আবিদা রাহার জন্ম হয়েছিল এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে। তার জন্মের দিন বাড়িতে তেমন কোনো আনন্দ ছিল না। কারণ পরিবারের অনেকেই ছেলে সন্তান আশা করেছিল। ছোটবেলা থেকেই আবিদা বুঝতে শিখেছিল যে পৃথিবী সব মানুষের জন্য সমান নয়। তার বড় ভাইয়ের ছোট ছোট ইচ্ছেগুলোও পরিবারের সবাই গুরুত্ব দিয়ে শুনত, অথচ আবিদার স্বপ্নগুলোকে প্রায়ই হাস্যকর বলে উড়িয়ে দেওয়া হতো। তবুও সে চুপচাপ ছিল। খুব বেশি অভিযোগ করত না। জানালার পাশে বসে আকাশ দেখতে ভালোবাসত। মেঘের ভেতরে সে নিজের অদেখা ভবিষ্যৎ খুঁজে বেড়াত।
স্কুলে আবিদা ছিল মেধাবী ছাত্রী। পড়াশোনার প্রতি তার ছিল অসম্ভব ভালোবাসা। শিক্ষকরা তাকে খুব পছন্দ করতেন। তারা বলতেন, মেয়েটার চোখে স্বপ্ন আছে। কিন্তু বাড়িতে ফিরে সে শুনত ভিন্ন কথা। আত্মীয়স্বজন প্রায়ই বলত, "মেয়ে মানুষ এত পড়ে কী হবে? শেষ পর্যন্ত তো সংসারই করতে হবে।" কথাগুলো শুনে তার মন খারাপ হতো, কিন্তু সে কাউকে কিছু বলত না। নিজের ডায়েরির পাতায় সব কষ্ট লিখে রাখত।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আবিদা বড় হতে লাগল। মাধ্যমিক পরীক্ষায় সে খুব ভালো ফল করল। পুরো এলাকায় তার নাম ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হলো না। পরিবারের কিছু মানুষ তার পড়াশোনা বন্ধ করে বিয়ের কথা বলতে শুরু করল। আবিদার পৃথিবী যেন মুহূর্তেই অন্ধকার হয়ে গেল। তার মনে হলো, এতদিন ধরে যে স্বপ্নগুলোকে বুকের ভেতর লালন করেছে, সেগুলো হয়তো একে একে মরে যাবে। কিন্তু সে হার মানল না। প্রথমবারের মতো নিজের জন্য কথা বলল। কাঁপা কণ্ঠে বলল, "আমি পড়তে চাই। আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই।"
তার এই কথায় অনেকেই রাগ করেছিল। কেউ বলেছিল সে অবাধ্য, কেউ বলেছিল সে পরিবারের সম্মান নষ্ট করছে। কিন্তু আবিদা নিজের সিদ্ধান্তে অটল রইল। অনেক ঝড়ঝাপটার পর অবশেষে সে শহরে পড়তে যাওয়ার সুযোগ পেল। নতুন শহর, নতুন জীবন, নতুন সংগ্রাম। সেখানে তার জন্য কেউ অপেক্ষা করে ছিল না। টাকার অভাবে তাকে টিউশনি করতে হতো। কখনো কখনো সারাদিন পরিশ্রম করে ক্লান্ত শরীর নিয়ে রাতে পড়তে বসত। চোখে ঘুম থাকত, কিন্তু স্বপ্নগুলো তাকে জাগিয়ে রাখত।
শহরের জীবন তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছিল। মানুষকে চিনতে শিখিয়েছিল। বিশ্বাস করতে শিখিয়েছিল, আবার বিশ্বাস ভাঙার কষ্টও দিয়েছিল। যাদের আপন ভেবেছিল, তাদের কেউ কেউ তাকে আঘাত করেছিল। তার সাফল্যকে ছোট করে দেখেছিল। আবিদা অনেক রাত কেঁদেছে। নিজের ঘরের অন্ধকারে বসে ভেবেছে, হয়তো সে সত্যিই ভুল পথে হাঁটছে। কিন্তু প্রতিবারই সে নিজেকে নতুন করে গুছিয়ে নিয়েছে। কারণ সে জানত, থেমে গেলে সব শেষ হয়ে যাবে।
বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রমের পর আবিদা নিজের যোগ্যতায় একটি ভালো চাকরি পেল। ধীরে ধীরে সে নিজের পরিচয় তৈরি করল। মানুষ তাকে তার নাম দিয়ে চিনতে শুরু করল, কারো মেয়ে বা কারো বোন হিসেবে নয়। তার অর্জন, তার পরিশ্রম এবং তার আত্মবিশ্বাসই হয়ে উঠল তার পরিচয়।
অনেক বছর পর একদিন সে নিজের গ্রামে ফিরে এল। সেই গ্রাম, যেখানে একসময় তার স্বপ্ন নিয়ে হাসাহাসি করা হতো। আজ সেই গ্রামের অনেক মেয়েই তাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়। যারা একদিন বলেছিল মেয়েদের স্বপ্ন দেখা উচিত নয়, তারাই এখন নিজেদের মেয়েদের বলে, "আবিদার মতো হতে শিখো।"
সন্ধ্যাবেলায় আবিদা গ্রামের সেই পুরোনো মাঠে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল। শৈশবের মতোই মেঘগুলো ভেসে যাচ্ছে। তার মনে পড়ল সেই ছোট্ট মেয়েটার কথা, যে একদিন জানালার পাশে বসে চুপচাপ স্বপ্ন দেখত। জীবন তাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে, অনেক অশ্রু দিয়েছে, কিন্তু সেই কষ্টই তাকে শক্ত করেছে। সেই অশ্রুই তাকে নিজের পরিচয় খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে।
মানুষ একসময় তাকে অবহেলা করেছিল, বুঝতে চায়নি, তার স্বপ্নকে গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু আজ সে আর সেই আগের মেয়ে নয়। আজ সে প্রমাণ করেছে যে একজন মেয়ের পরিচয় তার লিঙ্গে নয়, তার সাহসে; তার জন্মে নয়, তার কর্মে।
আর সেই কারণেই তার জীবনের গল্পের নাম—"উদাসীনি"। কারণ একসময় যে মেয়েটি নীরবে সব কষ্ট সহ্য করেছিল, সেই মেয়েটিই একদিন হাজারো নারীর সাহসের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
---
কিন্তু মানুষের জীবনে সাফল্য পেলেই সব কষ্ট শেষ হয়ে যায় না। আবিদার জীবনেও হয়নি। চাকরি, সম্মান আর পরিচয় পাওয়ার পরও তার ভেতরে কোথাও একটা শূন্যতা রয়ে গিয়েছিল। কারণ সে জানত, তার এই পথচলায় অনেক স্বপ্ন পূরণ হলেও কিছু স্বপ্ন মাঝপথেই হারিয়ে গেছে। অনেক সম্পর্ক সময়ের স্রোতে ভেসে গেছে। অনেক মানুষ, যারা একসময় তার জীবনের অংশ ছিল, আজ শুধু স্মৃতি।
গ্রামে ফিরে আসার পর আবিদা দেখতে পেল, আগের সেই ছোট্ট গ্রাম অনেক বদলে গেছে। কাঁচা রাস্তার জায়গায় পাকা রাস্তা হয়েছে, পুরোনো দোকানগুলোর জায়গায় নতুন ভবন উঠেছে। কিন্তু কিছু জিনিস বদলায়নি। এখনও অনেক মেয়ে পরিবারের চাপে নিজের স্বপ্নকে বিসর্জন দিচ্ছে। এখনও অনেক পরিবার মনে করে মেয়েদের জীবনের একমাত্র গন্তব্য বিয়ে।
এই দৃশ্যগুলো আবিদার হৃদয়কে নাড়া দিল। সে বুঝতে পারল, তার সংগ্রাম শুধু নিজের জন্য ছিল না। তার মতো আরও অনেক মেয়ের জন্য কিছু করা দরকার।
সেই ভাবনা থেকেই সে গ্রামের মেয়েদের জন্য একটি শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিল। প্রথমদিকে অনেকেই তাকে নিরুৎসাহিত করেছিল। কেউ বলেছিল, "এসব করে লাভ নেই।" কেউ বলেছিল, "মেয়েদের এত স্বাধীনতা দিলে সংসার ভেঙে যাবে।"
কিন্তু আবিদা এবার আর থামেনি। কারণ সে জানত, পরিবর্তন কখনো সহজে আসে না।
ধীরে ধীরে গ্রামের মেয়েরা তার কাছে আসতে শুরু করল। কেউ পড়াশোনার সাহায্য চাইত, কেউ নিজের স্বপ্নের কথা বলত, কেউ আবার শুধু নিজের মনের কষ্টগুলো ভাগ করে নিতে চাইত। আবিদা তাদের কথা শুনত। কারণ সে জানত, একজন মানুষের জীবনে কখনও কখনও শুধু একজন শ্রোতারই প্রয়োজন হয়।
একদিন একটি ছোট মেয়ে তার কাছে এসে বলল, "আপু, আমি বড় হয়ে আপনার মতো হতে চাই।"
কথাটা শুনে আবিদার চোখ ভিজে উঠল। কারণ সে বুঝতে পারল, তার জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য কোনো পদ, কোনো অর্থ বা কোনো পুরস্কার নয়। তার সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো কারও স্বপ্নের কারণ হয়ে ওঠা।
বছর কয়েক পরে সেই শিক্ষাকেন্দ্রটি একটি বড় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হলো। আশপাশের অনেক গ্রাম থেকে মেয়েরা সেখানে পড়তে আসতে লাগল। কেউ শিক্ষক হলো, কেউ ডাক্তার, কেউ লেখক, কেউ ব্যবসায়ী। আর তাদের প্রত্যেকের গল্পের কোথাও না কোথাও আবিদা রাহার নাম জড়িয়ে রইল।
এক বর্ষার বিকেলে, জানালার পাশে বসে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ছিল আবিদা। তার সামনে খোলা ছিল বহু বছরের পুরোনো সেই ডায়েরি। ডায়েরির প্রথম পাতায় কাঁপা হাতে লেখা ছিল—
"একদিন আমি নিজের পরিচয় তৈরি করব।"
লাইনটা পড়ে তার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল, আর ভেতরে তার মন শান্ত হয়ে যাচ্ছিল। কারণ সে অবশেষে বুঝতে পেরেছিল, জীবন মানে শুধু নিজের জন্য বেঁচে থাকা নয়। জীবন মানে অন্য কারও পথের আলো হয়ে ওঠাও।
ডায়েরির শেষ পাতায় সে লিখল—
"আমাকে একদিন সবাই উদাসীনি বলে চিনত। কারণ আমি চুপচাপ ছিলাম, নিজের কষ্ট কাউকে বলতাম না। কিন্তু আজ আমি জানি, নীরব মানুষও ইতিহাস লিখতে পারে। যদি তার ভেতরে স্বপ্ন বেঁচে থাকে, তবে কোনো বাধাই তাকে থামাতে পারে না।"
কলমটা বন্ধ করে আবিদা জানালার বাইরে তাকাল। আকাশে তখন মেঘ সরে গিয়ে এক টুকরো আলো দেখা দিয়েছে।
আর সেই আলোর মতোই, তার গল্প শেষ হলেও তার রেখে যাওয়া সাহস বেঁচে রইল অসংখ্য মেয়ের হৃদয়ে।
সমাপ্ত।