Invisible Love - 2 in Bengali Spiritual Stories by Sohagi Baski books and stories PDF | অদৃশ্য প্রেম - 2

Featured Books
Categories
Share

অদৃশ্য প্রেম - 2

#অধ্যায় ৩ : নিষিদ্ধ ইতিহাস

শাফরাজের শেষ কথাগুলো যেন পুরো কক্ষের বাতাসকে আরও ভারী করে তুলল। যাইনা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। তার গবেষকের মন ভয়ের চেয়ে কৌতূহলেই বেশি ভরে উঠেছে। সে ধীরে ধীরে বলল, "আমি সত্য জানতেই এসেছি। ফিরে যাওয়ার পথ যদি বদলায়, তবুও সত্যটা জানতে চাই।" শাফরাজ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে পাথরের বেদির দিকে এগিয়ে গিয়ে আঙুল ছুঁইয়ে দিল। মুহূর্তেই পুরো কক্ষের দেয়াল নীল আলোর পর্দায় ঢেকে গেল। যেন শত শত বছরের পুরোনো স্মৃতি জীবন্ত হয়ে উঠল।

যাইনা বিস্ময়ে দেখল, এই একই প্রাসাদ একসময় কতটা জাঁকজমকপূর্ণ ছিল। সোনালি গম্বুজ, ঝর্ণা, ফুলে ভরা বাগান আর অসংখ্য জিন সৈন্য পাহারা দিচ্ছে চারদিকে। আকাশে উড়ছে নীল আগুনের তৈরি পাখি। শাফরাজ শান্ত কণ্ঠে বলল, "এটাই ছিল নূর-ই-সুলতান রাজ্য। মানুষের চোখে এটি ছিল একটি পরিত্যক্ত দুর্গ, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল জিনদের রাজপ্রাসাদ। দুই জগতের মাঝখানে অবস্থান করত এই স্থান।"

যাইনা মুগ্ধ হয়ে চারদিকে তাকিয়ে বলল, "এত সুন্দর একটা রাজ্য ধ্বংস হলো কীভাবে?" শাফরাজের চোখের উজ্জ্বলতা মুহূর্তেই ম্লান হয়ে গেল। "বিশ্বাসঘাতকতা," সে শুধু একটিই শব্দ উচ্চারণ করল। "একজন মানুষ লোভের বশে জিনদের গোপন শক্তি দখল করতে চেয়েছিল। সেই সুযোগে জেসমিন কালো জাদু ব্যবহার করে রাজ্যে আক্রমণ চালায়। যুদ্ধ বহুদিন ধরে চলেছিল। শেষ পর্যন্ত রাজ্য ধ্বংস হয়ে যায়, আর আমাকে এই প্রাসাদের রক্ষক হিসেবে চিরনিদ্রায় আবদ্ধ করা হয়।"

যাইনা নরম গলায় বলল, "তাহলে সব মানুষ তো খারাপ ছিল না।" শাফরাজ তার দিকে তাকিয়ে বলল, "হয়তো না... কিন্তু সেই ঘটনার পর আমাদের জগতে মানুষের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়।"

ঠিক তখনই যাইনার মোবাইল ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল রাশেদের নাম। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে আতঙ্কিত কণ্ঠ শোনা গেল, "ম্যাম! আপনি কোথায়? আমরা আপনাকে চার ঘণ্টা ধরে খুঁজছি!" যাইনা বিস্ময়ে ঘড়ির দিকে তাকাল। সে তো মনে করেছিল মাত্র কয়েক মিনিট হয়েছে।

"চার ঘণ্টা?" অবাক হয়ে বলল সে।

শাফরাজ মৃদু হেসে বলল, "জিনদের জগতে সময় মানুষের মতো চলে না। এখানে কয়েক মিনিট, বাইরে কয়েক ঘণ্টা।"

যাইনা তাড়াতাড়ি বলল, "আমি আসছি। তোমরা চিন্তা কোরো না।"

ফোন কেটে সে শাফরাজের দিকে তাকাল। "আমাকে যেতে হবে।"

শাফরাজ মাথা নাড়ল। "হ্যাঁ। কিন্তু কাউকে আমার কথা বলবে না।"

"কেন?"

"কারণ মানুষ যেটা বুঝতে পারে না, সেটাকে ধ্বংস করতে চায়।"

যাইনা কিছু না বলে গোপন পথ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। বাইরে এসে দেখে পুরো গবেষক দল উদ্বিগ্ন মুখে দাঁড়িয়ে আছে। রাশেদ দৌড়ে এসে বলল, "ম্যাম! আপনি ঠিক আছেন? আমরা ভেবেছিলাম আপনি হারিয়ে গেছেন!"

যাইনা মিথ্যা হেসে বলল, "ভেতরে একটা পুরোনো কক্ষ পেয়েছিলাম। সিগন্যাল ছিল না, তাই যোগাযোগ করতে পারিনি।"

রাশেদ সন্দেহের চোখে তাকাল। "কিন্তু ম্যাম... আপনার জামায় এই নীল আলোর মতো দাগগুলো কী?"

যাইনা নিচের দিকে তাকিয়ে দেখল, সত্যিই তার হাতা ও ওড়নায় হালকা নীল ঝিলিক লেগে আছে। সে দ্রুত ধুলো ঝেড়ে বলল, "হয়তো কোনো খনিজ পদার্থ। পরে পরীক্ষা করব।"

সন্ধ্যা নামতেই সবাই ক্যাম্পে ফিরে গেল। কিন্তু যাইনার মাথায় বারবার ঘুরতে লাগল শাফরাজের কথা, ধ্বংস হওয়া রাজ্য আর জেসমিনের হুমকি।

সেই রাতেই ক্যাম্পে অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।

সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও যাইনার ঘুম আসছিল না। হঠাৎ সে তাঁবুর বাইরে কারও হাঁটার শব্দ শুনতে পেল। টর্চ নিয়ে বাইরে বেরিয়ে দেখল, কুয়াশার মধ্যে কালো পোশাক পরা একটি ছায়ামূর্তি ধীরে ধীরে প্রাসাদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

"কে ওখানে?" যাইনা ডাক দিতেই ছায়াটি থেমে গেল। তারপর ধীরে ধীরে পিছন ফিরে এমন এক ভয়ংকর হাসি দিল যে যাইনার শরীর শিউরে উঠল। পরের মুহূর্তেই সেটি ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে গেল।

ঠিক তখনই পেছন থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল, "আমি তো বলেছিলাম, রাত হলে একা বেরোবে না।"

যাইনা ঘুরে দেখল, শাফরাজ দাঁড়িয়ে আছে। আজ তার মুখে আগের মতো কঠোরতা নেই, বরং উদ্বেগ স্পষ্ট।

"তুমি এখানে?" যাইনা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল।

"তোমাকে রক্ষা করতে।"

"মানে?"

শাফরাজ গভীর কণ্ঠে বলল, "জেসমিন তোমাকে ছেড়ে দেবে না। তুমি এখন শুধু একজন মানুষ নও, তুমি এমন একটি দরজা খুলেছ যার চাবি বহু শতাব্দী ধরে হারিয়ে গিয়েছিল। সে তোমাকে ব্যবহার করে দুই জগতের সীমানা ভেঙে দিতে চায়।"

যাইনা কিছু বলার আগেই চারদিকের বাতাস অস্বাভাবিক ঠান্ডা হয়ে গেল। কুয়াশার ভেতর থেকে আবারও সেই লাল দুটি চোখ জ্বলে উঠল। দূর থেকে জেসমিনের কণ্ঠ ভেসে এল, "লুকিয়ে কতদিন বাঁচাবে তাকে, শাফরাজ? খেলা তো এখনই শুরু হয়েছে..."

কথাগুলো শেষ হতেই পুরো প্রাসাদ কেঁপে উঠল। দূরে কোথাও যেন একটি বিশাল পাথরের দরজা ধীরে ধীরে খুলে যাওয়ার শব্দ শোনা গেল। শাফরাজের মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে নিচু স্বরে শুধু একটি কথাই বলল—

"অসম্ভব... নিষিদ্ধ দরজাটা আবার খুলে গেছে!"