“নতুন শপথ”
জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ জেতার পর
মানুষ বুঝতে পারে—
শান্তিই আসল শক্তি।
শরতের বিকেল।
হালকা রোদ।
ইরা আর মায়া নদীর ধারে হাঁটছিল।
বাতাসে ঠান্ডা একটা স্পর্শ।
মায়া হঠাৎ বলল—
— “তুই কি কখনো ভাবিস…
যদি আমরা সেইদিন আলাদা হয়ে যেতাম?”
ইরা একটু থামল।
— “ভাবি।”
মায়া তাকাল।
— “তাহলে?”
ইরা হালকা হাসল।
— “তাহলে হয়তো আমরা দু’জনেই বেঁচে থাকতাম…
কিন্তু বাঁচতাম না।”
কিছুক্ষণ দু’জনেই চুপ।
শুধু নদীর জল বইছে।
মায়া ধীরে বলল—
— “আমি আগে সবসময় ভয় পেতাম…
কাউকে হারানোর।”
ইরা তার হাত ধরল।
— “এখন?”
মায়া একটু ভেবে বলল—
— “এখনও ভয় পাই…
কিন্তু পালাই না।”
ইরা বলল—
— “এইটাই তো সাহস।”
নদীর ধারে একটা ছোট মন্দির ছিল।
ওরা সিঁড়িতে বসে পড়ল।
সূর্য ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে।
মায়া হঠাৎ বলল—
— “ইরা…”
— “হুম?”
— “আমরা কি একটা শপথ করব?”
ইরা অবাক হয়ে তাকাল।
— “কিসের শপথ?”
মায়া ধীরে বলল—
— “যে…
আমরা যত ঝগড়া করি,
যত ভুল করি,
যত ভয় পাই—
আমরা কখনো একে অপরকে ছেড়ে যাব না।”
ইরা কিছুক্ষণ চুপ রইল।
তার চোখে হালকা জল।
— “তুই জানিস… এইটা সবচেয়ে কঠিন শপথ।”
মায়া মাথা নাড়ল।
— “তাই তো করছি।”
ইরা ধীরে তার হাত শক্ত করে ধরল।
— “ঠিক আছে।”
— “আমিও একটা শপথ চাই।”
মায়া বলল—
— “কি?”
ইরা হেসে বলল—
— “যদি কখনো অন্ধকার ফিরে আসে…
আমরা একে অপরকে মনে করিয়ে দেব—
আমরা আগেও জিতেছি।”
মায়া চোখ বন্ধ করে মাথা নাড়ল।
— “ডিল।”
দু’জন হাত ধরে বসে রইল।
সূর্য পুরো ডুবে গেল।
আকাশে প্রথম তারা উঠল।
মায়া হালকা হাসল।
— “দেখ… তারা।”
ইরা বলল—
— “হ্যাঁ।
আগে মনে হতো অন্ধকারের মাঝে আলো।”
মায়া বলল—
— “এখন?”
ইরা তার দিকে তাকাল।
— “এখন মনে হয়—
অন্ধকারের মাঝেও আমরা আছি।”
বাতাসে ঠান্ডা বাড়ছে।
মায়া ধীরে বলল—
— “ইরা…”
— “হুম?”
— “ধন্যবাদ।”
ইরা অবাক।
— “কিসের জন্য?”
মায়া ফিসফিস করে বলল—
— “আমাকে ছাড়িসনি।”
ইরা হেসে বলল—
— “তুইও না।”
রাত নেমে এল।
নদীর জল অন্ধকারে ঝিলমিল করছে।
ওরা ধীরে হাঁটতে শুরু করল।
এবার কোনো যুদ্ধ নেই।
কোনো ছায়া নেই।
শুধু সামনে একটা দীর্ঘ জীবন।
মায়া বলল—
— “জানিস… আমাদের গল্পটা কেমন?”
ইরা জিজ্ঞেস করল—
— “কেমন?”
মায়া হেসে বলল—
— “ভুল পথে শুরু…
ঠিক পথে শেষ।”
ইরা মাথা নাড়ল।
— “না।”
মায়া অবাক—
— “তাহলে?”
ইরা ধীরে বলল—
— “শেষ না।
এটা শুধু শুরু।”
“শেষ না… আমাদের শুরু”
সময় কখনো থেমে থাকে না।
কিন্তু কিছু গল্প—
সময় পেরিয়েও
হৃদয়ে বেঁচে থাকে।
৩ বছর পরে…
শহরটা অনেক বদলে গেছে।
নতুন রাস্তা হয়েছে,
নতুন মানুষ এসেছে,
পুরনো স্মৃতি ধীরে ধীরে মুছে গেছে।
কিন্তু কিছু জিনিস—
আজও ঠিক আগের মতো।
একটা ছোট্ট বাড়ি।
জানালা দিয়ে সকালের রোদ ঢোকে।
ঘরের ভেতর হাসির শব্দ।
ইরা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে।
— “মায়া! চা খাবে?”
ভিতর থেকে গলার আওয়াজ—
— “চা না… আজ কফি বানাস!”
ইরা হেসে ফেলল।
— “আচ্ছা মেমসাহেব!”
মায়া এসে দরজার পাশে হেলান দিল।
তার চোখে এখন আর কোনো অন্ধকার নেই।
শুধু শান্তি।
— “জানিস… মাঝে মাঝে বিশ্বাসই হয় না।”
ইরা তাকাল—
— “কি?”
— “আমরা এত কিছু পেরিয়ে এখানে এসে দাঁড়িয়েছি।”
ইরা ধীরে কফির কাপটা এগিয়ে দিল।
— “আমরা থামিনি বলেই।”
দু’জন বারান্দায় এসে বসল।
আকাশ পরিষ্কার।
হালকা বাতাস।
মায়া ফিসফিস করে বলল—
— “তুই কি কখনো ভয় পাস এখনো?”
ইরা একটু ভেবে বলল—
— “পাই।”
মায়া তাকাল—
— “কিসের?”
ইরা হালকা হেসে বলল—
— “তোকে হারানোর।”
মায়া কিছুক্ষণ চুপ।
তারপর ধীরে বলল—
— “আমিও পাই।”
নীরবতা।
তারপর ইরা তার হাত ধরল।
— “কিন্তু এবার আমরা জানি—
ভয় থাকলেও পাশে থাকা যায়।”
দূরে একটা ছোট পার্ক।
সেখানে বাচ্চারা খেলছে।
হাসির শব্দ ভেসে আসছে।
মায়া তাকিয়ে রইল।
— “জীবনটা এখন কত সহজ লাগছে।”
ইরা বলল—
— “সহজ না…
আমরা একসাথে আছি বলে সহজ মনে হচ্ছে।”
হঠাৎ হালকা বাতাস বইল।
মায়া চোখ বন্ধ করল।
এক মুহূর্তের জন্য
পুরনো স্মৃতি ফিরে এলো—
অন্ধকার…
যুদ্ধ…
ভয়…
হারানোর আশঙ্কা…
তার চোখ হালকা কেঁপে উঠল।
ইরা সেটা বুঝে গেল।
সে ধীরে বলল—
— “হেই… ফিরে আয়।”
মায়া চোখ খুলল।
ইরার দিকে তাকাল।
আর সব ভয় মিলিয়ে গেল।
— “আমি আছি,”
ইরা বলল।
— “আমি জানি,”
মায়া উত্তর দিল।
সন্ধ্যা।
আকাশে লাল আলো।
ওরা দু’জন ছাদে দাঁড়িয়ে।
মায়া বলল—
— “ইরা… একটা কথা?”
— “হুম?”
— “আমরা কি আবার নতুন করে শুরু করতে পারি?”
ইরা হেসে ফেলল।
— “আমরা কি কখনো থেমেছিলাম?”
মায়া একটু লজ্জা পেয়ে বলল—
— “মানে… এবার কোনো ভয় ছাড়া।”
ইরা তার দিকে এগিয়ে এল।
— “ঠিক আছে।”
— “তাহলে বল—
তুই কি আমার সঙ্গে আবার জীবনটা শুরু করতে চাস?”
ইরা তার দুই হাত ধরল।
তার চোখে গভীর ভালোবাসা।
— “আমি তোকে ভুল পথে পেয়েছিলাম…”
মায়ার চোখ ভিজে উঠল।
ইরা ধীরে বলল—
— “কিন্তু তোকে ভালোবেসেছি
সবচেয়ে ঠিকভাবে।”
হালকা বাতাস।
চারপাশে নীরবতা।
শুধু হৃদয়ের শব্দ।
মায়া ফিসফিস করে বলল—
— “আমি আবারও তোকে বেছে নিচ্ছি।”
ইরা বলল—
— “আমিও।”
দু’জন একে অপরকে জড়িয়ে ধরল।
এইবার কোনো ভয় নেই।
কোনো অন্ধকার নেই।
কোনো যুদ্ধ নেই।
শুধু—
ভালোবাসা।
আকাশে একে একে তারা জ্বলতে শুরু করল।
মায়া উপরে তাকিয়ে বলল—
— “দেখ… তারা।”
ইরা বলল—
— “হ্যাঁ… আগেও দেখতাম।”
মায়া হাসল—
— “এখন কেমন লাগে?”
ইরা ধীরে বলল—
— “এখন মনে হয়…
আমাদের গল্পটা ওদের মতো—
অন্ধকারের মাঝেও জ্বলতে পারে।”
শেষ আলোটা মিলিয়ে গেল।
রাত নেমে এল।
ওরা দু’জন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।
হাত শক্ত করে ধরা।
কারণ—
ভালোবাসা মানে শুধু পাওয়া না…
ভালোবাসা মানে
সব হারানোর ভয় নিয়েও
একসাথে থাকা।
শেষ লাইন…
“আমরা ভুল পথে একে অপরকে পেয়েছিলাম—
কিন্তু ঠিক ভালোবাসা দিয়ে
একটা পুরো জীবন গড়ে তুলেছিলাম।”