আয়ুষ রান্নাঘরের দরজায় ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, মুখ গম্ভীর।
— "মা, রুদ্র কেন এসেছে? এত বছর পর হঠাৎ?"
সাতমা একটু বিরক্ত মুখে থামিয়ে দিলেন আয়ুষকে,
— "তুই জানতে চাস কেন? ও এলে তোর সমস্যা কী? ও তো এই বাড়িরই ছেলে। তোর কাকা ওকে মানুষ করেছে।"
আয়ুষ একটু হকচকিয়ে গেল, তবু ঠোঁট কামড়ে বলল,
— "না মানে, কিছু না... ছয় বছর তো কোনো খবরই নেই, কোনো ফোন না, মেসেজ না... আর এখন হঠাৎ করে এসে হাজির। সেটা তো... একটু অদ্ভুত লাগে না?"
সাতমা তখন চুপচাপ সবজি কাটছিলেন, মুখে বিরক্তির ছাপ।
— "তুই বরং নিজের জীবন নিয়ে ভাব। অন্যের নিয়ে বেশি মাথা ঘামাস না।"
সাতমা হালকা গলায় বললেন,
— "এই আয়ুষ, রান্নাঘরে আয়, একটু সাহায্য কর।"
আয়ুষ ভ্রু কুঁচকে উত্তর দিল,
— "না মা, তুমি বরং তোমার আদরের রুদ্রর জন্য নিজের হাতেই রান্না করো। আমি ছুঁলে খাবারের স্বাদই তেতো হয়ে যাবে।"
আয়ুষের মুখে তীক্ষ্ণ বিদ্রূপ। সৎমার মুখ এক মুহূর্তে রাগে লাল হয়ে উঠল।
— "এই ছেলে! মুখ সামলে কথা বলিস!"
আয়ুষ হঠাৎই ঘুরে দাঁড়িয়ে, গজগজ করতে করতে দৌড়ে বেরিয়ে গেল রান্নাঘর থেকে। সে সোজা ছুটে গেল হলঘরের দিকে, যেন আর এক মুহূর্তও ওই রান্নাঘরে থাকা যায় না। পেছনে সৎমা দাঁড়িয়ে রইলেন ক্ষুব্ধ মুখে।
আয়ুষ ধপ করে গিয়ে বসে পড়ল ডানদিকের বড় সোফাটায়। রাগে ফুঁসছিল তার বুক। হলরুমটা বেশ বড়, ছিমছাম এবং রাজকীয় সাজে সাজানো। দেয়ালের একপাশে রুদ্রের একটা ছেলেবেলার ছবি— আয়ুষ হঠাৎ চোখ সরিয়ে নিল সেদিক থেকে।
তার মন এতটাই উত্তাল ছিল যে এই সাজানো গুছানো ঘরটাও যেন তার চোখে বিষাক্ত মনে হচ্ছিল। তখনই ডানদিকের করিডোর দিয়ে কাকা ভেতরে এলেন। তাঁর মুখে পরিচিত হাসি।
— "কী ব্যাপার আয়ুষ ম্যাডাম— থুড়ি, আয়ুষ সাহেব! আজ কলেজে গেলে না?"
তিনি মৃদু হাসতে হাসতে আয়ুষের পাশের সোফায় গিয়ে বসলেন। আয়ুষ চোখ সরিয়ে নিল। একবার গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
— "মন ভালো নেই, তাই যাইনি।"
কাকা একটু অবাক গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
— "মন খারাপ কেন? আবার রনির সাথে ঝগড়া করেছো?"
আয়ুষ চুপ। তার মনে চলছিল অন্য ঝড়। কাকা মৃদু হাসলেন,
— "তুমি কিন্তু এখনও সেই ছোট্ট আয়ুষই আছো... মুখ ফুলে থাকো, কারো কথার উত্তর দাও না।"
আয়ুষ এবার মুখ ঘুরিয়ে বলল,
— "কেউ যখন সবকিছু নিজের মতো করে নিয়ে নেয়, তখন মুখ না ফোলানোই ভালো।"
কাকা হালকা হাসি মুখে বললেন,
— "ভালই করেছো আজ কলেজে না গিয়ে। আজ তো রুদ্র আসছে, তাই ভাবছিলাম—"
আয়ুষ হঠাৎ কাকাকে থামিয়ে বলল, বিরক্তিতে গলা কাঁপছে,
— "প্লিজ কাকা! আপনিও শুরু করলেন? সকাল থেকে সবাই শুধু রুদ্র রুদ্র করে যাচ্ছে! মনে হচ্ছে আমি কোনো গেস্ট হাউসে থাকি, আর সে এই বাড়ির রাজপুত্র!"
কাকা হেসে ফেললেন।
— "আরে রে রে! এত রেগে যাচ্ছিস কেন বাবা? রুদ্র এখন বিশাল বড় মানুষ হয়েছে। তুই তো ওর খেলার সাথী ছিলি ছোটবেলায়।"
আয়ুষ নাক সিঁটকে বলল,
— "আনন্দ আপনাদের হতে পারে কাকা, আমার না। আর ওর সাথে খেলার নাম করে ছোটবেলায় আমি কতবার মার খেয়েছি, ভুলে গেছেন?"
ডাইনিং টেবিলের চারপাশে ধীরে ধীরে সবাই এসে বসছে। সবার আগে এল সৌম্য, আয়ুষের ১৫ বছর বয়সী ছোট ভাই। এরপর কাকা, বিশু দা এবং তাঁর স্ত্রী টিনা। সবশেষে এলেন আয়ুষের বাবা।
আয়ুষ মুখ শক্ত করে টেবিলে গিয়ে বসল, সৌম্যর পাশে। টেবিলে তখন গরম পরোটা আর আলুর দমের সুগন্ধ।
আয়ুষ পরোটার টুকরো মুখে দিতে দিতে হঠাৎ বলল,
— "বিশু দাদা, আজ অফিসে যাচ্ছো না?"
বিশু হেসে বলল,
— "আজ তো রুদ্র আসছে, তাই ভাবলাম বাসায়ই থাকি।"
আয়ুষ মুখ ভার করে বিড়বিড় করল, "ওহ... সবাই দেখি লাটসাহেবের জন্য ছুটি নিয়ে বসে আছে!"
খাওয়ার শেষে সৌম্য ব্যাগ কাঁধে তুলে নিতে নিতে জিজ্ঞেস করল,
— "রুদ্র দাদা তো রাতে আসবে, তাই তো?"
সাতমা মাথা নেড়ে বললেন,
— "হ্যাঁ, ওর ফ্লাইট রাত আটটার দিকে।"
আয়ুষ একটু খ্যাপানোর সুরে সৌম্যকে বলল,
— "উহু! ‘রুদ্র দাদা’! কী মিষ্টি সুরে বললি! রুদ্র আসছে শুনেই তোর মুখে এত আলো কেন রে?"
সৌম্য হেসে বলল, "আরে ভাইয়া! তুমি না শুধু খ্যাপাও!"
রাত দশটা। পশ্চিমবঙ্গ বিমানবন্দর।
বিমানের স্লাইডিং দরজা খুলতেই বেরিয়ে এল দুজন পুরুষ। দুজনেই লম্বা, সুদর্শন, গা শিউরে ওঠার মতো ব্যক্তিত্ব।
একজন—কালো ব্লেজারে, নিখুঁত করে সাজানো চুল, চোখে অদ্ভুত ঠান্ডা ভাব। এ যেন রুদ্র—ছয় বছর আগে এই মাটি ছেড়ে যাওয়া সেই দাম্ভিক ছেলেটা আজ একজন সফল বিজনেস টাইকুন।
তার ঠিক পিছনে আরেকজন—লম্বা, সুদর্শন, কিন্তু মুখে একটা কাটা দাগ। চোখে চড়া দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা। চারদিকে বিলাসবহুল কালো গাড়ি আর দেহরক্ষীদের কড়া বেষ্টনী।
রুদ্র গম্ভীর মুখে চশমা ঠিক করে বলল,
— “চলো। এখানে এক মিনিটও থাকব না।”
গাড়ির দরজা খুলে গেল। রুদ্র বসে পড়ল ভিতরে। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই বিশাল রাজবাড়ি আর একটা চেনা মুখ... সেই অভিমানী ছেলেটা... আয়ুষ...
রাতের আঁধারে গাড়িগুলো নিঃশব্দে ছুটে চলল শহরের দিকে।