ঘুঙুরের ছন্দ ও চেনা আকাশ - 1 in Bengali Women Focused by miss writer books and stories PDF | ঘুঙুরের ছন্দ ও চেনা আকাশ - 1

Featured Books
Categories
Share

ঘুঙুরের ছন্দ ও চেনা আকাশ - 1

 এক জীবনে অনেকে অনেক কিছু চায়,

এই এক জীবনে অনেকে অনেক কিছু পায়।

কিন্তু...

কিন্তু এই সব চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে

অনেক চাওয়া-পাওয়া অপূর্ণ রয়ে যায়।

জীবনের কিছু কিছু পাওয়া এত আকস্মিক আর জাদুকরী হয় যে, তখন মনে হয় পৃথিবীর সব সুখ বুঝি এক নিমেষে হাতের মুঠোয় চলে এসেছে।

আবার ঠিক তেমনই, কিছু কিছু অপূর্ণতা বুকের ভেতরে এমন একটা স্থায়ী ক্ষত তৈরি করে দেয়, যা বছরের পর বছর ধরে ছদ্মবেশে বয়ে বেড়াতে হয়। আমার ষোলো বছর বয়সের সেই চেনা জীবনটাতেও চাওয়া-পাওয়ার হিসেবটা আজ বর্তমানের মতো এত জটিল ছিল না। তখন আমার পৃথিবীটা জুড়ে ছিল শুধুই স্কুলের পড়াশোনা, কিছু চঞ্চল বন্ধু আর একটা মস্ত বড় ভালোবাসা—নাচ।

বিকেলের নরম আলোটা যখন নাচের স্কুলের জানলা গলে এসে কাঠের মেঝেতে পড়ত, তখন মনে হতো পুরো পৃথিবীটা একটা আলাদা ছন্দে দুলছে।

আমার বয়স তখন মোটে ১৬। ফ্রক ছেড়ে সবেমাত্র সালোয়ার-কামিজ পরতে শুরু করেছি। মাথার দু-পাশে দুটো বিনুনি, পিঠে স্কুলের ভারী ব্যাগ, আর ডান হাতে ঝুলত একটা কাপড়ের থলে—যার ভেতরে যত্নে রাখা থাকত একজোড়া ব্রোঞ্জের ঘুঙুর।

সপ্তাহের ওই দুটো দিন, অর্থাৎ বুধ আর শনিবার-এ আমার স্কুলের ক্লান্তি এক নিমেষে উধাও হয়ে যেত।

স্কুল ছুটি হতেই বন্ধুদের সাথে গল্প করতে করতে সোজা চলে আসতাম

'নূপুর নিক্কন' নাচের অ্যাকাডেমিতে।

আমাদের ব্যাচটা ছিল পুরোপুরি মেয়েদের। যতদূর মনে পড়ে, ক্লাসে আমরা জনা পনেরো মেয়ে ছিলাম। ধ্রুপদী নাচের বোল, তবলার তালের সাথে ঘুঙুরের গুরুগুরু শব্দ আর গুরুমশাইয়ের কড়া শাসন এই নিয়েই ছিল আমাদের সেই ছোট্ট মিষ্টি জগৎ।

"কী রে মেঘলা, আজকেও তুই খাতাটা আনিসনি?"

পূজার গলার আওয়াজে আমার ভাবনায় ছেদ পড়ল। পূজা আমার ছোটবেলার বন্ধু, একই সাথে আমরা স্কুলে পড়ি আর এখানে নাচ শিখি। ও যেমন চঞ্চল, তেমনই স্পষ্টবক্তা।আমি জিভ কেটে বললাম,

"ধুর! একদম ভুলে গেছি।

আসলে আজ স্কুলে অঙ্কের একটা সারপ্রাইজ টেস্ট ছিল তো, মাথাটা পুরো জ্যাম হয়ে আছে।

"পূজা নিজের ব্যাগ থেকে একটা ডায়েরি বের করে আমার দিকে এগিয়ে দিল।

"নে,

এটা দেখে নাচের নতুন মুদ্রাগুলো টুকে নে। তোকে নিয়ে আর পারি না বাপু!

"আমরা তখন ক্লাসের এক কোণে বসে মেঝেতে পা ছড়িয়ে ঘুঙুর বাঁধছিলাম। সুতোর ভেতরের মোটা লাল দড়িটা গোড়ালির ওপর শক্ত করে জড়িয়ে গিট দিতে দিতে আমি চারপাশটা দেখছিলাম। আমাদের এই নাচের স্কুলটা বেশ পুরনো ছিল। দেওয়াল জুড়ে বড় বড় সব বিখ্যাত নৃত্যশিল্পীদের ছবি, আর ঘরের একদিকের দেওয়ালটা জুড়েই ছিল একটা বিশাল আয়না। নাচের সময় নিজেদের অঙ্গভঙ্গি ঠিক আছে কি না, তা দেখার জন্য এই আয়নাটাই ছিল আমাদের একমাত্র ভরসা।আমাদের ব্যাচের ঠিক পরেই ছিল ছেলেদের ব্যাচ।

অর্থাৎ,

আমরা যখন ক্লাস শেষ করে বের হতাম, ওরা তখন ক্লাসে ঢুকত। ওই ব্যাচের ছেলেরা আমাদের থেকে বেশ কিছুটা বড় ছিল,

অন্তত বছর কুড়ি-বাইশের তরুণ সব। ওদের ব্যাচের নাচের ধরন, মুদ্রা এবং মুদ্রা প্রকাশের ভঙ্গিও ছিল আমাদের থেকে আলাদা। গুরুমশাই সবসময় বলতেন,

"ছেলেরা যখন তাণ্ডব বা কত্থকের কঠিন অংশগুলো করে, ওদের মধ্যে একটা আলাদা এনার্জি প্রয়োজন।

স্বাভাবিকভাবেই, ওদের সাথে আমাদের কখনো কোনো যৌথ অনুষ্ঠান বা প্রোগ্রাম হতো না। আমরা জানতাম ওরা আলাদা একটা গ্রুপ, ব্যস ওইটুকুই। আমার বয়স তখন ১৬ আর ওদের গ্রুপের সবার বয়সই প্রায় বাইশ-তেইশের কাছাকাছি।

আমাদের নিজস্ব একটা জগৎ ছিল, আর ওদের একটা সম্পূর্ণ আলাদা জগৎ।

কোনোদিন ভাবিওনি যে, এই দুটো আলাদা পৃথিবীর মধ্যে কোনোদিন কোনো চেনা সেতু তৈরি হতে পারে।নাচের ক্লাস শুরু হতেই চারপাশের সব কথাবার্তা বন্ধ হয়ে গেল। গুরুমশাই তবলার বাঁয়াতে একটা চাঁটি মেরে বললেন,

"সম-এ এসে থামবে সবাই। রেডি?

এক, দুই, তিন, চার..."মেঝেতে আমাদের পায়ের তাল আর ঘুঙুরের আওয়াজ এক হয়ে এক অদ্ভুত মাদকতা তৈরি করল। আমি যখন নাচতাম, তখন বাইরের সব চিন্তা ভুলে যেতাম। কে দেখছে, কে ভাবছে—তাতে কিছু এসে যেত না। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে নিখুঁত মুদ্রা ফুটিয়ে তোলাই ছিল তখন আমার ধ্যানজ্ঞান। কিন্তু আমি জানতাম না, সেই বিশাল আয়নার ওপারে, কিংবা ক্লাসের ওই কাঠের দরজার বাইরে কেউ একজন হয়তো লুকিয়ে আমার এই নাচের ভক্ত হয়ে উঠছিল।ক্লাস শেষ হতে হতে প্রায় সন্ধে নেমে এল। গা ঘেমে নেয়ে একসা।

ঘুঙুরগুলো খুলে যখন কাপড়ের থলেতে ভরছিলাম,

তখন পূজা ফিসফিস করে বলল, "মেঘলা, আজ কিন্তু একটু তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে।

তুই তো জানিস..."আমি পূজার দিকেতাকিয়ে একটু হাসলাম।

হ্যাঁ, আমি জানতাম।

পূজার জীবনে তখন একটা গোপন বসন্ত এসেছে। ওর বয়ফ্রেন্ড আকাশের সাথে ও মাঝেমাঝেই নাচের ক্লাসের শেষে একটু দেখা করতে যেত। আকাশও ওই ছেলেদের নাচের ব্যাচেই নতুন ভর্তি হয়েছিল। পূজা আর আকাশের এই মিষ্টি প্রেমের গল্পটা আমি প্রথম থেকেই জানতাম। আর বান্ধবী হিসেবে আমার দায়িত্ব ছিল বেশ গুরুভার—ওদের দেখা করার সময় আমাকে সঙ্গে যেতে হতো পাহারাদার হয়ে, যাতে বাড়ির কেউ বা চেনা কোনো মানুষ হুট করে দেখে না ফেলে।

"চল, আমার গোছানো হয়ে গেছে," আমি ব্যাগটা কাঁধে নিতে নিতে বললাম।

আমরা দুজনে নাচের স্কুল থেকে বের হয়ে একটু দূরের সেই চেনা গলির দিকে এগোতে লাগলাম, যেখানে সাধারণত আকাশ দাঁড়িয়ে থাকত। বিকেলের ম্লান আলোয় তখন রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো সবে জ্বলতে শুরু করেছে। আমি বিন্দুমাত্র টের পাইনি যে, আজকের এই সাধারণ বিকেলটা আমার ১৬ বছরের জীবনে একটা মস্ত বড় তোলপাড় নিয়ে আসতে চলেছে। আমি জানতাম না যে আকাশের সাথে আজ আরও একজন আসবে, যে আমার অগোচরেই আমাকে ভালোবেসে ফেলেছে।