কলমে : রায়হানা ইয়াসমিন রায়
রাত তখন আড়াইটা কি তিনটে। পুরো বাড়ি নিঃশব্দতাই ডুবে আছে। মেহুল তখন আদ্রিয়নের পড়ার টেবিলে মাথা রেখে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।আদ্রিয়ান নিজের চেয়ার ছেড়ে ধীর পায়ে মেহুলের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। ল্যাম্পের হলদেটে আলোয় মেহুলের ঘুমন্ত মুখটা আজ বড় বেশিই মায়াবী লাগছে। আদ্রিয়ান কিছুক্ষন একদৃষ্টিতে সেই মুখের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।তারপর খুব সাবধানে, যেন মেহুলের ঘুম না ভাঙে, ওকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিজের বিছানায় শুইয়ে দিল।
মেহুলকে নিজের বিছানায় শুইয়ে দেওয়ার পর আদ্রিয়নের মনে হলো, ঘরের বাতাস যেন হঠাৎই ভারী হয়ে গেছে। বুঁকের ভেতর এক অদ্ভুদ অস্তিরতা আর তোলপাড়। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়ে সে আর রুমে থাকলো না, সোজা চলে গেলো বারান্দায়।
পকেট থেকে লাইটার বার করে একটা সিগারেট ধরালো। অন্ধকারে আগুনের ছোট এক ফুলকি জ্বলে উঠলো। সারা রাত আদ্রিয়ান এক ফোটাও ঘুমাতে পারেনি। সে বারান্দার গ্রিল ধরে আছে, আর একের পর ওকে সিগারেট পুড়িয়ে ছাই করলো আদ্রিয়ান, কিন্তু মনের ভেতর ঝড় থামলো না।ভরের আলো ফুটতেই শেষ সিগারেটটা পিষে বাথরুমে ঢুকে গেলো, লম্বা শাওয়ার নেওয়ার উদ্দেশ্যে।যাতে মনের এই অস্তিরতা অন্তত কিছুটা কমে।
মেহুলের যখন ঘুম ভাঙলো, সে মুহূর্তের জন্য বুঝতে পারলো না সে কোথায়। চারপাশ টা চেনা অথচ বিছানাটা অচেনা। নরম কম্বলের ওম ছেড়ে আড়মোড়া ভাঙতে গিয়েই মেহুলের মনে পড়লো— সে তো কাল রাতে আদ্রিয়নের রুমে এসেছিলো পড়তে!
মনে পড়লো কাল রাতের সেই মুহূর্তটা.....
আদ্রিয়নের ধমকে যখন মেহুল কাঁদতে শুরু করেছিল, তখন আদ্রিয়নের রূপ যেন মুহূর্তেই পাল্টে গিয়েছিলো।সে একদম নরম স্বরে বলেছিলো— "রিলাক্স মাইরা রিলাক্স! তু্ই কথাই কথাই ছিচকাঁদুনির মতো কাঁদিস কেনো?"
মেহুল চোখের মানি মুছতে মুছতে বলেছিলো— আমি মোটেই ছিঁচকাঁদুনে নয়। আদ্রিয়ান তখন আলতো হেসে বলেছিলো —"হয়েছে হয়েছে! আর বকবক করতে হবে না, এবার পড়।"
এরপর ওকে আদ্রিয়ান অনেক সুন্দর করে পড়া বুঝিয়ে দিচ্ছিলো।মেহুল পড়তে পড়তেই কখন যে ঘুমে ঢোলে পড়েছে,, ও নিজেই জানে না।
মেহুলের ভাবনার মাঝে ছেদ ঘটলো বাথরুরমের দরজা খোলার আওয়াজে। আর মুহূর্তেই ওর চোখ কপালে উঠলো। আদ্রিয়ান বাথরুম থেকে বের হচ্ছে— পরনে কেবল একটা সাদা টাওয়াল, উমুক্ত ফর্সা বুক আর ভেজা গায়ে পানির কণা চিকচিক করছে। মেহুল ভয়ে চিৎকার দিতে যাবে, ঠিক তখনি আদ্রিয়ান এক লাফে বিছানায় এসে মেহুলের মুখ শক্ত করে চেপে ধরলো।
"চুপ চুপ,,!! একদম চিৎকার করবি না মাথামোটা,!এতো সকালে তোকে আমার রুমে দেখলে মা কি ভাববে?" —আদ্রিয়নের তপ্ত নিঃশাস মেহুলের মুখের ওপর আছড়ে পড়ছে। আদ্রিয়নের ভেজা চুল থেকে টপ–টপ করে পানি ঝরে মেহুলের মুখ ভিজিয়ে দিচ্ছে।মেহুল পিটপিট করে চোখ খুলে দেখলো, সে আদ্রিয়নের খুব কাছে। আদ্রিয়নের সাথে চোখে চোখ পড়তেই,ওর সারা শরীরে এক অদ্ভুদ শিহরণ বয়ে গেল।দুজনেই কয়েক মুহূর্ত একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলো। আদ্রিয়ান তড়িঘড়ি করে নিজেকে সামলে নিয়ে সরে দাঁড়ালো মেহুলের থেকে। অত্যন্ত ধীর অথচ কঠিন গলায় বলল—
"যা, তোর রুমে যা। খুব সাবধানে যাবি, কেউ যেন না দেখে। কেউ দেখলে পুঁতে ফেলবো তোকে। আর শোন্ যদি কেউ দেখেও নেই, বলবি ছাদে গিয়েছিলাম। মনে থাকবে।"
মেহুল শুধু মাথা নেড়ে রোবটের মতো ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। নিজের রুমের কাছে যেতেই দেখা হলো আরাধ্যার সাথে। আরাধ্যা অবাক হয়ে বলল—
"ইরা দিদি, তুমি এতো সকালে ওদিক থেকে আসছো যে?"
মেহুল তোতলাতে তোতলাতে বলল—
"না মানে, ছাদে গিয়েছিলাম রে। আমি যাই,, সামনে পরীক্ষা।"
এই বলে মেহুল নিজের রুমে ঢুকে হাফ ছেড়ে বাঁচলো। দরজার আড়ালে আদ্রিয়ান সব টা শুনে হালকা হাসলো— যাক তার পাগলিটা শিখিয়ে দেওয়া কথা গুলো ঠিকমতো বলতে পেরেছে।
খানিক বাদে শাওয়ার নিয়ে রেডি হয়ে নিচে নামলো মেহুল।ডাইনিং টেবিলে মেহুলের ফুফু নিশিতা বেগম খাবারের তদারকি করছেন। মেহুল খাচ্ছে আর ফোনের মধ্যে কি যেন দেখছে। আদ্রিয়ানো ব্রেকফাস্ট করতে বসেছে। মেহুল ফোনে থেকে মাতা তুলে সামনে তাকাতেই বিষম খেলো। কাশতে কাশতে মেহুলের অবস্থা খারাপ তাও আদ্রিয়নের কোনো নড়চড় নেই। ফুফু রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে মেহুলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন— "কিরে মা,, শরীরটা কি এখনো খারাপ? আদ্রিয়ান, তু্ই তো ওর সামনেই বসে আছিস ওকে একগ্লাস পানি এগিয়ে দিতে পারতিস না?কোনো ভ্রূক্ষেপই নেই ছেলেটার!"
আদ্রিয়ান নিষ্পৃহভাবে নিজের খাওয়া চালিয়ে গেল, যেন সে মেহুল কে চিনেই না।
খাওয়া শেষ করে আদ্রিয়ান বেরোতে যাবে, তখনি নিশিতা বেগম বললেন— "আদ্রিয়ান,, মেহুল কে সাথে নিয়ে যা না বাইকে।" আদ্রিয়ান কিছুতেই রাজি হচ্ছিলো না কিন্তু মায়ের জেদের কাছে শেষমেষ হার মানতেই হলো। মেহুল এই প্রথমবার আদ্রিয়নের বাইকে উঠবে। বাইক স্টার্ট দিয়ে আদ্রিয়ান নিচু স্বরে বলল— "ধরে বসবি, পরে গেলে আমি কিছু জানি না।" মেহুলের খুব অস্বস্থি হছিলো ওর কাঁধে হাত দিতে, তাই সে না ধরেই বসলো।
রাস্তার মাঝপথে হুট করেই বাইক থামিয়ে দিলো। গম্ভীর গলায় বলল— "নাম বাইক থেকে,,একটা কথা বললে যখন কানে যাই না তোর, তখন তু্ই হেঁটেই যা। আর খবরদার,, যদি মায়ের কাছে বলেছিস আমি তোকে মাঝপথে নামিয়ে দিয়েছি,, তবে তোর অবস্থা আমি কি করবো তু্ই কল্পনাও করতে পারবি না।" এই বলেই আদ্রিয়ান ধুলো উড়িয়ে চলে গেলো। মেহুল রাগে ফুসতে ফুসতে মনে মনে যাতা গালি দিতে লাগলো আদ্রিয়ানকে। এমন জায়গায় নামালো যেখানে একটা রিকশা পাওয়াও দেয়। বাকিটা পথ হেঁটেই কলেজে পৌঁছাতে হলো ওকে।
কলেজের গেটে সায়ন কে দেখা মাত্রই মেহুলের বুক ঢিপঢিপ করতে লাগলো।আদ্রিয়নের কাল রাতের হুমকির কথা মনে পড়লো। সেই ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে আদ্রিয়নের কেবিনের দিকে তাকালো মেহুল। আর ওখানেই বাঘের ভয়,,! আদ্রিয়ান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মেহুলের দিকে তাকিয়ে আছে। সায়ন কিছু বলতে যাবে তার আগেই মেহুল বলল— "আমার শরীর ভালো নেই সায়ন, সামনে পরীক্ষা, আমি এখন কোনো কথা বলতে পারবো না। সায়ন কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেহুল হনহন করে ভেতরে চলে গেলো ওপর থেকে আদ্রিয়নের ঠোঁটে বিজয়ী হাসি ফুটে উঠলো।
সেকেন্ড পিরিয়ড ছিল আদ্রিয়নের। ক্লাসের ভেতর পিনপতন নীরবতা, সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে আদ্রিয়নের জন্য।আদ্রিয়ান ক্লাসে ঢুকলো। ক্লাসে ঢুকতেই সবার নজর আটকে গেলো আদ্রিয়নের ওপর। সচরাচর সে ফর্মাল স্যুট বা ডার্ক কালারের ব্লেজার পরে,, কিন্তু আজ সে শুভ্র সাদা রঙের শার্ট পড়েছে। শার্টের হাতাগুলো কুনুই পর্যন্ত নিখুঁত ভাবে গোটানো। হাতে লেকচার শিট।ওকে আজ অন্যরকম উজ্বল আর অবিশ্বাস্য রকমের আকর্ষণীয় লাগছে। ইতি মধ্যে ক্লাসের কিছু ছাত্রীদের মধ্যে ফিসফাঁস শুরু হয়ে গেলো— স্যার কে আজ কি মারাত্মক লাগছে, সাদা শার্টে যেন স্যার পুরোই আগুন। হঠাৎ ক্লাসের সবচেয়ে অহংকারী মেয়ে "শিমরান" উঠে দাঁড়ালো।সে তার চুলের গোছা কানের পিছনে গুঁজতে গুঁজতে লাজুক হেসে বলল— "স্যার,, অপনাকে আজ খুব সুন্দর লাগছে।"
পুরো ক্লাস নিঃসব্দ হয়ে গেলো আদ্রিয়নের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায়। আদ্রিয়ান লেকচার শিটটা টেবিলে রাখতে রাখতে শিমরানের দিকে না তাকিয়েই বলল— "থ্যাংকস।"
তখন ক্লাসের বাকি মেয়েরা আহ্লাদে আটখানা হলেও মেহুলের পিত্তি জলে গেলো। সে মনে মনে বিড়বিড় করে বলল— "হ্যাঁ! সুন্দর রূপ তো দেখবেই! ওনার ওই খিটখিটে মেজাজ আর আগুনের মত রাগটা যদি দেখতে, তখন বুঝতে কতো ধানে কত চাল। যত সব ঢং!"
হুট্ করেই আরশি মেহুলকে কুনুই দিয়ে ধাক্কা দিয়ে বলল— "এই মেহুল একা একা কি বকছিস? ভুতে ধরলো নাকি তোকে.?"
মেহুল হড়বড়িয়ে গিয়ে জিভ কাটলো। অপ্রস্তুত হয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল— "কোই কিছু না তো!"
আদ্রিয়ান ডাস্টরাটা হাতে নিয়ে ক্লাসে দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল— "ওকে ক্লাস সাইলেন্স, এবার পড়াই মন দাও!"
আদ্রিয়ান ডাস্টারটা হাতে নিয়ে বোর্ডে দিকে তাকালো,ওর শরীরের পেশিগুলোর খাঁজ শার্টের উপর দিয়ে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। আদ্রিয়ান যখন লেকচার দিচ্ছিলো, আর লেকচার দেয়ার ফাঁকে ফাঁকে মেহুল কে দেখছিলো। এই চাহনিতে আজ কোনো কঠোরতা ছিল না, ছিল এক গভীর মাদকতা আর নেশা। আদ্রিয়ান যখনই তাকাচ্ছিলো, মেহুলের মনে হচ্ছিলো ওর শিরদাড়া দিয়ে এক তীব্র শীতল স্রোত বয়ে যাচ্ছে। আদ্রিয়নের ওই নেশা লাগানো চোখের চাউনি মেহুলড় শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগিয়ে তুলছিলো।
মনে হচ্ছিলো, ক্লাসের এই ভিড়ের মাঝেও আদ্রিয়ান যেন তার চোখের মায়ায় মেহুলকে একদম একলা করে ফেলছে। মেহুলের বার বার মনে পড়ছিলো সকালের এই মুহূর্তটার কথা,, লজ্জা আর আবেশে ওর দম বন্ধ হয়ে আসছিলো, তবুও ও এক অজানা তৃষ্ণায়য় বারবার সেই চোখেই হারাচ্ছিলো।