"সব ভালোবাসার গল্পের শেষ এক হয় না। কিছু ভালোবাসা পৃথিবীর নিয়ম ভেঙে জন্ম নেয়, আর কিছু ভালোবাসা দুই ভিন্ন জগতের মাঝখানে আটকে যায়। এই গল্পটা ঠিক তেমনই—একজন মানুষের মেয়ে লামিয়া আর এক শক্তিশালী জীন হাবিবের গল্প। তারা কেউই জানত না, একবার দেখা হওয়ার পর তাদের ভাগ্য এমনভাবে জড়িয়ে যাবে যে ভালোবাসা আর বিচ্ছেদের সীমারেখাও একসময় মুছে যাবে। কিন্তু মানুষ আর জীনের এই অসম্ভব সম্পর্ক কি শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পেরেছিল, নাকি নিয়তির কাছে হার মেনেছিল? উত্তরটা লুকিয়ে আছে এই দীর্ঘ, রহস্যময়, ভালোবাসায় ভরা গল্পের প্রতিটি অধ্যায়ে…"
সেদিন রাতটা ছিল অদ্ভুত নীরব। আকাশে চাঁদ ছিল না, শুধু কালো মেঘে ঢাকা আকাশ আর দূরে দূরে বিদ্যুতের চিকচিক আলো। শিলিগুড়ির এক ছোট্ট গ্রামের শেষ প্রান্তে থাকত লামিয়া। শান্ত, লাজুক আর বই পড়তে ভালোবাসা একটা মেয়ে। গ্রামের সবাই তাকে চিনত, কিন্তু খুব কম মানুষই জানত যে লামিয়ার মনে সবসময় একটা অজানা শূন্যতা কাজ করত। যেন সে কাউকে খুঁজছে, অথচ জানে না কাকে।
সেদিন কলেজ থেকে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গিয়েছিল। বৃষ্টিও শুরু হয়েছিল হঠাৎ করে। শর্টকাট রাস্তা ধরে বাড়ি ফিরছিল লামিয়া। সেই রাস্তার পাশেই ছিল পুরোনো এক আমবাগান, যেটাকে গ্রামের মানুষ “জীনের বাগান” বলে ডাকত। লোকজন বলত, সন্ধ্যার পর সেখানে গেলে অদ্ভুত সব ছায়া দেখা যায়। কিন্তু বৃষ্টির মধ্যে আর কোনো পথ না থাকায় লামিয়া সেই বাগানের ভেতর দিয়েই হাঁটতে লাগল।
হঠাৎ খুব জোরে বজ্রপাত হলো। ভয়ে লামিয়া চোখ বন্ধ করে ফেলল। আবার চোখ খুলতেই দেখল, তার সামনে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। সাদা পাঞ্জাবি, ভেজা চুল, আর গভীর কালো চোখ। ছেলেটা শান্ত গলায় বলল, “তুমি ভয় পেয়েছ?”
লামিয়া একটু পিছিয়ে গিয়ে বলল, “আপনি কে?”
ছেলেটা হালকা হাসল। “আমার নাম হাবিব।”
“এই বাগানে এত রাতে?”
“আমি তো এখানেই থাকি।”
কথাটা শুনে লামিয়ার গা শিউরে উঠল। কিন্তু অদ্ভুতভাবে ছেলেটার চোখে কোনো ভয় ছিল না, বরং ছিল এক ধরনের মায়া। বৃষ্টি আরও বাড়ছিল। হাবিব বলল, “চলো, তোমাকে রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছে দিই।”
সেই রাতেই শুরু হলো তাদের পরিচয়।
তারপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই লামিয়ার সঙ্গে হাবিবের দেখা হতে লাগল। কখনো নদীর ধারে, কখনো আমবাগানে, কখনো সন্ধ্যার ঠিক আগে। হাবিব খুব কম কথা বলত, কিন্তু লামিয়ার সব কথা মন দিয়ে শুনত। লামিয়া হাসলে হাবিব চুপচাপ তাকিয়ে থাকত। একদিন লামিয়া মজা করে বলল, “তুমি সবসময় এমন চুপচাপ থাকো কেন?”
হাবিব একটু দূরে তাকিয়ে বলল, “কারণ আমি জানি, এই সময়টা খুব বেশি দিন থাকবে না।”
কথাটা শুনে লামিয়ার বুকটা কেমন করে উঠল। “মানে?”
“একদিন তুমি আমাকে আর দেখতে পাবে না।”
“এমন কথা বলো না।”
হাবিব উত্তর দিল না। শুধু মৃদু হেসে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
দিন যেতে লাগল। লামিয়া বুঝতেই পারল না কখন হাবিব তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ হয়ে উঠেছে। সে অপেক্ষা করত শুধু বিকেল হওয়ার জন্য। একদিন নদীর ধারে বসে লামিয়া বলল, “হাবিব, তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?”
হাবিব দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “মানুষের ভাষায় যার নাম ভালোবাসা, আমি সেটা অনুভব করি।”
“তাহলে বলো না, তুমি আমাকে ভালোবাসো।”
হাবিব প্রথমবারের মতো সরাসরি লামিয়ার চোখের দিকে তাকাল। “আমি তোমাকে এতটাই ভালোবাসি যে তোমার জীবনে অন্ধকার নামুক, সেটা আমি কখনো চাই না।”
সেদিন লামিয়া হাবিবের হাত ধরতে গিয়েছিল। কিন্তু ছুঁতেই থেমে গেল। হাতটা ছিল বরফের মতো ঠান্ডা। লামিয়া অবাক হয়ে বলল, “তোমার হাত এত ঠান্ডা কেন?”
হাবিব ধীরে ধীরে হাত সরিয়ে নিল। “কারণ আমি তোমাদের মতো নই, লামিয়া।”
“মানে?”
চারপাশের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। আমগাছের পাতা কাঁপতে লাগল। হাবিব নিচু গলায় বলল, “আমি মানুষ নই। আমি জীন।”
কথাটা শুনে লামিয়ার শরীর কেঁপে উঠল। সে কয়েক পা পিছিয়ে গেল। “না… এটা মিথ্যে!”
“মিথ্যে হলে ভালো হতো।”
“তাহলে এতদিন…?”
“হ্যাঁ। আমি তোমার কাছে এসেছিলাম কারণ প্রথম দিন তোমাকে দেখে আমার মনে হয়েছিল, এই পৃথিবীতে এমন একজন আছে যে আমাকে ভয় পায় না।”
লামিয়ার চোখে জল চলে এল। “তুমি আগে বলোনি কেন?”
“কারণ আমি জানতাম, সত্যিটা জানলে তুমি হয়তো আমাকে ছেড়ে চলে যাবে।”
কিন্তু লামিয়া চলে গেল না। বরং ধীরে ধীরে আবার সামনে এগিয়ে এসে বলল, “তুমি জীন হও বা মানুষ, আমার কাছে তুমি শুধু হাবিব।”
সেই রাতে প্রথমবার হাবিবের চোখে জল দেখা গেল।
তারপর তাদের ভালোবাসা আরও গভীর হলো। কিন্তু সুখ যেন তাদের জন্য খুব বেশি দিন লেখা ছিল না। গ্রামের এক বৃদ্ধ ফকির খবর পেল যে আমবাগানে এক জীন মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করছে। তিনি সতর্ক করে বললেন, “মানুষ আর জীনের ভালোবাসার শেষ কখনো ভালো হয় না।”
লামিয়ার পরিবারও সব জানতে পারল। তাকে বাড়ি থেকে বের হতে নিষেধ করা হলো। কিন্তু ভালোবাসা কি কোনো দেয়ালে আটকে থাকে? এক অমাবস্যার রাতে লামিয়া চুপিচুপি বেরিয়ে আমবাগানে গেল।
হাবিব সেখানে অপেক্ষা করছিল। কিন্তু আজ তার মুখে অদ্ভুত কষ্টের ছাপ।
“তুমি এসেছ…”
“আমি না এসে পারতাম?”
হাবিব বলল, “আজ আমাদের শেষ দেখা।”
“কেন?”
“আমাদের জগৎ আর তোমাদের জগতের দরজা আজ বন্ধ হয়ে যাবে। আমাকে ফিরে যেতে হবে।”
লামিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব কীভাবে?”
হাবিব তার চোখের জল মুছে দিল। “ভালোবাসা কখনো হারায় না, লামিয়া। মানুষ শুধু তার প্রিয় মানুষটাকে দেখতে পায় না।”
চারপাশে ঝড় শুরু হলো। বাতাসে কালো ধোঁয়ার মতো ছায়া ঘুরতে লাগল। হাবিবের শরীর ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসছিল।
“হাবিব!”
“ভয় পেও না। আমি সবসময় তোমার কাছেই থাকব।”
“যেও না… প্লিজ যেও না…”
হাবিব শেষবারের মতো হাসল। “আমি যদি মানুষ হতাম, তোমার হাত ধরে সারাজীবন পাশে থাকতাম।”
তারপর এক ঝলক সাদা আলো চারপাশ ভরে দিল। আলো মিলিয়ে যেতেই হাবিব আর সেখানে ছিল না।
লামিয়া অনেকক্ষণ আমবাগানে দাঁড়িয়ে রইল। বৃষ্টি নামল ধীরে ধীরে। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “তুমি কথা দিয়েছিলে, পাশে থাকবে।”
সেই দিন থেকে লামিয়া আর কখনো হাবিবকে দেখেনি। কিন্তু গ্রামের মানুষ মাঝে মাঝে বলে, অমাবস্যার রাতে আমবাগানের ভেতর দিয়ে গেলে এক সাদা পাঞ্জাবি পরা ছায়া দূর থেকে তাকিয়ে থাকে। আর বাতাসে ভেসে আসে একটা পরিচিত কণ্ঠ—
“লামিয়া…”