“পূর্ণ ছায়ার শেষ চাল”
শেষ চাল কখনো হঠাৎ আসে না।
ওটা আসে তখনই—
যখন তুমি ভাবো
সবচেয়ে কঠিন সময়টা পেরিয়ে এসেছ।
রাত গভীর।
বৃষ্টির শব্দে শহর ঢেকে গেছে।
ইরা আর মায়া পাশাপাশি বসে আছে,
কথা নেই—
কিন্তু অস্বস্তি আছে।
মায়া হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।
— “কিছু ঠিক নেই,”
সে বলল।
— “ছায়ারা খুব চুপ।”
ইরা তাকাল।
— “চুপ মানেই তো বিপদ, তাই না?”
মায়া মাথা নাড়ল।
— “হ্যাঁ।
পূর্ণ ছায়া কখনো সরাসরি আক্রমণ করে না।
ও অপেক্ষা করে—
মানুষ ভাঙার জন্য।”
ঠিক তখনই
ঘরের আলো একবার ঝাঁপসা হয়ে নিভে গেল।
ইরা দাঁড়িয়ে পড়ল।
— “মায়া—”
ঘরের এক কোণে
অন্ধকার ঘন হয়ে উঠল।
ছায়া নয়—
কণ্ঠ।
— “খুব সুন্দর সিদ্ধান্ত নিয়েছ তোমরা।”
পূর্ণ ছায়ার গলা।
ইরার বুক ঠান্ডা হয়ে গেল।
— “তুমি আবার—”
— “এসেছি শেষ করতে,”
ছায়া বলল।
— “কারণ আলো আর ছায়া
একসাথে থাকলে
নিয়ম ভেঙে যায়।”
মায়া সামনে এগিয়ে গেল।
— “ওকে ছেড়ে দে।
যা চাইছিস, আমাকে নে।”
ছায়া হাসল।
— “এটাই তো আমি চাইছিলাম।”
হঠাৎ ইরার মাথার ভেতর
একটা ছবি ঢুকে পড়ল—
মায়া, একা।
অন্ধকারে বন্দী।
আর সে নিজে—
নিরাপদ।
পূর্ণ ছায়ার কণ্ঠ ফিসফিস—
— “একজনকে বাঁচাতে হলে
আরেকজনকে ছাড়তে হয়।”
ইরা চিৎকার করে উঠল—
— “মিথ্যে!”
তার শরীর থেকে আলো বেরোতে লাগল।
কিন্তু এবার আলো কাঁপছে।
মায়া বুঝে গেল।
— “ইরা… শোন।
ও তোকে ভাঙতে চাইছে।”
পূর্ণ ছায়া এগিয়ে এলো।
— “না।
আমি ওকে সত্য দেখাচ্ছি।”
হঠাৎ দরজায় আরেকটা ছায়া।
রিয়া।
চোখে অদ্ভুত শান্তি।
— “আমি বলেছিলাম,”
সে ইরার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “ভালোবাসা যখন ভাঙে,
তখন মানুষ নিজেকে বাঁচায়।”
ইরা স্তব্ধ।
— “তুমি ওর সাথে—?”
রিয়া হালকা হাসল।
— “আমি কারো সাথে না।
আমি শুধু শেষটা দেখতে চাই।”
মায়ার চোখে রাগ।
— “তুমি চলে যাও।”
রিয়া কাঁধ ঝাঁকাল।
— “এই শেষটা আমারও।”
পূর্ণ ছায়া হাত তুলল।
ঘর কেঁপে উঠল।
— “সময় শেষ।
একজন বাঁচবে।”
নীরবতা।
ইরা মায়ার দিকে তাকাল।
মায়া কিছু বলল না।
শুধু চোখে বলল—
‘নিজেকে বাঁচা।’
ইরার চোখ ভিজে উঠল।
— “না,”
সে ফিসফিস করল।
— “এবার আমি পালাব না।”
সে মায়ার হাত ধরল।
— “যদি কাউকে নিতে হয়—
দু’জনকেই নিতে হবে।”
পূর্ণ ছায়া থমকে গেল।
প্রথমবার।
— “অসম্ভব।”
ইরার আলো হঠাৎ স্থির হয়ে গেল।
আর সেই স্থিরতাই ভয়ংকর।
— “ভালোবাসা নিয়ম মানে না,”
ইরা বলল।
— “ভালোবাসা নিজের নিয়ম বানায়।”
আলো আর ছায়া
একসাথে বিস্ফোরিত হলো।
ঘর অন্ধকারে ডুবে গেল।
শুধু একটাই প্রশ্ন বাতাসে রইল—
কে বাঁচল?
“যেখানে আলোও রক্তাক্ত হয়”
অন্ধকার কাটলে
সবসময় আলো আসে না।
কখনও আসে ধোঁয়া,
কখনও আসে শূন্যতা।
ইরা চোখ খুলল ধীরে।
মাথার ভেতর ঝাঁঝরা ব্যথা।
চারপাশে ভাঙা দেয়াল, ছাই, ছড়িয়ে থাকা ছায়ার দাগ।
— “মায়া…?”
কণ্ঠ বেরোল না প্রথমে।
গলা শুকনো।
হঠাৎ এক হাত তার আঙুল চেপে ধরল।
— “আমি আছি।”
মায়ার কণ্ঠ।
কিন্তু আগের মতো না—
ভাঙা, ক্লান্ত, রক্তমাখা।
ইরা উঠে বসতেই দেখল—
মায়ার কাঁধে গাঢ় কালো দাগ,
যেন ছায়া পুড়িয়ে দিয়েছে।
— “তুমি ঠিক আছ?”
ইরা ছুঁতে যেতেই মায়া হালকা কেঁপে উঠল।
— “ছুঁইস না,”
সে বলল।
— “এখনও স্থির হয়নি।”
ইরার বুক কেঁপে উঠল।
— “কী স্থির হয়নি?”
মায়া চোখ নামাল।
— “আমার ভেতরেরটা।”
নীরবতা।
ভাঙা কাঁচে বৃষ্টির শব্দ।
হঠাৎ দূর থেকে একটা ধীর হাততালি।
তাল… তাল… তাল…
রিয়া।
সে দরজার ধারে দাঁড়িয়ে।
মুখে শান্ত হাসি।
— “তোমরা বেঁচে আছ,”
সে বলল।
— “অভিনন্দন।”
ইরা দাঁড়িয়ে পড়ল।
— “এটা তোমার পরিকল্পনা ছিল?”
রিয়া মাথা নাড়ল।
— “না।
কিন্তু আমি জানতাম—
ও শেষ চাল দেবে।”
মায়া দাঁত চেপে বলল—
— “তুমি ওকে ডাকলে কেন?”
রিয়া তাকাল মায়ার দিকে।
— “কারণ তুমি সবসময় শক্ত থাকতে চাও।
আর শক্ত মানুষ
নিজের অন্ধকার দেখতে পায় না।”
ইরা মাঝখানে ঢুকে পড়ল।
— “এখন কী চাও?”
রিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— “সত্য।”
সে ইরার দিকে তাকাল।
— “ও পুরোপুরি মানুষ না আর, ইরা।
ওর ভেতরে পূর্ণ ছায়ার অংশ ঢুকে গেছে।”
ইরার বুকের ভেতর শূন্যতা নামল।
— “মিথ্যে।”
মায়া কিছু বলল না।
এই নীরবতাই
সবচেয়ে ভয়ংকর।
ইরা ফিসফিস করে বলল—
— “মায়া…?”
মায়া চোখ তুলল।
চোখের গভীরে
একটা অচেনা অন্ধকার।
— “ও ঠিক বলছে,”
মায়া বলল।
— “যখন বিস্ফোরণ হলো…
আমি পুরোটা ঠেকাতে পারিনি।”
ইরার চোখে পানি জমল।
— “মানে?”
— “মানে,”
মায়া ধীরে বলল,
— “কখনও কখনও
আমি নিজেকে থামাতে পারব না।”
রিয়া শান্ত কণ্ঠে যোগ করল—
— “আর তখন
ও সবচেয়ে কাছের মানুষকেই আঘাত করে।”
ইরা এক পা পিছিয়ে গেল।
মায়ার গলা কাঁপল—
— “ইরা, বিশ্বাস কর…
আমি লড়ব।”
ইরা তাকিয়ে রইল।
ভালোবাসা, ভয়, বিশ্বাস—
সব একসাথে চেপে ধরেছে।
— “আমি জানি,”
ইরা বলল।
— “কিন্তু যদি একদিন
তুমি আমাকে চিনতে না পারো?”
মায়া কিছু বলল না।
শুধু চোখ বন্ধ করল।
এই চুপ থাকাটাই
ইরার হৃদয়ে ফাটল ধরাল।
রিয়া ধীরে বলল—
— “এটাই সেই জায়গা
যেখানে ভালোবাসা
রক্তাক্ত হয়।”
বাইরে বজ্রপাত।
ইরা গভীর শ্বাস নিল।
— “আমরা পালাব না,”
সে বলল।
— “কিন্তু আমি অন্ধও হব না।”
মায়া তাকাল।
— “মানে?”
— “মানে,”
ইরা ধীরে বলল,
— “আমাদের আলাদা থাকতে হবে—
কিছুদিন।”
ঘর নিস্তব্ধ।
মায়ার চোখে যেন কিছু ভেঙে গেল।
— “ইরা—”
— “না,”
ইরা মাথা নাড়ল।
— “এটা শাস্তি না।
এটা বাঁচার চেষ্টা।”
রিয়া চুপ করে সব দেখল।
ইরা দরজার দিকে এগোল।
— “যদি তুমি নিজেকে জিতে ফেরো,”
সে পেছনে না তাকিয়েই বলল,
— “আমি এখানেই থাকব।”
দরজা বন্ধ হলো।
মায়া একা দাঁড়িয়ে রইল।
হাত কাঁপছে।
রিয়া ধীরে কাছে এলো।
— “এটাই শুরু,”
সে বলল।
— “শেষ না।”
মায়া চোখ তুলল।
— “আমি জানি।”
আর সেই চোখে
একটাই প্রতিজ্ঞা—
নিজেকে হারালেও
ভালোবাসা হারাবে না।