Titas Nodi in Bengali Love Stories by Projapoti books and stories PDF | তিতাস নদী - পর্ব 8

Featured Books
Categories
Share

তিতাস নদী - পর্ব 8

তিতাসের কাঁপতে থাকা কাঁধ দুটো রুদ্রর চোখ এড়ায় না। পকেটে হাত গুঁজে রুদ্র তিতাসের সামনে এসে দাঁড়ায়।

"কী হলো? চোখে জল কেন?"

তিতাস চট করে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ দুটো মুছে নেয়। মাথা না তুলে, ভাঙা চাপা গলায় বলে, "আমার কোনো কথার উল্টো জবাব দেওয়ার অধিকার নেই। ছোটবেলা থেকে ছিল না, আজও নেই। আপনি আমাকে যা খুশি ভাবতে পারেন... কিন্তু প্লিজ, আমাকে এখন যেতে দিন।"

কথাটা শেষ করে ও পাশ কাটিয়ে দৌড় দেওয়ার চেষ্টা করতে, রুদ্র তিতাসের হাতটা ধরে তাকে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

"অধিকার কেউ থালা সাজিয়ে দিয়ে যায় না। অধিকার কেড়ে নিতে হয়। যারা আপনাকে নীরব থাকতে বাধ্য করেছে, ভুলটা তাদের ছিল। কিন্তু আপনি যদি আজও নিজেকে সেই পুরোনো খাঁচায় বন্দি করে রাখেন, তবে ভুলটা আপনার।"

তিতাস চমকে মাথা তুলে তাকায়। অবিশ্বাশ্বের চোখে প্রশ্ন করে, "যদি না পারি?"

"নিজের ওপর হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে যদি আপনি না পারেন, তাহলে মনে করবেন চিরকালের মতো আপনি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছেন। আপনার নিজের সত্তা বলতে কিছু নেই। আপনি যদি বাকিদের সামনে না পারেন, অন্তত আমার সামনে বোবা হয়ে থাকবেন না। কারণ, একটু আগে আপনি, সেটা ভুল করে হোক বা যাই হোক, প্রতিবাদ করেছিলেন তো? সেটাকে ধরে রাখতে শিখুন। ভালো আপনারই হবে। নাহলে এখনকার পরিস্থিতি আপনি নিশ্চই জানেন।"


তিতাসকে কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রুদ্র হালকা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে। "যাকগে, চলুন আপনাকে পার্কের বাইরে অবধি ছেড়ে দিয়ে আসি।"

"আ-আমি নিজে চলে যেতে পারব..."

"আবার সেই একই গান!" রুদ্র একটা ভুরু উঁচিয়ে থামিয়ে দেয় তাকে। "আপনার একটা কথাও এখন আমি শুনব না। যা বলছি, সেটা করুন।"

কথা বাড়িয়ে লাভ নেই বুঝে তিতাস মুখে কুলুপ আঁটে। বেশি বচসা করতে গেলে লোকটা আবার কী বাহানা তুলে আটকে দেবে, সেই ভয়ে সে পার্কের মেইন গেটের দিকে পা বাড়ায়। রুদ্রও তার পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করে। আড়চোখে তিতাসের দিকে তাকিয়ে রুদ্র মনে মনে ভাবে, 'সময় লাগবে, জানি। কিন্তু নিজের অস্তিত্ব ভুলে যাওয়া এই মেয়েটার বুকে যদি লড়াই করার সাহস আমি ফিরিয়ে আনতে না পারি, তবে আমার নামও রুদ্র রায় নয়!'

পার্কের ভারী গেট পেরিয়ে বাইরে আসতে শহরের পরিচিত ব্যস্ততা দু’জনকে ঘিরে ধরে। আড়মোড়া ভেঙে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে শুরু করে চারপাশ।

ফুটপাথের কোণে টিনের চাল দেওয়া চায়ের দোকানটার ঝাঁপ কেবল খুলছে। সাইকেলের টুংটাং শব্দ তুলে খবরের কাগজের হকার ঝড়ের বেগে পার হয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় কয়েকজন প্রাতঃভ্রমণকারী হালকা ছন্দে জগিং করছেন। আর চায়ের দোকানের সামনে জমছে টুকটাক ভিড়। সেখানে থেকে উঠছে ধোঁয়া ওঠা গরম মাটির ভাঁড় হাতে দু-চারজনের ক্ষণিকের আড্ডা।

রুদ্র কী যেন একটা ভেবে কয়েক সেকেন্ড থমকে দাঁড়ায়। তারপর তিতাসের দিকে তাকিয়ে সহসা বলে ওঠে, "চা খাবেন?"

তিতাস রুদ্রর দৃষ্টি অনুসরণ করে চায়ের দোকানটার দিকে ঘোরে। সেখানে বেশ কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে। অত মানুষের ভিড়ে চা খেতে কেমন যেন ইতস্তত বোধ হয় তার।

তিতাসকে অত শত ভাবতে দেখে রুদ্র হালকা একটু খোঁচা দিয়ে বলে, "এত ভাবার কী আছে? চা খাবেন তো বলুন, নাহলে একটা অটো ধরিয়ে দিচ্ছি। ভাবলাম, এক কাপ গরম চা পেটে পড়লে হয়তো বন্ধ হয়ে থাকা মস্তিষ্কটা আবার কাজ করা শুরু করবে!"

রুদ্রর কথায় তিতাস একটা দীর্ঘ হাঁফ ছাড়ে। কথা না বাড়িয়ে সে মেইন রোড পার হতে শুরু করে। রুদ্র তিতাসের পেছন পেছন চলে। তার অভিমানের বহর দেখে সে কেবল মুচকি হাসে।

চায়ের দোকানের সামনে পৌঁছে তিতাস কিছু বলার আগে রুদ্র দোকানদারকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠে, "দাদা, দুটো চা দিন তো!"

দুজনে দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে। সামনের দু-তিনটে প্লাস্টিকের চেয়ার আগে থেকে অন্য গ্রাহকদের দখলে, তাই বসার কোনো উপায় নেই। শেডের নিচে তারা দুজন অপেক্ষারত। রুদ্র পকেট থেকে ফোন বের করে ইমেইল চেক করছে ঠিকই, কিন্তু তার নজর আটকে আছে পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা তিতাসের ওপর।

ফোন থেকে চোখ না সরিয়ে রুদ্র বলে, "আপনার নামটা কি এ জন্মে জানা যাবে?"

তিতাস এতক্ষণ ধরে কীভাবে এই অদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে নিজেকে বের করবে সেই ফন্দি পাতছে। রুদ্রর আচমকা প্রশ্নটা কানে যেতে সে বিরোক্তিতে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয়।


"জাহ বাবা! নাম বলতে গিয়েও আবার এত দ্বিধা?" রুদ্র আরও একটু খোঁচা ফিয়ে বলে, "আপনার নামটা জেনে ফেললে কি আমি আপনার সম্পত্তি হড়পে নেব নাকি?"

তিতাস সোজা অন্যদিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় জবাব দেয়, "আমি অচেনা লোককে আমার নাম বলি না।"

রুদ্র এক ভুরু চড়িয়ে বেশ মজা পেয়ে তিতাসের দিকে তাকায়। হালকা একটু হেসে ফেলে সে। তিতাস কপাল কুঁচকে বিরক্তি প্রকাশ করলেও রুদ্রর দিকে একবারের জন্যও ফিরে তাকায় না।

"বেশ তাহলে আমি না হয় প্রথম পরিচয়টা দিয়ে দেই। আমি রুদ্র। রুদ্র রায়। কলকাতায় জন্ম, বড় হয়ে ওঠা। পড়াশোনা, চাকরি সব এখানে। মা-বাবাকে নিয়ে আমার ছোট্ট পরিবার। তা, এবার কি জানা যেতে পারে?"


চা-ওয়ালা দুটো ধোঁয়া ওঠা গরম মাটির ভাঁড় বাড়িয়ে দেয়। রুদ্র চা দুটো হাতে নিয়ে একটা তিতাসের দিকে বাড়িয়ে ধরে।

"নাও। বেশ গরম আছে, সামলে ধরো।"

তিতাস খুব সাবধানে, যাতে রুদ্রর আঙুলে নিজের আঙুলের একবিন্দুও ছোঁয়া না লাগে, সেভাবে মাটির ভাঁড়টা হাতে তুলে নেয়। রুদ্র তার কাণ্ড খেয়াল করেও মুখে কোনো মন্তব্য করে না।

গরম ভাঁড়ের ওম হাতে লাগতে তিতাস নিচু গলায় চোখ নামিয়ে বলে, "তিতাস। তিতাস চৌধুরী।"

আর কথা বাড়ে না। রুদ্র নতুন করে কথা শুরু করার কোনো তাগিদ দেখায় না। সে খুব ভালো করে জানে, কখন কোথায় থামতে হয়। অযথা বেশি মেলামেশা করতে গেলে মেয়েটা হয়তো ভেবে বসবে সে তাকে ইমপ্রেস করার চেষ্টা করছে! তাই সে নীরবতা বজায় রেখে নিজের ভাঁড়ে চুমুক দেয়।

চা শেষ করে রুদ্র আড়চোখে তিতাসের দিকে তাকায়। তিতাস তখনও নিজের ধোঁয়া ওঠা মাটির ভাঁড়টায় হালকা ফুঁ দিয়ে দিয়ে খুব সাবধানে অল্প অল্প করে চা খাচ্ছে। প্রতিবার গরম তরলটা মুখে নেওয়ার সময় ওর ঠোঁট দুটো অদ্ভুতভাবে উল্টে কুঁচকে যাচ্ছে। চোখের পাতায় সামান্য টান আর কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ, যেন দুনিয়ার কোনো জটিল অংক মেলাতে না পেরে মহা ফাঁপরে পড়েছে! মেয়েটার বাচ্চার মতো হাবভাব দেখে রুদ্রর হাসি পায়। 

"চা পছন্দ হয়নি?"

আচমকা নিস্তব্ধতা ভেঙে রুদ্রর গলার আওয়াজ পেতে তিতাস ভয়ে চমকে ওঠে। হাতটা সামান্য কেঁপে উঠতে চা কিছুটা ছিটকে এসে পড়ে ওর হাতের আঙুলে।

"আরে! আস্তে আস্তে!"

রুদ্র তিতাসের হাত থেকে মাটির ভাঁড়টা চট করে টেনে নিয়ে পাশের একটা বেঞ্চের ওপর রেখে দেয়। তিতাস ততক্ষণে ব্যথায় আঙুলে ফুঁ দিতে শুরু করেছে।

রুদ্র এক মুহূর্ত দেরি না করে চায়ের দোকানদারের কাছ থেকে পানির বোতলটা তুলে নেয়। ক্যাপটা খুলে বলে,
"হাতটা দিন। জল দিয়ে ধুয়ে নিন, জ্বালা কমে যাবে।"
"না... আমি ঠিক আছি।"

রুদ্রর ভুরু সঙ্গে সঙ্গে কুঁচকে যায়। গলার স্বর কিছুটা কড়া করে বলে, "তোমার কি আমার সঙ্গে কথায় কথায় 'না' বলতে খুব ভালো লাগে? যা বলছি, শান্ত হয়ে সেটা করো।"

তিতাসের আর 'না' করার সাহস হয় না। সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাতটা সামনের দিকে বাড়িয়ে দেয়।

রুদ্র খুব সাবধানে, ধীরে ধীরে তিতাসের লাল হয়ে যাওয়া আঙুলের ওপর ঠান্ডা পানি ঢালতে থাকে।
পানির শীতল স্পর্শে তিতাসের মুখের যন্ত্রণার ছাপটা নিমেষেই কিছুটা মুছে যায়।

খালি বোতলটা কাছের ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে রুদ্র বলে,
"এই চা আর খেতে হবে না। আরেকটা বানিয়ে দিতে বলব?"

"না, না! একদম না! আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমায় এবার যেতে হবে।"

"বেশ, চলুন। একটা অটো ধরিয়ে দিচ্ছি।"

রুদ্র দোকানদারকে চায়ের দাম মিটিয়ে দেয়। তিতাস চুপচাপ তার পেছন পেছন এগোয়। মেইন রোডে এসে রুদ্র হাত দেখিয়ে একটা অটো দাঁড় করায় আর তিতাসকে ভেতরে বসার ইঙ্গিত করে।

অটোতে উঠতে তিতাসের খেয়াল হয় ভাড়াটা রুদ্রই দিচ্ছে। সে ছটফট করে উঠে বলে, "আপনি ভাড়া দিচ্ছেন কেন? আমি দিয়ে দেব! চায়ের দামটাও তো আপনি আমাকে দিতে দেননি। দাদা, উনি যে টাকাটা দিচ্ছেন ওটা ফেরত দিন, আমি আপনাকে নিজের ভাড়া দিয়ে দেব।"

রুদ্র মানিব্যাগ পকেটে রেখে এক পা এগিয়ে আসে। অটোর ওপর সামান্য ঝুঁকে দাঁড়ায়। তার একটা হাত অটোর ছাদে রাখা, আর অন্য হাতটা আগের মতোই ট্রাউজার্সের পকেটে পোঁতা। তার গাঢ় আর তীক্ষ্ণ নজর সোজা আটকে আছে তিতাসের চোখে।


"চা আমি আপনাকে অফার করেছি। আর অটোতে তুলে দিয়ে আপনাকে নিরাপদে বাড়ি পাঠানোর দায়িত্বটাও আমিই নিয়েছি। অতএব সেখানে আমি টাকা দেব কী দেব না, তা নিয়ে আপনার অনর্থক চিন্তা না করলেও চলবে।"

তারপর অটোওয়ালার দিকে তাকিয়ে বলে,
"যান দাদা, ভালো করে সাবধানে নিয়ে যান।"

রুদ্র মুখটা আরেকটু নামিয়ে খুব নিচু স্বরে যোগ করে,
"আর শোনো তিতাস, চোখ-কান খোলা রেখে রাস্তা পার হবে। সব জায়গায় তো আমি পৌঁছাতে পারব না তোমাকে বাঁচাতে, তাই না?"

তিতাস অস্বস্তিতে পড়ে আমতা আমতা করে বলে, "আপনি... আপনি আপনার GPay কিংবা Paytm নম্বরটা দিন। আমি টাকাটা আপনাকে পাঠিয়া দিচ্ছি।"

ইতিমধ্যে, অটোওয়ালা চটে গিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে বলে, "আরে দিদি! কেন খামোকা সকাল সকাল সময় নষ্ট করছেন? এই দাদা যখন ভাড়া দিয়ে দিয়েছেন, আপনি বলুন কোথায় যাবেন। আপনাকে পৌঁছে দিচ্ছি!"

অটোওয়ালার ঝাঝালো কথায় তিতাসের মুখটা একেবারে চুপসে যায়। রুদ্র মাথা নেড়ে নিজের হাসি চেপে রাখতে পারে না। মৃদু এক হাসি খেলে যায় তার ঠোঁটে।

রুদ্র এক ভুরু উঁচিয়ে খোঁচা মেরে বলে, "সোজা ফোন নম্বর চাইতে পারতে, তিতাস। দিয়ে দিতাম। এভাবে GPay বা Paytm-এর বাহানা বানিয়ে কথা ঘোরানোর কী দরকার ছিল?"

পকেট থেকে আবার মানিব্যাগ বের করে নিজের কার্ডটা তিতাসের দিকে এগিয়ে দেয় রুদ্র। "নাও। এখানে আমার ফোন নম্বর আছে। দরকার পড়লে কল করতে পারো।"
তারপর অটোওয়ালার দিকে তাকিয়ে বলে, "যান দাদা। নিয়ে যান।"

শেষবারের মতো তিতাসকে বলে, "আর হ্যাঁ, সাবধানে যেও, তিতাস।"

অটো স্টার্ট হয়। রুদ্র সাইডে দাঁড়িয়ে থাকে। মোড় পার হতে তিতাস নিজের কোলে রাখা কার্ডটার দিকে তাকায়। কালো অক্ষরে বড়ো বড়ো করে লেখা, 

অ্যাডভোকেট রুদ্র রায়
ক্রিমিনাল জাস্টিস লয়ার
কলকাতা হাই কোর্ট