Pratapaditya in Bengali Motivational Stories by Rajkonya রাজকন্যা books and stories PDF | প্রতাপাদিত্য

Featured Books
Categories
Share

প্রতাপাদিত্য

পর্ব ১

শ্রাবণের শেষ রাত। আকাশজুড়ে কালো মেঘের আস্তরণ। একের পর এক বজ্রপাত যেন পুরো যশোর রাজ্যকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। কপোতাক্ষ নদীর জল উত্তাল হয়ে আছড়ে পড়ছে ঘাটে বাঁধা নৌকোগুলোর গায়ে। বাতাসে কাদা, বৃষ্টি আর ভয় মিশে আছে।

দূরে নদীর বুক চিরে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল কয়েকটি অচেনা যুদ্ধজাহাজ। জাহাজগুলোর মাথায় আগুন জ্বলছে। কালো অন্ধকারের মধ্যে সেই আগুনগুলোকে যেন নরকের চোখের মতো লাগছিল।

ঘাটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ জেলে আতঙ্কে ফিসফিস করে বলল—“মোগলদের জাহাজ…”

পাশে থাকা কিশোর ছেলেটা ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করল—“ওরা কি আবার লুট করতে এসেছে?”

বৃদ্ধ লোকটা নদীর দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল—“ওরা যেখানে যায়… সেখানকার নদীর জলও লাল হয়ে যায়।”

ঠিক তখনই ভয়ংকর এক বজ্রপাত আকাশ চিরে নেমে এলো।

একই সময় যশোর রাজপ্রাসাদের অন্তঃপুরে ছড়িয়ে ছিল অন্য এক উত্তেজনা।

দরজার বাইরে উদ্বিগ্ন মুখে পায়চারি করছিলেন বিক্রমাদিত্য। তাঁর কপালে চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট। ভেতর থেকে ভেসে আসছে নারীদের ব্যস্ত কণ্ঠস্বর, ধূপের গন্ধ আর চাপা উৎকণ্ঠা।

হঠাৎ—এক নবজাতকের কান্না। চারদিক যেন থেমে গেল কয়েক মুহূর্তের জন্য। তারপর অন্তঃপুরের দরজা খুলে এক দাসী ছুটে বেরিয়ে এলো।

“মহারাজ! পুত্রসন্তান হয়েছে!”

বিক্রমাদিত্যের মুখে ধীরে ধীরে হাসি ফুটল। কিন্তু সেই হাসির আড়ালেও যেন কোথাও এক অদ্ভুত আশঙ্কা লুকিয়ে ছিল।

কিছুক্ষণ পর রাজজ্যোতিষীকে ডাকা হলো। বৃদ্ধ মানুষটি শিশুটির সামনে বসে দীর্ঘক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন। বাইরে তখনও ঝড় চলছে। মাঝে মাঝে বজ্রের আলো এসে তাঁর মুখ আলোকিত করে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।

তিনি ধীরে ধীরে শিশুটির কপালে হাত রাখলেন।তারপর হঠাৎ তাঁর চোখ বড় হয়ে উঠল।

বিক্রমাদিত্য উদ্বিগ্ন গলায় বললেন—“কি দেখছেন আচার্য?”

বৃদ্ধ জ্যোতিষীর কণ্ঠ কেঁপে উঠল।“এই শিশুর ভাগ্যে যুদ্ধ আছে… রক্ত আছে… আগুন আছে…”

ঘরের সবাই নিঃশব্দ।

তিনি আবার বললেন—“এ এমন এক পুরুষ… যে কোনো সম্রাটের সামনে মাথা নত করবে না।”

বজ্রপাতের শব্দে ঘর কেঁপে উঠল।

“বাংলার ইতিহাসে এর নাম আগুনের অক্ষরে লেখা থাকবে।”

ঘরের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। পরদিন সকালেই রাজপ্রাসাদ উৎসবে ভরে গেল। শঙ্খধ্বনি, ঢাকের আওয়াজ, ব্রাহ্মণদের মন্ত্রোচ্চারণে মুখর হয়ে উঠল চারদিক। বিক্রমাদিত্য শিশুটিকে কোলে তুলে সবার সামনে বললেন— “এর নাম হবে প্রতাপ।”

চারদিকে উল্লাস ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু সেই আনন্দের মধ্যেও একজন মানুষ নীরবে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।বসন্ত রায়। বিক্রমাদিত্যের ভাই। তাঁর ঠোঁটে অদ্ভুত এক হাসি।

ধীরে ধীরে তিনি বললেন—“প্রতাপ… নামটা যেমন বড়… ভাগ্যও তেমন বড় হোক।”

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ মন্ত্রী অস্বস্তিতে চোখ নামিয়ে নিলেন। কারণ কথাগুলোর মধ্যে আশীর্বাদের চেয়ে অদ্ভুত এক ভবিষ্যৎ ঝড়ের ইঙ্গিত বেশি ছিল।

সময় কেটে যেতে লাগল। ছোট্ট প্রতাপ অন্য শিশুদের মতো ছিল না। খেলনার বদলে কাঠের তরবারি হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াত সে। সৈন্যদের অনুশীলন দেখত মুগ্ধ চোখে। ঘোড়ার শব্দ শুনলেই দৌড়ে চলে যেত আস্তাবলে।

একদিন গোপনে সে সৈন্যদের অনুশীলনের মাঠে ঢুকে পড়ল।

এক অভিজ্ঞ সেনাপতি মজা করে তার হাতে একটা কাঠের তরবারি তুলে দিলেন।

“দেখি ছোট রাজপুত্র… কত শক্তি তোমার?”

চারপাশে হাসির রোল উঠল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই সব হাসি থেমে গেল। প্রতাপ এত দ্রুত আঘাত করল যে সেনাপতির হাত থেকে কাঠের ঢাল ছিটকে মাটিতে পড়ে গেল।

মাঠ নিস্তব্ধ। সেনাপতি কিছুক্ষণ অবাক হয়ে প্রতাপের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন—“এ ছেলে যুদ্ধ শিখবে না… যুদ্ধ ওর রক্তে আছে।”

সেদিন সন্ধ্যায় প্রতাপ একা দাঁড়িয়ে ছিল নদীর ধারে।সূর্য ডুবে যাচ্ছে। নদীর জলে লাল আভা পড়েছে। বাতাসে কেমন এক অদ্ভুত নীরবতা। হঠাৎ দূরে কয়েকটি বড় জাহাজ দেখা গেল।

জাহাজগুলোর গায়ে মোগল চিহ্ন। প্রতাপ স্থির চোখে সেদিকে তাকিয়ে রইল। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ নৌসেনা ধীরে ধীরে বলল—“ওরা দিল্লির লোক।”

প্রতাপ জিজ্ঞেস করল—“ওরা এখানে কেন আসে?”

বৃদ্ধ লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “বাংলাকে নিজেদের করে নিতে।”

ছোট্ট প্রতাপের চোখে তখন অদ্ভুত এক আগুন জ্বলছিল। সে নদীর দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল—“বাংলা কারও হবে না।”

বৃদ্ধ নৌসেনা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।কারণ সেই কণ্ঠস্বর কোনো শিশুর ছিল না। সেই কণ্ঠস্বর ছিল—এক ভবিষ্যৎ ঝড়ের।

.................

যশোরের আকাশে তখন শীতের হালকা কুয়াশা।ভোরের সূর্য নদীর জলের উপর সোনালি আলো ফেলছে। কিন্তু রাজপ্রাসাদের ভেতরে অদ্ভুত এক ব্যস্ততা।প্রাসাদের উঠানে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে অশ্বারোহী সৈন্য। দাসরা দ্রুত ঘোড়ার জিন বাঁধছে, রসদ তোলা হচ্ছে শকটে। চারদিকে চাপা উত্তেজনা।

আজ প্রতাপ প্রথমবার যাত্রা করবে দিল্লির উদ্দেশ্যে।

তখন তার বয়স খুব বেশি নয়। কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে এমন এক তীক্ষ্ণতা ছিল, যা দেখে অনেক অভিজ্ঞ মানুষও অস্বস্তি বোধ করত।বিক্রমাদিত্য ধীরে ধীরে ছেলের সামনে এসে দাঁড়ালেন।কিছুক্ষণ চুপ করে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর নিচু গলায় বললেন—“দিল্লি শুধু একটা শহর নয় প্রতাপ… ওটা একটা সাম্রাজ্য।”

প্রতাপ শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল—“সাম্রাজ্য কি এতটাই শক্তিশালী?”

বিক্রমাদিত্য হালকা হাসলেন।“শক্তিশালী… কিন্তু অমর নয়।”প্রতাপ আর কিছু বলল না। সে ঘোড়ার লাগাম শক্ত করে ধরল। তার চোখে তখন কৌতূহলও ছিল, আবার কোথাও যেন এক অদ্ভুত আগুনও জ্বলছিল।

যাত্রা শুরু হলো। দীর্ঘ পথ। নদী, জঙ্গল, জনপদ পেরিয়ে ধীরে ধীরে উত্তর ভারতের দিকে এগোতে লাগল তাদের কাফেলা।যাত্রাপথে প্রতাপ সবকিছু খুব মন দিয়ে লক্ষ্য করত।কোথায় কেমন সৈন্য মোতায়েন থাকে, কোন দুর্গ কত উঁচু, কোন নদীপথ কত গুরুত্বপূর্ণ—সবকিছু, তার চোখ এড়িয়ে যেত না।এক রাতে তাঁবুর বাইরে বসে ছিল সে। দূরে আগুন জ্বলছে। সৈন্যরা পাহারা দিচ্ছে। হঠাৎ তার পাশে এসে বসলেন বসন্ত রায়। কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর তিনি বললেন—“তুমি খুব বেশি দেখো প্রতাপ।”

প্রতাপ হালকা হাসল।“যে রাজ্য রক্ষা করবে… তাকে সব দেখতে হয়।”

বসন্ত রায়ের চোখে অদ্ভুত এক ঝিলিক দেখা দিল।“সবাই রাজ্য রক্ষা করতে পারে না।”প্রতাপ এবার সরাসরি তাঁর চোখের দিকে তাকাল।“যে ভয় পায়… সে পারে না।”কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর বসন্ত রায় ধীরে ধীরে উঠে চলে গেলেন। কিন্তু তাঁর মুখের অভিব্যক্তি দেখে বোঝা যাচ্ছিল—এই ছেলেটাকে তিনি ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না।অবশেষে দিল্লি। প্রতাপ প্রথমবার দেখল সেই বিশাল নগরী। উঁচু প্রাচীর। সারি সারি সৈন্য। বাজারে ভিড়।চারদিকে সম্রাট আকবরের পতাকা উড়ছে।

কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল মানুষের চোখের দৃষ্টি।সেখানে ভয় আছে। আনুগত্য আছে। আর আছে ক্ষমতার প্রতি অন্ধ বিশ্বাস।দিল্লির রাজপ্রাসাদ যেন আরেক জগৎ। সোনালি কারুকাজে মোড়া বিশাল দরবার। রত্নখচিত স্তম্ভ। পারস্যের কার্পেট। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা রাজা-জমিদারদের সারি।দরবারের শেষ প্রান্তে বসে আছেন সম্রাট আকবর।তাঁর দৃষ্টি শান্ত। কিন্তু সেই শান্তির আড়ালে এমন এক ক্ষমতা লুকিয়ে ছিল, যা পুরো ভারতকে কাঁপিয়ে দেয়।

প্রতাপ দরবারে ঢুকতেই চারদিকে চাপা গুঞ্জন শুরু হলো। বাংলা থেকে আসা এই তরুণ রাজপুত্রের কথা অনেকেই শুনেছিল।আকবর স্থির চোখে প্রতাপের দিকে তাকালেন।“তোমার নাম প্রতাপ?”প্রতাপ মাথা নত করল না। শুধু বলল— “জি, মহারাজ।”দরবারের কয়েকজন আমীর সঙ্গে সঙ্গে অস্বস্তিতে একে অপরের দিকে তাকাল। কারণ সম্রাটের সামনে সবাই মাথা নত করে। এটাই নিয়ম।

আকবর কিছুক্ষণ প্রতাপের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর মৃদু হাসলেন।“বাংলার মানুষ কি সবার সামনে এমনভাবেই দাঁড়ায়?”

প্রতাপ শান্ত গলায় উত্তর দিল—“বাংলার নদীগুলো মাথা নত করতে শেখেনি, জাঁহাপনা।”

মুহূর্তের মধ্যে পুরো দরবার নিস্তব্ধ। এক রাজপুত সেনাপতি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল।“সম্রাটের সামনে কথা বলার আদব শেখো!”

প্রতাপ এবার ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।“আদব আমি জানি। কিন্তু ভয় পাই না।”সৈন্যরা হাত রাখল তরবারির উপর। চারদিকে টানটান উত্তেজনা। কিন্তু আকবর হঠাৎ হেসে উঠলেন।“তরুণ বয়সে আগুন থাকা ভালো।”দরবার আবার শান্ত হলো। কিন্তু সেই মুহূর্তে অনেকেই বুঝে গিয়েছিল—বাংলা থেকে আসা এই যুবক সাধারণ কেউ নয়। পরবর্তী কয়েকদিন প্রতাপ দিল্লির প্রতিটি জিনিস গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।

মোগলদের অস্ত্রাগার।তাদের কামান।অশ্বারোহী বাহিনী।দূত ব্যবস্থা।রসদ সরবরাহ।সবকিছু সে মনে রাখছিল। এক রাতে প্রাসাদের ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল প্রতাপ। দূরে দিল্লির আলো জ্বলছে।আকাশে ঠান্ডা বাতাস।ঠিক তখন সে নিচে সৈন্যদের কথা শুনতে পেল।এক মোগল সেনাপতি বলছে— “বাংলা শুধু সময়ের অপেক্ষা। ওদের নদী, ওদের সম্পদ… সব একদিন দিল্লির হবে।”আরেকজন হেসে উঠল।“ওরা লড়তে জানে না। শুধু জল আর কাদা নিয়ে বাঁচে।”প্রতাপের চোখ ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠল। তার মুঠি শক্ত হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে পূর্ব আকাশের দিকে তাকাল। সেই আকাশের ওপারেই বাংলা। তার জন্মভূমি।তার নদী।তার মানুষ।প্রতাপ খুব নিচু গলায় বলল— “বাংলা কারও দাস হবে না।”হঠাৎ দূরে যুদ্ধের ঢাক বেজে উঠল। আর সেই শব্দের মাঝেই যেন ইতিহাস ধীরে ধীরে নতুন পথে হাঁটতে শুরু করল।

..........................

দিল্লি থেকে ফিরে আসার পর প্রতাপ আর আগের মতো রইল না। যেন কয়েক মাসের মধ্যেই সে আরও নীরব, আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে।

যশোর রাজপ্রাসাদের সভাকক্ষে বসে থাকা মন্ত্রীরা লক্ষ্য করতেন—অন্যরা যখন শুধু কথা বলে, প্রতাপ তখন মানুষের চোখ দেখে। কথার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভয়, লোভ, বিশ্বাসঘাতকতা—সব যেন সে বুঝে ফেলতে পারে।

সেদিন সন্ধ্যায় রাজসভা বসেছে। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে।প্রাসাদের মশালের আলোয় সভাঘরটা অদ্ভুত গম্ভীর দেখাচ্ছে। বিক্রমাদিত্য সিংহাসনে বসে আছেন। পাশে বসন্ত রায়। সামনে যশোরের সেনাপতি, জমিদার আর মন্ত্রীরা।

এক দূত হাঁপাতে হাঁপাতে সভায় ঢুকে পড়ল।“মহারাজ! দক্ষিণ দিকের নদীপথে আবার মগ জলদস্যুদের আক্রমণ!”

ঘরের পরিবেশ মুহূর্তে বদলে গেল। এক মন্ত্রী উদ্বিগ্ন গলায় বলল—“ওরা এবার অনেক বড় বহর নিয়ে এসেছে।”

আরেকজন বলল—“গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে। মানুষ ধরে নিয়ে যাচ্ছে।”

বিক্রমাদিত্যের মুখ কঠিন হয়ে উঠল। কিন্তু তার আগেই প্রতাপ উঠে দাঁড়াল।

“আমাদের নৌবাহিনী কোথায়?”

এক বৃদ্ধ সেনাপতি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“ছোট ছোট নৌকা দিয়ে ওদের আটকানো কঠিন রাজপুত্র। ওদের জাহাজ বড়, কামান শক্তিশালী।”

প্রতাপ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল—“তাহলে আমাদেরও বড় জাহাজ বানাতে হবে।”

ঘরের সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। এক মন্ত্রী হেসে উঠল।

“বাংলার নদীতে যুদ্ধজাহাজ?”

প্রতাপ এবার তার দিকে তাকাল।

“যে নদী জীবন দিতে পারে… সে নদী যুদ্ধও জিততে পারে।”

ঘর নিস্তব্ধ। বিক্রমাদিত্য গভীর দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কারণ সেই মুহূর্তে তিনি বুঝলেন—প্রতাপ শুধু যুদ্ধ করতে চায় না, সে নতুনভাবে যুদ্ধের নিয়ম লিখতে চায়।

পরদিন থেকেই প্রতাপ ঘুরে ঘুরে নদীপথ দেখতে শুরু করল। কপোতাক্ষ। ভৈরব। ইছামতী।

সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নৌকার মাঝিদের সঙ্গে কথা বলত। কোথায় স্রোত বেশি, কোথায় নদী সরু, কোথায় কুয়াশা সবচেয়ে ঘন—সব জানতে চাইত।

একদিন গভীর রাতে সে একা দাঁড়িয়ে ছিল নদীর ধারে। দূরে জেলেদের নৌকায় ছোট ছোট প্রদীপ জ্বলছে।

হঠাৎ পিছন থেকে বসন্ত রায়ের কণ্ঠ ভেসে এলো—“রাজপুত্র হয়ে মাঝিদের সঙ্গে এত সময় কাটানো মানায় না।”

প্রতাপ পিছনে না তাকিয়েই বলল— “যে বাংলাকে রক্ষা করবে… তাকে বাংলার নদীকেও বুঝতে হবে।”

বসন্ত রায় ধীরে ধীরে সামনে এসে দাঁড়ালেন।“তুমি কি সত্যিই ভাবছ… দিল্লির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সম্ভব?”

প্রতাপ এবার তাঁর চোখের দিকে তাকাল।“অসম্ভব বলে কিছু নেই।”

বসন্ত রায় হালকা হেসে মাথা নাড়লেন।“তুমি এখনও তরুণ। ক্ষমতার আসল রূপ দেখনি।”

প্রতাপ শান্ত গলায় বলল—“ক্ষমতা ভয় দেখাতে জানে। কিন্তু ভয়কে হারাতে জানে না।”

বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ নদীর দিকে তাকিয়ে রইল। দূরে বজ্রপাত হলো। আর সেই আলোয় কয়েক মুহূর্তের জন্য বসন্ত রায়ের মুখটা অদ্ভুত লাগল। যেন সেখানে স্নেহের আড়ালে অন্য কিছু লুকিয়ে আছে।

কয়েকদিন পর খবর এলো—দক্ষিণের এক গ্রাম পুরোপুরি পুড়িয়ে দিয়েছে জলদস্যুরা। প্রতাপ নিজেই সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

সৈন্যরা নিয়ে পৌঁছানোর পর সে যা দেখল… তা তার ভেতরের মানুষটাকে বদলে দিল।

জ্বলন্ত ঘর। নদীর ঘাটে পড়ে থাকা মৃতদেহ। এক বৃদ্ধ নিজের নাতির নিথর শরীর আঁকড়ে বসে কাঁদছে। এক ছোট মেয়ে প্রতাপের সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে জল নেই। শুধু শূন্যতা।

“ওরা আমার মাকে নিয়ে গেছে…”

প্রতাপের বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।সে চারদিকে তাকাল। আগুন এখনও জ্বলছে। ধোঁয়ায় আকাশ কালো হয়ে আছে। সেই মুহূর্তে প্রতাপ ধীরে ধীরে মুঠি শক্ত করল। তার চোখে তখন আর শুধু রাগ ছিল না। ছিল যুদ্ধের সিদ্ধান্ত।

সেদিন রাতে যশোরে ফিরে এসে সে রাজসভায় ঢুকল।সবাই অবাক হয়ে দেখল—তার মুখে আর কোনো দ্বিধা নেই। প্রতাপ সোজা বিক্রমাদিত্যের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

“আমাদের নৌবাহিনী তৈরি করতে হবে।”

এক মন্ত্রী বিরক্ত গলায় বলল—“এত বড় বাহিনী গড়া সহজ নয়।”

প্রতাপ তার দিকে তাকাল।“বাংলা বাঁচানোও সহজ নয়।”

ঘরে নীরবতা নেমে এলো। প্রতাপ ধীরে ধীরে বলল—“আজ জলদস্যু এসেছে। কাল মোগল আসবে। যারা নদীকে নিয়ন্ত্রণ করবে… বাংলাও তাদের হবে।”

বিক্রমাদিত্য গভীরভাবে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।“তুমি কী চাও?”

প্রতাপের চোখে তখন আগুন জ্বলছে। সে স্পষ্ট গলায় বলল—“আমি এমন এক নৌবাহিনী চাই… যার নাম শুনলে নদীও কেঁপে উঠবে।”

..............................

যশোর রাজ্যের নদীতীরে তখন দিনরাত হাতুড়ির শব্দ।কাঠ কাটা হচ্ছে। লোহার পাত গলানো হচ্ছে। বিশাল বিশাল গাছ নদীপথে ভাসিয়ে আনা হচ্ছে দূর জঙ্গল থেকে।

মানুষ বুঝতে পারছিল—কিছু একটা বদলাচ্ছে। প্রতাপ প্রায় প্রতিদিনই চলে যেত জাহাজ নির্মাণ ঘাটে।রাজপুত্র হয়েও কাদা-মাখা ঘাটে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কারিগরদের কাজ দেখত সে।

এক বৃদ্ধ জাহাজ নির্মাতা অবাক হয়ে বলেছিল—“রাজপুত্র, আপনি এসব কাজ এত মন দিয়ে দেখেন কেন?”

প্রতাপ কাঠের বিশাল কিলের দিকে তাকিয়ে বলেছিল—“কারণ একদিন এই কাঠই বাংলাকে বাঁচাবে।”

ধীরে ধীরে তৈরি হতে লাগল নতুন ধরনের যুদ্ধজাহাজ।বাংলার নদীর জন্য বিশেষভাবে বানানো। দ্রুতগামী।সরু নদীতেও চলতে পারে। আর সামনে বসানো হচ্ছে কামান।

অনেকেই হাসাহাসি করছিল। এক মন্ত্রী তো সরাসরি বলেই ফেলল—“নদীতে কামান বসিয়ে যুদ্ধ জেতা যায় না।”

প্রতাপ শান্ত গলায় জবাব দিয়েছিল—“যুদ্ধ জেতে বুদ্ধি। শুধু শক্তি নয়।”

কিন্তু সবাই তার বিরুদ্ধে ছিল না।যশোরের সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে প্রতাপকে অন্য চোখে দেখতে শুরু করল। কারণ সে শুধু প্রাসাদে বসে আদেশ দিত না।সে মানুষের মাঝে যেত। জেলেদের সঙ্গে বসে খেত।মাঝিদের থেকে নদীর স্রোত শিখত। কারিগরদের নাম মনে রাখত।

আর সেই কারণেই মানুষ তাকে ভয়ও পেত… আবার ভালোবাসতও। একদিন দুপুরে হঠাৎ খবর এলো—মগ জলদস্যুরা আবার নদীপথে ঢুকেছে। এবার তারা সরাসরি যশোরের বাণিজ্য নৌকাগুলো আক্রমণ করছে।

রাজসভায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। এক সেনাপতি বলল—“ওদের কাছে বড় কামান আছে। আমাদের প্রস্তুতি এখনও শেষ হয়নি।”

আরেকজন বলল—“এখন যুদ্ধ মানে আত্মহত্যা।”

সবাই যখন দ্বিধায়, প্রতাপ তখন চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।

তারপর ধীরে ধীরে বলল—“যে যুদ্ধ এড়িয়ে পালায়… যুদ্ধ একদিন তার দরজায় এসে দাঁড়ায়।”

বিক্রমাদিত্য ছেলের দিকে তাকালেন।“তুমি কী করতে চাও?”

প্রতাপের চোখ স্থির।“আমি নদীতে নামব।”

ঘরের ভেতর মুহূর্তে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। এক মন্ত্রী প্রায় চিৎকার করে উঠল—“রাজপুত্র নিজে যুদ্ধ করবেন?”

প্রতাপ এবার ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।“যে সৈন্যের সামনে রাজা দাঁড়ায় না… সে সৈন্য মরতেও শেখে না।”

সেদিন রাতেই প্রস্তুতি শুরু হলো। ঘন কুয়াশায় ঢাকা নদী। ছোট ছোট যুদ্ধজাহাজে আগুন ঢাকা মশাল।সৈন্যদের মুখে চাপা উত্তেজনা। প্রতাপ নিজের জাহাজের সামনে দাঁড়িয়ে নদীর অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার পাশে বৃদ্ধ নৌসেনাপতি বলল—“রাজপুত্র… ভয় লাগছে না?”

প্রতাপ হালকা হাসল।“ভয় নদীর মতো। নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে শক্তি হয়।”

হঠাৎ দূরে শিঙার শব্দ ভেসে এলো। মগ জলদস্যুদের জাহাজ। অন্ধকার ভেদ করে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে বিশাল কালো ছায়ার মতো। সৈন্যদের অনেকের হাত কাঁপছিল। কারণ এটাই ছিল প্রতাপের প্রথম নদীযুদ্ধ। প্রতাপ ধীরে ধীরে তরবারি বের করল।বজ্রপাতের আলোয় তার চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলছিল।

“মনে রেখো… আজ যদি আমরা হারি… কাল বাংলা হারবে।”

তারপর সে হাত তুলল।“কামান প্রস্তুত!”

নদীর বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। দুই বহর ধীরে ধীরে একে অপরের দিকে এগিয়ে আসছে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে—আকাশ কাঁপিয়ে প্রথম কামানের গর্জন শোনা গেল।

............................

ঘন কুয়াশায় ঢেকে থাকা নদীটা যেন সেদিন যুদ্ধের আগেই মৃত্যুর গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছিল। দুই দিক থেকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল যুদ্ধজাহাজ।

একদিকে মগ জলদস্যুদের বিশাল বহর।কালো পাল। জাহাজের মাথায় আগুনের মশাল।কামানের মুখগুলো যেন অন্ধকারের মধ্যেই দাঁত বের করে আছে।

অন্যদিকে প্রতাপের ছোট কিন্তু দ্রুতগামী রণতরী।নদীর ঢেউ ধাক্কা মারছিল কাঠের গায়ে। সৈন্যদের অনেকের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছিল। কারণ ওরা জানত—এই যুদ্ধে হার মানে শুধু মৃত্যু নয়।হার মানে বাংলার নদীপথ হারানো।

প্রতাপ নিজের জাহাজের সামনের অংশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখ স্থির। হাতে তরবারি। বজ্রপাতের আলো মাঝে মাঝে তার মুখ উজ্জ্বল করে আবার অন্ধকারে ঢেকে দিচ্ছিল।

হঠাৎ—মগদের দিক থেকে ভয়ংকর শব্দে প্রথম কামান গর্জে উঠল। নদীর বুক কেঁপে উঠল। একটি গোলা এসে প্রতাপের পাশের নৌকায় আঘাত করতেই আগুন ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। সৈন্যদের চিৎকার।

কেউ নদীতে পড়ে গেল। কেউ আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে। এক তরুণ সৈন্য আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল—“ওদের কামান অনেক শক্তিশালী!”

কিছু সৈন্যের চোখে ভয় স্পষ্ট হয়ে উঠল। প্রতাপ চারদিকে তাকাল। তারপর হঠাৎ গর্জে উঠল— “পালাবে না কেউ!”

তার কণ্ঠস্বর যেন ঝড়ের শব্দও ছাপিয়ে গেল।“আজ নদী দেখবে—বাংলার সন্তানরা কিভাবে লড়াই করে!”সৈন্যদের চোখে আবার আগুন ফিরতে শুরু করল।প্রতাপ দ্রুত নদীর স্রোতের দিকে তাকাল। তারপর নৌসেনাপতিকে বলল—“ডান দিক ঘোরাও। কুয়াশার আড়াল ব্যবহার করো।”বৃদ্ধ সেনাপতি কয়েক মুহূর্ত অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। কারণ এত ভয়ংকর পরিস্থিতিতেও প্রতাপের মাথা ঠান্ডা। আদেশ দেওয়া মাত্র ছোট রণতরীগুলো কুয়াশার আড়ালে ছড়িয়ে পড়তে লাগল।

মগ জলদস্যুরা বুঝতেই পারল না—প্রতাপ সরাসরি আক্রমণ না করে নদীকেই অস্ত্র বানাচ্ছে। বিশাল জাহাজগুলো সামনে এগিয়ে আসছিল।

হঠাৎ—কুয়াশার ভেতর থেকে একসঙ্গে গর্জে উঠল বাংলার কামান।ধাম!ধাম!ধাম!একটি গোলা গিয়ে আঘাত করল মগদের প্রধান জাহাজে। আগুন ছড়িয়ে পড়ল মুহূর্তে। নদীজুড়ে চিৎকার। মগ সেনাপতি ক্রুদ্ধ হয়ে গর্জে উঠল—“ওদের ঘিরে ফেলো!”

বিশাল জাহাজগুলো দিক বদলাতে শুরু করল। কিন্তু এখানেই ছিল প্রতাপের আসল চাল। বাংলার ছোট রণতরীগুলো স্রোতের সঙ্গে এত দ্রুত চলছিল যে বড় জাহাজগুলো ঠিকমতো নিশানা করতেই পারছিল না।প্রতাপ তরবারি উঁচু করল।

“এবার সামনে!”

তার জাহাজ সরাসরি শত্রুর দিকে ছুটে গেল। দুই জাহাজ একে অপরের গায়ে ধাক্কা মারতেই ভয়ংকর শব্দ হলো। প্রতাপ এক লাফে শত্রুর জাহাজে উঠে পড়ল। চারদিকে রক্ত, আগুন, ধোঁয়া। এক মগ যোদ্ধা বিশাল কুঠার নিয়ে তার দিকে ছুটে এলো।

প্রতাপ মুহূর্তের মধ্যে তরবারি ঘুরিয়ে আঘাত করল।লোকটা ডেকে লুটিয়ে পড়ল। আরেকজন পিছন থেকে আক্রমণ করতে যেতেই প্রতাপ ঘুরে তার বুক লক্ষ্য করে লাথি মারল। সৈন্যরা বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিল।

কারণ তাদের রাজপুত্র যেন যুদ্ধক্ষেত্রে অন্য মানুষ হয়ে গেছে। নদীর উপর তখন আগুনের প্রতিফলন। মাঝে মাঝে বজ্রপাত আকাশ আলোকিত করছে। আর সেই আলোয় দেখা যাচ্ছিল—প্রতাপ সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, আর তার পেছনে বাংলার সৈন্যরা নতুন উন্মাদনায় লড়ছে।

হঠাৎ—এক ভয়ংকর বিস্ফোরণ। প্রতাপ পিছনে তাকিয়ে দেখল তার একটি রণতরী আগুনে জ্বলছে।নদীতে পড়ে যাচ্ছে সৈন্যরা। এক আহত সৈন্য চিৎকার করে উঠল—“রাজপুত্র! আমরা শেষ!”

প্রতাপ কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল—“যুদ্ধ তখনই শেষ হয়… যখন মানুষ আশা হারায়।”

সে আবার তরবারি তুলল।“বাংলার জন্য!”

চারদিক থেকে গর্জে উঠল—“বাংলার জন্য!”

সেই গর্জনে যেন নদীও কেঁপে উঠল। আর ঠিক তখনই প্রতাপের চোখে পড়ল—কুয়াশার আড়াল ভেদ করে আরও বড় এক মগ যুদ্ধজাহাজ ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। জাহাজটির মাথায় কালো পতাকা।আর তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক ভয়ংকর মানুষ।মুখে দাগ। হাতে বিশাল তলোয়ার। মগদের প্রধান সেনাপতি। সে দূর থেকে প্রতাপের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল।তারপর আকাশ কাঁপিয়ে চিৎকার করল—“আজ বাংলার নদীতে প্রতাপের রক্ত ভাসবে!”

চলবে................