গল্পটা চৌধুরী পরিবারের প্রায় দেড়শো বছরের পুরোনো জমিদারবাড়ির। গ্রামের মানুষরা জমিদার বাড়িটিকে বলতো—মৃত্যুমহল।
বাড়িটার আসল নাম ছিল মৃণালিনী ভবন। কিন্তু গত চল্লিশ বছর ধরে কেউ সেই নামে ডাকত না।
জমিদারবাড়ির চারপাশে বিশাল পাঁচিল। পাঁচিলের গায়ে বটগাছের শিকড় এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, যেন কোনো বিশাল মৃতদেহকে গাছের শিকড় দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। জমিদারবাড়ির প্রধান ফটকের দুপাশে পাথরের দুটি সিংহ। তাদের চোখের কোটরে জমে থাকা শ্যাওলার দিকে তাকালে মনে হতো, তারা যেন জমিদারবাড়ির ভিতরে ঢোকা প্রতিটি মানুষের পরিচয় মনে রাখে।
জমিদারবাড়ির পিছনে ছিল একটি পরিত্যক্ত পুকুর। পুকুরের জল কালো। দুপুরের রোদেও তার তল দেখা যেত না। গ্রামের লোকেরা বলতো, ওই পুকুরের তলায় নাকি এমন কিছু আছে, যা কোনোদিন মাটির উপরে উঠে আসতে চায় না। কিন্তু জমিদারবাড়ির সবচেয়ে ভয়ংকর জিনিস ছিল তার তেরো নম্বর ঘর।
জমিদারবাড়িতে মোট বারোটি ঘর থাকার কথা। পুরোনো নকশায়ও বারোটি ঘরের উল্লেখ ছিল। অথচ বাড়ির উত্তর দিকের করিডরের একেবারে শেষ প্রান্তে ছিল একটি অতিরিক্ত ঘর ছিল।
যার দরজার উপরে মরচে ধরা পিতলের ফলকে লেখা ছিলও —
১৩।
সেই দরজাটি গত চল্লিশ বছর ধরে বন্ধ। কেউ জানতো না, তার ভিতরে কী আছে। আর যারা জানতো, তারা কখনো মুখ খোলেনি। এই বাড়ির সঙ্গে যুক্ত ছিল আরও একটি অদ্ভুত ঘটনা। প্রতি বছর আশ্বিন মাসের অমাবস্যার রাতে বাড়ির সমস্ত ঘড়ি থেমে যেত রাত দুটো বেজে তেরো মিনিটে।
এক মিনিটের জন্য নয়। সারা রাতের জন্য। তারপর পরদিন সকালেও ঘড়িগুলো আর চলতো না। সেগুলো আবার চালু করতে হতো নতুন করে।
বাড়ির বৃদ্ধ পরিচারক নিবারণ বলতো, ওই সময়ে যদি বাড়ির ভিতরে কেউ নিজের নাম শুনতে পায়, তাহলে কোনোভাবেই সেই ডাকে উত্তর দেওয়া চলবে না। কারণ, যে ডাকছে সে পরিচিত কেউ নয়।
সে তোমার নাম জানে, তোমার মুখ জানে, এমনকি তোমার জীবনের গোপন কথাগুলোও জানে। কিন্তু সে মানুষ নয়।
সেই বছর আশ্বিন মাসের অমাবস্যার তিন দিন আগে কলকাতা থেকে জমিদারবাড়িতে এসে পৌঁছল অনুব্রত চৌধুরী। বয়স তিরিশ। পেশায় চাকুরীজীবী। বহু বছর আগে বাবার সঙ্গে ঝগড়া করে সে এই বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলো। তারপর আর কখনো ফিরে আসেনি।
এবার ফিরে আসার কারণ হলো , তার বাবার মৃত্যু।
বাড়ির মালিক সুশান্ত চৌধুরী অনুব্রত চৌধুরীর বাবা মারা গিয়েছেন সাত দিন আগে। ডাক্তারের রিপোর্টে লেখা ছিল, হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু। কিন্তু মৃত্যুর আগে তিনি ছেলেকে একটি চিঠি লিখেছিলেন।
চিঠিটা অনুব্রত কাছে পৌঁছেছিল বাবার মৃত্যুর দুদিন পর।
তাতে মাত্র চারটি লাইন লেখা ছিল।
'অনুব্রত,
আমি জানি, তুই আমাকে ক্ষমা করবি না।
কিন্তু এই বাড়িতে যা ঘটেছিল, তার সত্যিটা জানার অধিকার তোর আছে।
তেরো নম্বর ঘরের দরজা কখনো খুলিস না। যদি কখনো ভিতর থেকে তোর মায়ের গলা শুনতে পাস, তাহলে কোনোভাবেই উত্তর দিবি না। আমি আর পারছি না।
—বাবা'
চিঠিটা পড়ে অনুব্রতর প্রথমে রাগ হয়েছিলো । তারপর কৌতূহল। আর শেষ পর্যন্ত, বহু বছর ধরে বুকের মধ্যে চাপা পড়ে থাকা একটা পুরোনো যন্ত্রণা তাকে ফিরিয়ে এনেছিল এই জমিদারবাড়িতে।
তার মা মৃণালিনী চৌধুরী নিখোঁজ হয়েছিলো অনুব্রতর দশ বছর বয়সে। বাবা বলেছিলো, মা বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। কিন্তু অনুব্রতর মনে ছিল অন্য একটি স্মৃতি।
সেই রাতে সে মায়ের চিৎকার শুনেছিল। তারপর করিডরে বাবার পায়ের শব্দ। আর শেষে, তেরো নম্বর ঘরের দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজ। সেই স্মৃতির কথা সে কাউকে কখনো বলেনি।
কারণ, পরদিন সকালে বাবা তাকে বলেছিলো, সে নাকি দুঃস্বপ্ন দেখেছে। এত বছর পরও সেই কথাটা অনুব্রত বিশ্বাস করতে পারেনি।
বাড়ির ফটক পেরিয়ে ভিতরে ঢোকার সময় সন্ধ্যা নেমে এসেছিলো। আকাশে চাঁদ ছিল না।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ পরিচারক নিবারণ অনুব্রতকে দেখে কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেলো।
তারপর বললো , "ছোটোবাবু!"
অনুব্রত হাসি মুখে বললো , "কেমন আছো , নিবারণকাকা?"
নিবারন কোনো উত্তর দিলো না। শুধু অনুব্রত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব নিচু গলায় বললো , "আপনি ফিরে এলেন কেন?"
অনুব্রত বললো , "বাবার শ্রাদ্ধ করতে।"
নিবারণ মাথা নেড়ে বললো , "শ্রাদ্ধ তো হয়েই গেছে, ছোটোবাবু। তাহলে?"
নিবারন করিডরের অন্ধকারের দিকে তাকালো। তারপর একটু গম্ভীর গলায় বললো , "বাড়িটা আপনাকে ডাকছে ছোটো বাবু”।
অনুব্রত কিছু বলার আগেই ভিতর থেকে একটা শব্দ এলো ।
টক… টক… টক… ।
যেন কেউ কাঠের দরজায় নখ দিয়ে আঁচড় কাটছে। শব্দটা আসছিলো উত্তর দিকের করিডর থেকে। তেরো নম্বর ঘরের দিক থেকে।
অনুব্রত তাকিয়ে দেখল, করিডরের একেবারে শেষ প্রান্তে অন্ধকারের মধ্যে একটা ছায়া দাঁড়িয়ে আছে। সাদা শাড়ি পরা এক মহিলা। তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তার ডান হাতটা দরজার উপরে রাখা। যেন সে এতক্ষণ ধরে দরজাটা খোলার চেষ্টা করছিল।
অনুব্রত চোখের পলক ফেলল। ছায়াটা আর নেই। শুধু দরজার উপরে ঝুলে থাকা মরচে ধরা পিতলের ফলকটা বাতাস ছাড়াই ধীরে ধীরে দুলছে। তাতে লেখা আছে __ ১৩।