সুড়ঙ্গের ভেতরের বাতাস যেন হঠাৎ জমে গেল।মশালের আগুন কাঁপছে। দেয়ালের উপর ছায়াগুলো অস্বাভাবিকভাবে নড়ছে। আর সেই অন্ধকারের গভীর থেকে বারবার ভেসে আসছে—খস...খস...খস...যেন কেউ পাথরের মেঝের উপর পা টেনে টেনে এগিয়ে আসছে। কিন্তু সেই পদক্ষেপে মানুষের স্বাভাবিক ছন্দ নেই। আছে অদ্ভুত এক ভার। একটা অস্বস্তিকর ধীরতা।প্রতাপাদিত্য তরবারির হাতল শক্ত করে ধরল। তার পাশে সৈন্যরাও প্রস্তুত। রঘুপতি আচার্যের মুখ তখন প্রায় সাদা হয়ে গেছে। তার চোখ স্থির অন্ধকারের দিকে। যেন তিনি এমন কিছু দেখছেন, যা অন্য কেউ দেখতে পাচ্ছে না।প্রতাপ নিচু গলায় বলল—“আপনি এত ভয় পাচ্ছেন কেন?”রঘুপতি উত্তর দিলেন না। খস...খস...খস...শব্দটা আরও কাছে চলে এলো। বৃদ্ধ লোকটা হঠাৎ ফিসফিস করে বললেন—“আমি এই শব্দ ভুলিনি...”প্রতাপ তার দিকে তাকাল।“কার?”রঘুপতির কণ্ঠ কাঁপছে।“ভবানন্দের।”সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে এল।“মানে?”“মৃত্যুর আগে ওর একটা পায়ে গুরুতর আঘাত লেগেছিল।”রঘুপতির চোখে পুরনো স্মৃতি ভেসে উঠল।“ও হাঁটত পা টেনে টেনে।”প্রতাপের বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। না। এটা অসম্ভব।ভবানন্দ রায়ের কঙ্কাল তো এখানেই আছে। তাহলে?ঠিক তখনই—অন্ধকারের ভেতর একটা ছায়া দেখা গেল। সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল। মশালের আলো ধীরে ধীরে সামনে এগোল।আর সেই আলোয় ফুটে উঠল—একজন মানুষ।রক্তমাংসের মানুষ। বৃদ্ধ। অত্যন্ত বৃদ্ধ। লম্বা এলোমেলো চুল। মুখভর্তি সাদা দাড়ি। শরীরে ছেঁড়া পোশাক। আর তার ডান পা টেনে টেনে হাঁটার কারণে সেই পরিচিত শব্দ তৈরি হচ্ছে।খস...খস...খস...লোকটা সামনে এসে থামল। তার চোখ দুটো গভীর।ক্লান্ত। কিন্তু জীবন্ত। কয়েক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বলল না। তারপর রঘুপতি আচার্য কাঁপা গলায় বললেন—“তুমি...?”বৃদ্ধ লোকটা ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার চোখে জল চিকচিক করছে।“অনেক বছর পর দেখা হলো, রঘুপতি।”মুহূর্তের মধ্যে রঘুপতির হাত থেকে মশাল পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো।“না...”তার গলা শুকিয়ে গেছে।“এটা হতে পারে না...”লোকটা মৃদু হাসল। সেই হাসির মধ্যে অদ্ভুত কষ্ট।“আমিও অনেকবার ভেবেছিলাম আমি বোধহয় আর ফিরতে পারব না।”প্রতাপ দ্রুত সামনে এগিয়ে এল।“আপনি কে?”লোকটা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর এমনভাবে তাকাল, যেন বহু বছর ধরে এই মুখটাই খুঁজছিল।তার চোখ ভিজে উঠল।“তুমি...”সে থেমে গেল।“তুমি একেবারে তার মতো দেখতে।”প্রতাপের ভ্রু কুঁচকে গেল।“কার মতো?”লোকটা উত্তর দিল না। বরং ধীরে ধীরে কঙ্কালের দিকে তাকাল। বাক্সের ভেতরে থাকা কঙ্কাল। গলায় ঝোলানো ফলক।'ভবানন্দ রায়।'বৃদ্ধ লোকটার মুখে বিষাদ নেমে এল। তারপর সে নিচু গলায় বলল—“মৃত মানুষটাকে অন্তত শান্তিতে থাকতে দাও।”প্রতাপের বুকের ভেতর ধক করে উঠল।“আপনি কি ভবানন্দ রায়কে চিনতেন?”লোকটা এবার তার দিকে তাকাল। কয়েক মুহূর্ত।তারপর বলল—“খুব ভালো করে।”“কে ছিলেন তিনি?”লোকটার ঠোঁট কেঁপে উঠল।“আমার বড় ভাই।”সুড়ঙ্গের ভেতরে যেন বজ্রপাত হলো। সবাই স্তব্ধ।রঘুপতি আচার্য চোখ বন্ধ করে ফেললেন। প্রতাপ অনুভব করল তার নিজের হৃদস্পন্দনও যেন থেমে গেছে।“তাহলে আপনি...?”লোকটা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।“আমার নাম ভৈরব রায়।”আবার নীরবতা। কারণ আংটির ভেতরে খোদাই করা অক্ষর দুটো হঠাৎ অর্থ পেতে শুরু করেছে।'ভ''র'ভৈরব রায়।প্রতাপের মাথার ভেতর সবকিছু ঘুরতে লাগল। ভবানন্দ রায়। ভৈরব রায়। হারিয়ে যাওয়া উত্তরাধিকার। কালো সূর্য। গোপন দলিল। মায়ের রহস্যময় মৃত্যু। সব যেন এক সুতোয় বাঁধা।ঠিক তখনই ভৈরব রায় ধীরে ধীরে নিজের পোশাকের ভেতর হাত ঢুকিয়ে একটা পুরনো তাম্রনল বের করলেন। নলটা কালচে হয়ে গেছে। কিন্তু এখনও অক্ষত।তিনি সেটা প্রতাপের হাতে দিলেন।“এটা তোমার জন্য।”প্রতাপ অবাক হয়ে তাকাল।“এটা কী?”ভৈরব উত্তর দিলেন—“তোমার জন্মের আগের লেখা একটা চিঠি।”সবার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।“কার লেখা?”ভৈরবের চোখে অদ্ভুত এক ছায়া নেমে এলো। তিনি ধীরে ধীরে বললেন—“তোমার মায়ের।”মুহূর্তে প্রতাপের শরীর জমে গেল। তার হাত কাঁপতে শুরু করল। তার মায়ের লেখা চিঠি? যেটা তার জন্মেরও আগে লেখা? কিন্তু সে চিঠি এখানে এল কীভাবে? আর এত বছর লুকিয়ে ছিল কোথায়? ঠিক তখনই—সুড়ঙ্গের প্রবেশপথের দিক থেকে আতঙ্কিত চিৎকার ভেসে এলো।“রাজপুত্র!”একজন সৈন্য দৌড়ে আসছে। তার মুখে ভয়। শ্বাসপ্রশ্বাস অস্থির। সে সামনে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—“বড় বিপদ!”প্রতাপ চমকে উঠল।“কী হয়েছে?”সৈন্যটা কাঁপা গলায় বলল—“পর্তুগিজ দূত...”“কি হয়েছে তার?”সৈন্যের চোখ আতঙ্কে বড় হয়ে গেল।“তাকে হত্যা করা হয়েছে!”মশালের আলো কেঁপে উঠল। আর প্রতাপ বুঝতে পারল—যে মানুষগুলো সত্যের কাছাকাছি পৌঁছায়, তাদের কেউ একজন একে একে চুপ করিয়ে দিচ্ছে।
*******************************
সুড়ঙ্গের ভেতরের বাতাস যেন মুহূর্তেই ভারী হয়ে উঠল।
পর্তুগিজ দূত নিহত। খবরটা শোনার পর কয়েক সেকেন্ড কেউ কোনো কথা বলতে পারল না। মশালের আলো কাঁপছে। দেয়ালের উপর ছায়াগুলো লম্বা হয়ে উঠেছে।
আর প্রতাপাদিত্যের হাতে শক্ত করে ধরা সেই তাম্রনল—যার ভেতরে রয়েছে তার মায়ের লেখা চিঠি। হয়তো বহু বছরের লুকানো সত্য। হয়তো তার জীবন বদলে দেওয়ার মতো কোনো রহস্য। কিন্তু সেই চিঠি খোলার সুযোগও সে পেল না। কারণ সত্য আবারও রক্ত ঝরিয়েছে।
প্রতাপ বজ্রকণ্ঠে বলল—"কোথায়?"
সৈন্যটা হাঁপাতে হাঁপাতে উত্তর দিল—"নদীর ঘাটে।"
"কে করেছে?"
"জানি না।"
"কেউ দেখেনি?"
"দূতের দেহের পাশে থাকা প্রহরীরা সবাই মৃত।"
সুড়ঙ্গের ভেতরে অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো। প্রতাপ অনুভব করল—এটা কাকতালীয় নয়।একেবারেই নয়। যে দূত ঈশান ভট্টের খবর এনেছিল—
সে মৃত। যে লোকটা সত্যের পথে একটা নতুন দরজা খুলেছিল—সে মৃত।
আর এই প্রথমবার প্রতাপের মনে হলো—কেউ শুধু গোপন সত্য লুকিয়ে রাখতে চাইছে না। কেউ মরিয়া হয়ে সময় কিনছে। ঠিক তখনই ভৈরব রায় ধীরে ধীরে বললেন—"তারা ভয় পেয়েছে।"
প্রতাপ তার দিকে তাকাল।
"কারা?"
ভৈরব কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন—
"যারা এত বছর ধরে ছায়ার আড়াল থেকে খেলা চালিয়েছে।"
রঘুপতি আচার্য গম্ভীর হয়ে গেলেন।
"তুমি নিশ্চিত?"
ভৈরবের চোখে তিক্ত হাসি ফুটে উঠল।
"আমি তাদের চিনি।"
"কতটা?"
"ত্রিশ বছর ধরে তাদের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছি।"
সবার মুখে বিস্ময়। প্রতাপ এক পা এগিয়ে এল।
"তাহলে সব বলুন।"
ভৈরব তার দিকে তাকালেন। অনেকক্ষণ। যেন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন—"সব বলব।"
"কিন্তু তার আগে তোমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।"
"কী প্রশ্ন?"
ভৈরবের কণ্ঠ অদ্ভুত শান্ত।
"তুমি কি সত্যিই প্রস্তুত?"
প্রতাপ ভ্রু কুঁচকাল।
"সত্য জানার জন্য?"
"না।"
ভৈরব মাথা নাড়লেন।
"সত্যের মূল্য দেওয়ার জন্য।"
কথাটা শুনে সুড়ঙ্গের ভেতরে আবার নীরবতা নেমে এল। প্রতাপের মনে অজানা অস্বস্তি জন্ম নিল। কারণ আজ পর্যন্ত সে বহু যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল। মৃত্যুর জন্যও। কিন্তু সত্যের মূল্য? সেটা কতটা ভয়ংকর হতে পারে?
ঠিক তখনই—দূর থেকে একটা শব্দ ভেসে এলো।
ধুম!
তারপর আরেকটা।
ধুম!
সুড়ঙ্গের ছাদ কেঁপে উঠল। মাটি ঝরে পড়তে লাগল।
একজন সৈন্য চমকে উঠল।
"কামান!"
আরেকজন চিৎকার করে উঠল—"প্রাসাদের দিকে কামান ছোঁড়া হচ্ছে!"
প্রতাপের বুক ধক করে উঠল।
"মোগল?"
সৈন্যটা মাথা নাড়ল।
"না!"
"তাহলে?"
"কালো সূর্যের বাহিনী!"
সঙ্গে সঙ্গে সবাই একে অপরের দিকে তাকাল। কারণ কয়েক ঘণ্টা আগেও তারা যুদ্ধ না করে সরে গিয়েছিল।
তাহলে হঠাৎ আক্রমণ কেন?
ঠিক তখনই আরেকজন প্রহরী দৌড়ে এলো। তার মুখ আতঙ্কে সাদা।
"রাজপুত্র!"
"এবার কী?"
"পূর্ব ফটক ভেঙে গেছে!"
মুহূর্তেই চারদিকে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল।
"কী বলছ?"
"কালো সূর্যের সৈন্যরা ভেতরে ঢুকছে!"
প্রতাপ এক ঝটকায় তরবারি বের করল। তার চোখে যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠল। কিন্তু ঠিক তখনই ভৈরব রায় তার হাত চেপে ধরলেন।
প্রতাপ ঘুরে তাকাল।
"কী?"
ভৈরবের চোখে আতঙ্ক। প্রকৃত আতঙ্ক।
"ওরা প্রাসাদ দখল করতে আসেনি।"
"তাহলে?"
ভৈরবের গলা শুকিয়ে গেল।
"ওরা চিঠিটার জন্য এসেছে।"
প্রতাপের বুকের ভেতর যেন বজ্রপাত হলো। তার হাত অজান্তেই তাম্রনলের উপর শক্ত হয়ে উঠল। মায়ের লেখা চিঠি। যেটা সে এখনও খোলেইনি। যেটার অস্তিত্বের কথা কয়েক মিনিট আগেও কেউ জানত না।
তাহলে—কালো সূর্যের বাহিনী জানল কীভাবে? আর তার চেয়েও ভয়ংকর প্রশ্ন—এই সুড়ঙ্গের ভেতরের কথাগুলো বাইরে পৌঁছাচ্ছে কীভাবে?
প্রতাপ ধীরে ধীরে চারপাশে তাকাল।
রঘুপতি।
ভৈরব।
সৈন্যরা।
নৌসেনাপতি।
সবাই উপস্থিত।
আর সেই মুহূর্তে প্রথমবার—তার মনে হলো, শত্রু হয়তো প্রাসাদের বাইরে নেই। শত্রু হয়তো তাদের মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে। 🔥
***********************************
গোপন সুড়ঙ্গের ভেতর এমন নীরবতা নেমে এলো, যেন কেউ হঠাৎ সমস্ত শব্দ চুরি করে নিয়েছে।প্রতাপাদিত্যের হাতে শক্ত করে ধরা তাম্রনল। তার মায়ের লেখা চিঠি। যে চিঠির কথা মাত্র কয়েকজন মানুষ জানে।
আর ভৈরব রায়ের দাবি—"কালো সূর্যের বাহিনী এই চিঠির জন্যই এসেছে।"
প্রতাপের বুকের ভেতর একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি জন্ম নিল। ধীরে ধীরে। ভারী হয়ে উঠতে লাগল। কারণ এর মানে একটাই। এখানে উপস্থিত কারও না কারও মাধ্যমে খবর বাইরে পৌঁছেছে।
কেউ একজন কথা বলছে। কেউ একজন বিশ্বাসঘাতক। মশালের আলোয় প্রতাপ একে একে সবার মুখের দিকে তাকাল।রঘুপতি আচার্য।ভৈরব রায়।নৌসেনাপতি।প্রহরীরা।
সবাই নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু এখন আর কাউকেই পুরোপুরি বিশ্বাস করা যাচ্ছে না।ঠিক তখনই—সুড়ঙ্গের বাইরে আবার ভয়ংকর বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে এলো।ধুমমমম!
মাটি কেঁপে উঠল। ছাদ থেকে ধুলো ঝরে পড়তে লাগল। একজন সৈন্য আতঙ্কিত গলায় বলল—"রাজপুত্র, আমাদের এখনই উপরে যেতে হবে!"
প্রতাপ মাথা নাড়ল।"চলো।"
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে ভৈরব আবার তার হাত চেপে ধরল।"না।"
প্রতাপ বিরক্ত হয়ে তাকাল।"এবার কী?"
ভৈরবের চোখে উদ্বেগ।"চিঠিটা এখন খুলে দেখো।"
"এখন?"
"হ্যাঁ।"
"প্রাসাদ আক্রান্ত হচ্ছে।"
"আর সেই কারণেই এখন।"
ভৈরবের কণ্ঠে এমন তীব্রতা ছিল যে প্রতাপ থেমে গেল। রঘুপতিও ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।"আমি একমত।"
প্রতাপ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে তাম্রনলের মুখ খুলল।
ভেতর থেকে বেরিয়ে এল হলদে হয়ে যাওয়া একটা চিঠি। খুব যত্ন করে ভাঁজ করা। কাগজে বয়সের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু লেখাগুলো এখনও পড়া যায়। প্রতাপের হাত কাঁপছিল। কারণ এই প্রথমবার সে নিজের মায়ের হাতের লেখা দেখতে যাচ্ছে।
ধীরে ধীরে সে চিঠিটা খুলল। আর পড়তে শুরু করল।প্রথম লাইন দেখেই তার বুক কেঁপে উঠল। "আমার সন্তান, যদি তুমি এই চিঠি পড়ো, তবে বুঝবে আমি আর জীবিত নেই।"
সুড়ঙ্গের ভেতর কেউ নড়ল না। সবাই নিঃশব্দে শুনছে।প্রতাপ পড়তে থাকল।"আমার মৃত্যুকে স্বাভাবিক বলা হবে।"
তার চোখ বড় হয়ে গেল। পরের লাইন—"কিন্তু আমি জানি, আমার মৃত্যু স্বাভাবিক হবে না।"
মুহূর্তে পুরো সুড়ঙ্গ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। প্রতাপের গলা শুকিয়ে এলো। সে আরও পড়ল।"আমি এমন এক সত্য জেনে ফেলেছি, যার জন্য বহু মানুষ মরেছে।"
তার হাত কাঁপছে। চোখ দ্রুত নিচের দিকে নামছে।"যদি তারা আমাকে হত্যা করে, তাহলে জেনে রেখো—"
প্রতাপ হঠাৎ থেমে গেল। তার মুখের রঙ বদলে গেছে।রঘুপতি উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন—"কী লেখা আছে?"
প্রতাপ কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বলতে পারল না।তারপর ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার চোখে অবিশ্বাস।"এখানে একটা নাম লেখা আছে।"
ভৈরব এগিয়ে এল।"কার নাম?"
প্রতাপ ঠোঁট শুকিয়ে নিল। তারপর ফিসফিস করে বলল—"বসন্ত রায়।"
মুহূর্তে যেন সময় থেমে গেল। কেউ নিঃশ্বাসও নিল না।রঘুপতি আচার্যের চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল। ভৈরবের মুখ কঠিন হয়ে উঠল। প্রতাপ আবার চিঠির দিকে তাকাল। সেখানে স্পষ্ট লেখা—"যদি আমার কিছু ঘটে, তবে বসন্ত রায়ের উপর কখনও অন্ধ বিশ্বাস কোরো না।"
সুড়ঙ্গের ভেতর চাপা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। কারণ এতদিন ধরে যাকে প্রতাপ নিজের অভিভাবক বলে জেনে এসেছে—তার নামই এখন সন্দেহের কেন্দ্রে।কিন্তু ঠিক তখনই—সুড়ঙ্গের প্রবেশপথের দিকে থেকে তীব্র আর্তনাদ ভেসে এলো।
"বাঁচাও!"
তারপর—তরবারির শব্দ। চিৎকার। রক্ত জমিয়ে দেওয়া যুদ্ধের আওয়াজ। সবাই ঘুরে তাকাল। একজন আহত সৈন্য হোঁচট খেতে খেতে ভেতরে ঢুকে পড়ল।তার বুক রক্তে ভিজে গেছে। সে কষ্টে শ্বাস নিচ্ছে।
প্রতাপ ছুটে গেল।"কী হয়েছে?"
সৈন্যটা কাঁপা গলায় বলল—"ওরা... ওরা ভেতরে ঢুকে পড়েছে..."
"কারা?"
সৈন্যের চোখ আতঙ্কে বড় হয়ে গেল।"কালো সূর্যের লোক না..."
"তাহলে?"
লোকটা শেষ শক্তিটুকু দিয়ে বলল—"রাজপ্রাসাদের নিজের রক্ষীরা..."
প্রতাপের বুক ধক করে উঠল।"কী বলছ?"
সৈন্যটা রক্ত কাশল। তারপর ফিসফিস করে বলল—"ওরা বসন্ত রায়ের আদেশের কথা বলছে..."
পরের মুহূর্তেই তার মাথা কাত হয়ে গেল। সে মৃত।সুড়ঙ্গের ভেতর মৃত্যু নেমে এলো। আর প্রতাপ বুঝতে পারল—বহু বছরের রহস্য হয়তো অবশেষে মুখ খুলতে চলেছে। কিন্তু সেই সত্য প্রকাশের আগে—যশোর রাজপ্রাসাদের ভেতরেই গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। 🔥
***********************************
গোপন সুড়ঙ্গের ভেতরে তখন মৃত্যু, সন্দেহ আর বিশ্বাসঘাতকতার ছায়া একসঙ্গে নেমে এসেছে।আহত সৈন্যটার নিথর দেহ মাটিতে পড়ে আছে।তার শেষ কথাগুলো এখনও বাতাসে ভাসছে—"ওরা বসন্ত রায়ের আদেশের কথা বলছে..."
প্রতাপাদিত্য স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মনে হলো যেন কেউ তার বুকের ভেতর একটা ভারী পাথর ছুঁড়ে মেরেছে।
বসন্ত রায়। শৈশব থেকে যাকে সে কাকা বলে জেনেছে। যে তাকে যুদ্ধ শিখিয়েছে। রাজনীতি শিখিয়েছে। বিপদে আগলে রেখেছে। আজ সেই মানুষের নামই একের পর এক রহস্যের কেন্দ্রে উঠে আসছে।
প্রথমে বিক্রমাদিত্যের অসমাপ্ত বার্তা। তারপর মায়ের চিঠি। এবার প্রাসাদের রক্ষীদের বিদ্রোহ। সব পথ যেন এক জায়গাতেই গিয়ে মিশছে। কিন্তু প্রতাপ এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না। সে পারছেও না, চাইছেও না।ঠিক তখনই সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ থেকে তলোয়ারের শব্দ আরও কাছে ভেসে এলো।
ঝনাং! ঝনাং!
তারপর—একটা আর্তনাদ। আরেকটা। আরও কাছে।একজন সৈন্য আতঙ্কিত গলায় বলে উঠল—"ওরা ভেতরে নেমে আসছে!"
প্রতাপ এক ঝটকায় তরবারি বের করল। তার চোখে আবার যোদ্ধার আগুন জ্বলে উঠল।"সবাই প্রস্তুত হও।"
সৈন্যরা অস্ত্র তুলে নিল। ভৈরব রায় দেয়ালের পাশে সরে দাঁড়ালেন। রঘুপতি আচার্যের মুখে উদ্বেগ। আর ঠিক তখনই—অন্ধকার করিডরের ভেতর কয়েকটা ছায়া দেখা গেল। একজন। দুজন। পাঁচজন। দশজন।
মশালের আলো ধীরে ধীরে তাদের মুখ স্পষ্ট করল।আর প্রতাপের বুক কেঁপে উঠল। কারণ তারা শত্রু সেনা নয়। তারা যশোরের নিজের সৈন্য। রাজপ্রাসাদের রক্ষীবাহিনী।
যাদের অনেককে প্রতাপ ব্যক্তিগতভাবে চেনে। কিন্তু তাদের চোখে আজ অন্য কিছু। একটা অদ্ভুত উন্মাদনা। একটা অন্ধ আনুগত্য।
সামনের লোকটা তরবারি তুলে বলল—"রাজপুত্রকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।"
প্রতাপ ঠান্ডা গলায় বলল—"কি জন্যে? কার আদেশে?"
লোকটা উত্তর দিল—"মহারাজ বসন্ত রায়ের আদেশ।"
সঙ্গে সঙ্গে সুড়ঙ্গের ভেতরে চাপা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল।প্রতাপের মুখ আরও কঠিন হয়ে উঠল।"মহারাজ?"
লোকটা মাথা নাড়ল, "হ্যাঁ। যশোরের নতুন শাসক।"
মুহূর্তে চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। রঘুপতি আচার্য বিস্ময়ে বলে উঠলেন—"বসন্ত নিজেকে মহারাজ ঘোষণা করেছে?"
সৈন্যটা হেসে উঠল।"এই মুহূর্তে প্রাসাদের অধিকাংশ অংশ তার নিয়ন্ত্রণে।"
প্রতাপ অনুভব করল তার মুঠি শক্ত হয়ে যাচ্ছে।ঘটনাগুলো এত দ্রুত ঘটছে যে বিশ্বাস করা কঠিন।তাহলে কি সত্যিই একটা অভ্যুত্থান শুরু হয়ে গেছে?
ঠিক তখনই—পেছন থেকে ভৈরব রায়ের কণ্ঠ শোনা গেল।"আমি বলেছিলাম।"
প্রতাপ ঘুরে তাকাল। ভৈরবের চোখে তীব্র বিষাদ।
"ত্রিশ বছর আগে যা হয়েছিল, আবার তাই হচ্ছে।"
"মানে?"
"ক্ষমতা রক্ষার জন্য ইতিহাস মুছে ফেলা।"
তারপর তিনি কঙ্কালের দিকে তাকালেন। ভবানন্দ রায়ের কঙ্কাল।
"আমার ভাইও সত্য জানত।"
"তারপর?"
"তারপর সে অদৃশ্য হয়ে গেল।"
কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বিদ্রোহী সৈন্যদের নেতা গর্জে উঠল—"যথেষ্ট কথা হয়েছে!"
সে তরবারি তুলল। "রাজপুত্রকে জীবিত ধরো!"
পরের মুহূর্তেই যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। ঝনাং! ইস্পাতের সঙ্গে ইস্পাতের সংঘর্ষে পুরো সুড়ঙ্গ কেঁপে উঠল।প্রতাপ প্রথম আঘাতেই একজন সৈন্যের অস্ত্র ছিটকে দিল। দ্বিতীয় আঘাতে আরেকজনকে মাটিতে ফেলে দিল।
কিন্তু শত্রুর সংখ্যা অনেক। খুবই অনেক। সংকীর্ণ সুড়ঙ্গ দিয়ে একের পর এক লোক নেমে আসছে।মনে হচ্ছে পুরো প্রাসাদের একটা অংশ বিদ্রোহে যোগ দিয়েছে। রক্ত ছিটকে পড়ছে। চিৎকার। ধোঁয়া। আগুন।সুড়ঙ্গটা যেন নরকে পরিণত হয়েছে।
ঠিক তখনই প্রতাপের চোখে একটা অদ্ভুত দৃশ্য ধরা পড়ল। পেছনের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা এক সৈন্য। তার মুখ আংশিক ঢাকা। কিন্তু গলায় ঝুলছে একটা ছোট ধাতব চিহ্ন।
কালো সূর্য।
প্রতাপের বুক ধক করে উঠল। কালো সূর্য বাহিনী!তাহলে তারা শুধু বাইরে নয়। প্রাসাদের ভেতরেও ঢুকে পড়েছে। আরও ভয়ংকর—সম্ভবত বহু আগেই ঢুকেছিল। ঠিক তখনই সেই মুখোশধারী লোকটা প্রতাপের দিকে তাকাল।
তাদের চোখে চোখ পড়ল। আর লোকটা ধীরে ধীরে নিজের মুখোশ সরিয়ে ফেলল। মশালের আলো তার মুখে পড়ল। প্রতাপ কয়েক সেকেন্ড নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।
কারণ সেই মুখ সে চেনে। খুব ভালো করেই চেনে।শৈশব থেকে চেনে। রাজপ্রাসাদেরই একজন মানুষ।একজন বিশ্বস্ত মানুষ। যাকে সে কখনও সন্দেহ করেনি।
লোকটা মৃদু হাসল। তারপর বলল—"অনেক দিন পর দেখা হলো, রাজপুত্র।"
প্রতাপের চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল। আর তার মুখ থেকে অজান্তেই বেরিয়ে এল—"তুমি...!"
সুড়ঙ্গের আগুন কেঁপে উঠল আর বহু বছরের সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকের মুখ অবশেষে অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এলো। 🔥
***********************************
গোপন সুড়ঙ্গের ভেতরে তখন তলোয়ারের ঝনঝনানি, আহতদের আর্তনাদ আর জ্বলন্ত মশালের কাঁপা আলো মিশে এক ভয়ংকর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু প্রতাপাদিত্যের কাছে সেই মুহূর্তে সমস্ত শব্দ যেন দূরে সরে গেল।
কারণ তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মুখোশধারী মানুষটার মুখ সে চিনে ফেলেছে। খুব ভালো করেই চিনেছে।শৈশব থেকে। বিশ্বাস করে এসেছে। সম্মান করে এসেছে।
লোকটা মৃদু হাসছে। যেন বহুদিনের কোনো গোপন খেলা অবশেষে শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতাপের ঠোঁট শুকিয়ে গেল।"তুমি...!"
লোকটা ধীরে ধীরে মাথা নত করল।"হ্যাঁ, রাজপুত্র।"
"তুমি এখানে কী করছ?"
লোকটার চোখে অদ্ভুত শান্তি।"যেটা বহু বছর আগে শুরু করেছিলাম, সেটা শেষ করতে এসেছি।"
প্রতাপের বুকের ভেতর রাগ আর বিস্ময় একসঙ্গে আঘাত করল। কারণ লোকটা আর কেউ নয়—রাজপ্রাসাদের গুপ্তচর প্রধান। দেবব্রত সেন। যে বহু বছর ধরে যশোরের গোপন তথ্য সংগ্রহ করেছে।যে বিক্রমাদিত্যের বিশ্বস্ত লোক হিসেবে পরিচিত ছিল।যে প্রতাপের চোখে প্রায় পরিবারের সদস্যের মতো ছিল। আর আজ—তার গলায় ঝুলছে কালো সূর্যের প্রতীক।
রঘুপতি আচার্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন।"দেবব্রত?"
দেবব্রত মৃদু হেসে বলল— "গুরুদেব, অনেক দিন পর।"
"তুমি বিশ্বাসঘাতক?"
"বিশ্বাসঘাতক?" লোকটা হেসে উঠল।"বিশ্বাসঘাতক কে, সেটা ইতিহাস ঠিক করবে।"
প্রতাপ এক পা সামনে এগিয়ে এল। তরবারির ফলায় মশালের আলো ঝলসে উঠল।"তুমি কালো সূর্যের লোক?"
"আমি জন্ম থেকেই।"
সুড়ঙ্গের ভেতর যেন আবার বজ্রপাত হলো।"কি বললে?"
"আমার পরিবার তিন প্রজন্ম ধরে এই কাজ করছে।"
দেবব্রতের কণ্ঠে অহংকার।"আমরা সেই ইতিহাসের রক্ষক, যেটাকে তোমাদের রাজবংশ মুছে ফেলেছিল।"
ভৈরব রায়ের চোখ সরু হয়ে এলো।"তাহলে তুমি ওদের নতুন নেতা?"
দেবব্রত মাথা নাড়ল।"না।"
"তাহলে?"
লোকটা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর বলল— "নেতা এখনও ছায়ার আড়ালেই আছেন।"
প্রতাপের মনে সঙ্গে সঙ্গে সেই কালো বর্মধারী অশ্বারোহীর কথা ভেসে উঠল। কালো সূর্যের রহস্যময় নেতা। যে এখনও নিজের পরিচয় দেয়নি। ঠিক তখনই—সামনের বিদ্রোহী সৈন্যরা আবার আক্রমণ করল।
ঝনাং! প্রতাপ তলোয়ার ঘুরিয়ে প্রথম আঘাত ঠেকাল।তারপর এক ঝটকায় একজনকে মাটিতে ফেলে দিল।কিন্তু দেবব্রত যুদ্ধ করল না। সে শুধু দাঁড়িয়ে দেখছে।যেন তার অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে।
ঠিক তখনই প্রতাপ খেয়াল করল—দেবব্রতের চোখ বারবার তার হাতে ধরা তাম্রনলের দিকে যাচ্ছে।মায়ের চিঠি। দেবব্রত সেটা চায়। আর সেই মুহূর্তে প্রতাপ সব বুঝে গেল।"তোমাদের আসল লক্ষ্য চিঠিটা।"
দেবব্রতের ঠোঁটে হাসি ফুটল।"অবশেষে বুঝলে।"
"ওটার মধ্যে কী আছে?"
"এমন কিছু... যা পুরো বাংলার ইতিহাস বদলে দিতে পারে।"
প্রতাপের মুঠি আরও শক্ত হয়ে উঠল।"তাহলে সেটা আমি কাউকে দেব না।"
দেবব্রত দীর্ঘশ্বাস ফেলল।"আমি আশা করেছিলাম তুমি এমনটাই বলবে।"
তারপর সে ধীরে ধীরে হাত তুলল। পরের মুহূর্তে সুড়ঙ্গের দুই পাশের দেয়াল থেকে কয়েকজন লুকিয়ে থাকা ধনুর্ধর বেরিয়ে এলো। তাদের তীর সরাসরি প্রতাপ, রঘুপতি আর ভৈরবের দিকে তাক করা। সবাই থমকে গেল।
দেবব্রত শান্ত গলায় বলল—"চিঠিটা দাও।"
"না।"
"শেষবারের মতো বলছি।"
"না।"
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর দেবব্রত মাথা নাড়ল।"দুঃখজনক।"
সে হাত নামিয়ে আনল। ধনুর্ধররা তীর ছাড়তে প্রস্তুত হলো। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে—সুড়ঙ্গের গভীর অংশ থেকে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেল।
ধুমমমম!
মাটি কেঁপে উঠল। দেয়ালের পাথর ভেঙে পড়তে শুরু করল। ধনুর্ধররা ভারসাম্য হারিয়ে ছিটকে গেল। সৈন্যরা আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল। আর ধোঁয়ার মধ্যে থেকে একটা বিশাল পাথরের দরজা ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করল।
ঘরররর...
ঘরররর...
সবাই স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। কারণ সেই দরজাটা আগে কেউ দেখেনি। সুড়ঙ্গের মানচিত্রেও তার অস্তিত্ব নেই।
ভৈরব রায়ের মুখ মুহূর্তে সাদা হয়ে গেল।"না..."
প্রতাপ তার দিকে তাকাল।"কী হয়েছে?"
ভৈরবের ঠোঁট কাঁপছে।"ওটা..."
"কী?"
বৃদ্ধ লোকটা আতঙ্কে ফিসফিস করে বললেন—"ওটাই নিষিদ্ধ কক্ষ।"
সবার শরীর দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল।"নিষিদ্ধ কক্ষ?"
ভৈরব ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।"যেখানে রাজপরিবারের সবচেয়ে ভয়ংকর গোপন রহস্য লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।"
দেবব্রতের চোখেও প্রথমবারের মতো বিস্ময় দেখা দিল। মনে হচ্ছে সেও এই ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিল না।আর তখনই—ধোঁয়ার আড়াল থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এলো। বৃদ্ধ। ক্লান্ত। কিন্তু স্পষ্ট।"অবশেষে দরজাটা খুলেছে..."
সবাই একসঙ্গে ঘুরে তাকাল। আর প্রতাপ অনুভব করল—তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য হয়তো ঠিক দরজার ওপারেই অপেক্ষা করছে। 🔥
***********************************
সুড়ঙ্গের ভেতরে সবাই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে সময় নিজেই থেমে গেছে। ধোঁয়ার আড়াল থেকে ভেসে আসা সেই কণ্ঠ এখনও বাতাসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—“অবশেষে দরজাটা খুলেছে...”
প্রতাপাদিত্যের হাতের তলোয়ার শক্ত হয়ে উঠল। তার চোখ নিষিদ্ধ কক্ষের দিকে। পাথরের বিশাল দরজাটা ধীরে ধীরে খুলছে। শতাব্দী ধরে বন্ধ থাকা কোনো সমাধির মতো। ভেতর থেকে ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে আসছে। সেই বাতাসে পুরনো ধুলো, আর্দ্রতা আর ইতিহাসের গন্ধ।
রঘুপতি আচার্য প্রায় ফিসফিস করে বললেন— “অসম্ভব...”
প্রতাপ তার দিকে তাকাল।“আপনি এই জায়গার কথা জানতেন?”
রঘুপতির মুখ শুকিয়ে গেছে।“শুধু কিংবদন্তি হিসেবে।”
“কিংবদন্তি?”
ভৈরব রায় উত্তর দিলেন।“যশোর রাজবংশের প্রথম যুগ থেকে একটা গল্প চলে আসছিল।”
“কী গল্প?”
ভৈরবের চোখ নিষিদ্ধ কক্ষের অন্ধকারে স্থির।“একটা কক্ষ আছে... যেখানে সত্যকে বন্দি করে রাখা হয়েছে।”
প্রতাপ কিছু বলার আগেই—আবার সেই কণ্ঠ শোনা গেল। এবার আরও স্পষ্ট। আরও কাছে।“সত্যকে বন্দি করা যায় না...”
সবাই ঘুরে তাকাল। ধোঁয়ার পর্দা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। তার আড়াল থেকে একটা ছায়ামূর্তি বেরিয়ে এলো।
বৃদ্ধ। খুবই বৃদ্ধ। তার চুল তুষারের মতো সাদা। দীর্ঘ দাড়ি বুক পর্যন্ত নেমে এসেছে। শরীর দুর্বল। কিন্তু চোখ— সেই চোখে এমন তীক্ষ্ণতা, যেন তিনি মানুষের অন্তর দেখতে পারেন।
দেবব্রত সেনও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে এই মানুষটার উপস্থিতি তারও অজানা। প্রতাপ এক পা এগিয়ে এল।“আপনি কে?”
বৃদ্ধ লোকটা তার দিকে তাকাল। অনেকক্ষণ।অস্বাভাবিক দীর্ঘ সময়। তারপর মৃদু হাসল।“তুমি বড় হয়ে গেছ।”
প্রতাপের বুকের ভেতর ধক করে উঠল।“আপনি আমাকে চেনেন?”
“তোমার জন্মের আগেও চিনতাম।”
সুড়ঙ্গের ভেতর আবার নীরবতা। রঘুপতি আচার্যের চোখ বিস্ফারিত।“না...”তিনি কাঁপা গলায় বললেন—“এটা হতে পারে না...”
বৃদ্ধ লোকটা তার দিকে তাকাল।“অনেক বছর পর দেখা হলো, রঘুপতি।”
আচার্যের হাঁটু প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম হলো।“আপনি... আপনি কি...?”
লোকটা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।“হ্যাঁ। আমি অনন্তদেব।”
মুহূর্তে পুরো সুড়ঙ্গ স্তব্ধ হয়ে গেল। ভৈরব রায়ের চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল। দেবব্রতের আত্মবিশ্বাসও প্রথমবারের মতো কেঁপে উঠল। কারণ এই নামটা সবাই জানে। কিংবদন্তির মতো জানে।
অনন্তদেব। যশোর রাজ্যের প্রথম মহাগ্রন্থাগারিক।রাজপরিবারের ইতিহাসরক্ষক। যিনি প্রায় চল্লিশ বছর আগে রহস্যজনকভাবে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলেন। এবং যাকে মৃত বলে ধরা হয়েছিল।
প্রতাপ স্তব্ধ।“আপনি বেঁচে আছেন?”
অনন্তদেব মৃদু হেসে বললেন—“বেঁচে থাকা আর লুকিয়ে থাকা এক জিনিস নয়, রাজপুত্র।”
তারপর তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল প্রতাপের হাতে ধরা চিঠির উপর। তার চোখে গভীর বিষাদ ফুটে উঠল।“অবশেষে সে তোমার কাছে পৌঁছেছে।”
প্রতাপ চিঠিটা আরও শক্ত করে ধরল।“আপনি আমার মাকে চিনতেন?”
অনন্তদেব কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন—“তিনি ছিলেন এই রাজ্যের সবচেয়ে সাহসী মানুষদের একজন।”
“তাহলে তিনি কী জানতেন?”
অনন্তদেব উত্তর দিতে যাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই—দেবব্রত সেন গর্জে উঠল।“যথেষ্ট!”
সবাই তার দিকে তাকাল। দেবব্রতের মুখে উত্তেজনা।রাগ। উদ্বেগ।“এত বছর ধরে আমরা এই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করেছি।”
সে নিষিদ্ধ কক্ষের দিকে আঙুল তুলল।“আজ সত্য প্রকাশ পাবে।”
অনন্তদেব ধীরে ধীরে তার দিকে তাকালেন।“তুমি সত্য চাও না, দেবব্রত।”
“তাহলে?”
“তুমি প্রতিশোধ চাও।”
দেবব্রতের চোখে আগুন জ্বলে উঠল।“আর প্রতিশোধের অধিকার আমাদের আছে!”
তার কণ্ঠ সুড়ঙ্গ কাঁপিয়ে দিল।“আমাদের পূর্বপুরুষদের নাম মুছে দেওয়া হয়েছিল!”“আমাদের ইতিহাস চুরি করা হয়েছিল!”“আমাদের রক্তকে বিশ্বাসঘাতক বলা হয়েছিল!”
বিদ্রোহী সৈন্যদের মধ্যে গর্জন উঠল। অনন্তদেব শান্ত গলায় বললেন—“আর সেই কারণেই তুমি একই ভুল করতে চলেছ।”
দেবব্রত তলোয়ার বের করল।“আজ আর কেউ আমাকে থামাতে পারবে না।”
ঠিক তখনই—নিষিদ্ধ কক্ষের ভেতর থেকে একটা অদ্ভুত আলো দেখা গেল।ক্ষীণ। নীলাভ। যেন অন্ধকারের মধ্যে কেউ একটা তারা জ্বালিয়ে দিয়েছে।
সবাই থেমে গেল। আলোটা ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হতে লাগল। আর তার সঙ্গে সঙ্গে কক্ষের ভেতরের দেয়ালে খোদাই করা প্রাচীন চিহ্নগুলো দৃশ্যমান হয়ে উঠতে লাগল। প্রতাপের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। কারণ দেয়ালের মাঝখানে খোদাই করা রয়েছে—একটি বিশাল বংশবৃক্ষ।
যশোর রাজবংশের। আর সেই বংশবৃক্ষের একদম কেন্দ্রে—একটা নাম। যে নাম দেখে রঘুপতি আচার্যের মুখ থেকে আতঙ্কিত শব্দ বেরিয়ে এল।“হে ঈশ্বর...!”
প্রতাপ দ্রুত তার দিকে তাকাল।“কি হয়েছে?”
রঘুপতির ঠোঁট কাঁপছে। তার চোখ স্থির সেই নামের উপর।“যদি এটা সত্যি হয়...”
“তাহলে?”
বৃদ্ধ আচার্যের কণ্ঠ ভেঙে গেল।“তাহলে প্রতাপাদিত্যের জন্মের গল্পটাই মিথ্যা।” 🔥চলবে.....................