Vigilant Border Guard in Bengali Classic Stories by Susila Raj books and stories PDF | সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী - 3

Featured Books
Categories
Share

সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী - 3

রবিরা ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্টের দেওয়া ঠিকানায় গিয়ে ল্যাবটা খুঁজে বের করল।

 সেখানে থাকা অ্যাসিস্ট্যান্ট বললো, এই পরীক্ষা গুলো করতে তিন , চার দিন সময় লাগবে রক্তের স্যাম্পল নিতে । 

তারপর সব টেস্টের রিপোর্ট আসতে ষোলো ,সতেরো দিন লাগবে।

রবি প্রতিটি কথা নিজের ডায়রিতে যত্ন করে লিখে নিল। 

ষোলো থেকে সতেরো  দিন! কিন্তু মেয়ের সুস্থতার জন্য এছাড়া আর কোনো পথ নেই।

 রবির মনে দুশ্চিন্তার পাহাড় জমলেও অন্বেষার মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে, সে নিজের মন শক্ত করল।

অ্যাসিস্ট্যান্ট আরও বললেন, “আপনারা তো অনেক দূর থেকে এসেছেন, আপনাদের কোনো ফোন নম্বর আছে”? 

থাকলে দিয়ে যান, আমরা রিপোর্ট এসে গেলে ফোন করে জানিয়ে দেব।

 অথবা আপনারা আমাদের ল্যাবের নম্বরে ফোন করেও জেনে নিতে পারেন।

এছাড়াও অ্যাসিস্ট্যান্ট জানালেন, এই টেস্টগুলোর জন্য প্রায় বারো হাজার থেকে পনেরো হাজার টাকা লাগবে।

কিট অনুযায়ী বিল নির্ধারণ হবে। 

তবে অ্যাসিস্ট্যান্ট নিশ্চিত করে বললেন, “আমি এখনই ফাইনাল বিল বলতে পারছি না, ঠিক কত টাকা লাগবে।

 তবে আপনি যদি টেস্টগুলো করাতে চান, আমি সব টেস্টের জন্য দিনগুলো নির্দিষ্ট করে দেব।

আর ফাইনাল বিলও করে দেব, তবে আপনাকে আগে অর্ধেক টাকা ডিপোজিট হিসেবে জমা দিতে হবে। 

আর টেস্টের দিনের আগে বাকি সমস্ত টাকা জমা দিয়ে দিতে হবে”।

রবি নিজের চোখগুলো রগড়ে নিয়ে বিনীতভাবে বলল, “স্যার, টেস্ট তো করাতেই হবে।

 কিন্তু কিছু টাকা কি কমানো যায় না? আমার কাছে এখন এত টাকা নেই। 

আমি একজন সাধারণ স্কুলের ক্লার্ক।

আমার কাছে বারো হাজার থেকে পনেরো হাজার টাকা অনেক বড় ব্যাপার। কোনোভাবে কি কিছুটা কমানো যায় না, স্যার “?

রবি মাথা নিচু করে বলল, “আমার কাছে এখন মাত্র দুই হাজার টাকা আছে…”।

মনে হলো অ্যাসিস্ট্যান্টটা রবির অবস্থাটা বুঝতে পারছিল। 

সে বলল, “ঠিক আছে, আমি চেষ্টা করব যেন আপনার বিলটা কিছুটা কম হয়।

কিন্তু দুই হাজার টাকা খুবই কম—ডিপোজিটের জন্য যথেষ্ট নয়” । 

রবি বলল, “ যেদিন প্রথম টেস্ট হবে, সেদিনই আমি সব টাকা দিয়ে দেব… বিশ্বাস করুন”।

অ্যাসিস্ট্যান্টটা একটু দোনা-মনা করছিল।

 সুরভি নিজের সোনার কানের দুল খুলে বলল, “দাদা, আপনি এটা জমা রাখুন… আমরা যেদিন টাকা দেব, সেদিন নিয়ে নেব”।

এবার অ্যাসিস্ট্যান্টটা ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “আপনি কী করছেন! এখানে এসব হয় না… এটা আপনি নিজের কাছেই রাখুন”।

কিছুক্ষণ ভেবে সে বলল,  “ঠিক আছে, আপনারা প্রথম টেস্টের দিনই টাকা দেবেন”। 

অ্যাসিস্ট্যান্ট রবিবারের দিন ঠিক করে দিল। বলল,  “ডাক্তার দেখে বলবেন, উনি কতদিন ধরে রক্তের স্যাম্পল নেবেন। আপনার মেয়েটা তো খুব রোগা…।

 আর রক্তের স্যাম্পল অনেকটাই লাগে, তাই ডাক্তারই ঠিক করবেন।তবে প্রথম রক্ত পরীক্ষা এই রবিবারই হবে”।

রবিরা সেদিনই শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে উঠল।

 কোনো এক কারণে ট্রেনটা বেশ ফাঁকা ছিল, তাই টিটি-কে ধরে রবি দু’টো স্লিপার ক্লাসের সিট জোগাড় করে নিল।

রবি, সুরভি আর শিবরাজ—তিনজনেই এখন জানে যে রোগটা কোনো সাধারণ জ্বর-জারি নয়।

 মনে ভয় থাকলেও একটা আশার আলো দেখা দিয়েছে যে, অন্তত এবার সঠিক চিকিৎসা শুরু হয়েছে।

 সুরভি একমনে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করতে লাগলেন, যাতে তাঁর ছোট্ট মেয়েটা আবার আগের মতো হাসিখুশি হয়ে ওঠে। 

অন্যদিকে শিবরাজ যেন হঠাৎ করেই বড় হয়ে গেছে। সে বোনকে সারাক্ষণ আগলে রাখছে, যেন কোনো বিপদ বোনকে ছুঁতে না পারে।

বাড়িতে ফেরার পর সবাই মিলে অন্বেষাকে যত্নে রাখতে লাগল। নতুন ওষুধ গুলো শুরু হয়েছে।

 অবাক করার মতো বিষয় হলো, এই ওষুধগুলো দেওয়ার পর অন্বেষা আগের চেয়ে একটু ভালো বোধ করতে লাগল।

 তার জ্বরটা আর আগের মতো তীব্র হয়ে আসছিল না। সুরভি নিজের সবটুকু উজার করে দিয়ে মেয়ের সেবা করতে লাগল।

 ঠিকমতো খাওয়ানো, সময়মতো ওষুধ দেওয়া—সুরভির সারাদিন কাটত অন্বেষাকে ঘিরেই।

রবি তার জমানো টাকা থেকে বারো হাজার টাকা তুলে নিল।

 আর থাকা ও খাওয়ার জন্য আরও চারশো  টাকা হাতে রাখল। 

সে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করল, এই টাকাতেই যেন সবটা হয়ে যায়… যদিও সে জানত, এর পরেও চিকিৎসার জন্য পাহাড় প্রমাণ খরচ বাকি আছে।

রবি স্কুলে হেডমাস্টারকে সব কথা বলল। মেয়ের টেস্ট করানোর জন্য সে  পাঁচ দিনের ছুটি চাইলো।

হেড স্যার বললেন, “তুমি তো কখনও ছুটি নাও না… ঠিক আছে, আমি এই ছুটি মঞ্জুর করে দিচ্ছি।

 তুমি শুধু একটা লিভ অ্যাপ্লিকেশন দিও, সেখানে তোমার মেয়ের মেডিকেল টেস্টের কথা উল্লেখ করো। 

আমি ভেতর থেকে যতটা সম্ভব ম্যানেজ করার চেষ্টা করব”।

শনিবার রাতে আবার তারা ট্রেন ধরল।

প্রায় সকাল সাতটার দিকে—হাওড়ায় পৌঁছাল।

রবিরা সেই ল্যাবটায় গেল। রবি দেখল, বিল হয়েছে এগারো হাজার আটশো টাকা।সে অ্যাসিস্ট্যান্টকে অনেক ধন্যবাদ জানাল তাকে সাহায্য করার জন্য। তারপর সে সব টাকা মিটিয়ে দিলো।

অন্বেষা যখন দেখল তাকে রক্ত নেওয়ার জন্য ভেতরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সে ভয়ে কুকঁড়ে গেলো।শিবরাজ এক মুহূর্তের জন্য বোনের হাত ছাড়ল না। অন্বেষা যখন সিরিঞ্জ দেখে কেঁদে উঠল, শিবরাজ তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।

অন্বেষা যন্ত্রণায় আধো গলায় বলল, “ মা, দাদা .. আমার খুব লাগছে। বড্ড কষ্ট হচ্ছে গো”! 

শিবরাজ বোনের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে সান্ত্বনা দিল, “আর একটু সহ্য কর অন্বেষা, এই তো হয়ে গেছে। দেখবি, তুই একদম ঠিক হয়ে যাবি”।

সুরভি নিজের মেয়ের এই অবস্থা আর সহ্য করতে পারছিল না। মেয়ের শরীরে যখন ছুঁচ ফোটানো হচ্ছিল, সুরভি নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল।

 মা হয়ে কোলের সন্তানের এমন যন্ত্রণা দেখা যে কত বড় কষ্টের, তা যেন সুরভি প্রতি মুহূর্তে অনুভব করছিল। 

সব শেষে অন্বেষাকে কোলে নিয়ে সুরভি যখন বাইরে এলো, তখন তাঁর চোখ ছলছল করছিল। 

রবির বুকটাও কেঁপে উঠছিল, কিন্তু সে জানত, এখন তার ভেঙে পড়লে চলবে না।এই পরীক্ষার জন্য যিনি রক্তের স্যাম্পল নিচ্ছিলেন, তিনি বললেন, “আরও দুবার রক্ত নিতে হবে… তবে তার জন্য আরও চার দিন লাগবে। 

আপনারা এই ওষুধটা খাওয়াবেন, এতে রক্ত বাড়বে। আশা করি, দ্বিতীয়বার রক্ত নেওয়ার সময় আর কোনো সমস্যা হবে না, আর আমাদের অন্বেষারও বেশি কষ্ট হবে না। আপনারা যতটা সম্ভব ওকে ভালো ভাবে রাখবেন”।

এইভাবে অন্বেষার আরও দুবার রক্ত নেওয়া হলো। তারপর বৃহস্পতিবার রাতে ট্রেনে তারা আবার ফালাকাটার উদ্দেশ্যে রওনা দিল।ল্যাবের অ্যাসিস্ট্যান্ট ফোন নম্বর দিয়ে দিল, যাতে রবি  রিপোর্ট কোন দিন পাওয়া যাবে, সেটার খবর জানতে পারে।

দেখতে দেখতে দশ-বারো দিন কেটে গেল। এবার রবি সেই ল্যাবের নম্বরে ফোন করল। তারা জানালো, এখনও রিপোর্ট আসেনি— আরও চার - পাঁচ দিন পর ফোন করতে বলল।এভাবেই একদিন রবি শুনল, রিপোর্ট এসে গেছে।

এবার লক্ষ্য হলো রিপোর্ট গুলো সংগ্রহ করা এবং ডাক্তারবাবু কে সেগুলো দেখানো এবং অন্বেষারও আবার চেকআপ করাবে। রবি জানত, কলকাতার মতো জায়গায় এই ছোটাছুটি আর চিকিৎসার খরচ অনেক। তাই সে নিজের সঞ্চয় থেকে আবার কিছু টাকা তুলে নিল। 

রবিরা আবার প্রস্তুতি নিলো কলকাতায় যাওয়ার জন্য। আবার সেই ট্রেনের যাত্রা।