Mayador - 4 in Bengali Love Stories by Rayhana Yasmin Ray books and stories PDF | মায়াডোর - পর্ব 4

Featured Books
Categories
Share

মায়াডোর - পর্ব 4

রাত তখন ১২টা ২৫। পুরো শহর ঘুমিয়ে পড়লেও আজ চৌধুরী বাড়িতে ঘুমের নামগন্ধ নেই। দীর্ঘ এক বছর পর বাড়ির কর্তা আফতাব চৌধুরী বিদেশ থেকে ফিরেছেন। সাথে একমাত্র আদরের বোন রাবেয়া বেগমও এসেছেন দাদাকে দেখতে। ড্রয়িং রুমে যেন চাঁদের হাট বসেছে। মেজাজটাও বেশ ফুরফুরে সবার। আদ্রিয়ানের মা , আব্বু , ফুফু আর ফুফুর দুই ছেলে-মেয়ে সারা আর আরান মিলে গল্পের খই ফোটাচ্ছে। কিন্তু সেই আড্ডায় মেহুলের থাকা একদম বারণ। আদ্রিয়ানের কড়া শাসন— 'মেহুলের এখন আড্ডা দেওয়ার সময় নয়, এক্সাম চলছে তাই ওকে পড়তে হবে'।

এদিকে আরাধ্যা আজ কোনোভাবেই মায়ের কাছে ঘুমাবে না, তার বায়না সে মেহুলের কাছেই ঘুমাবে। ডিনার শেষে যখন বিছানা নিয়ে কথা হচ্ছিল, তখন নিশিতা চৌধুরী সহজের সুরেই বললেন— "সারাও বরং মেহুলের রুমেই ঘুমিয়ে পড়ুক।"

কথাটা শোনামাত্রই আদ্রিয়ানের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে গম্ভীর গলায় প্রতিবাদ করে বলল— "মেহুলের রুমে কেন? আরো তো অন্য রুম আছে, সারা সেখানে থাকুক। মেহুলের এখন এক্সাম, ও রাত জেগে পড়ে; সারার ঘুমের ডিস্টার্ব হবে।"

সারা ভাবলো আদ্রিয়ান ভাইয়া বুঝি তার ঘুমের কথা ভেবেই এতো চিন্তিত ! কিন্তু মেহুলের বুঁকের ভেতর টা অভিমানে টনটন করে উঠলো, মেহুলের মুডটা মুহূর্তেই তেতো হয়ে গেল। সে ভাবল, আদ্রিয়ান সারাকে নিয়ে একটু বেশিই আদিখ্যেতা করছে। আসলে আদ্রিয়ান যে মেহুলের পড়ার ডিস্টার্ব হবে ভেবেই সারাকে সরাতে চেয়েছিল, তা মেহুল ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারল না।

আদ্রিয়ানের আব্বু আরাধ্যাকে বুঝিয়ে বলল সারার সাথে ঘুমাতে, কিন্তু ছোট আরাধ্যা জেদ ধরে বলল— "না! আমি ইরা দিদির কাছে ছাড়া কারোর কাছে ঘুমাবো না।" 
সারা যখন তাকে জিজ্ঞেস করল কেন তার কাছে ঘুমাবে না, আরাধ্যা স্পষ্ট জানিয়ে দিল সে, "ইরা দিদির কাছেই ঘুমাবো মানে ঘুমাবো" । পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আদ্রিয়ান আরাধ্যার দিকে তাকিয়ে দিয়ে বলল— "ঠিক আছে এতো বায়না করতে হবে না। যা রুমে যা! তুই এখনো দাঁড়িয়ে আছিস কেন মাইরা? তোর না এক্সাম চলছে? দিন দিন ফাঁকিবাজ হয়ে যাচ্ছিস । যা রুমে যা!"

মেহুল আর কোনো কথা বলার সুযোগ পেল না। অভিমানে মুখ কুঁচকে গটগট করে নিজের রুমে চলে গেল।

---

পড়ার টেবিলে বসলেও মেহুলের মন বইয়ের পাতায় নেই। বারবার তার মনের কোণে দুপুরের সেই দৃশ্যটা ভেসে উঠছে। ভাবলে এখনো মেহুলের গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। আদ্রিয়ান না থাকলে এখন হয়তো সে হসপিটালের বেডে শুয়ে ব্যথায় ছটপট করছে ।

দুপুরে আদ্রিয়ান ওকে আইসক্রিম কিনে দেওয়ার পর যখন রাস্তা পার হতে যাচ্ছিল,ঠিক সেই মুহূর্তে আদ্রিয়ানকে ওর মা ফোন করে,আর ও রাস্তা থেকে সরে আসে কথা বলার জন্য,আদ্রিয়নের আব্বুকে ওর এয়ারপোর্টে আনতে যাওয়ার ছিল, আর মেহুলকে ও খাইয়েছে কিনা জানার ছিল নিশিতা চৌধুরীর তাই জন্য ফোন করা আদ্রিয়ানকে।আর মেহুল তখন একাই রাস্তা পার করছিলো,মেহুল লক্ষ্যই করেনি পেছন থেকে একটা বাইক দ্রুত গতিতে ধেয়ে আসছে। একদম শেষ মুহূর্তে আদ্রিয়ান পেছন থেকে মেহুলের হাত শক্ত করে টেনে নিজের বুকের ওপর নিয়ে আসে। মেহুল তখন এতটাই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল যে আদ্রিয়ানের বুকের ধকপকানি শুনতে শুনতে মাথা তুলে শুধু বলল— "**আমি বেঁচে আছি?**"

আদ্রিয়ান তখন রাগে ফেটে পড়ছিল। সে মেহুলকে ছাড়িয়ে নিয়ে গজগজ করতে করতে বলল— "**একটা থাপ্পড় মারবো তোকে! কে বলে ছিল তোকে একা একা রাস্তা পার হতে? যখন পারিস না রাস্তা পার হতে, কেনো গিয়েছিলি? অপেক্ষা করা যাচ্ছিলো না আমার জন্য দু মিনিট?**"

মেহুল কাঁচুমাচু হয়ে বলল— "আমি পারি রাস্তা পার হতে।" আদ্রিয়ানের রাগে তখন কপালের রগ দপদপ করছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল— "এবার কিন্তু তুই সত্যি মার খাবি! আর একটা কথা বললে দেখবি কী হয়, চল এখন!"

গাড়িতে উঠে সিটবেল্ট লাগাতে লাগাতে আদ্রিয়ান অত্যন্ত ব্যথাতুর গলায় বিড়বিড় করে বলল— "**তুই আমার জান নিয়ে তবেই শান্তি পাবি মনে হয়।**"
মেহুল অত্যন্ত নরম সুরে পালটা প্রশ্ন করল— "**জান গেলে তো আমার যাবে, তোমার কেন?**"

কথাটা শোনা মাত্রই আদ্রিয়ান চিবিয়ে চিবিয়ে বলল— "**আবার কথা বলছিস তুই? এবার কিন্তু সত্যিই মারবো তোকে!**" 
রাগের চোটে আদ্রিয়ান গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে একের পর এক জোরে ঘুসি মারতে শুরু করল। আদ্রিয়ানের এমন হিংস্র রূপ দেখে মেহুল এবার সত্যিই ভয় পেয়ে গেল। সে আদ্রিয়ানের হাতটা আলতো করে ধরার চেষ্টা করে খুব শান্ত স্বরে বলল— "**আচ্ছা সরি, আর হবে না এমন। প্লিজ শান্ত হও, তোমার হাতে ব্যথা লাগবে।**"

মেহুলের ওই মায়াভরা অনুরোধে আদ্রিয়ান যেন মুহূর্তেই পাথর হয়ে গেল। তার দীর্ঘদিনের জমানো রাগ নিমেষেই জল হয়ে গেল। সে একটু গম্ভীর হয়ে মেহুলের দিকে তাকিয়ে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল— "**হয়েছে হয়েছে, তোকে আর ইনোসেন্ট সাজতে হবে না। তুই আমাকে একদিন পাগল করে ছাড়বি মাইরা!**"

মেহুল যখন বুঝল তার কথায় কাজ হয়েছে এবং আদ্রিয়ান শান্ত হয়েছে, তখন সে আড়ালে মুখ টিপে মুচকি হাসল। আর সেই হাসির প্রতিচ্ছবি আদ্রিয়ান গাড়ির মিররে দেখে ফেলল। নিজের অজান্তেই আদ্রিয়ানের ঠোঁটের কোণেও তখন একচিলতে হাসি ফুটে উঠল।

---

এখন রাত প্রায় ১টা ৪০। ড্রয়িং রুমে সারার জন্য আদ্রিয়ানের সেই তথাকথিত দরদের কথা মনে পড়তেই মেহুলের মনটা আবার বিষিয়ে উঠল। কিছুতেই পড়ায় মন বসছে না, অস্থিরতা বাড়ছে। মেহুল ঠিক করল একটু ছাদের খোলা আকাশ দেখে আসবে।

হাতে ফোন নিয়ে মনে সাহস সঞ্চয় করে পা টিপে টিপে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হলো মেহুল। কিন্তু চিলেকোঠার দরজার কাছে পৌঁছাতেই সে থমকে গেল। দরজা খোলা! মেহুল বিড়বিড় করল— "ওমা! ছাদের দরজা খোলা কেন? চোর-ডাকাত ঢুকলো নাকি বাড়িতে!" ভয়ে মেহুলের বুক ঢিপঢিপ করছে। সে আর ছাদে যাওয়ার সাহস পেল না, বরং ফুফুকে ডাকার জন্য নিচে নামতে শুরু করল। ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা শক্ত হাত মেহুলের কবজি ধরে হ্যাঁচকা টান দিল। মেহুল চিৎকার করতে গিয়েও পারল না, কারণ এক জোড়া শক্ত হাত তার মুখ চেপে ধরেছে।

আদ্রিয়ান হিশহিশিয়ে ফিসফিস করে বলল— "**চুপ! সবসময় কথায় কথায় চেঁচাস কেন?**"
আদ্রিয়ানের পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে মেহুলের ধড়ে যেন প্রাণ ফিরে এল। আদ্রিয়ান মুখ ছেড়ে দিলেও মেহুলের কবজি ছাড়ল না। ঘুটঘুটে অন্ধকারে শুধু মেহুলের ফোনের ফ্ল্যাশ লাইটে ওদের চোখাচোখি হলো। মুহূর্তের জন্য সময় যেন থমকে গেল সেখানে। মেহুল অতি শীতল স্বরে বলল— "**ছাড়ো!**"

আদ্রিয়ান দ্রুত কবজি ছেড়ে দিল, কিন্তু ছাড়া মাত্রই মেহুল সিঁড়ি দিয়ে পা ফসকে পড়ে যেতে নিলে আদ্রিয়ান আবার তাকে টেনে নিজের কাছে নিয়ে এল। এবার আদ্রিয়ান কিছুটা বিরক্ত হয়ে হিশহিশিয়ে বলল— "**ছাড়তে পারবো না রে! ছাড়লেই যদি তুই আবার পড়ে যাস? তখন তোর কোমর ভেঙে যাবে, আর তখন তোর মতো অচল কে নিয়ে আমি চলতে পারবো না।**"

মেহুলের খুব অভিমান হলো লোকটার কথায়। সে মুখ ফুলিয়ে বলল— "মোটেই না! আমি আর পড়বো না, ছাড়ো আমায়!"
আদ্রিয়ান একটু ভাব নিয়ে বলল— "ছাড়লাম কিন্তু!"
বলেই আদ্রিয়ান হাত সরিয়ে নিল। মেহুল আবারও ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যেতে গেলে সে নিজেই আতঙ্কিত হয়ে আদ্রিয়ানের টি-শার্ট খামচে ধরল। এবার আদ্রিয়ান তাকে ধরল না। সে হাসকি স্বরে রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল— "**দেখ, এবার কিন্তু তুই-ই ধরেছিস আমায়, আমি ধরিনি তোকে!**"
বলেই আদ্রিয়ান মেহুলের কোমর ধরে ঘুরিয়ে ছাদের খোলা জায়গায় দাঁড় করিয়ে ছেড়ে দিল।

আদ্রিয়ান জিজ্ঞেস করল— "এত রাতে ছাদে কী করতে আসছিলি তুই? ঘুমোসনি কেন?"
মেহুল মুখ ভার করে বলল— "ভালো লাগছিল না, তাই একটু ছাদে আসছিলাম।"
"তাহলে আবার চলে যাচ্ছিলি কেন?"
"ছাদের দরজা খোলা দেখে ভাবলাম বাড়িতে চোর ঢুকেছে, তাই ফুফুকে ডাকতে যাচ্ছিলাম।"
"ওহ! যা এবার রুমে যা।"
মেহুল অনুনয় করে বলল— "একটু থাকি না প্লিজ!"
"আচ্ছা... একটুই কিন্তু, তারপর ঘুমাতে চলে যাবি।"

মেহুল চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ তার নাকে সিগারেটের কড়া গন্ধ এল। পেছন ফিরে দেখল আদ্রিয়ান খুব আয়েশ করে ধোঁয়া ছাড়ছে। মেহুল কাছে গিয়ে বলল— "তুমি স্মোক করো ভাইয়া? স্মোক করা ভালো নয়।"
আদ্রিয়ান গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল— "**তোর কী?**"

আদ্রিয়ান মেহুলকে কীভাবে বোঝাবে সে কত বড় চিন্তার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে! দুপুরে বাড়ি ফেরার পথে আফতাব চৌধুরী যখন বলেছিলেন—
"মেহুল মায়ের জন্য এবার উপযুক্ত পাত্র দেখতে হবে।"
তখন অবশ্য আদ্রিয়ান বলেছিলো— "আগে ও নিজের মেয়ে দাঁড়াক, তারপর না হয় এই সব নিয়ে ভাবা যাবে। অন্যের ঘাড়ের বোঝা বাড়ানোর তো কোনো মানে হয় না।"
আফতাব চৌধুরী তখন ছেলের কথায় একটু বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন— আহা,, বোঝা হতে যাবে কেনো? চাকরিওয়ালা দেখে মেহুলের বিয়ে দেবো।

সেই থেকেই আদ্রিয়ানের মাথার ভেতরে একরাশ চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে । মেহুলকে অন্য কারো হাতে তুলে দেওয়ার কথা ভাবতেই তার পৃথিবী ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। মেহুল আবার প্রশ্ন করল— "কী হলো? কথা বলছো না কেন?"

আদ্রিয়ান এবার গম্ভীর আর রূঢ় স্বরে বলল— "**যা রুমে যা, অনেক রাত হয়েছে। আর একটা কথা বললে ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেবো!**"
মেহুল আর কিছুই বলল না আদ্রিয়নের হুমকির ভয়ে। সে মনে মনে ভাবলো—"চলে যাই বাবা রিস্ক নেওয়া যাবে না, এই তারকাটা লোককে বিস্বাস নেই যদি সত্যিই ফেলে দেই।” 

আদ্রিয়ান একাকী দাঁড়িয়ে রইল সেই নিকষ কালো আকাশের নিচে। সিগারেটের শেষ ধোঁয়াটা আকাশের দিকে ছেড়ে খুব নিচু ও গম্ভীর স্বরে গেয়ে উঠল—

Khamoshiyan.....
Awaaz hai, tum sunne to aao kabhi
Chhukar tumhein khil jayengi
Ghar inko bulao kabhi.....

Bekarar hai baat karne ko
Kehne do inko zara.....

Khamoshiyan...
Teri meri khamoshiyan...

---

**(চলবে...)**

---