“শেষ যুদ্ধের আহ্বান”
ভোরের আলো ধীরে ধীরে শহরের উপর ছড়িয়ে পড়ছে।
ঝড় থেমে গেছে…
কিন্তু বাতাসে এখনো অদ্ভুত একটা ভার।
ইরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।
তার চোখে ক্লান্তি… তবুও শান্ত একটা দৃঢ়তা।
পেছন থেকে মায়া এসে দাঁড়াল।
— “ঘুমাসনি?”
ইরা হালকা হাসল।
— “আজ ঘুম আসেনি… মনে হচ্ছিল কিছু আসছে।”
মায়া চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
সে জানে—
ইরার অনুভূতি খুব কম ভুল হয়।
ঠিক তখনই
আকাশ হঠাৎ অদ্ভুতভাবে অন্ধকার হয়ে উঠল।
সূর্যের আলো যেন কেউ গিলে ফেলল।
চারদিকে ঠান্ডা বাতাস বইতে লাগল।
মায়ার শরীর শক্ত হয়ে গেল।
— “ও এসে গেছে…”
ইরার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
— “পূর্ণ ছায়া?”
মায়া ধীরে মাথা নাড়ল।
শহরের মাঝখানের পুরনো ভাঙা কারখানা।
চারদিকে ধুলো…
জং ধরা লোহা…
নিস্তব্ধতা।
মায়া আর ইরা ভিতরে ঢুকল।
মাটিতে অদ্ভুত কালো চিহ্ন আঁকা।
হঠাৎ চারপাশের দেয়াল কাঁপতে শুরু করল।
অন্ধকার ধীরে ধীরে জমে একটা বিশাল আকৃতি নিল।
পূর্ণ ছায়া এবার আগের মতো না।
তার শরীর আরও বড়…
আরও ভয়ংকর।
তার চোখ দুটো জ্বলছে আগুনের মতো।
— “অবশেষে তোমরা এসেছ।”
তার কণ্ঠে ভারী প্রতিধ্বনি।
ইরা মায়ার হাত শক্ত করে ধরল।
পূর্ণ ছায়া বলল—
— “আমি তোমাদের অপেক্ষায় ছিলাম… কারণ শেষ যুদ্ধ সবসময় স্বেচ্ছায় শুরু হয়।”
মায়া ঠান্ডা গলায় বলল—
— “এইবার শেষ করব।”
পূর্ণ ছায়া হাসল।
— “তুমি ভাবছ আমাকে ধ্বংস করবে?”
চারদিকে অন্ধকার ঘুরতে লাগল।
— “আমি ধ্বংস হই না… আমি ভয়, সন্দেহ আর হারানোর যন্ত্রণায় বাঁচি।”
ইরা এগিয়ে এল।
— “তাহলে আজ তোর খাবার শেষ।”
পূর্ণ ছায়া থেমে গেল।
— “তুমি নিশ্চিত?”
তার হাত উঠতেই
চারপাশে দৃশ্য বদলে গেল।
ইরা হঠাৎ নিজেকে একা দেখতে পেল।
মায়া নেই।
চারদিকে শুধু অন্ধকার।
তার কানে ভেসে এল পরিচিত কণ্ঠ—
— “সবাই একসময় ছেড়ে যায়…”
ইরার চোখে ভয় ফুটে উঠল।
সে বুঝল—
পূর্ণ ছায়া তার ভয় নিয়ে খেলছে।
অন্যদিকে
মায়া নিজেকে দেখতে পেল ভাঙা আয়নার মাঝে।
প্রতিটা আয়নায় তার আলাদা রূপ।
একটা রূপ সম্পূর্ণ আলো…
একটা সম্পূর্ণ অন্ধকার…
আর একটা রূপ ভেঙে পড়া।
পূর্ণ ছায়ার কণ্ঠ ভেসে এল—
— “তুমি সিদ্ধান্ত নাও… তুমি কে?”
মায়ার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
সে আয়নাগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে ভেসে উঠল—
ইরার হাসি…
ওদের প্রথম দেখা…
ওদের বিচ্ছেদ…
আর আবার ফিরে আসা।
তার চোখে জল চলে এল।
— “আমি শুধু আলো না…”
সে ফিসফিস করল।
— “আমি শুধু অন্ধকারও না…”
তার কণ্ঠ শক্ত হলো।
— “আমি দুটো নিয়েই আমি।”
সব আয়না একসাথে ভেঙে গেল।
মায়ার চারপাশে আলো বিস্ফোরিত হলো।
এদিকে ইরা হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছিল।
অন্ধকার তাকে ঘিরে ফেলেছে।
পূর্ণ ছায়া বলল—
— “তুমি সবসময় ভয় পাবে… কারণ ভালোবাসা হারানোর ভয় কখনো যায় না।”
ইরার চোখ বন্ধ হয়ে গেল।
তার মনে পড়ল—
মায়া তাকে বলেছিল—
“ভয় থাকা মানে দুর্বল হওয়া না।”
ইরা ধীরে উঠে দাঁড়াল।
— “হ্যাঁ… আমি ভয় পাই।”
পূর্ণ ছায়া থেমে গেল।
ইরা বলল—
— “কিন্তু ভয় থাকলেও আমি ভালোবাসা ছাড়ব না।”
এই কথা বলতেই
তার চারপাশে আলো ছড়িয়ে পড়ল।
অন্ধকার পিছিয়ে গেল।
হঠাৎ পুরো জায়গাটা কেঁপে উঠল।
মায়া আর ইরা আবার এক জায়গায় এসে দাঁড়াল।
পূর্ণ ছায়া এবার স্পষ্ট দুর্বল।
কিন্তু তার চোখে ভয়ংকর রাগ।
— “তোমরা ভাবছ জয়ী হয়ে গেছ?”
মায়া বলল—
— “না… কিন্তু তোর শেষ শুরু হয়ে গেছে।”
পূর্ণ ছায়া গর্জে উঠল।
সে পুরো শক্তি নিয়ে আঘাত করল।
অন্ধকার ঝড়ের মতো ছুটে এল।
মায়া আর ইরা একসাথে হাত ধরল।
তাদের শরীর থেকে আলো বের হতে লাগল।
দুটি শক্তি একসাথে মিলল।
ঘরের ভেতর বিস্ফোরণ ঘটল।
পূর্ণ ছায়া পিছিয়ে যেতে লাগল।
সে চিৎকার করল—
— “ভালোবাসা চিরকাল টেকে না!”
ইরা চিৎকার করে বলল—
— “টেকে… যদি কেউ ছাড়তে না চায়!”
মায়া শক্ত কণ্ঠে বলল—
— “আমরা ছাড়ব না।”
আলো পুরো জায়গা ঢেকে ফেলল।
পূর্ণ ছায়া ভেঙে যেতে লাগল।
কিন্তু শেষ মুহূর্তে
সে ফিসফিস করে বলল—
— “শেষ আঘাত এখনো বাকি…”
তার শরীর ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
সব শান্ত হয়ে গেল।
কারখানার ছাদ ভেঙে সূর্যের আলো ঢুকল।
ইরা হাঁপাচ্ছিল।
— “শেষ…?”
মায়া ধীরে বলল—
— “না… আমি অনুভব করছি… ও পুরোপুরি যায়নি।”
ইরা তার দিকে তাকাল।
— “তাহলে?”
মায়া আকাশের দিকে তাকাল।
— “শেষ যুদ্ধ এখনো সামনে… আর সেটা হবে এমন জায়গায়… যেখানে আমরা কেউ প্রস্তুত না।”
ইরা তার হাত শক্ত করে ধরল।
— “আমরা একসাথে থাকলে প্রস্তুতি লাগে না।”
মায়া হালকা হাসল।
— “ঠিক বলেছিস।”
দূরে আকাশে কালো মেঘ আবার জমতে শুরু করল।
কারণ
শেষ লড়াই এখনো বাকি।