( শ্রী শ্রী ঠাকুরের এক দয়ার কাহানি )
অন্ধকারের সঙ্গে প্রথম পরিচয়
ধনবাদ জেলার কয়লানগরীর কাছে একটি বড় বাঙালি কলোনি ছিল।
তার চারপাশে টিন, প্লাস্টিক আর খড়ের ছাউনি দিয়ে তৈরি অসংখ্য ঝুপড়িঘর ছড়িয়ে ছিল।
ভোর হতেই পুরো বস্তি জেগে উঠত—
কোথাও কয়লার কালিতে মাখামাখি মহিলারা জল ভরছে,
কোথাও আধভাঙা চটি পায়ে বাচ্চারা স্কুলে দৌড়চ্ছে,
আবার কোথাও শ্রমিকেরা হাতে টিফিন নিয়ে কারখানার দিকে রওনা দিচ্ছে।
এই কোলাহলময় বস্তিতেই মৌসুমী ব্যানার্জী তার স্বামী সঞ্জয় মণ্ডল এবং দুই বড় হতে থাকা মেয়েকে নিয়ে থাকত।
সঞ্জয় হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়ামের গাড়ি চালাত।
রোজগার মন্দ ছিল না।
কিন্তু তার সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল—নেশা।
সন্ধ্যা নামলেই সে পাড়ার কিছু বখাটে বন্ধুর সঙ্গে বসে পড়ত।
মদ, গালাগালি আর চিৎকার—এই ছিল তার পৃথিবী।
বাড়িতে এমন দিন খুব কমই যেত যেদিন ঝগড়া হত না।
নেশাগ্রস্ত হয়ে টলতে টলতে সে প্রায়ই মৌসুমীর ওপর চিৎকার করত—
“তোর বাপের টাকায় খাই নাকি!
রক্ত জল করে উপার্জন করি!
একটু খেলেই আকাশ ভেঙে পড়ল নাকি?
খাওয়া-পরার অভাব তো রাখিনি!
নিজের বক্তৃতা বন্ধ রাখ!”
মৌসুমী চুপ করে যেত।
এখন আর প্রতিবাদ করার শক্তি তার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না।
কখনও গভীর রাতে একা বসে সে ভাবত—
“এই মানুষটার জন্যই কি আমি নিজের বাড়ি ছেড়েছিলাম?”
যৌবনে সঞ্জয়ের বড় বড় চুল ছিল।
চলাফেরাও ছিল ঠিক সিনেমার অভিনেতা Mithun Chakraborty-এর মতো।
মেদিনীপুরের বাংলাহাট গ্রামে এক বান্ধবীর বিয়েতে মৌসুমী যখন প্রথম তাকে দেখেছিল, তখনই তার বাহ্যিক রূপে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল।
মা-বাবা অনেক বুঝিয়েছিলেন—
“শুধু রূপ দেখে জীবনের সিদ্ধান্ত নিস না।”
কিন্তু প্রেমে অন্ধ মৌসুমী কারও কথা শোনেনি।
দু’জনে বাড়ি ছেড়ে ধনবাদে এসে বসবাস শুরু করে।
সময় যেতে দেরি হল না।
ধীরে ধীরে সঞ্জয়ের আসল মুখ সামনে আসতে লাগল।
নেশা, মিথ্যে কথা, মারধর আর অন্য মহিলাদের সঙ্গে সম্পর্ক…
আজও মৌসুমীর মনে হয়—
“হায়…
আমি যদি তার চুল না দেখে, তার সংস্কার দেখতাম…”
সে কখনও খেয়ালই করেনি সঞ্জয় বয়স্কদের সম্মান করে কি না।
কোনও জীবের প্রতি দয়া আছে কি না।
তার কথাবার্তায় ভদ্রতা আছে কি না।
সে শুধু বাইরের চাকচিক্যে মুগ্ধ হয়ে পড়েছিল।
আজ সেই ভুলই তার জীবনের শাস্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনেকবার সে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভেবেছে।
কিন্তু বড় হতে থাকা দুই মেয়ের মুখ মনে পড়তেই তার পা থেমে গেছে।
যাবেই বা কোথায়?
বাপের বাড়ির দরজা তো বহু বছর আগেই তার জন্য বন্ধ হয়ে গেছে।
তার বড় মেয়ে মৌ ব্যানার্জীর বয়স ছিল ষোলো।
সে মায়ের মেয়ে কম, বন্ধুই যেন বেশি ছিল।
যখনই সঞ্জয় হাত তুলত, মৌ মাঝখানে দাঁড়িয়ে যেত।
এটা কোনও বাড়ি ছিল না—
একটা নরক ছিল।
এখানে ধর্মের কোনও কথা হত না,
বাচ্চাদের নীতি-কথাও শোনানো হত না।
দুই মেয়ে রোজ নতুন নতুন গালাগালি শিখছিল।
এমন কদর্য ভাষা যে শুনলে লজ্জায় মাথা নত হয়ে যায়।
কিন্তু এই অন্ধকারের মাঝেই হয়তো কোথাও একটুকরো আলো জন্ম নিতে চলেছিল।
একদিন স্কুলে মৌ-এর বান্ধবীরা তাকে বলল—
“কাল রেলগেটের কাছে খুব বড় একটা সৎসঙ্গ হবে।
ভাণ্ডারাও আছে।
তুই তো এত সুন্দর গান গাস, তোকে আমাদের সঙ্গে যেতেই হবে।”
মৌ প্রথমে ইতস্তত করল।
বাড়ির পরিবেশ এমন ছিল যে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের প্রতি তার বিশেষ আকর্ষণ ছিল না।
তবে স্কুলের শিক্ষক গোপাল দা প্রায়ই Sri Sri Thakur Anukulchandra-এর কথা বলতেন।
তিনি নিজেও দীক্ষিত ছিলেন।
সাদা পোশাক, শান্ত মুখ, মধুর কথা…
না পেঁয়াজ, না রসুন, না কোনও নেশা।
মৌ-এর সবসময় মনে হত—
“স্যার অন্য সবার মতো নন কেন?”
গোপাল দা মৌ-এর বাড়ির পরিস্থিতি জানতেন।
তিনি স্নেহভরে বললেন—
“মাকে নিয়ে অবশ্যই আসিস।
ভালো লাগবে।”
পরের দিন রেলগেটের কাছে বিশাল প্যান্ডেল সাজানো হয়েছিল।
চারদিকে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি আর লাল পাড় সাদা শাড়ি পরা মায়েদের দেখা যাচ্ছিল।
পুরো পরিবেশ যেন দেবলোকের কোনও উৎসব পৃথিবীতে নেমে এসেছে।
করতাল, শঙ্খধ্বনি আর “বন্দে পুরুষোত্তমম্” ধ্বনিতে চারদিক মুখরিত হয়ে উঠেছিল।
মৌসুমী অবাক হয়ে দেখল—
তাদের কলোনি আর পাড়ার অনেক মানুষ সেখানে সেবার কাজে ব্যস্ত।
যাদের সে সবসময় শান্ত আর ভালোবাসাপূর্ণ মানুষ হিসেবেই দেখেছে।
কিছুক্ষণ পরে মঞ্চে বসা সহ-প্রতৃত্বিক দেব মধু দা কথা বলা শুরু করলেন—
“Sri Sri Thakur Anukulchandra প্রত্যেক নারীর মধ্যে মাতৃভাব দেখার শিক্ষা দিয়েছেন।
মাতৃভাব প্রতিষ্ঠিত না হলে কোনও নারীকে স্পর্শ পর্যন্ত করা উচিত নয়।
তাই সৎসঙ্গে প্রতিটি নারীকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করা হয়।”
পুরো প্যান্ডেল নিস্তব্ধ ছিল।
মধু দা আবার বললেন—
“মায়েরা…
সংসারকে স্বর্গ বানাবেন না নরক—তার ভিত আপনাদের হাতেই থাকে।
যদি স্বামী নেশায় ডুবে যায়…
যদি সে অনৈতিক পথে চলে যায়…
তাহলে শুধু গালাগালি আর রাগ দিয়ে পরিবর্তন আসবে না।
হিংসা থেকে জন্ম নেয় বিদ্বেষ।
অহিংসা থেকে ভালোবাসা…
ভালোবাসা থেকে শ্রদ্ধা…
আর শ্রদ্ধা থেকে পরিবর্তন।”
এই কথাগুলো যেন সরাসরি মৌসুমীর অন্তরে গিয়ে লাগল।
প্রথমবার তার মনে হল—
হয়তো সে শুধু সঞ্জয়কেই দোষ দিয়ে এসেছে…
কিন্তু সংসার থেকে ভালোবাসা আর শ্রদ্ধাও তো কোথাও হারিয়ে গিয়েছিল।
মধু দার কণ্ঠ আবার ভেসে এল—
“Sri Sri Thakur Anukulchandra-এর অমোঘ বাণী—
‘সৎসঙ্গের আশ্রয় গ্রহণ করো।
সত্নাম মনন করো।
আমি নিশ্চয়ই বলছি—
নিজের উন্নতির জন্য আলাদা করে আর ভাবতে হবে না।’”
মৌসুমীর চোখ ভিজে উঠল।
ওদিকে ভাণ্ডারায় হাজার হাজার মানুষ শৃঙ্খলার সঙ্গে প্রসাদ গ্রহণ করছিল।
এত বড় ভিড়…
তবু না কোনও ধাক্কাধাক্কি, না পুলিশ।
বারবার মাইকে ঘোষণা হচ্ছিল—
“সৎসঙ্গ হল অনুসরণ আর অনুশাসনের আরেক নাম।”
কিছুক্ষণ পরে সঙ্গীতাঞ্জলি শুরু হল।
মৌ-এর নাম ঘোষণা করা হল।
এত বড় মঞ্চে সে প্রথমবার গান গাইতে চলেছে।
তার হাত কাঁপছিল।
মায়ের হাত ধরে সে মঞ্চে উঠল।
সামনে ঠাকুরজির বিশাল বিগ্রহ।
মৌ প্রণাম করল।
তারপর ধীরে ধীরে বাংলা ভক্তিগীতি শুরু করল।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই পরিবেশ বদলে গেল।
করতালের শব্দ আরও জোরে বেজে উঠল।
মায়েরা ভাবাবেগে দুলতে লাগলেন।
লোকজন একে অপরকে বলতে লাগল—
“এত সুন্দর মেয়েকে আজ পর্যন্ত বড় মঞ্চে আনা হয়নি কেন?”
তখন কেউ বলল—
“ও তো এখনও দীক্ষিত নয়।”
সবকিছু দেখে মৌসুমী হতবাক হয়ে গিয়েছিল।
প্রথমবার সে বুঝতে শুরু করল—
কেন তাদের প্রতিবেশীরা সবসময় ভালোবাসায় থাকে।
কেন তাদের বাড়ি থেকে গালাগালি নয়, ভজনের সুর ভেসে আসে।
হয়তো…
দীক্ষার মধ্যে সত্যিই কোনও শক্তি আছে।
ঠিক তখনই সামনের কলোনির রাহুল ব্যানার্জী সেখানে এলেন।
সম্পর্কে তিনি মৌসুমীর কাকা লাগতেন।
হেসে তিনি বললেন—
“চলো…
মধু দা এখন দীক্ষাগৃহে বসে আছেন…”
আর মৌসুমী জীবনে প্রথমবার এমন এক দ্বারের দিকে পা বাড়াল…
যেখানে হয়তো তাকে দোষ নয়, দিশা দেওয়া হবে।
॥ প্রথম পর্ব সমাপ্ত ॥
जयगुरु 🙏🙏🙏
वंदे पुरुषोत्तमम