পুরোনো চাবির গল্প - 1 in Bengali Horror Stories by writer subra books and stories PDF | পুরোনো চাবির গল্প - 1

Featured Books
Categories
Share

পুরোনো চাবির গল্প - 1

শ্যামলপুর গ্রামের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল রায়বাড়ি। লোকে বলত, ওই বাড়িতে নাকি ভূত থাকে। কিন্তু আমার ঠাকুমা বলতেন, “ভূত না রে, ওখানে থাকে একটা গল্প। যে গল্পের শেষটা কেউ জানে না।”আমি তখন ক্লাস টেনে পড়ি। স্কুল ছুটির পর রোজ বিকেলে নদীর পাড়ে বসে বই পড়তাম। সেদিনও বসেছিলাম। হঠাৎ নদীর ধারে ভেজা বালির মধ্যে ঝিকঝিক করে কী যেন চকচক করল। কৌতূহল নিয়ে হাতে তুলে দেখি, একটা পুরোনো লোহার চাবি। মরচে ধরা, কিন্তু গায়ে কারুকাজ করা। দেখেই মনে হল, এটা কোনো সাধারণ চাবি নয়।বাড়ি এসে ঠাকুমাকে দেখালাম। ঠাকুমা চাবিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “এই চাবি আমি চিনি। এটা রায়বাড়ির।”“রায়বাড়ির?” আমি অবাক হলাম। “ওই ভূতের বাড়ির?”ঠাকুমা হাসলেন। “ভূত না রে পাগল। গল্প বলি শোন।”অনেক বছর আগে, রায়বাড়িতে থাকতেন রায়কর্তা নরেন্দ্রনাথ। তার একমাত্র মেয়ে ছিল মালতী। মালতী ছিল খুব মেধাবী, কিন্তু তার বাবা চাইতেন সে বিয়ে করে সংসারী হোক। মালতী কিন্তু চাইত পড়াশোনা করতে, কলকাতায় গিয়ে ডাক্তারি পড়তে।একদিন নরেন্দ্রনাথ মেয়ের ঘরে একটা সিন্দুক দেখতে পেলেন। সিন্দুকটা সবসময় তালা দেওয়া থাকত। তিনি মালতীকে জিজ্ঞেস করলেন, “এর মধ্যে কী আছে?”মালতী বলল, “আমার স্বপ্ন, বাবা।”নরেন্দ্রনাথ রেগে গিয়ে সিন্দুকটা ভেঙে ফেললেন। ভেতর থেকে বেরোল মালতীর লেখা ডায়েরি, কিছু বই, আর একটা মেডিকেল কলেজের ভর্তির ফর্ম। নরেন্দ্রনাথ সব পুড়িয়ে দিলেন। মালতী সেদিন আর কিছু বলেনি। শুধু নিজের গলার চাবিটা খুলে নদীতে ফেলে দিয়েছিল।“তারপর?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।“তারপর মালতী আর কোনোদিন হাসেনি। কিছুদিনের মধ্যেই সে অসুখে পড়ে মারা গেল। রায়কর্তা বুঝতে পারলেন তিনি কত বড় ভুল করেছেন। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। মালতী মারা যাওয়ার পর রায়বাড়ি ফাঁকা হয়ে গেল। লোকে বলতে লাগল, ওখানে মালতীর অতৃপ্ত আত্মা ঘোরে।”ঠাকুমার কথা শুনে আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। পরের দিন আমি আবার নদীর পাড়ে গেলাম। ইচ্ছে হল, মালতীর জন্য কিছু করতে।রায়বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে দেখলাম, বাড়িটা সত্যিই পরিত্যক্ত। দরজা-জানলা ভাঙা, দেওয়ালে লতা পাতা। সাহস করে ভেতরে ঢুকলাম। ধুলো আর মাকড়সার জালে ভরা একটা ঘরে টেবিলের ওপর পড়ে আছে একটা পোড়া ডায়েরির অংশ। কয়েকটা পাতা তখনও আস্ত আছে।একটা পাতায় লেখা:  “আমি ডাক্তার হতে চাই। শুধু নিজের জন্য না, এই গ্রামের মানুষের জন্য। এখানে একটা ছোট ডিসপেনসারি নেই। কত মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা যায়। বাবা বোঝে না।”আরেকটা পাতায় লেখা:  “আজ বাবা আমার সিন্দুক ভেঙেছে। আমার স্বপ্ন পুড়িয়েছে। কিন্তু স্বপ্ন কি আগুনে পোড়ে? আমি আবার লিখব। যতবার পোড়াবে, ততবার লিখব।”পড়তে পড়তে চোখ ভিজে গেল। বুঝলাম, মালতী হেরে যায়নি। তার স্বপ্নটা রয়ে গেছে এই পোড়া পাতার ভাঁজে।আমি ঠিক করলাম, মালতীর স্বপ্ন আমি পূরণ করব। বাড়ি ফিরে এসে গ্রামের মোড়লদের সঙ্গে কথা বললাম। প্রথমে তারা হাসল, বলল, “মেয়েছেলের ডাক্তারি পড়ার কী দরকার?”কিন্তু আমি হার মানলাম না। ঠাকুমার সাপোর্ট ছিল। তিনি নিজের গয়না বিক্রি করে কিছু টাকা দিলেন। গ্রামের কয়েকজন যুবকও এগিয়ে এল। আমরা সবাই মিলে রায়বাড়ির একটা অংশ পরিষ্কার করলাম।এক বছরের মধ্যে রায়বাড়ির একটা ঘরে ছোট্ট একটা ডিসপেনসারি খুললাম। নাম দিলাম “মালতী স্মৃতি স্বাস্থ্যকেন্দ্র”। ডাক্তার ছিলাম না আমি, কিন্তু শহর থেকে একজন নার্সদিদিকে নিয়ে এলাম। তিনি সপ্তাহে তিনদিন বসতেন।আস্তে আস্তে গ্রামের মানুষ আসতে লাগল। প্রথমে ভয়ে ভয়ে, তারপর বিশ্বাস করে। ছোটখাটো জ্বর, কাটাছেঁড়া, গর্ভবতী মায়েদের চেকআপ – সব হতে লাগল।একদিন এক বুড়ো লোক এসে বলল, “বাবা, তুমি তো রায়কর্তার ভুল শুধরে দিলে। মালতী মা বোধহয় শান্তি পেয়েছে।”সেদিন রাতে আমি আবার রায়বাড়িতে গেলাম। হাতে সেই পুরোনো চাবিটা। মালতীর ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে চাবিটা মেঝেতে রাখলাম। মনে বললাম, “মালতী দিদি, তোমার চাবি তোমাকে ফেরত দিলাম। তুমি যে দরজাটা খুলতে চেয়েছিলে, আমি সেই দরজাটা খুলেছি।”বিশ্বাস করো, সেদিন একটা ঠান্ডা হাওয়া বয়ে গেল। মনে হল কেউ ফিসফিস করে বলল, “ধন্যবাদ।”আজ পাঁচ বছর পর, মালতী স্মৃতি স্বাস্থ্যকেন্দ্র অনেক বড় হয়েছে। আমি নিজেও নার্সিং পড়ছি। ঠাকুমা নেই, কিন্তু তার শেখানো কথাটা আমি ভুলিনি – “প্রতিটা পুরোনো জিনিসের পেছনে একটা গল্প থাকে। সেই গল্পটা খুঁজে বের করাই আসল কাজ।”সেই পুরোনো চাবিটা এখন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের টেবিলের ওপর রাখা। সবাই জিজ্ঞেস করে, “এটা কিসের চাবি?”আমি হেসে বলি, “এটা একটা মেয়ের স্বপ্নের চাবি। যে স্বপ্ন কোনোদিন মরে না।”