পর্ব ৫: বন্ধ দরজার ওপাশে
বৃষ্টির শব্দটা যেন আরও ভারী হয়ে উঠেছে।
রায় ভিলার দ্বিতীয় তলার করিডোরে দাঁড়িয়ে আরোহীর মনে হচ্ছিল, সময় যেন ধীরে ধীরে থেমে যাচ্ছে।
তার হাতে এখনও সেই পুরোনো ছবিটা।
ছবির নিচে লেখা ভবিষ্যতের তারিখটা বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
১৭ আগস্ট, ২০২৬।
সে ধীরে ধীরে ছবিটা ভাঁজ করে ব্যাগে রাখল।
মেঘলা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— "আরোহী... আমার সঙ্গে এসো।"
— "কোথায়?"
— "সব প্রশ্নের উত্তর যেখানে লুকিয়ে আছে।"
অর্ণব তৎক্ষণাৎ সামনে এসে দাঁড়াল।
— "না।"
তার গলায় এবার আদেশের সুর।
— "ও ঘরটা খোলা যাবে না।"
মেঘলা ঠান্ডা চোখে অর্ণবের দিকে তাকাল।
— "চার বছর ধরে তুমিই তো ওটা বন্ধ করে রেখেছ। আর কতদিন?"
অর্ণব চোখ নামিয়ে ফেলল।
কয়েক মুহূর্ত পরে সে খুব আস্তে বলল,
— "কিছু দরজা বন্ধ থাকাই ভালো।"
মেঘলা তিক্ত হেসে উঠল।
— "না, দাদা। কিছু দরজা বন্ধ থাকলে মানুষ বাঁচে না... শুধু সত্যিটা বন্দি হয়ে থাকে।"
"দাদা" শব্দটা শুনে আরোহী চমকে উঠল।
সে বুঝতে পারছিল, এই ভাই-বোনের সম্পর্কের আড়ালে এমন কিছু লুকিয়ে আছে, যা এখনও কেউ বলেনি।
করিডোরের একেবারে শেষ প্রান্তে একটা কাঠের দরজা।
অন্য সব দরজার থেকে আলাদা।
দরজার ওপর খোদাই করা একটি নাম—
"মেঘলা"
আরোহী দরজার দিকে তাকিয়ে বলল,
— "এটা... তোমার ঘর?"
মেঘলা মাথা নাড়ল।
— "একসময় ছিল।"
— "এখন?"
সে মৃদু হাসল।
— "এখন শুধু স্মৃতি থাকে এখানে।"
দরজার হাতলে হাত রাখতেই আরোহী বুঝল—
হাতলটা বরফের মতো ঠান্ডা।
সে আস্তে চাপ দিল।
দরজাটা খুলে গেল।
ঘরে ঢুকতেই একটা হালকা সুগন্ধ নাকে এল।
পুরোনো বই...
শুকনো ফুল...
আর বৃষ্টিভেজা মাটির গন্ধ।
ঘরটা আশ্চর্যজনকভাবে পরিষ্কার।
মনে হচ্ছে, কেউ নিয়মিত যত্ন নেয়।
জানালার পাশে একটি কাঠের টেবিল।
টেবিলে একটি ডায়েরি।
একটি ক্যামেরা।
আর কাঁচের ফুলদানিতে শুকিয়ে যাওয়া কৃষ্ণচূড়া।
আরোহী ক্যামেরাটা হাতে নিল।
— "এটাই কি তোমার ক্যামেরা?"
মেঘলা চুপচাপ মাথা নাড়ল।
ক্যামেরা অন করতেই স্ক্রিনে একের পর এক ছবি ভেসে উঠতে লাগল।
শহরের রাস্তা।
বৃষ্টির ফোঁটা।
হাসিমুখ।
নদীর ঘাট।
তারপর...
আরোহীর বুক ধক করে উঠল।
স্ক্রিনে তার নিজের ছবি।
কলেজ স্ট্রিট।
বৃষ্টির দিন।
যেদিন তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল।
সে অবাক হয়ে বলল,
— "এটা তো সেদিনের ছবি..."
মেঘলা হেসে বলল,
— "হ্যাঁ।"
আরোহী পরের ছবিতে গেল।
তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
আরও একটা ছবি।
সে বই পড়ছে।
কিন্তু...
এটা তো সেদিনের নয়।
সে তো এই পোশাক পরে এক সপ্তাহ আগে লাইব্রেরিতে গিয়েছিল।
আরেকটা ছবি।
সে বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে।
আরেকটা।
সে পার্কে বসে ডায়েরি লিখছে।
আরোহী ধীরে ধীরে ক্যামেরাটা নামিয়ে রাখল।
তার গলায় কাঁপুনি।
— "তুমি... আমাকে আগে থেকেই চিনতে?"
মেঘলা কিছু বলল না।
শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
অনেকক্ষণ পরে খুব আস্তে বলল,
— "তোমাকে আমি প্রথম দেখিনি কলেজ স্ট্রিটে..."
আরোহীর বুক ধক করে উঠল।
— "তাহলে?"
মেঘলা তার দিকে তাকাল।
চোখে জল চিকচিক করছে।
— "আমি তোমাকে... অনেক আগে থেকেই দেখছিলাম।"
ঠিক সেই মুহূর্তে...
ঘরের কোণে রাখা পুরোনো ডায়েরিটা নিজে থেকেই খুলে গেল।
পাতাগুলো দ্রুত উল্টাতে লাগল।
ফড়ফড়... ফড়ফড়...
শেষে এসে একটা পাতায় থেমে গেল।
আরোহী ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে পড়তে শুরু করল।
পাতার ওপরে লেখা—
"যদি কোনোদিন আরোহী এই ঘরে আসে... তাহলে বুঝব, ভাগ্য আবার আমাদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।"
পাতার নিচে তারিখ—
১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২২।
আরোহীর হাত কেঁপে উঠল।
সে ফিসফিস করে বলল—
"কিন্তু... ২০২২ সালে তো আমি তোমাকে চিনতামই না..."
মেঘলা চোখ বন্ধ করে বলল—
"তুমি আমাকে চিনতে না... কিন্তু আমি তোমাকে চিনতাম।"
ঠিক তখনই নিচতলা থেকে প্রচণ্ড জোরে কাঁচ ভাঙার শব্দ ভেসে এল।
ঝনননন!
অর্ণব দৌড়ে ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল।
তার মুখ ফ্যাকাশে।
সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—
"ও এসে গেছে... এবার আমাদের হাতে খুব কম সময় আছে।"
অর্ণবের কণ্ঠে এমন আতঙ্ক ছিল, যা অভিনয় হতে পারে না।
ঘরের ভেতরের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।
মেঘলা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
তার মুখের শান্ত ভাবটা মিলিয়ে গেছে।
— "কোথায়?"
অর্ণব জানালার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— "নিচে... ড্রইংরুমে।"
আরোহী আর কিছু বুঝতে না পেরে বলল,
— "কে এসেছে? তোমরা বারবার 'ও' বলছ কেন?"
মেঘলা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে উত্তর দিল,
— "এখনও যদি বলি, তুমি বিশ্বাস করবে না।"
হঠাৎ নিচ থেকে একটা ভারী শব্দ ভেসে এল।
ধাম!
মনে হলো কেউ একটা বড় কাঠের আলমারি ফেলে দিয়েছে।
তারপর...
একটা পুরোনো গ্রামোফোন নিজে থেকেই বাজতে শুরু করল।
মৃদু সুরে ভেসে এলো—
"আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা..."
পুরো বাড়িটা সেই সুরে কেঁপে উঠল।
অর্ণব দাঁত চেপে বলল,
— "ও আবার ওই গানটা চালিয়েছে..."
মেঘলা নিচু স্বরে বলল,
— "প্রতিবারই একই গান..."
আরোহী অবাক।
— "কে চালিয়েছে?"
কেউ উত্তর দিল না।
তিনজন ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল।
মোবাইলের টর্চের আলো অন্ধকার কেটে এগোচ্ছে।
ড্রইংরুমে পৌঁছাতেই আরোহী থমকে গেল।
কয়েক মিনিট আগেও যে ঘরটা ধুলোয় ভরা ছিল...
এখন সেটা একেবারে পরিষ্কার।
সোফার ওপর সাদা চাদর।
টেবিলে তাজা ফুল।
মোমবাতি জ্বলছে।
মনে হচ্ছে, কেউ যেন অতিথি আসার অপেক্ষায় ঘর সাজিয়েছে।
কিন্তু সেখানে কেউ নেই।
শুধু গ্রামোফোনটা ঘুরছে।
মেঘলা ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে সুইটা তুলে দিল।
গান থেমে গেল।
ঠিক তখনই...
পেছন থেকে খুব আস্তে একটা মেয়ের হাসির শব্দ।
খিলখিল...
আরোহী দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল।
কেউ নেই।
কিন্তু ঘরের এক কোণে রাখা দোলনা চেয়ারটা নিজে নিজেই দুলছে।
অর্ণব নিচু গলায় বলল,
— "আমাদের চলে যাওয়া উচিত।"
মেঘলা মাথা নাড়ল।
— "না। আজ আর পালাব না।"
ঠিক সেই সময় আরোহীর চোখ পড়ল ফায়ারপ্লেসের ওপরে ঝোলানো একটি বড় তেলের ছবিতে।
একজন মহিলা।
মুখে মায়াভরা হাসি।
এই মুখটাই সে কিছুক্ষণ আগে দেখেছিল।
ছবির নিচে লেখা—
"ইলা রায় (১৯৭৮–২০২৩)"
আরোহী বিস্মিত।
সে ছবিটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
ফিসফিস করে বলল,
— "ইনি... তোমাদের মা?"
অর্ণব মাথা নাড়ল।
— "হ্যাঁ।"
— "কিন্তু উনিই তো..."
বাকিটা শেষ করতে পারল না।
কারণ ঠিক তখনই ছবিটার কাঁচে একটা ফাটল ধরল।
ক্র্যাক...
তারপর আরেকটা।
আরেকটা।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পুরো কাঁচটা ভেঙে মাটিতে পড়ে গেল।
ঝনঝন!
তিনজনই চমকে উঠল।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—
ছবিটা ভাঙেনি।
শুধু কাঁচটা ভেঙেছে।
আর কাঁচ সরে যেতেই ছবির পেছনে একটা ছোট্ট খাম দেখা গেল।
অর্ণব হতবাক।
— "এটা তো আগে কখনও দেখিনি..."
মেঘলা ধীরে ধীরে খামটা বের করল।
খামের ওপর মাত্র চারটি শব্দ লেখা—
"শুধু আরোহীর জন্য।"
আরোহীর বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
— "আমার জন্য?"
— "কিন্তু... কে লিখবে?" অর্ণব ফিসফিস করল।
কাঁপা হাতে আরোহী খামটা খুলল।
ভেতরে একটা চিঠি।
আর একটা পুরোনো ছবি।
ছবিটা দেখে তার চোখ বড় হয়ে গেল।
ছবিতে একটি ছোট মেয়ে।
বয়স আট-নয় বছর।
তার পাশে দাঁড়িয়ে আরেকটি মেয়ে।
দুজনেই হাসছে।
আরোহী ভালো করে তাকিয়ে নিঃশ্বাস আটকে ফেলল।
ছোট্ট মেয়েটি...
ঠিক তার ছোটবেলার মতো দেখতে।
সে কাঁপা গলায় বলল,
— "এটা... অসম্ভব..."
চিঠির প্রথম লাইন পড়তেই তার হাত কেঁপে উঠল—
"প্রিয় আরোহী, যদি তুমি এই চিঠি পড়ো, তাহলে বুঝব তোমার সঙ্গে মেঘলার আবার দেখা হয়ে গেছে..."
আরোহীর আঙুল কাঁপছে।
চিঠিটার কাগজ হলদে হয়ে গেছে।
মনে হচ্ছে বহু বছর আগে লেখা।
সে ধীরে ধীরে পড়তে শুরু করল।
"প্রিয় আরোহী,
তুমি যখন এই চিঠি পড়বে, তখন হয়তো আমি আর বেঁচে থাকব না।
হয়তো তুমি আমাকে চিনবে না।
কিন্তু আমি তোমাকে চিনি।
তুমি ছোটবেলায় একবার এই বাড়িতে এসেছিলে।
সেদিন তোমার বয়স ছিল মাত্র আট বছর।
তুমি আর মেঘলা সারাদিন বাগানে খেলেছিলে।
তারপর এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যেটা তোমার স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা হয়েছিল।
যদি সত্যিটা জানতে চাও... তবে রায় ভিলার পশ্চিম দিকের পুরোনো লাইব্রেরিতে যেও।
সেখানে একটি নীল রঙের ডায়েরি আছে।
সেই ডায়েরিই তোমাকে সব উত্তর দেবে।
— ইলা রায়"
চিঠিটা পড়া শেষ হতেই আরোহী স্থির হয়ে গেল।
তার চোখে যেন সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছে।
সে ফিসফিস করে বলল,
— "আমি... এখানে এসেছিলাম?"
মেঘলা ধীরে ধীরে মাথা নিচু করল।
অর্ণবও চুপ।
এই নীরবতাই যেন উত্তর।
আরোহীর বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত ব্যথা উঠল।
কেন যেন তার মাথার ভেতর কিছু অস্পষ্ট ছবি ভেসে উঠতে লাগল।
একটা দোলনা...
একটা লাল বল...
একটা ছোট্ট মেয়ে হেসে বলছে—
"আমরা কখনও আলাদা হব না, ঠিক আছে?"
হঠাৎ তার মাথায় প্রচণ্ড যন্ত্রণা শুরু হলো।
সে দু'হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে বসে পড়ল।
মেঘলা ছুটে এসে তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল।
— "আরোহী!"
আরোহীর চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।
— "আমার... মনে হচ্ছে... আমি এই বাড়িটা আগে দেখেছি..."
মেঘলার চোখও ভিজে উঠল।
সে খুব আস্তে আরোহীর কপালে হাত রাখল।
— "জোর কোরো না। সব মনে করার দরকার নেই।"
কিন্তু আরোহী এবার দৃঢ় গলায় বলল,
— "না। আমি সব জানতে চাই।"
অর্ণব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— "তাহলে আমাদের লাইব্রেরিতে যেতে হবে।"
ঠিক সেই মুহূর্তে...
টিক... টিক... টিক...
ঘরের দেয়ালে ঝোলানো পুরোনো ঘড়িটা হঠাৎ নিজে থেকেই চলতে শুরু করল।
অর্ণব দ্রুত ঘড়িটার দিকে তাকাল।
তার মুখের রং বদলে গেল।
— "খারাপ হয়েছে..."
আরোহী অবাক।
— "কী হয়েছে?"
অর্ণব নিচু স্বরে বলল,
— "ঘড়িটা শুধু একটা সময়েই চলে..."
— "কোন সময়?"
— "যখন নিচের গোপন পথ খুলে যায়।"
কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুরো বাড়িটা কেঁপে উঠল।
গররর...
ফায়ারপ্লেসের সামনে থাকা পাথরের মেঝে ধীরে ধীরে সরে যেতে লাগল।
তার নিচে দেখা গেল অন্ধকারে নেমে যাওয়া সরু সিঁড়ি।
ঠান্ডা বাতাস উঠে এল নিচ থেকে।
সেই বাতাসে ভেসে এল পুরোনো কাগজের গন্ধ...
আর খুব মৃদু একটা শিশুর হাসি।
খিলখিল...
আরোহী মোবাইলের টর্চ জ্বালাল।
সিঁড়ির নিচে শুধু অন্ধকার।
কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
মেঘলা তার পাশে এসে দাঁড়াল।
ধীরে ধীরে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিল।
— "ভয় পাচ্ছ?"
আরোহী তার হাতটা শক্ত করে ধরল।
— "তুমি যদি পাশে থাকো... তাহলে না।"
প্রথমবার মেঘলার মুখে একফোঁটা সত্যিকারের হাসি ফুটে উঠল।
কিন্তু সেই হাসি এক সেকেন্ডও স্থায়ী হলো না।
কারণ...
সিঁড়ির নিচের অন্ধকার থেকে হঠাৎ একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল—
"অবশেষে ফিরে এলে, আরোহী..."
কণ্ঠটা না অর্ণবের...
না মেঘলার...
তবু অদ্ভুতভাবে পরিচিত।
তিনজন একসঙ্গে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।
অন্ধকারের গভীরে যেন কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
আর তার চোখ দুটো...
অস্বাভাবিক নীল আলোয় জ্বলছে।
—
চলবে...