ইন্সপেক্টর অনিকেত প্রথমেই বাড়ির সমস্ত দরজা-জানালা পরীক্ষা করলো।
হরিপদকে যেখানে পাওয়া গেছে, তার আশেপাশে কোনো লড়াইয়ের চিহ্ন নেই। দোতলার জানালাগুলো ভিতর থেকে বন্ধ ছিল। মূল ফটকে পাহারা ছিল। বাইরের কেউ সহজে বাড়িতে ঢুকতে পারেনি।
"বাড়ির মধ্যে কোনও গোপন পথ আছে?" ইন্সপেক্টর অনিকেত জিজ্ঞেস করলো।
নিবারণ মাথা নেড়ে বললো , "জানি না, স্যার।"
"জানি না, না কি বলতে চাইছো না ?" ইন্সপেক্টর অনিকেত জিজ্ঞাসা করলো।
নিবারণ চুপ করে রইল।
ইন্সপেক্টর অনিকেত বিরক্ত হয়ে বললো , "দেখো, একটা খুন হয়েছে। এখানে ভূতের গল্প শোনার সময় আমার নেই।"
নিবারণ তাঁর দিকে তাকালো তারপর বললো , "আপনি ভূতে বিশ্বাস করেন না, স্যার?"
ইন্সপেক্টর অনিকেত বললো , "না।"
নিবারণ বললো , "তাহলে এই বাড়িতে রাত কাটান।"
ইন্সপেক্টর অনিকেত কিছু বললো না।
রাত আটটার দিকে ইন্সপেক্টর অনিকেত হরিপদর ঘরের তল্লাশি করলো। আলমারিতে পুরোনো দলিল, জমির কাগজ, কিছু হিসাবের খাতা আর কয়েকটি চিঠি পাওয়া গেলো।
একটি চিঠির উপরে লেখা ছিল—
'মৃণালিনী দেবীর ঘটনার প্রকৃত বিবরণ।'
চিঠিটি খোলা ছিল না।
অনুব্রত সেটা হাতে নিয়ে কাঁপতে লাগলো ।
"এটা কোথায় পেলেন?" অনুব্রত জিজ্ঞাসা করলো ।
"হরিপদ মিত্রর আলমারি থেকে," ইন্সপেক্টর বললো ।
চিঠি খুলে পড়া হলো। লেখাটি হরিপদ মিত্রের।
'১৯৮৬ সালের আশ্বিন মাসের অমাবস্যার রাতে জমিদারবাড়ির উত্তর দিকের ঘরে যে ঘটনা ঘটেছিল, তার সাক্ষী আমি। সুশান্তবাবুর নির্দেশে আমি সেই রাতের সমস্ত প্রমাণ নষ্ট করেছিলাম। কিন্তু আমি জানি, মৃণালিনী দেবী বাড়ি ছেড়ে যাননি। তাঁকে হত্যা করা হয়েছিলো । আর সেই হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল এই বাড়ির আরও তিনজন মানুষ।'
চিঠিটা সেখানেই শেষ।
অনুব্রত বুকের ভিতরটা ঠান্ডা হয়ে গেলো।
"তাহলে আমার মা..." অনুব্রত মনে মনে বললো।
ইন্সপেক্টর অনিকেত চিঠিটা ভাঁজ করে পকেটে রাখলো এবং বললো , "আমরা এর উত্তরটা খুঁজে বের করবো।"
সেই রাতে অনুব্রত আর ঘুমোতে পারল না। রাত একটা নাগাদ সে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো । করিডরে মৃদু নীল আলো। দূরে তেরো নম্বর ঘরের সামনে কেউ বসে আছে।
সাদা শাড়ি। খোলা চুল।
অনুব্রত ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো।
"মা?" অনুব্রত বললো ।
মহিলাটি মাথা তুলল। তার মুখ দেখা গেলো না। চুলে ঢাকা। কিন্তু তার হাতে ছিল একটা ছোট্ট কাঠের পুতুল। অনুব্রত চিনতে পারল পুতুলটাকে। ছোটোবেলায় মা তাকে এই পুতুলটা উপহার দিয়েছিল। মহিলাটি পুতুলটা দরজার সামনে রেখে উঠে দাঁড়াল। তারপর ধীরে ধীরে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেলো। অনুব্রত ছুটে গিয়ে পুতুলটা তুলে নিলো।
পুতুলের পিঠে নখ দিয়ে লেখা ছিল কয়েকটি অক্ষর।
'দক্ষিণের দেওয়াল।'
পরদিন সকালে অনুব্রত ইন্সপেক্টর অনিকেতকে কথাটা জানালো।
দক্ষিণের দেওয়াল ছিল পুরোনো নাচঘরের পিছনে। বহু বছর ধরে সেখানে কেউ যেত না। দেওয়ালের একটি অংশ অন্য অংশের তুলনায় নতুন ইট দিয়ে গাঁথা। ইন্সপেক্টর অনিকেত লোক ডেকে দেওয়াল ভাঙালো।
ইট সরাতেই বেরিয়ে এলো একটা সরু ফাঁকা জায়গা। তার ভিতরে কাপড়ে মোড়া একটি ডায়েরি।
ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—
মৃণালিনী রায়চৌধুরীর ব্যক্তিগত ডায়েরি।
অনুব্রতর হাত কাঁপছিল। সে প্রথম পাতাটা খুলল।
'আজ বুঝলাম, আমার স্বামী শুধু নিষ্ঠুর মানুষ নন। তিনি ভয়ংকর কিছু একটা লুকিয়ে রেখেছেন। প্রতি অমাবস্যায় তিনি উত্তর দিকের ঘরে যান। সঙ্গে থাকে সুকান্ত, হরিপদ আর একজন অচেনা তান্ত্রিক।
তারা ঘরের ভিতরে কী করে, জানি না।
কিন্তু গতকাল রাতে আমি একটা মেয়ের কান্না শুনেছি। আজ সকালে উঠোনে রক্ত দেখলাম। আমি ভয় পাচ্ছি। যদি আমার কিছু হয়, তবে আমার ছেলে অনুব্রতকে সত্যিটা জানিও।'
পরের পাতায় লেখা—
'মেয়েটার নাম কুসুম। তার বয়স মাত্র সতেরো। সে এই বাড়িতে কাজ করতে এসেছিলো। আজ তিন দিন ধরে তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
সুশান্ত বলেছে, কুসুম পালিয়ে গেছে। কিন্তু আমি জানি, সে মিথ্যে বলছে।'
অনুব্রতর চোখ ঝাপসা হয়ে এলো ।
পাতা উল্টাতে গিয়ে সে দেখল, শেষ কয়েকটি পাতা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে।
শুধু একটি লাইন পড়া যাচ্ছিলো ।
'যদি আজ রাতে আমি মারা যাই, তবে মনে রেখো, তেরো নম্বর ঘরের ভিতরে যে আছে, সে আমার মতোই একজন মা।'
অনুব্রত ডায়েরিটা বন্ধ করলো। ঠিক সেই সময় বাড়ির পিছনের পুকুর থেকে একটা চিৎকার ভেসে এলো । সবাই ছুটে গেলো। পুকুরের জলের উপর ভেসে উঠেছে একটা মৃতদেহ।
সুশান্ত চৌধুরী।
তার চোখ দুটো উপড়ে নেওয়া হয়েছে। বুকের উপর রক্ত দিয়ে লেখা—
'দ্বিতীয় পাপের শাস্তি।'