Hacked laptop in Bengali Thriller by Miss writer books and stories PDF | হ্যাক হওয়া ল্যাপটপ

Featured Books
Categories
Share

হ্যাক হওয়া ল্যাপটপ



রাত তখন প্রায় দুটো।

বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানিতে অন্ধকার ঘরটা আলোকিত হয়ে উঠছে। নিজের ঘরে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিল রাহুল। কম্পিউটার নিয়ে তার বরাবরই আগ্রহ। পড়াশোনার পাশাপাশি সে ছোটখাটো ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজও করে।

হঠাৎ ল্যাপটপের স্ক্রিন নিজে থেকেই জ্বলে উঠল।

রাহুল অবাক হয়ে তাকাল। সে তো কিছুক্ষণ আগেই স্ক্রিন বন্ধ করেছিল! এবার স্ক্রিনের মাঝখানে একটা কালো উইন্ডো খুলে গেল। সেখানে সাদা অক্ষরে লেখা উঠল—

“তুমি যা খুঁজছ, তা তোমার কম্পিউটারেই লুকিয়ে আছে।”

রাহুল ভেবেছিল, হয়তো কোনো ভাইরাসের কারণে এমন হচ্ছে। সে উইন্ডোটা বন্ধ করার চেষ্টা করল। কিন্তু কিছুতেই বন্ধ হলো না।

কয়েক সেকেন্ড পর আবার নতুন একটা মেসেজ ভেসে উঠল।

“পিছনে তাকিও না।”

রাহুলের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে ধীরে ধীরে পিছনে তাকাল। ঘরে সে একাই ছিল। জানালার বাইরে বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না।

নিজেকে বোঝাল, নিশ্চয়ই কেউ তার সঙ্গে মজা করছে। ল্যাপটপ বন্ধ করে সে ঘুমিয়ে পড়ল।

কিন্তু পরদিন সকালে উঠে সে বুঝতে পারল, ব্যাপারটা মোটেই সাধারণ নয়।

তার ল্যাপটপের ডেস্কটপে একটা নতুন ফোল্ডার তৈরি হয়েছে। নাম—“আমার সত্য”।

ফোল্ডারটা খুলতেই রাহুলের চোখ কপালে উঠল। সেখানে তার ব্যক্তিগত ছবি, পুরোনো মেসেজ এবং এমন কিছু নথি ছিল, যেগুলো সে অনেক আগেই মুছে দিয়েছিল বলে ভেবেছিল।

সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল একটি ভিডিও।

ভিডিওটি চালু করতেই রাহুল দেখতে পেল, রাত দুটোর সময় তার নিজের ঘরের দৃশ্য। সে ল্যাপটপের সামনে বসে আছে, বারবার পিছনে তাকাচ্ছে।

কিন্তু ভিডিওর এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল আরেকজন মানুষ।

কালো পোশাক পরা, মুখ ঢাকা এক অচেনা ব্যক্তি।

রাহুল দ্রুত পিছনে তাকাল। ঘরে কেউ নেই।

ভিডিওর শেষে লেখা উঠল—

“আমি তোমার খুব কাছেই আছি।”

রাহুলের হাত ঠান্ডা হয়ে গেল। সে সঙ্গে সঙ্গে তার বন্ধু অর্ণবকে ফোন করল। অর্ণব কম্পিউটার নিয়ে পড়াশোনা করে এবং এসব বিষয়ে যথেষ্ট জানে।

সব শুনে অর্ণব বলল, “তোর ল্যাপটপে কেউ অননুমোদিতভাবে ঢুকে পড়েছে। আপাতত ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন কর। আর কোনো অচেনা ফাইল খুলবি না। আমি বিকেলে আসছি।”

কিন্তু রাহুলের মনে অন্য প্রশ্ন ঘুরছিল। হ্যাকার তার ব্যক্তিগত ফাইল পেল কীভাবে? আর ভিডিওতে তার ঘরের দৃশ্য এল কোথা থেকে?

দুপুরে অর্ণব এল। সে ল্যাপটপ পরীক্ষা করে দেখল, কয়েকটি অচেনা প্রোগ্রাম চালু রয়েছে। কে বা কারা সেগুলো চালু করেছে, তা বোঝা সহজ ছিল না।

ঠিক তখনই ল্যাপটপে ইন্টারনেট সংযোগ না থাকা সত্ত্বেও স্ক্রিন জ্বলে উঠল।

নতুন একটি মেসেজ।

“অর্ণবকে বিশ্বাস কোরো না।”

দুজনেই স্তব্ধ হয়ে গেল।

অর্ণব বলল, “এটা আমাদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করার চেষ্টা। মাথা ঠান্ডা রাখ।”

কিন্তু পরের মেসেজটা দেখে রাহুলের মুখ শুকিয়ে গেল।

“তিন বছর আগের দুর্ঘটনাটার কথা মনে আছে?”

রাহুলের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

তিন বছর আগে তার দাদা সৌরভ রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়েছিল। পুলিশ অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পায়নি। বাড়ির সবাই ধরে নিয়েছিল, সৌরভ হয়তো কোথাও চলে গেছে।

কিন্তু রাহুল কখনও বিশ্বাস করেনি যে তার দাদা স্বেচ্ছায় তাদের ছেড়ে চলে যেতে পারে।

সৌরভও কম্পিউটার নিয়ে কাজ করত। নিখোঁজ হওয়ার আগে সে রাহুলকে বলেছিল, একটি বড় প্রতিষ্ঠানের গোপন তথ্য নিয়ে সে কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা জানতে পেরেছে। তবে সে বিস্তারিত কিছু বলেনি।

রাহুল এতদিন বিষয়টাকে আলাদা করে দেখেনি। এবার তার মনে হলো, দুটো ঘটনার মধ্যে হয়তো যোগ রয়েছে।

স্ক্রিনে আবার মেসেজ এল—

“পুরোনো নীল ডায়েরিটা খুঁজে বের করো।”

রাহুলের মনে পড়ল, সৌরভের ঘরে একটা নীল ডায়েরি ছিল। দাদা নিখোঁজ হওয়ার পর ডায়েরিটা আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

সেদিন সন্ধ্যায় রাহুল পুরোনো জিনিসপত্র ঘাঁটতে শুরু করল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর আলমারির পিছনে একটা নীল ডায়েরি পাওয়া গেল। ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা ছিল—

“যদি আমার সঙ্গে কিছু ঘটে, তাহলে বুঝবে আমি ভুল মানুষের ওপর বিশ্বাস করেছিলাম। সত্যিটা ল্যাপটপের মধ্যে লুকিয়ে আছে।”

তার নিচে একটা তারিখ এবং কয়েকটি অক্ষর লেখা ছিল।

রাহুলের মনে হলো, এগুলো কোনো গুরুত্বপূর্ণ ফাইলের সংকেত হতে পারে।

সে ডায়েরিটা নিয়ে অর্ণবের কাছে গেল। অর্ণব কিছুক্ষণ লেখাগুলো দেখে বলল, “এটা কোনো ফাইলের নাম বা পুরোনো অ্যাকাউন্টের ইঙ্গিত হতে পারে। কিন্তু নিশ্চিত না হয়ে কিছু করা ঠিক হবে না।”

দুজন মিলে ল্যাপটপের পুরোনো ব্যাকআপ পরীক্ষা করল। সেখানে একটি এনক্রিপ্ট করা ফাইল পাওয়া গেল, যার নাম ছিল “SOURAV_FINAL”।

ফাইলটি খুলতে বিশেষ অনুমতি এবং সঠিক পাসওয়ার্ড প্রয়োজন ছিল। ডায়েরির তারিখটি ব্যবহার করে রাহুল সম্ভাব্য পাসওয়ার্ডের কথা ভাবল। কয়েকবার চেষ্টা করার পর ফাইলটি খুলে গেল।

ভেতরে ছিল কয়েকটি নথি এবং একটি ভিডিও।

ভিডিওতে সৌরভকে দেখা গেল। মুখে ক্লান্তির ছাপ, চোখে আতঙ্ক।

সে বলছিল, “রাহুল, যদি তুই এই ভিডিও দেখিস, তাহলে হয়তো আমি আর বাড়ি ফিরতে পারব না। আমি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করতাম, সেখানে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করা হচ্ছে। আমি তার প্রমাণ পেয়েছি। কিন্তু এই কাজের সঙ্গে জড়িত একজনকে আমি চিনি। সে আমাদের খুব কাছের মানুষ।”

ভিডিওটা হঠাৎ থেমে গেল।

রাহুলের গলা শুকিয়ে গেল। সে অর্ণবের দিকে তাকাল।

অর্ণবের মুখ অস্বাভাবিক গম্ভীর।

“ভিডিওর বাকি অংশ কোথায়?” রাহুল জিজ্ঞাসা করল।

অর্ণব কোনো উত্তর দিল না।

ঠিক তখনই ল্যাপটপের স্ক্রিনে নতুন মেসেজ এল।

“এবার তোমার বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করো, সে তোমাকে কী বলতে ভুলে গেছে।”

রাহুল ধীরে ধীরে অর্ণবের দিকে ফিরল।

“তুই কিছু জানিস?”

অর্ণব অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মাথা নিচু করে বলল, “সৌরভ নিখোঁজ হওয়ার আগে আমার সঙ্গে দেখা করেছিল। ও আমাকে কিছু নথি দিয়েছিল। আমি ভয় পেয়ে সেগুলো লুকিয়ে ফেলি। আমি জানতাম না, ওর সঙ্গে ঠিক কী হয়েছিল। এতদিন কাউকে বলার সাহস পাইনি।”

রাহুল রাগে কাঁপতে লাগল। “তুই আমাকে এতদিন কিছু বলিসনি কেন?”

অর্ণব চোখ নামিয়ে বলল, “আমি ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু আমি তোর দাদার ক্ষতি করিনি।”

তাদের কথার মাঝেই স্ক্রিনে শেষ একটি ভিডিও চালু হলো।

সৌরভের মুখ দেখা গেল। এবার সে সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলল, “রাহুল, যে আমার ল্যাপটপে ঢুকতে পারবে, সে-ই সত্যিটা খুঁজে পাবে। কিন্তু সাবধান, সব প্রমাণ সত্যি হয় না। কেউ হয়তো তোকে ভুল পথে চালিত করছে।”

ভিডিও শেষ হওয়ার পর স্ক্রিনে একটি নাম ফুটে উঠল।

“RAHUL.”

তারপর লেখা এল—

“এই পুরো ঘটনাটা শুরু হয়েছিল তোমার ল্যাপটপ থেকে। কিন্তু তোমার ল্যাপটপে ঢুকেছিল কে?”

রাহুল অবাক হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

হঠাৎ তার মনে পড়ল, কয়েক মাস আগে সে অনলাইনে একটি অচেনা সফটওয়্যার ডাউনলোড করেছিল। সেই সফটওয়্যার ইনস্টল করার পর থেকেই ল্যাপটপ মাঝে মাঝে অদ্ভুত আচরণ করত। সে বিষয়টাকে গুরুত্ব দেয়নি।

তাহলে কি সেই সফটওয়্যারের মাধ্যমেই কেউ তার ল্যাপটপে ঢুকেছিল?

রাহুল আর অর্ণব ঠিক করল, সব নথি নিরাপদে রেখে সাইবার অপরাধ দমনকারী বিভাগের সাহায্য নেবে। তারা জানত, নিজেরা সব রহস্যের সমাধান করতে পারবে না।

কিন্তু ল্যাপটপ বন্ধ করার ঠিক আগে স্ক্রিনে আরেকটি মেসেজ ফুটে উঠল।

“সৌরভ বেঁচে আছে।”

রাহুলের চোখ বড় হয়ে গেল।

তারপর পর্দা কালো হয়ে গেল।

কয়েক সেকেন্ড পর স্ক্রিনে একটি নতুন ভিডিও চালু হলো। সেখানে দেখা গেল একটি অন্ধকার ঘর, একটা জানালা এবং জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষ।

মানুষটি ধীরে ধীরে ক্যামেরার দিকে ঘুরল।

তার মুখ দেখে রাহুলের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

সে সৌরভ!

ভিডিওতে সৌরভ ঠোঁট নাড়ল—

“রাহুল, আমাকে খুঁজতে এসো না। কারণ যে মানুষটা আমাকে আটকে রেখেছে, সে তোমার বাড়িতেই আছে।”

ভিডিও শেষ হয়ে গেল।

রাহুল আর অর্ণব একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।

ঠিক তখনই রাহুলের ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এল—

“এবার নিজের ঘরের দরজাটা খুলে দেখো।”

রাহুল ধীরে ধীরে দরজার দিকে তাকাল।

দরজার ওপাশ থেকে তিনবার টোকা পড়ল।

টক... টক... টক...

সে কাঁপা হাতে দরজার কাছে এগিয়ে গেল।

আর দরজা খুলতেই দেখল, সামনে দাঁড়িয়ে আছে এমন একজন মানুষ, যাকে সে গত তিন বছর ধরে মৃত বলে বিশ্বাস করে এসেছে।

সৌরভ।

কিন্তু সৌরভের চোখে ছিল এক অচেনা শীতলতা।

সে মৃদু হেসে বলল, “ল্যাপটপটা বন্ধ করেছিস তো, রাহুল?”

রাহুল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

সৌরভ এবার ফিসফিস করে বলল—

“কারণ এখন থেকে তোকে আর ল্যাপটপ হ্যাক করতে হবে না। আমি নিজেই তোর জীবনে ঢুকে পড়েছি।”

দরজার বাইরে আবার বিদ্যুৎ চমকাল।

আর ঘরের ভেতরে ল্যাপটপের কালো স্ক্রিনে নিঃশব্দে ভেসে উঠল শেষ একটি শব্দ—

“WELCOME BACK.”