Mayador - 3 in Bengali Love Stories by Rayhana Yasmin Ray books and stories PDF | মায়াডোর - পর্ব 3

Featured Books
Categories
Share

মায়াডোর - পর্ব 3

আজ মেহুলের এক্সাম। সারা রাত পড়ার পর ভোরের দিকে যখন ফজরের আজান দিল, মেহুল উঠে নামাজ পড়ে নিল। আজ আর ঘুমাল না, বরং নিচে নেমে গেল ফুফুকে সাহায্য করতে। আজ আদ্রিয়ানের আব্বু, **আফতাব চৌধুরী**, দীর্ঘ এক বছর পর সৌদি আরব থেকে বাড়ি ফিরছেন। শুধু আব্বু নন, আজ আদ্রিয়ানের একমাত্র ফুফু **রাবেয়া বেগম** উনার ছেলে আরান আর মেয়ে সারাকে নিয়ে আসছেন দাদাকে স্বাগত জানাতে। বাড়িতে আজ এলাহি কাণ্ড, খুশির আমেজ!

সকাল সাতটা। মেহুল কিচেনে ফুফুকে আদা কুচিয়ে দিচ্ছিল, এমন সময় আদ্রিয়ান নিচে নামল। পরনে আজ একটা ধূসর রঙের টি-শার্ট আর ব্ল্যাক ট্রাউজার। এই ক্যাজুয়াল লুকেও লোকটাকে বড্ড বেশি সুন্দর লাগে—মেহুল আড়চোখে একবার দেখে নিয়ে আবার কাজে মন দিল। কিচেনে মেহুলকে দেখেই আদ্রিয়ানের কপালে ভাঁজ পড়লো চোখমুখ শক্ত হয়ে এল।

"মায়রা! তোর আজ থেকে এক্সাম না? তোর এখন স্টাডি টেবিলে থাকার কথা, তুই কিচেনে কী করছিস?"—আদ্রিয়ানের গলার স্বরে কিচেনের ব্যস্ততা থমকে দিল।

নিশিতা চৌধুরী পাশ থেকে বলে উঠলেন, "আহা, হয়েছে! সকাল সকাল মেয়েটাকে বকতে শুরু করলি কেন? ও তো আমাকে একটু সাহায্যই করছিল। আর তোর ফুফুও তো তার ছেলে-মেয়ে নিয়ে এখনই চলে আসবে, বাড়িতে মেহমান আসবে বলে কথা!"

আদ্রিয়ান এবার মায়ের দিকে তাকিয়ে কঠোর গলায় বলল, "তোমার আস্কারাতেই ও এত ফাঁকিবাজ হয়েছে মা। পড়া বাদ দিয়ে এসব করার কোনো মানে হয় না। কী হলো? এখনও দাঁড়িয়ে আছিস কেন? কথা কানে যায় না? যা এখান থেকে!"

মেহুল আর একটা কথা বলার সাহস পেল না। কিচেন থেকে ও প্রায় দৌড়ে নিজের রুমে চলে গেল। ঝটপট শাওয়ার নিয়ে রেডি হয়ে বেরোনোর সময় ফুফু অনেক করে খেতে বললেন, কিন্তু মেহুল খেল না। একটা জেদ চেপেছে ওর মনে। "ফিরে এসে খাব ফুফু"—বলেই ও বেরিয়ে পড়ল।

...

পরীক্ষা বেশ ভালো হয়েছে। হল থেকে বেরিয়ে মেহুল দেখল সবাই চলে গেছে। ও রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু এই ভরদুপুরে কোনো রিকশা নেই। রোদ যেন পিঠ পুড়িয়ে দিচ্ছে। মেহুল ঠিক করল হেঁটেই যাবে। কিছুটা এগোতেই একটা পরিচিত হর্ন শুনে চমকে উঠল ও। ওর সামনে এসে থামল আদ্রিয়ানের সেই পরিচিত "ব্ল্যাক মার্সিডিজ"।

গাড়ির গ্লাস নামিয়ে আদ্রিয়ান নির্লিপ্ত গলায় বলল, "গাড়িতে ওঠ।"

মেহুল অবাক! যে লোকটা কাল মাঝরাস্তায় বাইক থেকে নামিয়ে দিয়েছিল, সে আজ গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে?মেহুল ভাবলো আজকেও যদি গাড়ি থেকে নামিয়ে দেই, "না বাবা রিক্স নিয়ে যাবে না। আমি উঠবো না।
মেহুল নড়ল না দেখে আদ্রিয়ান নিজেই গাড়ি থেকে নেমে এল। মেহুলের কবজি শক্ত করে ধরে হিড়হিড় করে টেনে গাড়ির সামনের সিটে বসিয়ে দিল।

"দয়া করে সিটবেল্টটা লাগা!"—আদ্রিয়ানের গলা যেন বরফের মতো শীতল। মেহুল স্ট্যাচুর মতো বসে আছে। মেহুলকে নড়তে না দেখে আদ্রিয়ান এবার ধমক দিয়ে উঠল, "কানে কম শুনিস নাকি? একটা থাপ্পড় মারব বেয়াদব!"

মেহুল হকচকিয়ে বলল, "ইয়ে মানে ভাইয়া... আমি তো এটা পরতে পারি না।"
আদ্রিয়ান দাঁত কিড়মিড় করে বলল, "সেটা আগে বললেই হতো! বোবার মতো চুপ করে আছিস কেন?"

আদ্রিয়ান এবার মেহুলের দিকে অনেকটা ঝুঁকে এল। মেহুলের নাকে আদ্রিয়ানের শরীর থেকে
 আসা '𝗕𝗹𝘂𝗲 𝗱𝗲 𝗖𝗵𝗮𝗻𝗲𝗹' এর সেই আভিযাত্য মাখা তীব্র সুবাস আর তপ্ত নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে। মেহুল আড়ষ্টতায় চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। সিটবেল্টটা লক করার শব্দ হলো। কিন্তু আদ্রিয়ান সরল না। মেহুলের একদম কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে গম্ভীর আর বিদ্রূপের সুরে ফিসফিস করে বলল—

**"এইভাবে চোখ বন্ধ করার কী আছে? আমি কি তোকে কিস করব নাকি? যত সব!"**

মেহুল চট করে চোখ খুলল। ওর মুখটা তখন অপমানে আর তীব্র লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে গেছে। ইস! লোকটা এতোই নির্লজ্জ! আগে জানতাম না।মেহুল লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়ে জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। ওর হার্টবিট তখন ড্রামের মতো বাজছে!

...

গাড়ি এসে থামল একটা দামী রেস্টুরেন্টের সামনে। আদ্রিয়ান বলল, "নামবি, নাকি কোলে করে নামাতে হবে?"
মেহুল মনে মনে ভাবল, "কী অসভ্য আর ঠোঁটকাটা লোক রে বাবা!"

ভেতরে ঢুকে একটা নিরিবিলি টেবিলে বসল ওরা। আদ্রিয়ান গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, "কী খাবি?"
"আমি কিছু খাব না।"—মেহুল মৃদুস্বরে বলল।

সকাল থেকেই মেহুলের ওপর আদ্রিয়ানের মেজাজ চড়ে আছে। মেহুলকে পরীক্ষা শুরুর এক ঘণ্টা আগে বাড়ি থেকে বেরোতে দেখেছিল ও। ভেবেছে সায়নের সাথেই দেখা করতে গিয়েছে (যদিও মেহুল গিয়েছিলো ওর বন্ধু নীলার কাছে ওর বই আনতে, যেখানে সায়নের সাথে শুধু হাই–হ্যালো হয়েছিল।)

আদ্রিয়ান ধমকে উঠল, "একটা থাপ্পড় দেব! তোকে কে বলেছে এত কথা বলতে? আমি যা বলব, সেটাই শুনবি। এখন যা অর্ডার করব, তাই খাবি।"

আদ্রিয়ান চিকেন আর পরোটা অর্ডার করল। খাবার আসার পর ও মেহুলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, "বাড়িতে না খেয়ে বেরিয়েছিলি কেন? সায়নের সাথে দেখা করার খুব তাড়া ছিল, তাই না?"

মেহুল তোতলাতে লাগল, "আমি... আমি তো নীলার..."
"চুপ! একটা কথা বলবি না। কথার অবাধ্য হওয়ার শাস্তি বাড়িতে গিয়ে পাবি।"

খাবার সামনে দিয়ে আদ্রিয়ান বলল, "খা! খেয়ে উদ্ধার কর।"
মেহুল কাঁচুমাচু হয়ে বলল, "তুমি খাবে না?"
"না।"
"কেন?"
"ইচ্ছে তো করছে তোকে খেয়ে ফেলি!"—আদ্রিয়ানের চোখের চাহনি পাল্টে গেল।
মেহুল থতমত খেয়ে বলল, "মা... মানে?"
"বেশি কথা বলছিস মাইরা, এবার কিন্তু সত্যিই মার খাবি।"

মেহুলের কেন জানি না আজ খুব ইচ্ছে করছে এই রগচটা লোকটাকে একটু জ্বালাতে । ও একটু ঝুঁকে, আদ্রিয়ানের খুব কাছে গিয়ে মায়াবী সুরে আদুরে গলায় ডাকল—
"**আদি......**"

ডাকটা শোনামাত্রই আদ্রিয়ানের বুকটা ধক করে উঠল। ও মেহুলের চোখের দিকে তাকাতেই মেহুল ওর গজদন্তি বের করে একটু দুষ্টু হাসি হেসে বলল—
"**......ভাইয়া!**"

আদ্রিয়ানের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল। নিমেষেই যেন সব রাগ উধাও! ও আমতা আমতা করে বলল, "কী... কী হয়েছে?"
মেহুল বিনিয়ে বিনিয়ে বলল, "একটু খাও না।"
আদ্রিয়ান যেন কোনো ঘোরের মধ্যে চলে গেলো। 
কিছুই বলছে না।
মেহুল এবার একটু ঝাঁজ নিয়ে বলল,
 "আদি ভাইয়া"....
আদ্রিয়ান এবার অত্যন্ত নরম, নেশাতুর সুরে বলল, "**হুম...**"
এই একটা 'হুম' শব্দে যেন জাদু ছিল। মেহুলের সারা শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল।

আদ্রিয়ান নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, "কি হলো, চুপ করে গেলি কেনো? বল!" 
মেহুল ঘাবড়ে গিয়ে বলল, "না.....কিছু না।"

মেহুলের যখন মাথা নিচু করে বাধ্য মেয়ের মতো পরোটা ছিঁড়ে মুখে দিচ্ছে, আদ্রিয়ান তখন এক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রইলো। মেহুলের ওই শান্ত মুখ আর একটু আগে সুর করে ডাকা "আদি".... ডাকটা আদ্রিয়নের বুকের ভেতর তোলপাড় করে দিচ্ছে।
আদ্রিয়ান মনে মনে বলল— "বড্ড জ্বালাচ্ছিস আমায় মাইরা। নিজের এই অবাধ্য দুষ্টুমিগুলো একটু সামলে রাখ। আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে পালানোর পথ খুঁজে পাবি না। তখন তোর এই প্রতিটা দুষ্টুমির হিসাব আমি তোর থেকেই বুঝে নেব। আর সেদিন চাইলেও তুই আমার থেকে নিস্তার পাবি না।"

খাওয়া শেষ করে ওরা বাইরে বেরোল। মেহুলের অবাক হওয়ার তখন আরও বাকি ছিল। আদ্রিয়ান হঠাৎ পকেটে হাত দিয়ে বলল, "আইসক্রিম খাবি?"

মেহুল বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রইল। যে মানুষটা তাকে সব সময় ধমকের ওপর রাখে, সে কি না এখন আইসক্রিম খাওয়াতে চাইছে? আদ্রিয়ান চৌধুরী কি আসলেই দু'জন মানুষ?

**(চলবে...)**

---
আদ্রিয়ানের এই শাসন আর কেয়ারের মাঝে মেহুল কি নিজের মনকে সামলাতে পারবে? নাকি মেহুলের প্রতিটা অবাধ্যতার হিসাব খুব শীঘ্রই বুঝে নেবে আদ্রিয়ান? 
আপনাদের উৎসাহিত থাকলে চতুর্থ পর্ব খুব শ্রীঘ্রই দেবো..!🎀