Poran Bondhua 7 in Bengali Love Stories by Srabanti Ghosh books and stories PDF | পরাণ বঁধুয়া - 7

Featured Books
Categories
Share

পরাণ বঁধুয়া - 7

পর্ব - ৭

--"তোমরা সবাই আমার উপর রাগ করছ। আমাকে জিজ্ঞেস করেছ, আমি বলেছি। আমি তোমাদের কারো মতকে ছোট করতে চাইনি।" বুবুন খুব সংকোচের সঙ্গে বলে। ওর খুব ভয় করছে। বাড়ির সবাই একদিকে, ও আর একদিকে, এমন কখনো হয়নি এতকালে। মা যদি এখন কান্নাকাটি শুরু করে, কি করবে ও? বাবা কি খুব রাগ করেছে? 

--"নাহ্, আমরা রাগ করিনি বুবুন। আমি অন্ততঃ রাগ করিনি। এই প্রথমবার তোমার সঙ্গে আমার মত মিলল না, তাই ভাবছিলাম। আজ কে ঠিক, কে ভুল বোঝা যাবে না। সময়ে বোঝা যাবে, দুজনেই হয়ত ঠিক ছিলাম। তোমার মা নিজের পছন্দ, ইচ্ছে, এগুলোকে খুব গুরুত্ব দেয় না, তুমি জান। সবাই যাতে খুশি, ওটাতেই খুশি থাকে। আমার ভাগ্য ভাল, তোমার মেজমা, ছোটমা, আরও বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছে আমাকে মাথায় করে রাখতে। এদের সবার একটা ইচ্ছে হয়েছিল, মৌকে বাড়িতে আনার। সেটা সফল হয়েছে। মৌয়ের কাছে আমি কৃতজ্ঞ, সে আমাকে সুযোগ দিয়েছে। এবার এদের ইচ্ছেপূরণ হল না।"

--"বাবা আমাকে কৃতজ্ঞ হয়েছ বলে পর করে দিও না।" মৌ অস্ফুটে বলে। 

--"না রে মা। এটা পর করা নয়। তোর যদি আমাদের পছন্দ না হত, আমরা কি কিছু করতে পারতাম? তেমনি বুবুনের এই প্রস্তাব অপছন্দ হলে কিছু করার নেই। থাক, এই কথা এখানেই শেষ হোক। ওদের যা উত্তর দেওয়ার, আমি দেব। রুমুকে ওরা এখনও কিছু জানায়নি। সে যেন কখনো কিছু না জানে, এইটুকু আমার অনুরোধ।" স্বপনবাবু উঠে চলে যান। 

বড় আঘাত পেয়েছেন। যে দিন গেছে, তা আবার কেন ফিরে আসে? একদিন বংশগৌরব কপচেছিলেন। বাড়ির মেয়ে প্রেম করলে বংশের মর্যাদা চলে যাবে ভেবে ভুল করেছিলেন। তাঁর গর্ব যে ছেলে, নিজের মতো পড়ুয়া, মেধাবী, পরিশ্রমী, একরোখা বলে চিরকাল গর্ব করেছেন, আজ সে কেন বাবার ছেড়ে ফেলা জুতোয় পা গলালো? এটাই তবে ভবিতব্য? রুমুর আশেপাশেই কোথাও বিয়ে হবে? সুখী হবে, আবার বাবলুর কাছে মাথা হেঁট হবে? 

🍁🍁🍁🍁🍁

বুবুন আরও পাঁচ মিনিট চুপ করে বসে থাকে। কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। কেউ কোনো কথা বললে তার উত্তর দিতে পারত। নিজের মতটা আবার বোঝাতে পারত। সবাই চলে যাচ্ছে। প্রথম পালালো তুলি মিলি। ওদের মত কেউ জানতে চায়নি। তবে প্রথমে রুমু ওদের বৌদি হতে পারে, ভাইদার সঙ্গে বিয়ে হতে পারে ভেবে ভীষণ খুশি হয়েছিল। তারপর রুমুর সম্পর্কে ভাইদার মত শুনে সত্যিই একটা ধাক্কা খেয়েছে। এমনিতেই রুমুর দুঃখে দুঃখী ছিল ওরা। সেখানে যোগ হল, রুমুর মতো মেয়ের সম্পর্কেও বিনা দোষে লোকে এসব ভাবে? লোক আর কে, তাদের হিরো, পাড়ার গর্ব, তাদের নিজের দাদা। মৌ ননদদের পিছু নিয়েছে। মায়েরা তিনজন রান্নাঘরে ঢুকছে। মেজকা, ছোটকা খবরের কাগজটা ভাগাভাগি করে মুখ ঢেকেছে। রাঙাদাটাও ওদের দলেই নাম লেখাচ্ছে। কি উৎসাহ খবরের কাগজে!

বুবুন উঠে পড়ে। ধ্যাত, কেউ বোঝে না। ঐ মেয়ে বৌ হয়ে এলে এইসব নাচানাচি, সিনেমা, থিয়েটার করে বেড়াবে। না ভুল হল। থিয়েটার ও দেখবে না। বরং ডিস্কো থেকে যাবে। এই যে বুবুনের প্রাণ রবীন্দ্রসংগীত, ও মেয়ে জন্মে শুনেছে? একা বুবুন কেন? বাবা কত ভাল পুরাতনী গান গায়। মায়েরা তিনজন, বিশেষ করে ছোটমার তো আশেপাশে গান গাইতে ডাক পড়ে। মেজকা, ছোটকা, সবাই ভাল গায়। তুলি পড়ছে মিউজিক এন্ড ড্রামা নিয়ে। সেখানে ঐ মেয়ে? 

এই তো বৌমণি, জিনস কুর্তা এসব পরে না তা তো নয়। প্রথম দেখাই তো সিনেমা হলে, রাস্তায়। এত ভাল নেচার ওর, বুবুনের একদম নিজের দিদি মনে হয়। বাড়িঘর ছেড়ে ওদের কাছে এসেছে, কি করে বৌমণিকে একটু ভাল রাখবে, ওরা তিন ভাইবোন খালি তাই ভাবে। বৌমণিও সেরকম। বুবুন যদি একটানা কাজ করে, মনে করে করে, জল দিয়ে আসবে, কফি, খাবার দিয়ে আসবে। সামনে দাঁড়িয়ে থেকে খাওয়াবে, নাহলে বুবুন নাকি কাজের চাপে ভুলে যাবে। 

প্রথম দু একবার তাই হয়েছিল। বৌমণি খাবার রেখে বলেছে, ও কাজ করতে করতে হুঁ বলেছে, তারপর কিছু মনে নেই। সেই থেকে এই জুলুম চালু হয়েছে। মাঝে মাঝে বুবুন খেপে ওঠে, "আমাকে কি বাচ্চা ছেলে পেয়েছ? তোমার সামনে খেতে হবে মানে?"

সঙ্গে সঙ্গে বৌমণির মুখে মেঘের ছায়া, "তুমি কেন বাচ্চা ছেলে হবে, তুমি অনেক নামীদামী মানুষ ভাই। আমি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়াই, তোমার কাজের মর্ম কি বুঝব?" 

রাগ করে চলে যাচ্ছিল, বুবুন ছুটে এসে হাত ধরে বলেছিল, "ওহ্, অমনি রাগ! এখন তোমার নিজের ভাই হলে বলতে পারতে এভাবে?"

চলবে