Private Eye Society - 5 in Bengali Adventure Stories by Aro Chatterjee books and stories PDF | প্রাইভেট আই সোসাইটি - 5

Featured Books
Categories
Share

প্রাইভেট আই সোসাইটি - 5


প্রাইভেট আই সোসাইটি’।

নামটা আগেই বলে রাখি আমার দেওয়া নয়। সুবীরের দেওয়া। আমার নিজের প্ল্যান ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম—‘মিস্ট্রি হান্টার্স’ বা ‘কনস্পিরেসি সিন্ডিকেট’ (সুবীর অবশ্য শুনেই নাক কুঁচকে বলল, “ব্ল্যাক মার্কেট মার্কা নাম হয়ে যাচ্ছে রে শিবু”)। যাই হোক, আমার পছন্দ ছিল ওই টাইপের কিছু। বেশ একটা দমদার, মারকাটারি ব্যাপার!

তা বলে ‘প্রাইভেট আই সোসাইটি’?

প্রথমত, আমরা আইনত কোনো ‘প্রাইভেট আই’ বা বেসরকারি গোয়েন্দা নই। আমাদের মজ্জায় খাঁটি বাঙালি আলসেমি ঢুকে বসে আছে। রোদ-জল মাথায় নিয়ে, ছদ্মবেশ ধরে কারুর পেছনে চোরের মতো ঘুরঘুর করার কোনো সাধ আমার অন্তত এই পঁচিশ বছর বয়সে নেই। আমাদের সব থিওরি, সব কাটাছেঁড়া হয় ঘরে বসে, আরামকেদারায় পিঠ ঠেকিয়ে। ল্যাপটপের স্ক্রিন আর কফির মগই আমাদের ইনভেস্টিগেশনের শেষ আর শুরু। কাজেই ‘প্রাইভেট আই’ কথাটা আমাদের ক্ষেত্রে পুরোপুরি ভুল এবং নেহাতই প্রযোজ্য নয়। 

তায় আবার ‘সোসাইটি’!

নামটা শুনলে মনে হয় যেন স্বয়ং রাজা রামমোহন রায় বা ডিরোজিও সাহেব নতুন কোনো সমাজ সংস্কার বা ব্রাহ্মসমাজ তৈরির জন্য আমজনতাকে ডাক দিচ্ছেন! আর তা ছাড়া, একটা সোসাইটি বা সমিতি তৈরি করতে গেলে শুনেছি খাতায়-কলমে অন্তত পাঁচজন লোক লাগে। আমরা এখানে দুটো আধ-পাগলাটে লোক বদ্ধ ঘরে বসে, আরাম চেয়ারে দোল খেতে খেতে দুনিয়ার তাবড় তাবড় ষড়যন্ত্র নিয়ে মাথা ঘামাই। আমরা আবার কীসের সোসাইটি তৈরি করব? নিজেদের ওপরেই মাঝে মাঝে হাসি পায়।

আমি তাই নামটা শুনেই হা-হা করে উঠেছিলাম, “ধুর ধুর! এটা কোনো নাম হলো?”

সুবীর চশমাটা নাকের ডগায় ঠেলে দিয়ে বলল, “কেন? কী খারাপ আছে শুনি? আমার তো শুনতে খারাপ লাগছে না।”

“আরে মানে...” আমি একটু আমতা আমতা করলাম। নিজের ব্যক্তিগত জেদ আর পছন্দ ছাড়া অন্য কোনো জুতসই টেকনিক্যাল কারণ খোঁজার চেষ্টা করলাম মনে মনে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, পারলাম না।

ভেতরে ভেতরে আর একটু জোরে চেষ্টা করলাম মাথা খাটাতে, কিন্তু কোনো লাভ হলো না। সত্যি বলতে কী, নামটা নাম হিসেবে কিন্তু বেশ ভালো। বেশ একটা সুন্দর ছন্দ আছে নামটায়। মুখ থেকে গড়গড়িয়ে বেরিয়ে যায়—প্রাইভেট আই সোসাইটি! মনে মনে সুবীরকে একটা বাহবা দিতেই হয়। নামটা বানিয়েছে একদম টপ ক্লাস, প্রফেশনালদের মতো।

কিন্তু আমি হচ্ছি এক নম্বরের গবেট আর গোঁয়ার। কোনো তর্কে কারুর কাছে এত সহজে হার মানলে নিজেকে পৃথিবীর নিকৃষ্টতম জীব বলে মনে হয়। নিজের ইগো চূর্ণ হতে দেওয়া যায় না।

শেষ পর্যন্ত আমাদের মধ্যে একটা ‘স্টেলমেট’ বা অচলাবস্থা তৈরি হয়ে গেল। ঠিক হলো, নামটা আমরা এখনই ফাইনাল হিসেবে ব্যবহার করব না। ওটাকে হোল্ডে রেখে আর একটু ঝাড়াপোছা করে দেখা যাবে পরে কী করা যায়। সাবিত্রীদি ততক্ষণে আমাদের চা দিয়ে নিজের ঘরে চলে গেছে।

আমি এবার ক্লান্ত হয়ে সোফায় শরীরটা এলিয়ে দিলাম। তর্কের ঠেলায় মাথাটা ধরে গেছে। ঘরের কোণে রাখা পুরনো কালার টিভিটা চালু করলাম। রাত তখন প্রায় এগারোটা। চুমন কি বলছে আজকে একটু দেখা দরকার। মনটা অন্যদিকে ঘোরানো দরকার। অগত্যা চ্যানেল দিলাম সি বি ডি আনন্দে।

চ্যানেলটা দিতেই দেখলাম ফাটিয়ে একটা উটকো খবর হচ্ছে। কলকাতার কোনো এক স্টেশনে নাকি এক পাগল জনসমক্ষে জ্যান্ত আটটা টিকটিকি চিবিয়ে খেয়ে নিয়েছে! ক্যামেরার সামনে প্রত্যক্ষদর্শীরা হাত-পা নেড়ে সেই রোমহর্ষক বর্ণনা দিচ্ছে।

আমি উদাস মুখে সোফায় বসে মানবজীবনের খাদ্যসংকট এবং টিকটিকি কি ডাইনোসরের মাসতুতো ভাই কি না তার কথা ভাবছি, এমন সময় হঠাৎ স্ক্রিনের তলার ফ্ল্যাশ নিউজটা বদলে গেল। নিউজ অ্যাঙ্করের গলার স্বর এক ধাক্কায় বেশ গম্ভীর হয়ে উঠল, আর তার ঠিক পাশেই ভেসে উঠল একটা চেনা যুবকের ছবি।

এই ছবি আমি আগে দেখেছি। খুব বেশিদিন আগে নয়, এই তো যেদিন সুবীরের বাড়িতে এলাম সেদিনই রুমে এই ছবিটা ছিল।

লি মিং! 

নিউজ অ্যাঙ্কর বলতে শুরু করল, “গতকাল রাত্রে সারা চায়নাটাউনের ঘুম উড়িয়ে পাওয়া গেছে এক চিনা যুবকের মৃতদেহ। কলকাতার ডকের ধারে আজ সকালে বডিটি উদ্ধার হয়। বডির অবস্থা দেখে মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনো পর্যন্ত স্পষ্ট করে বলা যাচ্ছে না, তবে ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা সন্দেহ করছেন—কোনো এক অচেনা বা রহস্যময় উপায়ে ছেলেটিকে মারা হয়েছে। ছেলেটির নাম এই মুহূর্তে জানা যাচ্ছে লি মিং, বয়স মাত্র উনিশ বছর। বডিকে ইতিমধ্যেই মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানোর বন্দোবস্ত করা হয়েছে। স্থানীয়দের অনেকে সন্দেহ করছেন যে, এই খুনের কারণ সম্ভবত বর্ণবিদ্বেষ বা কোনো গ্যাং ওয়ারের সাথে সম্পর্কিত—”

আমি সোফায় সোজা হয়ে বসলাম। 

লি মিং!

এর ফটোই তো সুবীরের ঘরের সেই লাল কালির বোর্ডের মাঝখানে পিন দিয়ে আটকানো ছিল! ‘মিসিং কেস’ হিসেবে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, টিভিতে এই খবরটা দেখানোর সময় ও যে এতদিন ধরে নিখোঁজ ছিল, সেই নিয়ে একটা শব্দও উচ্চারণ করা হলো না। যেন ছেলেটি কাল রাত পর্যন্ত বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছিল আর হঠাৎ খুন হয়ে গেছে! কি ব্যাপার ?

কিন্তু আমার আসল ধাক্কাটা লাগা তখনো বাকি ছিল।

টিভির স্ক্রিনে তখন লি মিং-এর ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে ডকের ধারের সেই ভিড়ের ফুটেজটা দেখাচ্ছিল। পুলিশ বডি তুলছে, আর উৎসুক জনতা চারপাশ থেকে ঘাড় উঁচিয়ে দেখছে। ক্যামেরাটা যখন আস্তে করে ডানদিকে প্যান করল, ভিড়ের একদম পেছনের সারিতে একটা লোক চোখে পড়লো।

আমার প্রায় বিষম খাওয়ার মত অবস্থা হলো! এ কি ?

সেই কালো সানগ্লাস পরা এজেন্ট মার্কা ভদ্রলোক! হুবহু এক! সেই চিবুকের গড়ন, সেই কাঁধের চওড়া ভঙ্গি, আর এই মাঝরাতেও চোখে সেই একই কুচকুচে কালো চশমা!

মাথার ভেতরটা ঝিমঝিম করে উঠল। মহারাষ্ট্রের লোনার লেকের সেই ঝাপসা ড্রোন ভিডিও থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে এই লোকটা হুবহু একই চশমা পরে কলকাতার ডকের ধারে চলে আসল কীভাবে? এতটা কাকতালীয় ব্যাপার কি পৃথিবীতে ঘটা সম্ভব? নাকি আমার চোখের ভুল?

না, অসম্ভব! ইম্পসিবল! স্রেফ ক্লান্তি বলে এটাকে উড়িয়ে দেওয়া আর যাচ্ছে না। এই লোকটা কোনো সাধারণ কৌতূহলী পাবলিক নয়। 

আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল। সঙ্গে পেটের মধ্যে গুরুগুর করতে লাগলো। আমি সোফা থেকে লাফিয়ে উঠে পেছনের ঘরের দিকে তাকিয়ে সজোরে হাঁক দিলাম:

“সুবীর! জলদি এদিকে আয়! এক্ষুনি!"