নন্দিনীর গল্প (A Women Focused Story) books and stories free download online pdf in Bengali

নন্দিনীর গল্প (A Women Focused Story)

জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ সপ্তাহ। প্রচন্ড দাবদাহে সবার আই ঢাই অবস্থা। পাখার নিচ থেকে সরলেই ঘামে একেবারে চান করে যেতে হচ্ছে। এইরকম সময়ে আকাশে কালো মেঘ দেখলে কার না ভালো লাগে! কিন্তু সকাল থেকেই এই মেঘ, গুমোট ভাবটাকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে।
দুপুরের দিক থেকেই ওয়েদার পাল্টাতে থাকে। শুধু গুড় গুড় শব্দ করে মেঘ দেখে চলেছে। একবার টিপ টিপ করে কয়েক ফোঁটা পড়ে, মাটির উপর জলছড়া দিয়ে গেল যেন। কিন্তু এতে গরম ভাবটাই পুরোপুরি কাটিয়ে দিয়েছে। এখন বৃষ্টি না হলেও আকাশ কিন্তু পরিষ্কার হয় নি, এখনই হয়তো আসতে পারে।
দুপুরের খাওয়া শেষ করে, নন্দিনী সবকিছু গুছিয়ে নেয়। একমাত্র ভাই নকুলের দুদিন ধরে জ্বর! আজকে বিকালে আবার একবার ডাক্তার বাবুর কাছে যেতে হবে। এই নকুল ছাড়া নন্দিনীর আর কেউ নেই। বাবা, মা অনেকদিন আগেই চলে গেছেন। একটা দাদা ছিল, সেও এক বছর হল ইহলোকের মায়া কাটিয়েছে!
সেই থেকে নন্দিনীর কাঁধে সব দায়িত্ব। কতই বা বয়স হবে নন্দিনীর, বড় জোড় উনিশ-কুড়ি। এই বয়সে যখন সবাই ফুর্তি করে বেড়ায়, নন্দিনী তখন পরের বাড়িতে বাসন মাজে। পাড়ার সকল ছেলে মেয়ে যখন কলেজে যায়, নন্দিনী তখন নিজের বাড়িতে খর কুটো কুড়িয়ে এনে রান্না করে। সন্ধ্যাবেলা সবাই যখন গল্প-গুজব করে কাটায়, নন্দিনী তখন বাড়িতে বসে বসে ঠোঙ্গা তৈরি করে।
বিকালে নকুলকে নিয়ে বীরেন ডাক্তারের চেম্বারে যায় নন্দিনী। ছোটবেলা থেকেই এই বীরেন ডাক্তারই নকুলকে দেখে আসছে। যখন ডাক্তারের চেম্বারে হাজির হয়, তখনও ডাক্তার বাবু আসেননি। তাই এক পাশে নকুল কে বসিয়ে নন্দিনী দাঁড়িয়েই থাকে। নকুলের আগেই আরো দুজন রোগী আছে। বেশিক্ষন অপেক্ষা করতে হয় না। ডাক্তারবাবু ঢুকতে ঢুকতেই নকুলকে জিজ্ঞাসা করেন, কি রে, কেমন আছিস এখন?
ডাক্তার বাবু জ্বর কমে গেছে, তবে মাঝে মাঝে আসে। আর গা হাত পায়ে খুব ব্যাথা।
তা একটু থাকবে। ওষুধগুলো ঠিক মত খাচ্ছিস তো?
হ্যাঁ, ডাক্তার বাবু, সময় ধরে ধরে খাচ্ছি।
ঠিক আছে একটু বোস, এদের দেখে নিয়ে তোকে দেখছি। বলে ডাক্তার বাবু ভিতরে ঢুকে যায়।
কিছুক্ষণ পরেই নকুলের ডাক পড়ে। তখন নকুলের সাথে নন্দিনীও ভিতরে ঢোকে। ডাক্তারবাবু নকুলকে ভাল করে পরীক্ষা করে আবারও ওষুধ লিখে দেন।
ডাক্তারবাবু আগের ওষুধগুলো আর চলবে না?
ওই গুলোই চলবে। তিনদিন পরে একবার খবর দিবি শুধু। আশা করি ঠিক হয়ে যাবে, আর দেখাতে আসতে হবে না।
ডাক্তারবাবুর ফিস দিতে জেতেই ডাক্তারবাবু বলেন, তোদের ফিস দিতে বারন করেছি না। ওই টাকায় বরং কিছু ভালো খাবার কিনে খাস।
ডাক্তারবাবুকে প্রণাম করে বেরিয়ে পরে নন্দিনী। ভাইকে সঙ্গে নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ির পথ ধরে। দুপুর থেকে আকাশ এমনই ভারী করে আছে। বৃষ্টিতে ভিজলে নকুলের সমস্যা হতে পারে। আর সঙ্গে কোন ছাতাও নেই। আসলে ছাতা কেনার মতো বিলাসিতা নন্দিনী দেখাতে পারে না! ওই টাকায় কয়েকদিন পেটে ভাত জুটবে!
বাড়িতে ফিরে আবার বাড়ির কাজ নিয়ে পড়ে। কদিন ধরেই নন্দিনী লক্ষ্য করছে, বাগানের দিক থেকে কয়েকজন তাদের বাড়ির দিকে উঁকি ঝুঁকি মারা শুরু করেছে। এমনিতে ছোটবেলা থেকেই নন্দিনীর ভয় ডর খুব কম। আর এখন তো ভয় করলে ভয় চেপে বসবে। এ কথাটা নন্দিনী খুব তাড়াতাড়ি শিখে ফেলেছে।
আজকেও যখন নকুলকে নিয়ে বাড়িতে ফিরছিল, তখনও চোখে পড়েছে। পাড়ারই কয়েকজন তাদের বাগানের ভিতরে ঢুকেছে। তাই হাতের কাজ ফেলে রেখেই একবার বাগানের দিকে যায়। এই বাগানটা অনেকদিন থেকে পড়েছিল। কয়েকদিন আগে নকুলকে নিয়ে নন্দিনী কয়েকটা কুমড়োর দানা লাগিয়ে ছিল। সেখানে গাছ ভালই হয়েছে।
কয়েকটা কঞ্চি কুমড়ো গাছের গোড়ায় পুতে দিয়ে, মাচা বানিয়ে নিয়েছে। এখন কুমড়ো বাগানটা বেশ সুন্দর দেখতে লাগে। মাচার পাশে দাঁড়িয়ে নন্দিনী ঠিক করে, এই বাগান থেকেই সংসারের দুঃখ বোঝাবে। আস্তে আস্তে বাইরের কাজ, মানে পরের বাড়িতে ঝি গিরি কাজ ছেড়ে দিতে হবে। উপরে আকাশের দিকে মুখ করে মনে মনে ঈশ্বরকে জানায়, আমার থেকে তো সব কেড়ে নিয়েছো, তাতেও আমার কোন দুঃখ নেই। শুধু এই চাপ বহন করার ক্ষমতা দিও ঈশ্বর! ভাইকে যেন মানুষের মতো মানুষ করতে পারি!
যা কাগজ ছিল, তা সবই প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। কালকে নতুন করে কাগজ জোগাড় করতে না পারলে ঠোঙ্গা তৈরিও বন্ধ। তাই সন্ধ্যার পর ভাইকে একটু বসতে বলে, তৈরী ঠোঙ্গা গুলো নিয়ে দোকানে দোকানে বিক্রির উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়ে।
ভবেশের দোকানে ঢুকতেই ভবেশ বলে, এইতো নন্দিনী এসে পড়েছে। যতটা ঠোঙ্গা এনেচিস, ওজন করে দিয়ে দে। কালকে এলি না! এমনিতেই ভবেশ নন্দিনীর বেশিরভাগ ঠোঙ্গাই কিনে নেয়। ওজন করে দেখা যায় সাত কিলো তিনশো গ্রাম হয়েছে। মানে বত্রিশ টাকা কেজি দরে দুশো চৌত্রিশ টাকা।
ভবেশদা আজকে আর একটু বেশি করে দাও না, কালকে কেটে নেবে।
এটা শুনে ভবেশ নন্দিনীকে 300 টাকা দেয়। টাকাটা নিয়ে দোকান থেকে বেড়িয়ে পড়ে নন্দিনী। কিছুটা এগিয়ে গিয়ে রামদার কাগজের দোকান। সেখান থেকে প্রয়োজন মতো 10 কিলো পুরনো খবরের কাগজ কিনে নেয়। তারপর বাড়ির পথ ধরে। বাড়ি পৌঁছে কাগজগুলোকে বিভিন্ন সাইজে কেটে নেয় নন্দিনী। এটা নন্দিনী তার দাদার কাছ থেকে শিখেছে।
দাদা বলতো, কাজকে কখনো ফেলে রাখবি না! যেটা কালকে করার কথা, তা আজকে কর। আর যা আজকে করার কথা, তা এখনি কর। কথাটা মনে পরতেই দাদাকে খুব মিস করে নন্দিনী।
গত বছর এই রকমই একটা গরমের দিনে দাদাকে অকালে হারাতে হয়। বাগানে এমনিই ঘোরাঘুরি করছিল। কিন্তু ভগবানের মনে হয়, ইচ্ছে ছিল না। তাই একটা বিষধর সাপ দাদাকে কাটে। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়ে ছিল। মায়ের যে গয়নাগুলো ছিল, সেগুলো বিক্রি করে টাকা জোগাড়ও হয়েছিল, সব খরচ হলো, কিন্তু হাসপাতাল থেকে দাদাকে আর জীবিত বাড়ি ফেরানো যায়নি।
ভাবলে মন খারাপ হয়ে আসে। লুকিয়ে চোখের জল মুছে, নন্দিনী ভাইয়ের জন্য মুড়ি বের করে।
দিদি, দুপুরের তরকারি নেই রে।
দাঁড়া দিচ্ছি।
দুপুরের ঠান্ডা তরকারি দিয়ে মুড়ি খায় নকুল।
জানিস দিদি, এক হপ্তা পরেই তো স্কুল খুলে যাচ্ছে। তখন আর স্কুলে যেতে বলবি না।
এমন কথা ভুল করেও ভাবিস না ভাই! তুই ছাড়া আমার আর কে আছে বল! তুই যদি লেখাপড়া শিখে মানুষ না হোস, তাহলে আমাদের দুঃখ কে গোছাবে?
নকুল আবেগে দিদিকে জড়িয়ে ধরে। আচ্ছা, শুধু তোর জন্যই আমি পড়বো দিদি!
এই তো আমার ভালো ভাই।
পরদিন সকালে কারোর বাড়িতে বাসন মাজতে যায় না নন্দিনী। একটা কাস্তে নিয়ে কুমড়ো শাক কাটতে থাকে। কয়েকটা ডগাকে একসাথে একটা খড় দিয়ে বেঁধে আঁটি বানায়। অনেকগুলো আঁটি নিয়ে বাজারে বিক্রি করতে যায়। বাজারের মাঝে এক জায়গায় কুমড়ো শাকের আঁটি গুলো রেখে বিক্রির আশায় দাঁড়িয়ে থাকে।
কত করে যাচ্ছে কুমড়ো শাক?
10 টাকা আঁটি।
এই তো সেদিন 4 টাকা করে কিনলাম।
আমাকে শুনিয়ে কি হবে। পোসালে নাও, না পোসালে নিও না।
তোর বড় বড় কথা বড্ড নন্দিনী, তোর বিক্রিই হবে না!
শুনতে খারাপ লাগছে, নাঃ। তোমার সোনার দোকানে গত বছর যখন মায়ের গয়না বিক্রি করতে গেছিলাম, তখন আমারও খুব খারাপ লেগে ছিল। তখন দাদা হাসপাতালে ভর্তি ছিল তো, তাই বলতে পারি নি। তোমাকে কুমড়ো শাক বেচতে আমি এখানে আসি নি। আমার বিক্রি নিয়ে তুমি অত বিচলিত হচ্ছ কেন?
কি যা তা বলছিস?
10 টাকা করে আঁটি। নিলে নাও, না হলে সামনের অন্য খদ্দেরদের ছাড়ো।
এই নে কুড়ি টাকা, দুটো আঁটি দে।
টাকা টা পাল্টে দাও। এটাতে রং লেগে আছে।
না চললে দোকান থেকে পাল্টিয়ে নিবি।
নন্দিনীও দুটো কুমড়ো পাতা ছিঁড়ে এগিয়ে দেয়।
এবারে লজ্জায় টাকাটা পাল্টিয়ে দু আঁটি কুমড়ো শাক নেয়।
এই লোকটি চলে যাওয়ার পর, পাশে বসা বয়স্ক কাকাটি নন্দিনীর দিকে এগিয়ে আসে। বলে তোকে আশীর্বাদ করি মা, তুই যেন সব সময় খারাপ লোকের মুখের উপর এইভাবে কথা বলতে পারিস।
বেশিক্ষণ নন্দিনীকে অপেক্ষা করতে হয় না। নটা বাজার আগেই নন্দিনীর সব শাক বিক্রি হয়ে যায়। হিসাব থেকে বুঝতে পারে আজকে 34 টা আঁটি হয়ে ছিল। এই টাকাটা থেকে কিছুটা দানা কিনতে হবে। সেই মতো কেনাকাটা করে বাড়ি ফেরে নন্দিনী।
আজকে সকাল থেকে নকুলের আর জ্বর আসে নি। নকুলকে পাশে নিয়ে বাগানে আরো খানিকটা অংশ পরিষ্কার করে নন্দিনী মাটি ঠিক করে। তাতে নতুন কেনা দানাগুলো লাগিয়ে দেয়। কয়েকটা লঙ্কাগাছও কিনে ছিল, সেগুলোও বসিয়ে দেয়। আবার রান্নাও করতে হবে, তাই আর দেরি করে না।
নকুলের সঙ্গে যখন বাগানে ছিল, তখন পাড়ার ছেলে গুলো আবার বাগানে ঢুকে, দূর থেকে লক্ষ্য রাখলেও তাদের কিছু বলে না। ওরা একটা বড় আম গাছের নিচে বসে গল্প করছে। ছেলেগুলোও নকুল আর নন্দিনীকে লক্ষ্য করে, দূর থেকেই দেখতে পায়।
যাদের যাদের বাড়িতে নন্দিনী বাসন মাজার কাজ করতো, বিকালে তারা প্রায় প্রত্যেকেই নন্দিনীর বাড়িতে খোঁজ নিতে আসে। তাদের সবাইকে নন্দিনী জানিয়ে দেয় যে, সে আর কাজ করবে না। কয়েকজন তো টাকা বাড়ানোর কথা বলে। কিন্তু নন্দিনী যাকে একবার না করেছে, তাকে কিছুতেই আর হ্যাঁ করানো যায় না। শেষে তারা ফিরে যায়।
সেই দিন থেকেই নন্দিনীর পরের কাছে গোলামী করার দিন শেষ। এবারে স্বাধীনভাবে থাকবে। পরদিন সকালে আবারও কুমড়ো শাক বিক্রি করে নন্দিনী। বাগানে কাজ করার সময় পাড়ার ছেলেগুলো আম গাছের গোড়ায় হাজির। আজকে প্রদীপ আর নেড়া রয়েছে। নন্দিনী এগিয়ে যায়।
আমরা যখন বাগানে কাজ করি, তখন দূর থেকে কি দেখিস তোরা!
প্রদীপ বলে, আমাদেরও কাজ করতে নেবে দিদি?
আমার কাছে কি কাজ করবি তোরা! তোদের পয়সা দেবো কি করে?
পয়সা দিতে হবে না। ফসল উঠলে খাইয়ে দিও।
তোদের চলবে কি করে?
তোমাদের যখন চলে যাচ্ছে তখন আমাদেরও চলে যাবে।
আর কথা বাড়ায় নি নন্দিনি। তখন থেকেই প্রদীপ আর নেড়া কাজে লেগে পড়ে। পাড়া থেকে চেয়ে দুটো কোদাল জোগাড় করে। পুরো বাগানটা দুজনেই সাফ করে ফেলে। বাঁশ ঝাড় থেকে বাঁশ কেটে বাগানের চারদিক বেড়া দিয়ে দেয়। বাগানের একদিকে পাতি লেবু, আর পেঁপে গাছ লাগায়। তার পাশ থেকে নানান সবজি। দিন পনেরো মতো পর থেকেই বাগানের রূপ অন্যরকম হয়ে যায়। আষাঢ় মাসের শেষ সপ্তাহে ধনেপাতা, শসা, কড়াই বিক্রি শুরু হয়।
প্রদীপ আর নেড়া এখন প্রায় সবসময়ই নন্দিনীদের বাগানে থাকে। নন্দিনীও তাদের ঠকায়নি। লাভের অংশ থেকে প্রদীপদেরও কিছু কিছু দিতে থাকে।
দেখতে দেখতে এক বছর কেটে যায়। নকুলও স্কুলে যাওয়া নিয়ে আর কোন কথা বলেনি। মাধ্যমিকে নকুল যে খুব ভালো রেজাল্ট করে ছিল, তাও নয় কোন রকমে সেকেন্ড ডিভিসনে পাস করে, আর্টস নিয়ে পড়ছিলো। এবারে উচ্চ মাধ্যমিক। পরীক্ষার দেওয়া হয়ে গিয়েছে অনেকদিন হলো।
কদিনের মধ্যেই হয় তো রেজাল্ট বেরোবে। একদিন বিকেল বেলায় নন্দিনী যখন পাতিলেবু তুলছিল আর জড়ো কর ছিল। এগুলি কালকে বিক্রি হবে। এমন সময় নেড়া বলে, আচ্ছা দিদি, পুকুরটা তো এমনি পড়ে আছে। কাউকে চাষ করতে দিলে তো কিছু পয়সা আসতে পারে।
কিন্তু বাগানের গাছে জল দেওয়ার কি হবে তখন।
তাহলে চলো না, আমরাই মাছ চাষ করি।
প্রদীপও নেড়ার সাথে তালে তাল মেলায়।
তা করলেই হয়। তোদের জন্য এখন তো আর আমাদের খাওয়া-পরার অভাব নেই।
ও কথা বলো না দিদি, শুরুটা তুমিই করেছিলে।
তোরা না থাকলে কি এতটা সম্ভব হতো!
হ্যাঁ, যা বলছিলাম দিদি, কালকে বরং কোন একজন জেলেকে নিয়ে আসি। একবার জাল দেওয়া হোক। তারপর কিছু মাছ ছেড়ে, চাষ শুরু করব।
তবে তাই কর।
পরদিন জেলেরা পুকুরে জাল নামায়। কয়েকটা ল্যাঠা, তিনটে কই, একটা শিঙি মাছ পড়ে। জেলেরা বলে এই পুকুরে কিচ্ছু হবে না।
জেলেদের পাওনা গন্ডা মিটিয়ে দিলে তারা চলে যায়। তখন নেড়া বলে, দিদি শুনলে তো জেলেদের কথা! তোমার কাছে দিব্যি করছি, এই পুকুর থেকে মাছ চাষ করে দেখাবো।
ন্যাড়ার কথার ধরন থেকে সবাই হেসে ওঠে।
তোমরা হাসছো দিদি!
নারে, তোর কথায় হাসছি না। কথা বলার ধরনের জন্য হাসছি। আর এই কথাটা মাথায় ঢোকাতে পেরেছিলাম বলেই আজকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছি।
দুদিন যেতে না যেতেই ন্যাড়া একটা হাড়ি করে কোথা থেকে মাছ নিয়ে হাজির। চলো দিদি, আজকে পুকুরে মাছ ছাড়বো। সবাই একসাথে পুকুরের কাছে যায়। হাড়িটা নেড়াই আসতে আসতে পুকুরের জলে ডুবিয়ে বসিয়ে দেয়। বলে কিভাবে ছাড়তে হয় তাও তো জানিনা। শুধু দেখেছি, মাছ ছাড়ার আগে জলে হাত দিয়ে চাপড়ায়। দেখো, হাড়ি থেকে মাছ গুলো কেমন বাইরে বেড়িয়ে যাচ্ছে।
কি মাছ রে ওগুলো?
কোন ভাল মাছ নয় এগুলো দিদি। এগুলো সবই নাইলোটিকার বাচ্চা। তেলাপিয়ার মতো। তবে খুব বড় বড় হয়। বাজারে খুব বেশি দামে বিক্রি হয় না। তবে শুনেছি, পুকুরে একবার ছাড়লে, আর ছাড়তে হয় না। কিছুদিন ছাড়া ছাড়া শুধু তুলতে থাকো।
তাই যেন হয়, প্রদীপ বলে।
কিন্তু এদের কি খাবার দিতে হবে, নন্দিনী জিজ্ঞাসা করে।
কোন খাবার দিতে হবে না। পুকুরের নোংরা খেয়েই এটা বড় হয়।
দেখা যাক কি হয়।
পুকুর ছেড়ে আবার সবাই বাগানে উঠে আসে। বাগানে আজকে নতুন মাচা তৈরী করতে হবে। সেই মতো প্রদীপ, নেড়া আর নকুল কাজে লেগে পড়ে। আগের মত এখন আর শুধু কঞ্চি দিয়ে তৈরি নয়, বাঁশ কেটে আগে স্ট্রাকচার তৈরি করে, তার উপরে কঞ্চি।
মাচা তৈরি করতে করতে অনেকটা সময় কেটে যায়। তখন সন্ধ্যা হতে আর বেশি দেরী নেই, এমন সময় একজন এসে জানায়, উচ্চ মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেড়িয়েছে। কালকে এগারোটায় স্কুল থেকে মার্কশিট দেবে। কারো নাম্বার জানা যায় নি, তবে নকুলও পাশ করেছে, এটা জানায়।
সকাল থেকেই খুশির হাওয়া। নকুল যে শুধু পাশ করেছে, এই জন্য নয়। আজকে সকালেই একটা গাড়ী এসে বাড়ির সামনে দাঁড়ায়। তারা গ্রাম থেকে সবজি নিয়ে শহরে বিক্রি করে। প্রতিদিনই তারা এখান থেকে সবজি কিনবে জানায়।
এমনিতেই অনেক সবজি উৎপাদন হওয়ায়, বিক্রির চিন্তাই ভোগাচ্ছিল। এখন আর সেই চিন্তাও রইল না। তাদের গাড়িতে সবজি তুলে দিলে, তারাও দাম পত্র মিটিয়ে দেয়। তারপরে সবাই মিলে স্কুলের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়ে।
স্কুলে পৌছতেই কুন্তল বাবু নকুলকে জড়িয়ে ধরেন।
আজকে তোর জন্যই সবার কাছে স্কুলের নাম ছড়িয়ে পড়েছে। খবরের কাগজেও আমাদের স্কুলের নাম বেড়িয়েছে। শহরের নামী দামি সব স্কুলের সবাইকে টেক্কা দিয়ে নকুল আর্স বিভাগে প্রথম হয়েছে।
এদিকে নন্দিনীর চোখে জল। কিছুতেই আনন্দ চেপে রাখতে পারে না। এমন সময় নকুল এসে দিদিকে প্রণাম করে বলে, সব হয়েছে শুধু তোর জন্যই। তুই না থাকলে এতদিনে হয়তো পড়াশোনাই ছেড়ে দিতাম। তাই আমার এই ফল আসলে তোরই।
সবাইকে আবেগঘন মুহূর্ত থেকে সরিয়ে, প্রদীপ বলে, দিদি আজকে আর ছাড়ছি না, আজকে কিন্তু মিষ্টি খাওয়াতে হবে। আড় পাড়ার সবাইকে বলে দিচ্ছি।
ওর বলার ধরন দেখে সকলে একসাথে হেসে উঠি।