The last train didn't stop. in Bengali Horror Stories by Sudip Maity books and stories PDF | শেষ ট্রেনটা থামেনি

Featured Books
Categories
Share

শেষ ট্রেনটা থামেনি

রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। রতনপুর স্টেশন অদ্ভুতভাবে ফাঁকা। দিনের সেই কোলাহল নেই, নেই লোকজনের ভিড়, শুধু দূরে কোথাও একটা ট্রেনের হুইসেল মাঝেমধ্যে শোনা যাচ্ছে।

আমি, অর্ণব, অফিস থেকে ফিরছিলাম। আজ কাজের চাপে দেরি হয়ে গেছে, আর বাড়ি ফিরতে হলে এই শেষ লোকাল ট্রেনটাই ধরতে হবে। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছিল—যেন কিছু একটা ঠিক নেই। বাতাস ভারী, আলো জ্বলছে ঠিকই, কিন্তু সেই আলোয় উষ্ণতা নেই, বরং একটা ঠান্ডা নিস্তব্ধতা চারদিকে ছড়িয়ে আছে। 

প্ল্যাটফর্মের এক কোণে একটা চায়ের দোকান খোলা ছিল। ভাবলাম, এক কাপ চা খেয়ে নিই। দোকানের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই দোকানদার আমার দিকে তাকাল—তার চোখে একটা অদ্ভুত দৃষ্টি, যেন সে আমাকে দেখে চিনে ফেলেছে। আমি বললাম, “একটা চা দিন।” সে চুপচাপ চা বানাতে লাগল, তারপর হঠাৎ বলল, “আজ ট্রেন ধরবেন না, বাবু…” 

আমি হেসে বললাম, “কেন? শেষ ট্রেন তো রোজই চলে।” লোকটা ধীরে বলল, “সব ট্রেন একরকম হয় না…” তার গলায় এমন একটা চাপা ভয় ছিল, যেটা অভিনয় মনে হয় না। তবুও আমি গুরুত্ব দিলাম না। চা শেষ করে প্ল্যাটফর্মে ফিরে এলাম। ঘড়িতে তখন ১১:৪৫। কোনো ঘোষণা নেই। হঠাৎ দূরে একটা আলো দেখা গেল, আর কোনো শব্দ ছাড়াই একটা ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢুকে পড়ল। আশ্চর্যের বিষয়—কেউ উঠছে না, কেউ নামছেও না। 

পুরো প্ল্যাটফর্ম ফাঁকা, অথচ ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। বুকের ভেতর কেমন যেন ধকধক করছিল, কিন্তু বাড়ি ফেরার তাড়ায় উঠে পড়লাম। ভেতরে ঢুকেই বুঝলাম, কিছু একটা অস্বাভাবিক। কামরাটা প্রায় ফাঁকা, কয়েকজন লোক বসে আছে, কিন্তু তারা কেউ নড়ছে না, কথা বলছে না, মাথা নিচু করে বসে আছে। আমি জানালার পাশে একটা সিটে বসলাম। ট্রেনটা ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল।

প্রথমে সব স্বাভাবিক লাগছিল, কিন্তু কিছুক্ষণ পর বুঝলাম, ট্রেনটা কোনো স্টেশনে থামছে না। জানালার বাইরে শুধু অন্ধকার, মাঝে মাঝে ছায়া ছুটে যাচ্ছে। আমি পাশের লোকটাকে জিজ্ঞেস করলাম, “এই ট্রেনটা কোথায় থামবে?” লোকটা ধীরে মাথা তুলল, আর তার চোখ দেখে আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল—চোখে কোনো সাদা অংশ নেই, পুরো কালো। সে ফিসফিস করে বলল, “যেখানে নামার, সেখানেই নামবেন…” 

আমি আর কিছু বলতে পারলাম না। হঠাৎ লাইটটা একবার ফ্লিক করল, তারপর আবার জ্বলল। এবার দেখলাম, কামরার সব লোক আমার দিকে তাকিয়ে আছে। একসাথে। তাদের মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, শুধু তাকিয়ে আছে। আমি উঠে দাঁড়ালাম, অন্য কামরায় যাওয়ার জন্য দরজার দিকে এগোলাম। দরজাটা বন্ধ। জোরে টানলাম, খুলল না। ধাক্কা দিলাম, তবুও না।

তখনই পিছন থেকে একটা ঠান্ডা গলা শোনা গেল—“এভাবে পালাতে পারবেন না…” আমি ঘুরে দাঁড়ালাম। একজন বয়স্ক লোক দাঁড়িয়ে আছে, তার মুখে অদ্ভুত হাসি। সে বলল, “কোথায় নামবেন?” আমি কাঁপা গলায় বললাম, “বর্ধমান…” সে হেসে বলল, “ওখানে আর কেউ নামে না…” আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল। “কেন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

সে ধীরে ধীরে আমার কাছে এসে বলল, “কারণ এই ট্রেনটা জীবিতদের জন্য নয়…” কথাটা শেষ হতেই আমার মাথা ঘুরে উঠল। আমি জানালার দিকে তাকালাম। ট্রেনটা একটা ভাঙা, অন্ধকার স্টেশনে ঢুকছে। কোনো আলো নেই, প্ল্যাটফর্ম ভাঙা, একটা সাইনবোর্ড আধভাঙা অবস্থায় দাঁড়িয়ে—তাতে লেখা ‘শ্মশানঘাট’। 

ট্রেনটা থামতেই সব দরজা একসাথে খুলে গেল। কামরার লোকগুলো ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল, আর একসাথে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। তাদের মুখ বিকৃত হয়ে যাচ্ছে, চোখ গর্তের মতো, ঠোঁট ফেটে হাসি বেরোচ্ছে। আমি দৌড়ে দরজার দিকে গেলাম, আর কোনোভাবে লাফ দিয়ে নিচে নেমে পড়লাম। মাটিতে পড়ে গিয়ে গড়িয়ে উঠলাম, হাঁপাতে হাঁপাতে পিছনে তাকালাম। ট্রেনটা আবার চলতে শুরু করেছে।

কিন্তু প্রতিটা জানালায় সেই মুখগুলো—সবাই আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। আমি উঠে দৌড়াতে লাগলাম। স্টেশনটা পুরো ফাঁকা, চারদিকে কুয়াশা, দূরে শ্মশানের আগুন জ্বলছে। হঠাৎ পিছন থেকে একটা গলা—“তুমি পালাতে পারবে না…” আমি পিছনে তাকালাম, কেউ নেই। আবার দৌড়ালাম। হঠাৎ পা আটকে গেল। নিচে তাকিয়ে দেখি, মাটির ভেতর থেকে একটা হাত বেরিয়ে এসে আমার পা চেপে ধরেছে। আমি চিৎকার করে উঠলাম।

তারপর একের পর এক হাত বেরোতে লাগল মাটির নিচ থেকে, আমাকে টেনে ধরছে। আমি প্রাণপণে ছাড়ানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারছিলাম না। সেই সময় হঠাৎ সব অন্ধকার হয়ে গেল। যখন চোখ খুললাম, দেখি আমি হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছি। পাশে পুলিশ আর কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে। তারা বলল, আমাকে রেললাইনের পাশে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া গেছে। আমি বেঁচে গেছি—কিন্তু সবকিছু কি সত্যিই শেষ? 

বাড়ি ফিরে আসার পরও রাতে ঘুমোতে পারি না। চোখ বন্ধ করলেই সেই ট্রেনটা দেখি। সেই মুখগুলো দেখি। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপারটা হলো—আমার মোবাইলের ঘড়ি। যেদিন সেই ঘটনাটা ঘটেছিল, তখন সময় ছিল রাত ১২:১৭। কিন্তু আজও, এতদিন পরও, আমার ফোনে সেই একই সময় আটকে আছে—১২:১৭। 

আর মাঝে মাঝে, গভীর রাতে, জানালার বাইরে তাকালে আমি এখনও দেখি—দূরে একটা ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে, কোনো শব্দ নেই, শুধু অন্ধকারে তার জানালাগুলো জ্বলজ্বল করছে… আর সেই জানালার ভেতর থেকে কেউ একজন আমার দিকে তাকিয়ে আছে… ধীরে ধীরে হাসছে… আর ফিসফিস করে বলছে—“পরের বার… তুমি নামতে পারবে না…”



গল্পটা একদম গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো 😨🔥
শেষ ট্রেনের এই concept টা সত্যিই mind-blowing—শেষ পর্যন্ত suspense ধরে রেখেছে 👏
এমন গল্প পড়লে সত্যিই রাতে ঘুম আসতে চায় না 😶‍🌫️

ভালো লাগলে অবশ্যই comment করুন আর আমাকে follow করতে ভুলবেন না ❤️📖