক করে একসপ্তাহ আগে বাবলি জানিয়েছে, আসছে। গতকাল এসে পৌঁছেছে। এতো আগে বলে একটু খটকা ছিল। তাও সবাই ভেবেছিল, এতবছর পর ফিরছে। ও এদিককার আত্মীয় বন্ধু সবার সঙ্গে দেখা করতে আসছে। সে জায়গায় এ কি কথা ! 

শর্মির চোখে জলের ধারা। তার মধ্যেই প্রশ্ন করে করে জানা যায়, আজ ওকে স্কুলের অন্য মিসদের জানিয়ে রেখে ছুটি করতে বলেছিল বাবলি। বেলায় রুমুকে পাশে ওদের কাকার বাড়ি পাঠিয়ে শর্মিকে বলেছে, ওর ব্রেন টিউমার ধরা পড়েছে। খুব জটিল অবস্থা। প্রথমে মাথা ব্যাথা বা অন্য উপসর্গগুলো ও অতিরিক্ত পরিশ্রম, ভাবনাচিন্তার ফল ভেবেছিল। শেষে ডাক্তার যখন ডাক্তারের কাছে গেল, মুম্বাইয়ের মতো জায়গাতে, পু্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা হয়েছে। তারা বিশেষ আশা দিতে পারছেন না। 

সবারই মুখে কেউ কালি লেপে দিয়েছে। জীবনে কি কখনো একটা একটানা গদ্যের মতো শান্তি, স্থিতি আসে না? আহারে, রুমুটার ন বছর বয়স থেকে বাবা থেকেও নেই। আজ একুশ বছরে তার মাথাতেই বাজটা ফেলতে হল? 


চলবে