Coming back to you in Bengali Love Stories by Sohagi Baski books and stories PDF | তোমার কাছে ফিরে আসা

Featured Books
Categories
Share

তোমার কাছে ফিরে আসা

আবিত আর লামিয়ার বিয়েটা হয়েছিল খুব বেশি জাঁকজমক ছাড়াই, কিন্তু তবুও যেন চারপাশে এক অদ্ভুত মায়া ছড়িয়ে ছিল—আলো, ফুল আর মানুষের ভিড়ের মাঝেও তাদের দুজনের চোখ শুধু একে অপরকেই খুঁজে নিচ্ছিল। লাল শাড়িতে লামিয়া যখন মণ্ডপে এসে দাঁড়াল, আবিতের মনে হলো—এটাই সেই মানুষ, যার জন্য এতদিনের অপেক্ষা, এতদিনের অজানা টান। সিঁদুর পড়ানোর সময় তার হাতটা একটু কেঁপে উঠেছিল, আর লামিয়া মৃদু হেসে চোখ নামিয়ে নিয়েছিল—সেই হাসির ভেতরেই যেন ছিল নতুন জীবনের সমস্ত প্রতিশ্রুতি।
বিয়ের পর প্রথম রাতটা ছিল একদম অন্যরকম—কোনো সিনেমার মতো নয়, বরং নরম, ধীরে ধীরে একে অপরকে চিনে নেওয়ার মতো। লামিয়া চুপচাপ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, বাইরে তখনও কিছু আতশবাজির আলো দেখা যাচ্ছিল, আর আবিত তার পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলেছিল, “আজ থেকে তুমি শুধু আমার গল্পের অংশ না… তুমি পুরো গল্পটাই।” লামিয়া কিছু বলেনি, শুধু তার কাঁধে মাথা রেখেছিল—সেই নীরবতার মধ্যেই যেন হাজারটা অনুভূতি গলে গিয়েছিল।
দিনগুলো নতুনভাবে শুরু হতে লাগল—সকালের চায়ের কাপ, ছোট ছোট ঝগড়া, আবার একটু পরেই হাসি… সবকিছুই যেন ধীরে ধীরে তাদের সম্পর্কটাকে আরও গভীর করে তুলছিল। আবিত কখনো কখনো অফিসে যাওয়ার আগে ইচ্ছে করে লামিয়ার ঘুম ভাঙাত, শুধু তার আধো ঘুমের মুখটা দেখার জন্য, আর লামিয়া রাগ দেখিয়ে বলত, “তুমি একদমই ভালো না,” কিন্তু তার চোখে থাকত ভালোবাসার স্পষ্ট ছাপ।
একদিন বিকেলে হঠাৎ বৃষ্টি নামল, আর লামিয়া ছাদে গিয়ে ভিজতে লাগল—ছোটবেলার মতো হাত দুটো ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আবিত তাকে দেখে হেসে ফেলল, তারপর নিজেও গিয়ে দাঁড়াল তার পাশে। লামিয়া বলল, “জানো, আমি ছোটবেলায় ভাবতাম—আমার স্বামী যদি এমন হয়, যে আমার সাথে বৃষ্টিতে ভিজবে…” আবিত কথাটা শেষ হতে না দিয়েই বলল, “তাহলে তুমি ঠিক মানুষটাই বেছে নিয়েছো।” সেই মুহূর্তটা ছিল একদম নিখুঁত—কোনো ভয় নেই, কোনো দ্বিধা নেই, শুধু দুজন মানুষের একসাথে থাকা।
রাতগুলোতে তারা অনেক কথা বলত—স্বপ্ন, ভয়, ভবিষ্যৎ… সবকিছু নিয়েই। একদিন লামিয়া হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “তুমি কখন বুঝলে তুমি আমাকে ভালোবাসো?” আবিত একটু ভেবে বলল, “যেদিন বুঝলাম, তোমাকে ছাড়া আমার দিনগুলো ফাঁকা লাগে… সেদিন থেকেই।” লামিয়া চুপ করে ছিল, কিন্তু তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরে রেখেছিল।
এরকমই চলতে থাকল তাদের ছোট ছোট সুখের গল্পগুলো… ধীরে ধীরে, অজান্তেই… কিছু একটা বদলাতে শুরু করছিল
 আবিত লক্ষ্য করছিল—আগের মতো লামিয়া আর তেমন হাসে না, মাঝেমধ্যে অকারণে চুপ হয়ে যায়, যেন তার ভেতরে কোথাও কোনো অজানা চিন্তা বাসা বেঁধেছে। সে প্রথমে ভাবল হয়তো নতুন সংসার, নতুন দায়িত্ব—এসবের চাপ, তাই খুব একটা কিছু বলল না, শুধু একটু বেশি খেয়াল রাখতে শুরু করল।

একদিন রাতে, যখন তারা দুজনেই বিছানায় শুয়ে ছিল, আবিত ধীরে করে বলল, “তুমি কি কিছু লুকাচ্ছো আমার থেকে?” লামিয়া একটু চমকে উঠল, তারপর মুখ ঘুরিয়ে বলল, “না তো… এমন কিছু না।” কিন্তু তার গলার কাঁপনটা আবিত এড়িয়ে যেতে পারল না। সে আর জোর করল না, শুধু তার হাতটা আলতো করে ধরে রাখল—যেন বোঝাতে চাইল, সে পাশে আছে, সবসময়।

পরের দিনগুলোতে সেই অস্বস্তিটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। লামিয়া অনেক সময় একা একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে, ফোনে কারো সাথে কথা বলে, কিন্তু আবিত কাছে এলেই হঠাৎ চুপ করে যায়। আবিতের মনে সন্দেহ জাগতে লাগল, কিন্তু ভালোবাসাটা এতটাই গভীর ছিল যে সে সেই সন্দেহটাকে বিশ্বাসে ঢেকে রাখতে চাইছিল।

এক বিকেলে আবিত অফিস থেকে একটু আগে ফিরে এল। ঘরে ঢুকেই সে দেখল, লামিয়া তাড়াহুড়ো করে ফোনটা লুকিয়ে ফেলল। সেই ছোট্ট মুহূর্তটাই যেন আবিতের ভেতরে কিছু একটা ভেঙে দিল। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল, তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, “আমার থেকে কিছু লুকানোর দরকার কি?” লামিয়া এবার কিছু বলল না—শুধু চোখ নামিয়ে রাখল।

সেই নীরবতাই যেন সবচেয়ে বেশি কষ্টের ছিল। আবিত ধীরে ধীরে বলল, “আমি তো শুধু তোমাকেই বিশ্বাস করে সবকিছু ছেড়ে দিয়েছি… তুমি কি আমায় এতটুকুও বিশ্বাস করো না?” তার গলার ভেতরে জমে থাকা কষ্টটা স্পষ্ট ছিল।

লামিয়ার চোখে জল চলে এল, কিন্তু সে তখনও কিছু বলল না। কয়েক মুহূর্ত পরে সে শুধু বলল, “সবকিছু এত সহজ না, আবিত…” এই কথাটাই যেন আরও অনেক প্রশ্ন তৈরি করে দিল।

সেদিন রাতে তারা দুজনেই পাশাপাশি শুয়ে ছিল, কিন্তু মাঝখানে যেন একটা অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কেউ কারো দিকে তাকায়নি, কেউ কোনো কথা বলেনি—তবুও দুজনেরই ঘুম আসেনি।

তারপরের দিন সকালে, আবিত ঘুম থেকে উঠে দেখল—লামিয়া পাশে নেই… ঘরটাও অদ্ভুতভাবে নিরব… আর টেবিলের ওপর রাখা আছে একটা ছোট্ট কাগজ… যেটা হয়তো তাদের গল্পটার মোড় ঘুরিয়ে দিতে চলেছে…




… আবিত ধীরে ধীরে কাগজটা হাতে তুলে নিল, তার বুকের ভেতরটা কেমন অজানা ভয় আর অস্থিরতায় ভরে উঠছিল। কাগজটা খুলতেই তার চোখে পড়ল—“আমি একটু সময় চাই… নিজেকে গুছিয়ে নিতে… তুমি খুঁজতে যেও না, প্লিজ…” এতটুকুই লেখা, কিন্তু এই কয়েকটা শব্দ যেন আবিতের পুরো পৃথিবীটা থামিয়ে দিল।

সে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল, যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না—এই লামিয়া, যে তাকে এক মুহূর্ত ছাড়া থাকতে পারত না, সে-ই আজ নিজে থেকে দূরে চলে গেছে। তার মনে পড়তে লাগল গত কয়েকদিনের সেই অদ্ভুত আচরণগুলো, সেই চুপচাপ থাকা, সেই লুকোনো কথা… সবকিছু যেন একসাথে মিলে একটা বড় রহস্য হয়ে দাঁড়াল।

প্রথমে আবিত ঠিক করেছিল—সে লামিয়ার কথামতোই করবে, তাকে সময় দেবে। কিন্তু সময় যত এগোতে লাগল, ততই তার ভেতরের অস্থিরতা বেড়ে উঠতে লাগল। সে প্রতিটা মুহূর্তে ভাবছিল—লামিয়া এখন কোথায়, কেমন আছে, একা আছে তো? তার ফোনে বারবার হাত যাচ্ছিল, কিন্তু সেই ছোট্ট কাগজের কথাগুলো তাকে আটকে দিচ্ছিল।

দিন কেটে গেল… তারপর আরও কয়েকটা দিন। ঘরটা যেন একদম ফাঁকা হয়ে গেল—যেখানে আগে লামিয়ার হাসির শব্দ ভেসে আসত, এখন শুধু নীরবতা। আবিত বুঝতে পারল—এই নীরবতা সহ্য করা তার পক্ষে সম্ভব না।

একদিন বিকেলে সে আর নিজেকে থামাতে পারল না। সে লামিয়ার পুরনো কিছু জিনিস খুঁজতে লাগল—হয়তো কোনো ক্লু পাবে। আলমারির ভেতর থেকে একটা ছোট ডায়েরি বেরিয়ে এল—যেটা সে আগে কখনো দেখেনি। ডায়েরিটা খুলতেই সে দেখল, লামিয়ার হাতের লেখা—অসংখ্য কথা, অসংখ্য অনুভূতি… আর তার ভেতরে লুকিয়ে আছে এমন কিছু সত্য, যা আবিতকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে।

পাতাগুলো উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ একটা জায়গায় এসে তার হাত থেমে গেল—সেখানে লেখা, “আমি জানি না, আমি ঠিক করছি কি না… কিন্তু আমি ওকে কষ্ট দিতে চাই না… তবুও সত্যিটা একদিন না একদিন ওর সামনে আসবেই…” আবিতের বুকটা কেঁপে উঠল। কী সেই সত্যি? কেন লামিয়া এতদিন সেটা লুকিয়ে রেখেছিল?

আরও কয়েকটা পাতা উল্টাতেই তার চোখে পড়ল একটা নাম… একটা অতীত… যেটা লামিয়া কখনো তাকে বলেনি। সেই মুহূর্তে আবিত বুঝতে পারল—এই গল্পটা শুধু ভালোবাসার না, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এমন কিছু, যা হয়তো তাদের সম্পর্কটাকে পুরোপুরি ভেঙেও দিতে পারে… অথবা নতুন করে গড়তেও পারে…





ডায়েরির পাতায় লেখা ছিল—একটা পুরনো সম্পর্কের কথা, একসময়কার ভালোবাসা, যেটা ভেঙে গিয়েছিল খুব খারাপভাবে। সেই মানুষটা নাকি আবার ফিরে এসেছে লামিয়ার জীবনে, হঠাৎ করেই… আর লামিয়া বুঝতে পারছিল না কী করবে। সে আবিতকে ভালোবাসে—এটা সে বারবার লিখেছে, কিন্তু তার অতীতের সেই অসমাপ্ত অধ্যায় যেন আবার দরজায় কড়া নাড়ছিল।

শেষের দিকে একটা লাইনে লেখা ছিল—“আমি যদি সবকিছু খুলে বলি, হয়তো আবিত আমাকে ভুল বুঝবে… কিন্তু না বললেও তো আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না…”

এই কথাগুলো পড়তে পড়তেই আবিতের চোখ ভিজে উঠল। সে বুঝতে পারল—এটা প্রতারণা না, এটা একটা ভয়… একটা দ্বন্দ্ব, যেখানে লামিয়া নিজেই আটকে গেছে। আর ঠিক তখনই আবিত সিদ্ধান্ত নিল—সে পালাবে না, সে এই গল্পটার শেষটা নিজেই লিখবে।

সে খোঁজ শুরু করল। লামিয়ার বন্ধুবান্ধব, পরিচিত জায়গা—সব জায়গায় খুঁজতে লাগল। অবশেষে একদিন সন্ধ্যায়, সেই পুরনো লাইব্রেরির সামনে এসে দাঁড়াল—যেখানে প্রথমবার সে লামিয়াকে দেখেছিল। তার মনে হচ্ছিল, যদি কোথাও লামিয়া ফিরে আসে, তাহলে হয়তো এখানেই আসবে।

আর সত্যিই… কিছুক্ষণ পর সে দেখল—লামিয়া দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক আগের মতোই, শুধু চোখ দুটো ক্লান্ত আর ভেজা। আবিত ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে গেল। দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল—কত কিছু বলার ছিল, কিন্তু শব্দ যেন হারিয়ে গিয়েছিল।

অবশেষে আবিত বলল, “তুমি কেন বলোনি?”
লামিয়ার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল, “আমি ভয় পেয়েছিলাম… তোমাকে হারানোর ভয়।”

আবিত একটু এগিয়ে এসে বলল, “আর আমাকে না বলে চলে গিয়ে… তুমি কি আমাকে হারাওনি?” তার গলায় কষ্ট ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল ভালোবাসা।

লামিয়া মাথা নিচু করে বলল, “আমি নিজেকে ঠিক করতে চেয়েছিলাম… যেন তোমার সামনে দাঁড়িয়ে মিথ্যে না বলতে হয়…”

কিছুক্ষণ নীরবতার পর আবিত ধীরে করে তার হাতটা ধরে বলল, “আমার কাছে তোমার অতীত না… তোমার বর্তমানটাই গুরুত্বপূর্ণ। আর আমি শুধু এটুকু জানি—আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারি না।”

লামিয়া হঠাৎ কেঁদে উঠে তাকে জড়িয়ে ধরল। সেই আলিঙ্গনে ছিল ভয়, কষ্ট, আর সবকিছুকে ছাড়িয়ে যাওয়া এক গভীর ভালোবাসা।

সেদিন তারা দুজনেই বুঝেছিল—ভালোবাসা মানে নিখুঁত হওয়া না, বরং সব অসম্পূর্ণতাকে মেনে নিয়েও পাশে থাকা। বিশ্বাস ভেঙে যেতে পারে, কিন্তু যদি দুজনেই চায়—তাহলে সেটাকে আবার নতুন করে গড়ে তোলা যায়।

আবিত আর লামিয়া আবার একসাথে হাঁটতে শুরু করল—এইবার আর কোনো লুকোচুরি নেই, কোনো ভয় নেই… শুধু সত্যি আর ভালোবাসা নিয়ে।

আর তাদের গল্পটা শেষ হয়নি—বরং সেদিন থেকেই নতুন করে শুরু হয়েছিল।